শতবর্ষের আলোয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : ঢা. বি সাংস্কৃতিক দল

Mon, Sep 27, 2021 6:19 PM

শতবর্ষের আলোয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : ঢা. বি  সাংস্কৃতিক দল

মিজানুর রহমান খান :  (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো।– বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।)

 

এই লেখাটি যখন লিখছি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে। অনেকের মতো আমারও সৌভাগ্য যে আমিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তি উৎসবের অংশীদার হতে পেরেছি। করোনা ভাইরাসের (ঈড়ারফ-১৯) ভয়ংকর ছোবলে সারা বিশ্ব যখন বিধ্বস্ত ও পর্যুদস্ত তখন ঘরে বসেই আমরা উদ্যাপন করছি প্রিয় প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তি উৎসব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু কথা মনে পড়ছে এই মুহূর্তে। সেসবের মধ্য থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের কিছু স্মৃতি নিয়ে এই লেখার শুরু ও শেষ। উল্লেখ্য, সকল কথাই আমার অস্তিত্ব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিমন্ডলের সঙ্গে সম্পর্কিত।

 

স্বাধীনতা অর্জনের কালে হাতে গোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বাংলাদেশে। যোগ্যতা অনুযায়ী যে যার মতো উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান বেছে নিত। প্রতিযোগিতা তখনও ছিল। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারলে দ্বিতীয় পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতো ছাত্রছাত্রীরা। কিন্তু পছন্দের তালিকার শীর্ষে সবসময় থাকত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন নিয়মে তিন বছরের  স্নাতক এবং এক বছরের  স্নাতকোত্তর অর্জন করা যেত। কিন্তু আমাদের সময়ে তা হয়নি। আমাদের সময়ে অতিরিক্ত চার বছর বেশি থাকতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল। এই সময়টা বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি ও সাংস্কৃৃতিক কর্মকান্ডের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ জেনারেল এরশাদ বন্দুকের নল দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। সেনাশাসকের থাবা থেকে গণতন্ত্র রক্ষাকল্পে তখন গঠিত হয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ১৯৮২ সাল থেকেই সামরিক স্বৈরশাসন-বিরোধী ছাত্র আন্দোলন তুঙ্গে উঠেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিদিন মিছিল-মিটিং সভা-সমাবেশ চলত। মিছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে কখনো কখনো উজিয়ে গিয়ে রাজপথ কাঁপিয়ে দিত। ঠিক এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে নিজেকে নিয়োজিত করেছিল। রাজনৈতিক আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড একীভত হয়েছিল স্পষ্ট মনে আছে। আক্ষরিক অর্থেই আমরা দেখতাম প্রতিদিন দুপুর বারোটার মধ্যে বিশাল বিশাল মিছিল ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করত। আর প্রতিদিন বিকেলে টিএসসি আইল্যান্ড হয়ে উঠত কবিতা আবৃত্তি, গণসংগীত পরিবেশনা ও পথনাটক পরিবেশনার তীর্থস্থান। 

অনেকের মতো গ্রাম থেকে শহরে গিয়েছি আমি। আমার কাছে তখনও সবকিছু নতুন। অ্যাকাডেমিক ভবনগুলো নতুন, আবাসিক হলগুলো নতুন, ছাত্রছাত্রীরা নতুন, শিক্ষকগণ নতুন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধানও নতুন। এতসব ‘নতুনের’ মাঝে নতুন করে ‘নতুন হয়ে ওঠা’ সহজ ছিল না মোটেও। কিন্তু অন্য উপায়ও ছিল না। নতুন যে হতেই হবে। নইলে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া কেন? এ অবস্থায় ধীরে ধীরে বন্ধু জুটে যায়। সহপাঠী-বন্ধু আর আবাসিক হলের বন্ধু। উঁচু ক্লাসের বন্ধু এবং নিচু ক্লাসের বন্ধু। শহুরে বন্ধু এবং গ্রামের বন্ধু। এভাবে চিনতে থাকি পথঘাট, অলিগলি আর মানুষজন। আমার একটা সুবিধা ছিল। সহজেই আমি অপরিচিত মানুষের সাথে মিশে যেতে পারতাম। অল্পদিনের মধ্যে আমার একটা উপায় হলো। আমি অনেককিছু বুঝতে এবং চিনতে শিখলাম। কিন্তু প্রথম বর্ষ পর্যন্ত আমার গন্ডিটা ছোটই ছিল। কলাভবনে ক্লাস, ক্লাসের ফাঁকে লাইব্রেরিতে পড়াশোনা এবং রাত্রিযাপনের জন্য আবাসিক হলে ফিরে যাওয়া।

 

১৯৮১ সালের ডাকসু নির্বাচনে সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন লিয়াকত আলী লাকী। তিনি ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ছিলেন। সামরিক শাসন ও ডাকসুর বিধিবিধানের কারণে এবং নিয়মিত সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে গণসংস্কৃতির বিকাশ ত্বরান্বিত করা যাচ্ছিল না। লিয়াকত আলী লাকী তখন সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে থেকেই স্বতন্ত্রভাবে সংস্কৃতি চর্চার উপায় খুঁজতে থাকেন। কারণ তখন ঢাকার সমাজে অপসংস্কৃতির চেহারা ক্রমশ দেখা দিতে শুরু করেছিল। এ সময় সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি আব্দুল্লাহেল বাকী লিয়াকত আলী লাকীর উদ্যোগকে পূর্ণতা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। আব্দুল্লাহেল বাকীর সহযোগিতায় লিয়াকত আলী লাকী ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল’ নামের সংগঠন গড়ে তোলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউট ও আবাসিক হলসমূহে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এবং অ্যাকাডেমিক ভবনগুলোতে পোস্টার লাগিয়ে সদস্য সংগ্রহ করতে থাকেন। ওই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের আবৃত্তিশিল্পী, সংগীতশিল্পী, নাট্যশিল্পী ও যন্ত্রীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হতে থাকেন। অল্পদিনের মধ্যে এক ঝাঁক সংস্কৃতিকর্মী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে গতিশীল করে তোলেন। সদস্য সংখ্যা দ্রæত বাড়তে থাকলে পৃথক দপ্তরের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সে সময় টিএসসির পরিচালক ছিলেন জামান স্যার। টিএসসিতে অফিস কক্ষ এবং মহড়াকক্ষের ব্যবস্থা হয়ে যায়। প্রসঙ্গত বলে রাখি জামান স্যার আপন সন্তানের মতো টিএসসিকে ভালবাসতেন। সুযোগ পেলেই তিনি টিএসসিতে চলে আসতেন। ঘুরে ঘুরে সকল সংগঠনের মহড়া দেখতেন এবং সকলকেই উৎসাহ জোগাতেন। এখানে ওখানে পড়ে থাকা কাগজের টুকরো, আইসক্রিমের কাঠি, চকলেটের খোসা এবং প্লাস্টিকের প্যাকেট নিজ হাতে কুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলতেন। স্যারকে সকলে ভীষণ সমীহ করে চলতেন।

 

১৯৮৩ সালের শেষদিক থেকে আমি নিয়মিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলে যাতায়াত শুরু করি। প্রতিদিন সকালবিকাল দপ্তর সরগরম থাকত। মহড়াকক্ষে চলত মহড়া। কোনোদিন আবৃত্তি, কোনোদিন কোরাস গান আর কোনোদিন নাটকের মহড়া। শিল্পীরা ছিলেন ভীষণ চটপটে এবং দক্ষ। তখনও আমি কাউকে চিনতাম না। মহড়াকক্ষের এক কোণে ম্যাটের উপর বসে থাকতাম আর পর্যবেক্ষণ করতাম সবকিছু। দু’একটি অনুষ্ঠান হয়ে যাওয়ার পর সদস্যশিল্পীদের নাম জানা হল। তাও আবার সকলের নাম নয়। সংগীতে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে সুজিত মোস্তফা, শ্যামল চৌধুরী, আব্দুস সামাদ শামলু, শামীমা পারভীন শিমু, অভিজিৎ চৌধুরী, শান্তনু সাহা, পাপড়ি চৌধুরী, লতিকা সরকার, সুবর্ণা চৌধুরী, কৃষ্টি হেফাজ, নাদিরা বেগম, জিয়াউল হক জিয়া, কাবেরী আচার্য শুক্লাকে মনে পড়ছে। নাটকে লিয়াকত আলী লাকী, হুমায়ুন কবীর হীরা, জিল্লুর রহমান জন, মনির উদ্দিন আহমেদ, শাহজাহান কবীর রাসেল, আহমেদ সিদ্দিকী, আশরাফুল হক মুকুল, বিরূপাক্ষ পাল, ইমামুল হক কিসলু, অপু সরকার (অপু ভুঁইয়া), সাবিনা বারী লাকী এরা ছিলেন অগ্রগণ্য। আবৃত্তিতে ইস্তেকবাল হোসেন, গীতি আরা নাসরীন, আহমেদ হোসেন, খন্দকার শাজাহান সাজু, এলিস ও আনিসের নাম উল্লেখযোগ্য। নৃত্যে সোহেল রহমান, সেলিনা আনাম সোনিয়া, অ্যানি ফেরদৌসী, ডালিয়া আহমেদ, অনুপ কুমার, সুনীতা সাহা প্রমুখ উল্লেখযোগ্য সদস্য। দীর্ঘ ছয় বছর অনেক সদস্য নতুন করে যুক্ত হয়েছেন আবার কেউ কেউ চলেও গিয়েছেন। কিন্তু দক্ষ ও ধৈর্যশীল কাÐারীর মতো হাল ধরে ছিলেন লিয়াকত আলী লাকী। যন্ত্রীদের মধ্যে তবলায় নিয়মিত শিল্পী ছিলেন অভিজিৎ চৌধুরী এবং বাঁশিতে গৌশঙ্কর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের নাটক বিভাগের আমি সদস্য হয়েছিলাম মূলত দুটি পথনাটক দেখে। একটি ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ এবং অপরটি ‘অবিরাম পাউরুটি ভক্ষণ’। কারণ আমার গ্রামের যাত্রাপালায় অভিনয় করার আনন্দ ও অভিজ্ঞতা আমার ছিল। এই দুটো ছিল সে সময়ের ঢাকায় সাড়া জাগানো পথনাটক। লাকী ভাই’র দুর্দান্ত অভিনয় ছিল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল যে আশির দশকে সামরিক শাসন চলাকালে নাটকটির শতাধিক শো করতে হয়েছিল। সে সময়ের জনপ্রিয় দুটো নাটকের কলাকুশলীদের নাম এখানে উল্লেখ করছি-

‘অবিরাম পাউরুটি ভক্ষণ’ এই পথনাটকের শিল্পী ও কলাকুশলীরা হলেন- গোকুল- বিরুপাক্ষ পাল, অজিত বাবু- সেলিম চৌধুরী, কর্মচারী ১- মনির আহমেদ, কর্মচারী ২- গোলাম শফিউদ্দিন, খাদ্যমন্ত্রী- শাজাহান কবীর রাসেল, পুলিশ কমিশনার- জিল্লুর রহমান জন, বিশ্বম্ভর বাবু- আশরাফুল বাকী/হিমু চৌধুরী, ফটোগ্রাফার- শেখ মুহ. জাহাঙ্গীর ইকবাল/হুমায়ুন কবীর হীরা/কামাল মিলন, নিদেশনা- বাহারউদ্দিন খেলন (অতিথি নির্দেশক)।

‘রথযাত্রা’ নাটকের শিল্পীও কলাকুশলীবৃন্দ হলেন- মন্ত্রী- হিমু চৌধুরী, পুরোহিত- মাহবুবুর রহমান টনি, ধনপতি ১- আহম্মেদ সিদ্দিকী, ধনপতি ২- আশরাফুল হক মুকুল, ধনপতি ৩- জিল্লুর রহমান জন, নাগরিক ১- মনির উদ্দিন আহমেদ, নাগরিক ২- শাজাহান কবীর রাসেল, নাগরিক ৩- মোদাচ্ছের হাসান রুমী, সৈনিক ১- ফরিদ আহমেদ রবি, সৈনিক ২- হুমায়ুন কবীর হীরা, সৈনিক ৩- নাসিম আনোয়ার, কবি- মেসবাহ আহমেদ নাসিম, চর- বিরুপাক্ষ পাল, দলপতি- লিয়াকত আলী লাকী, নির্দেশনা- কামালউদ্দিন নীলু (অতিথি নির্দেশক)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক দলের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নাট্য-প্রযোজনার কথা মনে পড়ে। এগুলো হলো- ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’, ‘অবিরাম পাউরুটি ভক্ষণ’, ‘রথযাত্রা’, ‘সোনাই মাধব’, ‘চÐালিকা’ এবং ‘সেই মেয়ে’।

নিয়মিত শিল্পীদের অনুপস্থিতিতে হঠাৎ একদিন কোরাস গানে কণ্ঠ মেলাবার সুযোগ পেলাম আমি। ‘হেই সামালো ধান হো কাস্তেটা দাও শান হো’Ñ ঘুরেফিরে কয়েকবার গাইতেই গানটা আমার মুখস্থ হয়ে গেল। সুর এবং তালও ঠিক হয়ে গেল ওই দিনই। কোরাস গানে কণ্ঠ মেলাবার সুবিধাটা এই যে প্রয়োজনে চুপ করেও থাকা যায় কিছুক্ষণ। মনে পড়ছে সেদিন এই গানে হারমোনিয়ামে লিড দিচ্ছিলেন আব্দুস সামাদ শামলু। একদিন বিকেলে আমাদের ডাক পড়লো। মহড়াকক্ষে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো বাহারউদ্দীন খেলনের সঙ্গে। খেলন ভাই ভারতের এনএসডি থেকে নাটকের উপর পড়ালেখা করে দেশে ফিরেছেন। উপস্থিত সদস্যদের মধ্য থেকে আমরা যারা নাটকে অভিনয় করতে চাই তিনি তাদের আলাদা করে নিলেন। পরদিন একই সময়ে মহড়াকক্ষে আমাদের হাতে তিনি নাটকের স্ক্রিপ্ট তুলে দিলেন এবং বৃত্তাকারে বসে এক এক করে নাটকের বিভিন্ন অংশ পাঠ করতে বললেন। পাঠশেষে স্ক্রিপ্টের ফটোকপিগুলো আমাদের দিয়ে দিলেন এবং পরদিন আরও ভালো করে পড়ে আসতে বললেন। ঋত্বিককুমার ঘটকের নাটক ‘সেই মেয়ে’। পরদিন কাস্টিং চড়ান্ত হলো। এই নাটকে পাগলা গারদের অনেকগুলো পাগলের চরিত্রের মধ্যে আমিও এক পাগল ছিলাম। চল্লিশ মিনিটের এই নাটকটির প্রথম পরীক্ষামূলক শো হয়েছিল টিএসসি’র নিচতলার ক্রীড়াকক্ষের প্রশস্ত মেঝেতে। সে সময়ের টিভি নাটকের নামকরা শিল্পী আফরোজা বানু আমাদের পরীক্ষামূলক শো দেখতে এসেছিলেন। এরপর ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাস অবলম্বনে রচিত আরেকটি নাটকে আমি অভিনয় করি। ওই নাটকের যে চরিত্রে আমি অভিনয় করি তার নাম আন্দ্রেই নাখোদকা। নাটকটি অভিনীত হয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের মিলনায়তন মঞ্চে। এই নাটকেরও নির্দেশনায় ছিলেন বাহারউদ্দিন খেলন।

আশির দশকের শুরু থেকে হিন্দি সিনেমা এবং হিন্দি গান বাংলাদেশের সমাজকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। বিপন্ন সেই সময়ে সচেতন মানুষেরা অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপক সংখ্যক ছাত্রছাত্রীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলে অন্তর্ভুক্ত করে সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চায় নেতৃত্ব দেন লাকী ভাই। এই মহৎ কাজের ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগ-ডে’র পরিবর্তে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ পালনের ঘোষণা দিলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এগিয়ে আসে এবং সাধুবাদ জানায়। ফলে ১৯৮৩ সালে প্রথম ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ স্বতঃস্ফর্তভাবে পালিত হয়। বাংলা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক সন্জীদা খাতুন যত্ন সহকারে সকলকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত শিখিয়েছিলেন এবং নিজেও মঞ্চে গান করেছিলেন। সেরকম অন্তহীন অনুপ্রেরণা দেওয়ার মতো শিক্ষক বাংলাদেশের এই সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেই।

আমাদের সময়ে আমরা লেখাপড়ার পাশাপাশি রাজনীতিই শুধু নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলাম। মানবিক হয়ে ওঠার দীক্ষা পেয়েছিলাম। আমরা অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই জানতাম না আমাদের পেশা কী হবে। আমরা যন্ত্রের মতো বেড়ে উঠিনি, আমরা বৃক্ষের মতো বিকশিত হয়েছি। ভাষা, সংস্কৃতি, শিল্প, ইতিহাস ইত্যাদির সামগ্রিক সুর ও সুবাসে আমাদের দেহ-মন-প্রাণ বিকশিত হয়েছে। আমাদের এই বেড়ে ওঠায়, বিকশিত হওয়ায় এবং সুস্থ জীবনাকাক্সক্ষায় ব্রতী হতে আলো দেখিয়েছে আজকের শতবর্ষের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Future Station Ltd.
উপরে যান