'শনিবার বিকেল': জঙ্গীবাদ প্রত্যাখান ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের বার্তা

Mon, Aug 15, 2022 10:54 PM

'শনিবার বিকেল': জঙ্গীবাদ প্রত্যাখান ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের বার্তা

সৈকত রুশদী : চলমান ১১-দিনব্যাপী 'দক্ষিণ এশিয়ার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব টরন্টো'র চারটি চলচ্চিত্র দেখা হলো চারদিনে। 'নো ল্যান্ড'স ম্যান', 'শনিবার বিকেল', 'রেহানা মরিয়ম নূর' ও 'Deep6'।

প্রথম দু'টি নির্মাণ করেছেন বাংলাদেশী চলচ্চিত্রকার মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তৃতীয়টি বাংলাদেশী চলচ্চিত্রকার আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ এবং আর চতুর্থটি ভারতীয় চলচ্চিত্রকার মধুজা মুখার্জী নির্মিত।

চারটি চলচ্চিত্রই দেশ-বিদেশের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত ও প্রশংসিত।

শনিবার বিকেলে উপভোগ করলাম 'শনিবারের বিকেল'। সিনেপ্লেক্স ওডিওন-এর মর্নিংসাইড সিনেমাস প্রেক্ষাগৃহে।

জেনেছিলাম, বাংলাদেশে নতুন প্রজন্ম ও ধারার চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে বর্তমানে অগ্রণী মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত 'শনিবার বিকেল' বাংলাদেশে এক রেস্তোরাঁয় জঙ্গী হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমে গত কয়েকদিন ধরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানতে পারলাম, 'শনিবার বিকেল' বাংলাদেশ সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পায়নি।

ফলে ঔৎসুক্য নিয়েই চলচ্চিত্রটি দেখেছি। ঠিক কী কারণে বাংলাদেশ সেন্সর বোর্ড ছাড়পত্র না দিয়ে এই চলচ্চিত্রটি দেশে প্রদর্শন নিষিদ্ধ করেছে, তা' জানার আগ্রহ ছিল।'শনিবার বিকেল' দেখে তা' স্পষ্ট হলো না।

এই চলচ্চিত্রে ইসলাম ধর্মের নামে জঙ্গী হামলা, নিরীহ ও নিরাপরাধ মানুষ হত্যা ও নিপীড়ন এবং তার প্রতিবাদ তুলে ধরা হয়েছে। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশ বাংলাদেশে বিদেশী অতিথিকে বাঁচাতে এক ধর্মপ্রাণ মুসলমানের আত্মবিসর্জন দেখানো হয়েছে।

একটি সৃজনশীল শিল্পকর্মকে দর্শক-শ্রোতারা নিজস্ব, নানা ধরণের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেন। সেই হিসেবে এই চলচ্চিত্রটি নিয়ে আমার অতৃপ্তি রয়েছে। আরও একটু বেশি কিছুর প্রত্যাশা তৈরী হয়েছিল।

চলচ্চিত্রটিতে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনকারী বাংলাদেশকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ স্বীকারের উল্লেখ প্রাসঙ্গিক হতো। তা' নেই।

কিন্তু একটি সৃজনশীল শিল্প মাধ্যম হিসেবে 'শনিবার বিকেল' চলচ্চিত্রের ছাড়পত্র না পাওয়ার কোনো কারণ দেখছি না।

ছাড়পত্র না দেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে দুই রকমের তথ্য পাওয়া গেছে। সেন্সর বোর্ড সূত্র থেকে প্রথমে বলা হয়েছে, এই চলচ্চিত্র বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আহত করতে পারে। অর্থাৎ তাদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করতে পারে। পরে বলা হয়েছে, বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে পারে।

দু'টির কোনোটিই 'শনিবার বিকেল' চলচ্চিত্রের মর্মবাণীর সাথে সাযুজ্যপূর্ণ নয়।

প্রকৃতপক্ষে প্রথম দফাটি নিয়েই আলোচনা করা যেতে পারে। কেননা, বাংলাদেশ সেন্সর বোর্ড ছাড়পত্র দিক বা নিষিদ্ধই করুক, তার আইনগত সীমা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ। সঙ্গত কারণেই, বিদেশে অবাধে চলচ্চিত্রটির প্রদর্শন চলছে। এতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ বা উজ্জ্বল হয়েছে কিনা চলচ্চিত্রটির দর্শকরাই বলতে পারবেন।

আমার কাছে চলচ্চিত্রটিকে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণকারী কিছু মনে হয়নি।

প্রদর্শনী শেষে মঞ্চ থেকে দর্শকদের সাথে প্রশ্নোত্তরকালে পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জানালেন, এই চলচ্চিত্রটি ১ জুলাই ২০১৬ সালে ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান নামের এক রেস্তোরাঁয় জঙ্গী হামলার উপর ভিত্তি করে নয়। যেকারণে, ঐ দুঃখজনক ঘটনার কোনো চরিত্র এই চলচ্চিত্রে নেই।

উল্লেখ্য, হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গী হামলার ফলে ১৭ জন বিদেশী সহ ২২ জন মানুষ নিহত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে বেসামরিক কোনো স্থাপনায় কোনো ধরণের সহিংস হামলায় এটিই সর্বোচ্চ প্রাণহানি। এই বেদনাদায়ক ঘটনায় নিরীহ ও নিরাপরাধ মানুষের প্রাণহানির গভীর ক্ষত বাংলাদেশ এখনো বহন করছে। আরও দীর্ঘকাল তা' বহন করে যেতে হবে।

বাংলাদেশে বা অপর কোনো দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদের অজুহাতে এমন কোনো মর্মন্তুদ ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, তার বার্তা দিতে পারে 'শনিবারের বিকেল'।

সেন্সর বোর্ড ছাড়পত্র না দিলে বাংলাদেশের মানুষ সেই বার্তা থেকে বঞ্চিত হবে।

আর ভিন দেশের মানুষ মনে করবে ,'শনিবার বিকেল' নিষিদ্ধ করে ধর্মনিরপেক্ষ দাবিদার বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ধর্মীয় উগ্রবাদের নামে জঙ্গীদের সহিংস হামলা ও মানুষ হত্যা করা যে উচিৎ নয় এই বার্তাটিকেই নিষিদ্ধ করতে চাইছে।

আমি আশা করবো, সেন্সর বোর্ড নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে 'শনিবার বিকেল' বাংলাদেশে প্রদর্শনের জন্য ছাড়পত্র দেবে।

আর এর মাধ্যমে জঙ্গীবাদকে প্রত্যাখান করে এক অসাম্প্রদায়িক ও সহিষ্ণু সমাজ গঠনের বার্তাটি অবাধে বাংলাদেশের জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে সহায়তা করবে।

টরন্টো, সোমবার

১৫ আগস্ট ২০২২


Designed & Developed by Future Station Ltd.
উপরে যান