ওমিক্রন নিয়ে কানাডা কেন এতো উদ্বিগ্ন!

Sun, Dec 19, 2021 2:17 AM

ওমিক্রন নিয়ে কানাডা কেন এতো উদ্বিগ্ন!

শওগাত আলী সাগর: থার্টি ফার্ষ্ট নাইটে টরন্টোর বাংলাদেশিদের অন্তত তিনটি বড় ধরনের আয়োজন ছিলো। টিকেটও বিক্রি হয়ে গিয়েছিলো।কিন্তু সেগুলো বাতিল করে দিতে হয়েছে। অন্টারিওর প্রভিন্সিয়াল সরকার নতুন করে কিছু বিধি নিষেধ আরোপ করায় এই আয়োজনগুলো বাতিল করা ছাড়া উপায় ছিলো না। কেবল বাংলাদেশিই কমিউনিটিই নয়, পুরো অন্টারিও, কুইবেক আরো বেশ কয়েকটি প্রভিন্সও একই পথ ধরেছে। ফেডারেল সরকার জরুরী না হলে দেশের বাইরে কোথাও না যেতে  নাগরিকদের পরামর্শ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো স্পষ্ট করে বলেছেন, কোথাও যাওয়ার সময় এটা না।  

আমরা কী তাহলে আবারো লকডাউনের সময়ে ফিরে যাচ্ছি?- এই প্রশ্ন নাগরিকদের মনে উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করেছে।

এতোক্ষণে অন্টারিও প্রভিন্সিয়াল সরকারের নতুন নির্দেশনা কার্যকর হয়ে গেছে। নতুন নির্দেশনা অনুসারে ইনডোরে ১০ জনের বেশি লোক সমাগম করা যাবে না। অর্থ্যাৎ আপনার বাড়ীতে ১০ জনের বেশি লোক নিয়ে কোনো ধরনের পার্টি বা কিছু করতে পারবেন না। শপিং মল, গ্রোসারি স্টোর, রেস্টুরেন্টে ক্যাপাসিটির অর্ধেক লোককে ঢুকতে দেয়া যাবে।

বিদেশি নাগরিকদের কানাডায় ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষযটি ফেডারেল সরকারের বিবেচনায় আছে। তবে এখনো এই ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয় নি।

কোভিডের নতুন ভাইরাস ওমিক্রনকে নিয়ে সরকার যে বেশ উদ্বিগ্ন- সেটা এখন পরিষ্কার। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা তো প্রথম থেকেই বলে আসছেন- ওমিক্রন দ্রুত সংক্রমন ছড়ায়,এটি যে ডেল্টার চেয়ে বেশি ক্ষতি করে, তার প্রমান  এখন পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে- ওমিক্রন নিয়ে  তা হলে কানাডা এতো উদ্বিগ্ন কেন?

কানাডার উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারনও আছে। প্রথমত কানাডা ঝুঁকি নিতে  চাচ্ছে না একদম। শেষ মুহুর্তে সংকটে হাবুডুবু খেতে চায় না কেউই। তাই আগাম সতর্কতা, আগাম প্রস্তুতি।

কানাডা সরকারের বিবেচনায় কোন জিনিসগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে? ওমিক্রন দ্রুত ছড়ায়-  এই তথ্যটাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে কানাডা। ডেল্টাসহ অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টগুলোয় ১০ থেকে ১২টা স্পাইট প্রোটিন মিউটেশন ছিলো। ওমিক্রনের স্পাইক প্রোটিন মিউটেশন ২৬ থেকে ৩২টি। এটি হচ্ছে তার সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতার নিদর্শন। অন্টারিওতে কোভিডের নানা ভ্যারিয়েন্টের ’আর ভ্যালু’ নিয়েও কাজ হয়। আর ভ্যালু হচ্ছে রিপ্রোডাক্টিভ ক্যাপাসিটি। ডেল্টার  চেয়ে ওমিক্রনের রিপ্রোডাক্টিভ ক্ষমতা চারগুন বেশি বলে বিশেষজ্ঞতরা তথ্য দিচ্ছেন।

ভ্যারিয়েন্টটি যদি ডেডলি না হয়, সংক্রমিতদের তেমন ক্ষতি না করে তা হলে এ নিয়ে উদ্বেগের কি আছে? কানাডা ঠিক এই সান্তনার উপর দাঁড়াতে চায় না। কানাডা নিজেদের মতো করে যে বিশ্লেষণ করেছে, তাতে বলা হচ্ছে- এটা সত্য দক্ষিন আফ্রিকায় ওমিক্রণের কারনে তেমন উল্রেখযোগ্য ক্যাজুয়্যালটি নেই। কানাডীয়ান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন- দক্ষিন আফ্রিকার লোক সংখ্যার উল্লেখযোগ্য হচ্ছে তরুন। কিন্তু কানাডার জনসংখ্যায় বয়সী মানুষের সংখ্যা বেশি। অধিকাংশ ইউরোপ আমেরিকার একই অবস্থা। ফলে দক্ষিন আফ্রিকার মানুষের ইমিউন ক্যাপাসিটি আর কানাডার বয়সী মানুষের ইমিউন ক্রাপাসিটি একই রকম হবে- এটি তারা মনে করছেন না। ফলে তারা সতর্ক থাকতে চাচ্ছেন।

অন্টারিও সায়েন্স টেবল ওমিক্রন নিয়ে যে মডেলিং করেছে তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো পদক্ষেপ না নিলে  ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কেবল অন্টারিও প্রভিন্সেই ৬০০ ব্যক্তিকে আইসিইউতে ভর্তি করতে হবে। এই তথ্যটাই সরকারকে সবচেয়ে ভাবিয়ে তুলেছে। হাসপাতালে চাপ বাড়ুক এটা কোনোভাবেই সরকার হতে দিতে চায় না।

কোভিডের তৃতীয় ওয়েভের গত মে মাসে অন্টারিওর হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিলো ৯০০ জন। ডিসেম্বর মাসের প্রথম থেকে গড়ে ১৪৬ থেকে ১৬৮ জন রোগী আইসিইউতে আছেন। এই সঙখ্যাটা বাড়লে হাসপাতালের উপর যে চাপ তৈরি হবে সেটিই এভয়েড করতে চাচ্ছেন সরকার।  

হিসেব করে দেখা গেছে, কানাডায় নতুন যারা সংক্রমিত হচ্ছেন তাদের ৫০ শতাংশই ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমন। প্রতি ২.৮ দিনে সংক্রমণের হার দ্বিগুন হয়ে গেলে  মোট কোভিড রোগীর পরিমান কী হবে তা নিয়েই সরকার উদ্বিগ্ন্। আর বিপুল সংখ্যক সংক্রমিতদের পরিস্থিতির অকস্মাৎ অবনতি ঘটা শুরু হলে সেটি সামলানো সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে যাবে। সেই ঝুঁকি তারা নিতে চাচ্ছেন না।সে জনেই সংক্রমণের গতির উপর সার্কিট ব্রেকার আরোপ করতে চাচ্ছেন তারা।

 সার্কিট ব্রেকার হিসেবে পুরনো বিধি নিষেধ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ভ্যাকসিন কার্যক্রমকে জোরদার করার চেষ্টা করছে সরকার। প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব কোভিডের নতুন ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ ঠেকানোর সরকারি উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করা।

 

লেখক: শওগাত আলী সাগর, প্রধান সম্পাদক, নতুনদেশ।


Designed & Developed by Future Station Ltd.
উপরে যান