সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: বিনাশ কাম্য নয়

Fri, Sep 24, 2021 1:13 AM

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: বিনাশ কাম্য নয়

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ : বাংলাদেশে খুন-খারাবিসহ নানা ধরনের অপরাধ দ্রুতগতিতে বাড়ছে। সমাজবিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত অপরাধ বৃদ্ধির প্রধান কারণ বিচারহীনতা বা বিচারের দীর্ঘসূত্রতা। এতে অপরাধীরা উৎসাহিত হয়। অপরাধীরা যখন রাজনৈতিক প্রশ্রয় বা মদদ পায়, তখন তা ভয়াবহ রূপ নেয়। বাংলাদেশের অবস্থা এখন তা-ই হয়েছে। দলীয় কোন্দলে খুনাখুনি হচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর সংঘাতে জীবন যাচ্ছে। জায়গাজমির দখলসহ নানাবিধ স্বার্থের সংঘাতেও রক্ত ঝরছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অনেক অপরাধী বড় বড় অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে।

 

আসন্ন শারদীয় দুর্গোৎসব-কে কেন্দ্র করে  প্রতিমা ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। গত ২১ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) গভীর রাতে শহরের আড়ুয়াপাড়া ‘আইকা যুব সংঘের পূজামণ্ডপে এ ঘটনা ঘটে। বুধবার সকালে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার খাইরুল আলমসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। কুষ্টিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাব্বিরুল আলম জানান, শহরের আড়ুয়াপাড়া রেললাইন সংলগ্ন হেমচন্দ্র লেনে ‘আইকা যুব সংঘ দুর্গাপূজার আয়োজন করেছে। ইতিমধ্যে প্রতিমার নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে দুর্বৃত্তরা প্রতিমার মাথা, হাতসহ অংশবিশেষ ভেঙে ফেলেছে। প্রতিমা ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

 

এর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে আবারও আগুন দেয়ার পৃথক দুটি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে, উপজেলার সদর ইউনিয়নের নাসিরপুর গ্রামে ভুপেশ মাঝির বাড়িতে দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে নিয়তি চক্রবর্তী নামে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। পত্রিকান্তরে জানা যায়, ২০১৬ সালের ১৬ নভেম্বর (বুধবার) সন্ধা পৌনে ৭টায় নাসিরনগর উপজেলা সদরে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অঞ্জন কুমার দেবের বাড়িতে আগুন দেয়া হয়। এর আগে ৫ নভেম্বর (শনিবার) তার বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছিল। উপজেলা চেয়ারম্যান এটিএম মনিরুজ্জামান সরকার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিয়াকত আলী ও নাসিরনগর থানার ওসি আবু জাফর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হামলার ঘটনা চলতে না চলতেই একই ধরণের হামলার শিকার হয়েছে ঝালকাঠি এবং সেটা একই দিনে। ঝালকাঠি শহরের বারচালা এলাকায় কালীবাড়ি মন্দিরে হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ঐদিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে এই হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় অন্তত ১০ জন সামান্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে প্রাথমিকভাবে আহত ব্যক্তিদের নাম জানা যায়নি।

 

ঘটনার পর গণমাধ্যমকে পুলিশ জানায়,  রাতে কার্তিক পূজা শেষ হওয়ার পর কিছু লোক মন্দির লক্ষ্য করে ইট নিক্ষেপ করতে থাকে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করলে হামলাকারীরা পুলিশকেও লক্ষ্য করে ইট ছুঁড়তে থাকে। একপর্যায়ে পুলিশের ধাওয়ায় তারা পালিয়ে যায়। হামলায় মন্দিরের একটি প্রতিমার মাথা ভেঙে গেছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

 

এর আগে, ৩০ অক্টোবর (রোববার) ৫০/৬০টি হিন্দু পরিবারের বাড়িঘর ভাঙচুর ও ৩ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) পাঁচটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বেশ উত্তপ্ত হয়।  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর। সারাদেশে আন্দোলন কর্মসূচিও পালন করেছেন বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলো।

 

২০১৬ সালের ১২ নভেম্বর  দিবাগত রাত সাড়ে চারটার দিকে নাসিরনগরের পশ্চিমপাড়ার চেংরাপাড়া মহল্লার ছোট্টু লাল দাসের বাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। ৫ নভেম্বরের পর ওই এলাকায় পুলিশ পাহারায় রয়েছে। এর মধ্যে আরেকটি ঘরে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। থেমে নেই নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা। ছোট্টু লাল দাস সাংবাদিকদের জানান, আগুনে ওই ঘরে থাকা মাছ ধরার দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা মূল্যের পাঁচটি বড় জাল পুড়ে গেছে। এগুলো তার আয়ের একমাত্র অবলম্বন ছিল। তবে ওই ঘরে কেউ ছিল না। তিনি জানান, তাদের মহল্লায় ৫৩টি পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে ৫২টি হিন্দু পরিবার ও একটি মুসলিম পরিবার। উপজেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সভাপতি কাজল জ্যোতি দত্ত ও সাধারণ সম্পাদক হরিপদ পোদ্দার জানান, ৩০ অক্টোবরের ঘটনার পর থেকে উপজেলায় পুলিশের ব্যাপক নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যেও দুষ্কৃতকারীরা তৎপর!

 

প্রশ্ন হচ্ছে,  এসব দুষ্কৃতকারীদের খুঁটির জোর কোথায়? প্রশাসনের সামনে তারা  ঘরে আগুন দিচ্ছে, লুটপাট করছে, হত্যা করছে। পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে। এর মানে কী দাঁড়ায়? নাসিরনগর থানার তৎকালীন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, আগুন দেয়ার ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তিনি জানান, ৩০ অক্টোবরের হামলার ঘটনার পর থেকে নাসিরনগর সদর উপজেলার বিভিন্ন মহল্লায় পুলিশের ১৪টি টহল দল রাতে পাহারা দিচ্ছে। প্রতি দলে ৪ জন করে পুলিশ সদস্য রয়েছেন। যদিও ওসির এ দাবী অস্বীকার করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা বলছেন, ১২ নভেম্বর (শনিবার) রাতে তাদের গ্রামে পাহারায় পুলিশ ছিল না। তারা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে পাহারা দিয়েছেন। প্রতিদিন রাতে গ্রামের বাড়িঘর পাহারা দেন। ঘটনা ঘটার পর হোমড়া চোমড়া ব্যক্তিবর্গ যখন ঘটনাস্থল পরিদর্শন আসেন, তখন পুলিশের দেখা পাওয়া যায়।

 

প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার) রাতে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় ডাবর ইউনিয়নের ডাহচী গ্রামে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) একটি মন্দিরে কীর্তন ও ধর্মসভার সময় গুলি ও বোমা হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে দুজন ভক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলে পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রামের লোকজন এক দুর্বৃত্তকে ধরে ফেলে। পরে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শী বরাত দিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ঐ দিন রাত ৮টার দিকে ইসকন মন্দিরে ধর্মসভা চলছিল। এ সময় ৪-৫ জন দুর্বৃত্ত আগ্নেয়াস্ত্রসহ ধর্মসভায় ঢুকে পড়ে। তারা অতর্কিতভাবে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে। পরে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। হামলায় গুলিবিদ্ধ হন ডাবর গ্রামের রণজিৎ কুমার রায় (৪০) ও একই গ্রামের হিরেন চন্দ্র রায়ের ছেলে মিথুন চন্দ্র রায় (২৮)। তাদের দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভক্তরা জানান, হামলার সময় ইসকন মন্দিরে ৩০-৩৫ জন ভক্ত ছিলেন। গুলি ও ককটেল বিস্ফোণের বিকট শব্দে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। মহেশপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফুল্ল চন্দ্র রায় জানান, মোটরসাইকেল নিয়ে পালানোর সময় ডাবর গ্রামের মো. মুসলিম ও ওমর ফারুক রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে মোটরসাইকেলসহ শরিফুল ইসলাম নামে এক দুর্বৃত্তকে ধরে পাশের একটি কমিউনিটি সেন্টারে আটকে রাখে। তার বাড়ি গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ি থানায়। বাবার নাম শাখাওয়াত হোসেন। পরে রাত সাড়ে ১১টার দিকে মোটরসাইকেলসহ তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়। এ সময় র‌্যাব-১৩-এর সদস্যরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

 

নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) স্থানীয় নেতা শরিফুল ইসলাম বিচারকের কাছে দিনাজপুরে মন্দিরে হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। উক্ত মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দিনাজপুর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) এসআই বজলুর রশিদ জানান, শরিফুল জেলার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম নাজমুল হোসেনের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। তিনি বলেন, ‘বিচারকের কাছে দেয়া জবানবন্দিতে মন্দিরে গুলি ও বোমা ছোড়ার ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন শরিফুল। তিনি বলেন, ‘দিনাজপুর জেএমবির অন্যতম এই লিডার শরিফুল ইসলাম কার নির্দেশে এবং কয়জনকে সঙ্গে নিয়ে মন্দিরে হামলা করেন- জবানবন্দিতে তাও বলেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করতে চাননি গোয়েন্দা পুলিশের এই কর্মকর্তা। এর আগে শরিফুল দিনাজপুরে ইতালীয় পাদ্রি হত্যাচেষ্টায়ও জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেয় বলে পুলিশ জানায়।

 

সেদিন এসআই বজলুর বলেছিলেন, ‘শরিফুল বলেছে, সে জেএমবির নেতাদের কয়েকজনের মধ্যে অন্যতম। তার মিশন দিনাজপুর। এর আগে রংপুর রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি হুমায়ুন কবির দিনাজপুরে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বিদেশি নাগরিক হত্যার চেষ্টা, কান্তজিউ মন্দিরে রাস মেলা ও ইসকন মন্দিরে গুলি-বোমা ও পেট্রোল পাম্পে লুটসহ সব হামলার ঘটনাই একই সূত্রে গাঁথা। তিনি বলেন, ‘এগুলো জেএমবির কাজ। এর পক্ষে পুলিশের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

 

আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, নাসিরনগর-ঝালকাঠি, কিংবা নাসিরনগর-গোবিন্দগঞ্জ অথবা নাসিরনগর-হবিগঞ্জ কোন সূত্রে গাঁথা? ৩১ অক্টোবরের সুনামগঞ্জের ছাতকে যে দুটি মন্দিরে হামলা হয়েছে, সেটি কী এই সূত্রের বাইরে? এই হামলা গুলোর কমন স্পট হচ্ছে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর। নাসিরনগরের হামলার সাথে সাথে দেশের একাধিক স্থানে একই দিন একই ধরণের হামলা ঘটেছে। এই সহজ সূত্রটির রহস্যভেদ হবে কবে?

 

সমাজবিশ্লেষকরা বলছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, মন্দির ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা সুপরিকল্পিত। চিহ্নিত একটি গোষ্ঠী এ ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রশাসনের দূরদর্শিতার অভাব ও উদাসীনতা এ হামলার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে বলা হয়।

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ও বাড়িঘরে কয়েক দফা জঘন্য হামলার ঘটনা ঘটে-ই চলছে। সেই সাথে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের বাড়িঘরেও হামলা হয়েছে। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর একের পর এক এমন হামলার ঘটনায় মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের মধ্যে একধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের নামে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে নষ্ট রাজনীতির এক নতুন সংস্করণ।

 

২০০৫ সালে সাঁথিয়ায়, ২০১২ সালে  ফটিকছড়ি, ২০১৪ সালে রামু-উখিয়া-পটিয়ার ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনবসতি, মন্দির ধ্বংসের জন্য ধর্মীয় অনুভূতি ক্ষুন্নের অজুহাত বারবার ব্যবহার করা হয়। হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়া এবং নাসিরনগর উপজেলার পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের অদূরদর্শিতার বিষয়ে তদন্ত করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

 

নাসিরনগরে হামলার শিকার জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে হামলাকারীদের সম্পর্কে সুস্পষ্ট বক্তব্য না দিলেও গোবিন্দগঞ্জের ঘটনায় সাঁওতালরা স্পষ্ট করেই জড়িতদের নামধাম উল্লেখ করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। কারা কী আশ্বাস দিয়ে তাদের মাঠে নামিয়েছে, কিভাবে কত দিনে কত টাকা তাদের কাছ থেকে কে কে নিয়েছে, তা-ও তারা উল্লেখ করেছে। শিল্প মন্ত্রণালয় বা চিনিকলের পক্ষ থেকে দেয়া বক্তব্যেও ঘটনার নেপথ্যে কারা কিভাবে কাজ করেছে, তার উল্লেখ পাওয়া যায়। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় প্রভাবশালীরা চিনিকলের জমি গ্রাস করার জন্য সাঁওতালদের ব্যবহার করে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তাহলে তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না কেন? গ্রেফতার করা হচ্ছে না কেন?

 

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নে এক যুবক পবিত্র কাবাঘরের ছবি সম্পাদনা করে ফেসবুকে পোস্ট করেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এরপর স্থানীয় লোকজন তাকে পুলিশে সোপর্দ করে। এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে পরের দিন নাসিরনগর সদর উত্তাল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ৩০ অক্টোবর উপজেলা সদরের কলেজ মোড়ে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। সমাবেশ চলাকালে বেশ কয়েকটি মন্দির ও হিন্দুদের বাড়িতে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। ধারাবাহিকভাবে সারাদেশে চলছে একই ধরণের হামলা। হামলার অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা। এসব হামলার শিকার হচ্ছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ!

 

এ ধরনের ঘটনার যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেজন্য নাসিরনগরে হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া জরুরি। এই জরুরী কাজটি করতে যতো বেশী দেরী হবে ততো বেশী সহিংসতা বাড়বে। অপরাধীরা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগও পাবে। অতীতে আমরা তেমনটি-ই দেখেছি এবং চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বরের কুষ্টিয়ার ঘটনা আমাদের ভয়ংকর অতীতের কথা রূঢ়ভাবে মনে করিয়ে দিয়েছে!

 

আমরা চাই, বক্তৃতা বা বিবৃতি না দিয়ে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করা হোক। সেই কাজের ধীরগতি দেশবাসীকে ব্যথিত করছে। কেন এই ধীরগতি সেটা বুঝতে আমরা সক্ষম নই। হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, লুটতরাজ ও হামলার বিচারের দাবিতে মিছিল ও মানববন্ধন করা হয়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এ দেশে সুদীর্ঘকাল ধরে সাম্প্রদায়িক হামলা হয়ে আসছে। কিন্তু এগুলোর কোনো সুরহা আমরা দেখতে পাই না। এভাবে আমাদের আর কতদিন আন্দোলন, মানববন্ধন করে যেতে হবে? আমাদের মনে একই প্রশ্ন বারবার জেগে উঠছে।

নির্মম-নির্যাতনের এমন ঘটনা-ই কী আমরা দেখতে থাকবো? কে দেবে এই প্রশ্নের উত্তর! তবুও মানুষ   আশা করে। আমরা বিশ্বাস করি, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করা হবে। বিচারের মুখোমুখি করা হবে। পাশাপাশি গৃহহীন সাঁওতালদের জন্য দ্রুত আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে। হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণেরও ব্যবস্থাও করা হবে। আমাদের এই বিশ্বাস অটুট থাকবে তো? হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে পালিত হবে তো? কুষ্টিয়ায় ঘটে যাওয়া ঘটনার পূনরাবৃত্তি কোনভাবেই কাম্য নয়। আশা রাখি সরকার এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুলো বিশেষভাবে বিবেচনা করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। স্বাধীন বাংলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনাশ কোনো ভাবেই কাম্য নয়।

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ: সিনিয়র সাংবাদিক।

jsb.shuvo@gmail.com


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Future Station Ltd.
উপরে যান