চলে গেলেন প্রবাসী অন্তপ্রাণ নূরুল ইসলাম

Tue, Jan 11, 2022 8:39 PM

চলে গেলেন প্রবাসী অন্তপ্রাণ নূরুল ইসলাম

সাঈদ চৌধুরী : মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও প্রবাসীর কথা গ্রন্থের লেখক নূরুল ইসলাম চলে গেছেন তাঁর স্থায়ী ঠিকানায়। ইন্না-লিল্লা-হি ওয়া ইন্না- ইলাইহি রা-জিউ-ন। ১১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় তিনি লন্ডনের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। তিনি স্ত্রী, একছেলে, এক মেয়ে এবং নাতি-নাতনি, আত্নীয় স্বজন ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। 

দুঃসাহসী সাধক ও গবেষক নুরুল ইসলাম ‘প্রবাসীর কথা’ নামে সহস্রাধিক পৃষ্ঠার গবেষণা গ্রন্থ রচনা করে জাতীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। ‘প্রবাসীর কথা’র লেখক হিসাবে ২০১২ সালে তিনি বাংলা একাডেমির ফেলোশিপ লাভ করেন। এই গ্রন্থে প্রবাসের সুখ-দুঃখ, যাপিত জীবনের সুবিধা-অসুবিধা এবং দেশবাসীর কাছে চাওয়া-পাওয়ার কথা ফুটে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে  বাঙালি জাতির সংগ্রাম গাথা জীবন কথা খুঁজে পেতে হলে এটি প্রথম এবং নির্ভরযোগ্য দলিল। তাঁর অক্লান্ত শ্রম ও মেধা এবং প্রবাস দর্শন পুরোপুরি বুঝতে হলে এই ঐতিহাসিক গ্রন্থটি পড়তেই হবে।

প্রবাসী অন্তপ্রাণ নুরুল ইসলাম ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য লন্ডন এসেছিলেন। এখানে এসেই আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। তখন দেশের শাসন ক্ষমতা পশ্চিমাংশে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছিল এবং পূর্ব পাকিস্তানে নানা ভাবে বৈষম্য সৃষ্টি হয়। এই বৈষম্যের অবসান ঘটাতে প্রবাসীরা সোচ্চার হন। নুরুল ইসলাম এই সংগ্রামে অংশ নিয়ে অল্পদিনে ছাত্র ও সুধী মহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। ১৯৬৩ সালে ‘ন্যাশনাল ফেডারেশন অব পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশন ইন গ্রেট ব্রিটেন’ গঠনের অন্যতম প্রধান ছিলেন। পরের বছর ১৯৬৪ সালে ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউস’ প্রতিষ্ঠায়ও তিনি অন্যতম সংগঠক ছিলেন।

আন্তর্জাতিক প্রচার তৎপরতার কৌশল নির্ধারণের জন্য বঙ্গবন্ধু সহ জাতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে মিলিত হবার জন্য ১৯৬৬ সালে তিনি দেশে যান। পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীনতার নামে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে পাক সরকার তাঁকে গ্রেফতার ও পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করে ফেলে। ফলে যথাসময়ে লন্ডনে ফিরে আসতে পারেননি। এতে লেখাপড়ার ব্যত্যয় ঘটে।

লেখক ও গবেষক নুরুল ইসলাম তখন দেশ থেকে ৬-দফা আন্দোলনের পক্ষে প্রচার তৎপরতায় সক্রিয় হন। তিনি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে ৪ ও ৫ নং সেক্টরের প্রতিনিধি দেওয়ান ফরিদ গাজীর (প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা সম্পন্ন) একান্ত সচিব ছিলেন।

১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারের কর্মসূচির অংশ হিসেবে বর্হিবিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়ে তিনি সচেষ্ট হন। বাংলাদেশ সরকারের ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি আব্দুস সামাদ আজাদের সফরসঙ্গী হিসেবে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রাপ্তির জন্য তার ইউরোপীয় বন্ধুদের মাধ্যমে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছেন।

স্বাধীনতা লাভের পর দেওয়ান ফরিদ গাজীর নেতৃত্বে বৃহত্তর সিলেটকে পূণর্গঠনের জন্য সিলেটের সকল সংসদ সদস্যকে নিয়ে ‘সিলেট জেলা প্রশাসন পরিষদ’ গঠিত  হয়। তিনি এই পরিষদের সচিব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এ সময় হানাদার বাহিনীর দোসর ও রাজাকারদের বিচারের জন্য গঠিত সিলেট জেলা ফ্যাক্ট ফাইণ্ডিং কমিটির কর্মকর্তা হিসেবেও বিশেষ দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রবাসীদের কল্যাণার্থে ‘প্রবাসী বাঙালি কল্যাণ বোর্ড’ গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর আস্তাভাজন হিসেবে প্রবাসী অন্তপ্রাণ নূরুল ইসলাম এই বোর্ডের সচিব হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট পর্যন্ত নিষ্ঠার সাথে সকল কাজ সম্পাদন করেন।

প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় সমন্বিত ভূমিকা পালনের জন্য ১৯৭৮ সালে সিলেটে ‘বাংলাদেশ ওভারসিজ সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। নুরুল ইসলাম ওভারসিজ সেন্টারের ট্রাস্ট্রি বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রবাসীদের বহুমুখী সমস্যা লাগবে প্রাণপাত করেছেন। 

বিশ্বমানের বাঙালি গবেষক নুরুল ইসলাম দেশের জন্য গভীরভাবে ভাবতেন, চিন্তা করেছেন। সাংবাদিকতা ও সমাজসেবাকে জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। তিনি লন্ডন থেকে প্রকাশিত পাকিস্তান টু-ডে  এবং পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত ডন পত্রিকার সংবাদ প্রতিনিধি হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তিনি প্রবাসীদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

সুলেখক নূরুল ইসলাম ১৯৩২ সালের ১ জুন সিলেট শহরতলীর সদরখলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ভাই জনপ্রিয় লেখক ও শিক্ষাবিদ মদন মোহন কলেজের অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম ৯ বছর আগে ইন্তেকাল করেছেন। তারা দুজনই ছাত্র জীবনে সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান ও সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সহপাটি ছিলেন। 

সিলেট এমসি কলেজে অধ্যয়নকালে নূরুল ইসলাম ১৯৫২-৫৩ সালে কলেজ ইউনিয়নের নির্বাচিত সেক্রেটারি ছিলেন। ঢাকায় ভাষা আন্দোলনে প্রতিবাদী ছাত্রদের গুলি করে হত্যার প্রতিবাদে এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সিলেটের তৎকালীন গোবিন্দপার্কে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ঐতিহাসিক প্রথম সভায় তিনি সভাপতিত্ব করার বিরল গৌরবের অধিকারী। ১৯৫৩-৫৪ সালে সিলেট মহকুমা (বর্তমান সিলেট জেলা) ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তখন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের জন্য সক্রিয় ভাবে কাজ করেছেন। 

নুরুল ইসলামের স্ত্রী জানালেন, জন্ম মাটি সিলেট সদর উপজেলার হাদারখোলায় একটি গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার অন্তিম ইচ্ছা ছিল, আল্লাহর অশেষ রহমতে সে আশা পূরন হয়েছে। সুরমা নদীর তীরে খুবই আধুনিক মান সম্পন্ন গ্রন্থাগার তৈরী হয়েছে।

সাংবাদিক নুরুল ইসলাম সিলেট প্রেসক্লাবের সদস্য ছিলেন। ১৯৯৭ সালে প্রিন্স চার্সের সিলেট সফর কালে অন্যতম সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। প্রবাসীর কথা গ্রন্থ ছাড়াও ২০১৩ সালে অভিবাসনের উপর FROM SOJOURNER TO SETTLERS নামে তার দ্বিতীয় গবেষণা বইটি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

 প্রবাসী বাংলাদেশীদের জীবন-যাপন ও দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান নিয়ে রচিত হয়েছে এই বই। ২০১৩ সালের ২৪ জুন সোমবার বাংলা একাডেমীতে বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আমিও ছিলাম। প্রফেসর ইমেরিটাস আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলা একডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। আলোচক ছিলেন ড. ফিরোজ মাহমুদ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, বইটি একটি কথক ঠাকুরের কাহিনী। বইটিতে একেক সময় একেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তারপর সবগুলো বিষয়ের সমন্বয় করা হয়েছে। বইটিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কথা তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে সিলেটি প্রবাসীদের নিয়ে লেখা।

প্রফেসর ইমেরিটাস আনিসুজ্জামান বলেন, বইটিতে প্রবাসীরা কিভাবে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন তা সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। শামসুজ্জামান খান বলেন, প্রবাসীরা কি কি ভাবে দেশের জন্য অবদান রাখছেন তা বইটি পড়ে জানা যাবে।  ফিরোজ মাহমুদ বলেন, বইটি গবেষণাভিত্তিক একটি বই। তাঁর প্রবাসীর কথা বইটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের রেফারেন্স বই হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

গবেষক নুরুল ইসলাম ছিলেন প্রবাসীদের জন্য এক আলোকবর্তিকা। তাঁর দুটি গ্রন্থে প্রবাসীদের জীবন, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক অবস্থার একটি পরিপূর্ণ চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি কর্ম পাগল এবং অত্যন্ত সৎ একজন মানুষ ছিলেন। অর্থের লোভ বা সম্পদের কোন মোহ ছিলনা। সারাটা জীবন মানুষের জন্য কাজ করেছেন। পরিবার ও বন্ধুবান্ধবকে খুব একটা সময় দেননি। দেশে এবং বিলেতে তাঁকে নিয়ে অনেক কাজ করেছি। অনেক অনুষ্ঠান করেছি। সে স্মৃতি পৃথক ভাবে বড় পরিসরে আলোচনা করার আশা রাখি।

মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা ও শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।

 


Designed & Developed by Future Station Ltd.
উপরে যান