অহিংস পৃথিবী দেখতে চাই

Mon, Oct 11, 2021 3:40 AM

অহিংস পৃথিবী দেখতে চাই

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ : ইতিহাস কথা বলে। ইতিহাস মানুষকে ভাবায়, তাড়িত করে। প্রতিদিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা কালক্রমে রূপ নেয় ইতিহাসে। সেসব ঘটনাই ইতিহাসে স্থান পায়, যা কিছু ভালো কিংবা যা কিছু প্রথম। যা কিছু মানবসভ্যতার অভিশাপ-আশীর্বাদ। তাই ইতিহাসের দিনপঞ্জি মানুষের কাছে সবসময় গুরুত্ব বহন করে। দার্শনিক জন ল্যাক হন বলেছেন, "ভবিষ্যৎকে জানার জন্য আমাদের অতীত জানা উচিত"।

বিশ্ব থেকে হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি, মারামারি, অসহিষ্ণুতা ও রক্তপাত বন্ধে বিশ্ববাসীকে সচেতন করতে প্রতিবছর ২ অক্টোবর বিশ্ব অহিংস দিবস পালন করা হয়। ২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে প্যারিসে ইরানী নোবেল বিজয়ী শিরিন এবাদী তার একজন হিন্দি শিক্ষকের কাছ থেকে দিবসটির ব্যাপারে একটি প্রস্তাবনা গ্রহণ করেন। পরে ২০০৭ সালে ভারতীয় রাজনীতিক সোনিয়া গান্ধী জাতিসংঘে সিদ্ধান্তটি পেশ করেন। ২০০৭ সালের ১৫ জুন জাতিসংঘের সাধারণ সভায় ২ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক অহিংস দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। উল্লেখ্য, এই দিনটি ভারত স্বাধীনের অবিসংবাদী পথপ্রদর্শক মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিন।

আন্তর্জাতিক অহিংস দিবসটি পালন করার জন্য মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনকে কাজে লাগানো ইউএনয়ের চমৎকার একটি কৌশল। ভারতের স্বাধীনতার প্রতি গান্ধীর উত্সর্গ এবং তাঁর কৌশলগুলি বিশ্বের সর্বত্র নাগরিক এবং মানবাধিকার উদ্যোগের মূল ভিত্তি। এটি সেই দিন যখন বিশ্বব্যাপী প্রত্যেকে এমন এক ব্যক্তির জন্মদিন উদযাপন করে যিনি "অহিংসা" ধারণাটি এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করেছিলেন এবং চূড়ান্ত শতাব্দীর মধ্যে এই ধরণের সামাজিক প্রতিক্রিয়া বিশ্বের সর্বত্র রয়েছে। পৃথিবীর অন্য দেশ গুলোর মতো নানান আয়োজনে বাংলাদেশেও এ দিসবটি পালন করা হয়। 'সংঘাত নয়, জঙ্গীবাদ নয়- এসো ঐক্য ও  সম্প্রতির স্বদেশ গড়ি'- এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে মানববন্ধন, শোভাযাত্রাসহ এ দিবস পালন করা হয়।

 

অহিংসা বলতে বোঝায় হিংসা থেকে দূরে থাকা। প্রশ্ন হচ্ছে, পৃথিবীর অসহিষ্ণুতা, উত্তেজনা, সহিংসতা কী থেমে আছে? মানুষ কেন প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠছে? কেন বার বার সারা বিশ্বে খুনোখুনি, হানাহানি, মারামারি লেগেই রয়েছে? আমরা কী আমাদের ভবিষ্যৎ ক্রমশ অশান্তিতে পরিণত করছি?

প্রশ্ন গুলোর উত্তর খুঁজতে গুরুত্বের দিক দিয়ে পরিবারের সামাজিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে হবে। পরিবারের প্রভাব সমগ্র সমাজ জীবনের ওপর পতিত হয় ও পারিবারিক পরিবর্তন পুরো সমাজব্যবস্থার ওপর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। কাজেই পরিবারের ভিত্তির ওপর সমাজ কাঠামো তৈরি হয় এবং সমাজের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি রচিত হয়। সে হিসেবে জ্ঞানীরা বলেন, শান্তিময় সমাজ গঠনে পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম। প্রত্যেকটি পরিবার তার সদস্যদের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে থাকে এমনকি পরিবারভুক্ত সদস্যদের চরিত্র গঠন হয়ে থাকে পরিবার থেকে।

সন্তান পরিবার থেকে শিখতে পারে আদব-কায়দা, শ্রদ্ধাবোধ, দায়িত্ববোধ, নীতি-নৈতিকতাবোধ। মানবজীবনের মৌলিক আদর্শগুলো শিখতে পরিবারকে অগ্রগন্য করা হয়। একজন ব্যক্তি তার জীবনকে যেভাবে দেখতে ইচ্ছুক সেটি হলো- তার জীবনদর্শন। অর্থাৎ জীবন যেভাবে চললে একজন ব্যক্তির কাছে ভালো মনে হয় সেটিই সেই ব্যক্তির জীবন দর্শন।

পরিবারের পরের ধাপটি হচ্ছে সমাজ। সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতার সংকট, দারিদ্র্য, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, গতানুগতিক আমলাতন্ত্রের চর্চা,দুর্নীতির প্রসার,নেতৃত্বের সংকট, নাগরিক অসচেতনতা, কর্তৃত্বমূলক ক্ষমতা কাঠামো, প্রভৃতি। সর্বস্তরে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি, শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন, স্বশাসিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, উগ্রবাদের বিস্তার রোধ, গণমুখী সেবা উদ্ভাবন, স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা, আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন,সামাজিক নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিতকরণ, যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের মাধ্যমে সমাজের কাঠামো মজবুত রাখা জরুরি।

 

গণমানুষের জন্য কল্যাণকামী, ক্রিয়াশীল ও অপরিহার্য সংঘ হচ্ছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের সফলতা ও ব্যর্থতা পাশাপাশি থাকলেও এর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মূলত রাষ্ট্রের বুৎপত্তিই হয়েছে সভ্যতাকে অগ্রগামী ও পরিশীলিত করার জন্য। আর  রাষ্ট্র বলতে এমন এক রাজনৈতিক সংগঠনকে বোঝায় যা কোনো একটি ভৌগোলিক পরিসর ও তৎসংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার সার্বভৌম ক্ষমতা সংরক্ষণ করে।

 

রাষ্ট্র সাধারণত একগুচ্ছ প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ হিসাবে সংশ্লিষ্ট ভৌগোলিক সীমার ভেতর বসবাসকারী সভ্যদের শাসনের জন্য নিয়ম-কানুন তৈরি এবং জনস্বার্থে প্রয়োগ করে থাকে। প্রাচীনকাল ও মধ্যযুগে রাষ্ট্রকে মনে করা হতো ঈশ্বরের সৃষ্টি করা প্রতিষ্ঠান।

 

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা রাষ্ট্রকে ‘সর্বজনীন কল্যাণ সাধনকারী’ এবং ‘মানুষের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য অপরিহার্য’ সংঘ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। আর রাষ্ট্রীয় অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জনসাধারণকে আইন মেনে চলতে বাধ্য করা, সমাজের শান্তি ভঙ্গকারীদের শাস্তির বিধান করা এবং সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা রাষ্ট্রের প্রধান কাজ। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে সকল শ্রেণির নাগরিকদের অধিকারের সমতা বিধানও রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব এবং আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

 

আজ সারাবিশ্বে সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে, জাতিতে-জাতিতে যে বিদ্বেষ, হিংসা ছড়িয়ে পড়েছে, তা থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করতে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস বাণী প্রেরনা যোগায়। হিংসা দিয়ে পৃথিবীতে কখনই কোনো সমস্যার সমাধান হয়নি। আর বাংলাদেশের মানুষ সকল সময়ই শান্তি প্রিয়। তারা সকল সময় শান্তির জন্য কাজ করে। বাংলাদেশের মানুষ সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে মিলনের কথা বলে। একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে 'বাংলাদেশ' নামক রাষ্ট্রের জন্ম। সংঘাতমুক্ত সমাজ, সংঘাতমুক্ত পৃথিবী, যুদ্ধমুক্ত বিশ্ব গঠনে মহাত্মা গান্ধীর দর্শন অত্যন্ত মানুষকে অনুপ্রানীত করে। সামরিক অস্ত্রের বিপরীতে অহিংস অস্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

 

ইতিহাস বারবার ফিরে ফিরে আসে কিংবা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। সহিংসতা শুধু ধ্বংস করে, সৃষ্টি করে না। সহিংসতা, দ্বন্দ্ব, হানাহানি জাতি হিসেবে আমাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই আমাদের এগিয়ে যেতে হলে এই দ্বন্দ্ব- হানাহানির অবসান ঘটাতে হবে। গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত, ন্যায় বিচার ভিত্তিক সম্প্রীতি গড়ে তুলতে হবে। গুম, খুন, অপহরণসহ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে তৎপর হতে হবে। সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, আজকের পৃথিবী, আগামীর ভবিষ্যৎ। আমরা শান্তি চাই। আমরা একটি অহিংস পৃথিবী দেখতে চাই।।

 

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ: সিনিয়র সাংবাদিক।jsb.shuvo@gmail.com


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Future Station Ltd.
উপরে যান