ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিকথা 

Wed, Jul 28, 2021 6:50 AM

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিকথা 

মো: কামালউদ্দিন : দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর স্মৃতিকথা লিখবো এটা কখনো ভাবিনি। জানা থাকলে প্রতিদিনের ক্লাস নোট খাতার পাশাপাশি আরেকটি খাতা স্মৃতিচারণের জন্য রাখলে আজ বিশাল একটি গ্রন্থ হয়ে যেতো অনায়াসে। 

"ভুল সবই ভুল, এই জীবনের পাতায় পাতায়"। দুই বৎসরের স্নাতকোত্তরের কোর্স শেষ হয় চার বৎসরে। রেজাল্ট বেরুতে সময় ক্ষেপন হয় এক বৎসর। এ যেনো গর্ভধারণ প্রক্রিয়ার মতো ব্যাপার। পরীক্ষা শেষে এক ছাত্রী বিয়ের পর মা হন। বাংলার বাণীতে ছবিসহ সেই সংবাদ প্রকাশিত হলে ডিপার্টমেন্টের টনক নড়ে।

 

লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পরিবর্তে স্নাতক পরীক্ষায় প্রাপ্ত নাম্বারের ভিত্তিতে স্নাতকোত্তর পর্বে ভর্তি ব্যবস্থা ছিল ১৯৮০ সালে। আমাদের ভর্তির পর পরই এই পদ্ধতির অবসান হয়। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে ভর্তির আবেদন পত্র জমা দেয়ার সময় কাজিন বন্ধুতুল্য দেলোয়ার হোসেন বাদল আমার সঙ্গী ছিল তখন। বাদল এখন সপরিবারে সিডনী প্রবাসী। বাদল বললো - দাদা, বাংলা ডিপার্টমেন্টেও একটা এপ্লিকেশন জমা দেই। দেখি না কি হয়? টেবিলে অপেক্ষায় স্যার আমার কাগজপত্র দেখে ভড়কে যাওয়ার মতো অযাচিত অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন করলেন - সব বিষয়ে তোমার মার্ক এতো বেশি কেনো? তুমি কি নকল করেছো? উত্তরে তর্ক না করে যুক্তির আশ্রয় নেই। স্যার কলেজের পরীক্ষার উত্তর পত্র কি কলেজ শিক্ষকেরা দেখেন, না বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা দেখেন? না, কেনো আমরা দেখি। তা'হলে তো স্যার আপনার প্রশ্নের উত্তর আপনার কাছেই আছে। 

 

শৈশবে মসজিদে গিয়ে আরবী পড়েছি। কৈশোরের প্রতিটি ভোরে মসজিদে হাজির হয়েছি। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে সকাল আটটার ক্লাস শুরুর পূর্বে উপস্থিত থাকা আমার কাছে কোনো কষ্টকর ব্যাপার বলেই মনে হতো না। ভোরে উঠেই শাওয়ারের পর বাসি ভাত কিংবা পান্তা ভাত অথবা রুটি। নারায়ণগঞ্জের জামতলার মোড় থেকেই প্রগতির তৈরী সুপরিয়র বাসে চড়ি। গুলিস্তান থেকে রিক্সায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশ ঘেষে কলা ভবনে যাওয়ার পথে সবুজের এক মাদকতায় আচ্ছন্ন হয়ে ক্লাসে পৌঁছি। সহপাঠী বন্ধু আবু ইয়াহিয়া দুলাল একদিন জিজ্ঞেস করে - কিরে হলে থেকে সকাল আটটার ক্লাস ধরতে পারি না, লেট লতিফ হই। তুই এতো সকালে অতো দূর থেকে কেমন করে আসিস?

 

দেখা গেলো অনেকেই প্রাচ্যের ডান্ডির শহর থেকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে যান। কারো কারো বাদুর ঝোলা হয়ে যেতে গিয়ে দুলালের মতো লেট লতিফ হয়ে ডান্ডি-পটাশ হন। এরপর শুরু হলো আনন্দ নামক বাস প্রাপ্তির স্বাক্ষর অভিযান। অভিযান সফল হলো। বাসার মোড় থেকেই সাতটা দশের "আনন্দ" বাসে চড়ি। রোকেয়া হলে গেইটের অপজিটে নেমেই এক কাপ গরম চা এর পর দোতলা সিগারেটের ধূম্ররাশি উড়িয়ে ক্লাসে ঢুকি। দিনের শুরুতে প্রক্ষালন কক্ষে বিসর্জন পর্বটি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতি ভোরে বাস ধরার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ফলে সময়াভাবে ভোরের বিসর্জন পর্বে অংশগ্রহণ সম্ভব হতো না। ক্লাসের বিরতিতে কখনো কখনো গিয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার, শাহবাগ পাবলিক লাইব্রেরি ও চারুকলা পর্যন্ত। 

 

স্যারদের নামের আদ্যক্ষর দিয়ে ক্লাস রুটিন ও নোট খাতায় তাঁদের নাম লেখার রীতি ছিল। যেমন - ডক্টর আহমদ শরীফ স্যারের নাম - আশ। ডক্টর সৈয়দ আকরম হোসেন স্যারের নাম - সৈআহো। অনেকেই নামের বানান ভুল করেন, এজন্য আকরম স্যার প্রথম ক্লাসে বললেন আমার নামের বানানে র - এ আকার নাই। বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের এক কর্মচারী ডক্টর আহমদ শরীফ স্যারের নামের বানান ভুল করলে স্যার তাঁকে বলেছিলেন - আহম্মক কোথাকার! ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ স্যার তাঁর নাম বোর্ডে লিখে বলেছিলেন - ম - এ ওকার হবে না।

 

ডক্টর রফিকুল ইসলাম স্যারের লেখা "বীরের এ রক্তস্রোত মাতার এ অশ্রুধারা" বই পাঠে জানি ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ স্যার স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন। একদিন ডিপার্টমেন্টের করিডোরে দীন মুহম্মদ স্যার রফিক স্যারের নাম উচ্চারণ করে বললেন - রফিক শোনো। রফিক স্যার তাঁর সামনে মাথা ঝুঁকে দাঁড়িয়ে বলছেন - জি স্যার, জি স্যার। যতটুকু শ্রদ্ধাভরে কথা বলা প্রয়োজন রফিক স্যার তার এতটুকুও কম করেননি। লেখক ডক্টর রফিকুল ইসলামকে অধ্যাপক রফিক স্যারের পাশাপাশি এনে দেখে বিস্মিত হই। 

 

দীন মুহম্মদ স্যার বেশ কিছুদিন বানানের রীতির ক্লাস নিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে বই জেরোক্স করা যেতো। ফ্রয়েডের একটি বই জেরোক্স করার জন্য ফর্ম পূরণের পর অনুমতির জন্য ডিপার্টমেন্টে জমা দেই। দিন-মাস ঘুরে বৎসর এলে দীন মুহম্মদ স্যার বললেন - তুমি ফ্রয়েডের বই পড়তে চাও কেনো? স্যার নবীজী (সাঃ) বলেছেন - "জ্ঞানের জন্য সুদূর চীন যেতে পারো"। স্যার দুচোখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন - আচ্ছা নাও। লন্ডন যাবার সময় প্লেনে স্যার হাঁচি দেবার পর আলহামদুলিল্লাহ শব্দ করে উচ্চারণ করেছিলেন। সহযাত্রী তাঁকে প্রশ্ন করেছিল - তোমার উচ্চারিত শব্দের অর্থ কি? উত্তরে স্যার বলেছিলেন - এটা তোমাদের "এক্সকিউজ মি" শব্দের আরবী।

 

আকরম স্যারের ক্লাসটি ছিল ঠিক লাঞ্চের পর ভাত ঘুমের সময়। স্যার বললেন - আমার ক্লাসটি দু'টি পিরিয়ডের সমান দীর্ঘ। দুপুরে আমার ক্লাসটির জন্য তোমাদের কষ্ট হবে। আমি চাই তোমরা কষ্ট করেই শেখো। স্যারের প্রতিটি ক্লাসের জন্য লাঞ্চের পর ঘুম তাড়ানিয়া চা ছিল অত্যাবশ্যকীয়। কখনো একসাথে দুই কাপ। আশির দশক থেকে আজো পত্রিকা ও বইয়ের সব সাক্ষাৎকার পড়ি। আকরম স্যারের সাক্ষাৎকার আজো দেখিনি গত চার দশকে। স্যার হয়তো সচেতনভাবে এই পর্বটি এড়িয়ে চলেন। পথের পাঁচালী, অপরাজিতা, আরণ্যক, লাল সালু, চাঁদের অমাবস্যা, কাঁদো নদী কাঁদো, পদ্মা নদীর মাঝি, পুতুল নাচের ইতিকথা, দিবারাত্রির কাব্য - স্যারের নির্দেশ ছিল এই নয়টি বইয়ের প্রতিটি বই তিনবার করে পড়তে হবে। কি বিরাট বিশাল আয়োজন। সারারাত জেগে প্রতিটি বই তিনবার করেই পড়েছি। পড়ায় কোনো ফাঁকি ছিল না। শৈশব থেকেই বই পড়ি। ডক্টর আহমদ শরীফ স্যার, ডক্টর সৈয়দ আকরম হোসেন স্যার ও ডক্টর সাঈদ-উর-রহমান স্যার বই পড়া ও বইয়ের সমালোচনা করা শিখিয়েছেন। শিখিয়েছেন কর্তন, বর্জন। আকরম স্যার ও সাঈদ-উর-রহমান স্যার বলেছিলেন - আমরা তোমাদের চোখ তৈরী করে দেবো। দেখার দায়িত্ব তোমাদের।

 

টিউটোরিয়াল ক্লাসগুলি ছিল ছাত্র শিক্ষকদের একে-অপরের সান্নিধ্যে আসার ও জানার সুযোগ। সাইদুর রহমান ভুঁইয়া স্যারের টিউটোরিয়াল ক্লাসে স্যার জিজ্ঞেস করলেন - তুমি কোথায় থাকো? স্যার আমি রুমির স্কুল ফ্রেন্ড। একসময়ে স্যার সপরিবারে নারায়ণগঞ্জ থাকতেন। রুমি স্যারের বড় ছেলে, আমার সহপাঠী ছিল। জামি স্যারের দ্বিতীয় ছেলে।এয়ারফোর্সের প্লেন ক্রাশে রুমির অকাল প্রয়াণ ঘটে। স্যার স্তব্ধতার ঘোর ভেঙ্গে বললেন - তোমার বাসা কোথায়, ঠিকানা বলো? ঠিকানা বলার পর বললাম - স্যার আপনি যে গলিতে থাকতেন আমি তার পশ্চিমের গলিতে। একদিন পড়ন্ত দুপুরে মহল্লার মোড়ের মুদি দোকানের ছেলেটির বাসায় এসে বললো - ভাই ঢাকা থেইক্কা একজন লোক আইছে, আপনেরে ডাকে।আমার দোকানের সামনে খাড়ায়াইয়া রইছে। অলি ভাই, তাঁকে বাসায় নিয়ে আসতেন। না হেয় আইবো না। আপনেরে আমার লগে যাইতে কইছে। সাইদুর রহমান স্যারকে দেখে বিস্মিত হয়ে সালাম দিয়ে বলি - স্যার বাসায় চলুন। না, চলো রিক্সায় ওঠো, বোস কেবিনে যাবো। বোস কেবিন নারায়ণগঞ্জের শতাব্দী প্রাচীন প্রসিদ্ধ সকাল-সন্ধ্যায় চা ও আড্ডার জন্য।

 

"সেই চম্পা নদীর তীর" থেকে একরাশ সুর নিয়ে আসতেন আবু হেনা স্যার। তাঁর কন্ঠে সব সময়ই ধ্বনিত হতো একটি গান বা কবিতার লাইন। "আমার চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ", মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী", "হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মতো নাচেরে"। আবু হেনা স্যার রবীন্দ্র কাব্য পড়াতেন। সংবাদের সাহিত্য পাতায় রবীন্দ্র কাব্য নিয়ে স্যারের একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। টিউটোরিয়াল পরীক্ষায় স্যারের লেখাটি উত্তর পত্রে লিখে দিয়েছিলাম। আবু হেনা স্যার ও সাঈদ উর রহমান স্যার দুজনের "আপনি" সম্বোধনে আমি আজো আচ্ছন্ন ও আবিষ্ট।

 

ডক্টর সাঈদ উর রহমান স্যার বলেছিলেন - আপনারা "রাশিয়ার চিঠি" পড়বেন। প্রতিদিন লাঞ্চের পর ক্লাস না থাকলে লাইব্রেরিতে বসে বাংলা সাহিত্যের দিকপালদের রচনাবলী থেকে তাঁদের লেখা চিঠি পড়েছি। কারো রচনাবলী যেনো বাদ পড়ে না যায় এজন্য ক্যাটালগ ঘেঁটে সব রচনাবলীর নাম লিখে রেখেছি। 

 

প্রথম আলো লিখেছে - "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ আমাদের অহংকারের অনুষঙ্গ"। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হবার সুযোগ পেয়ে ডক্টর আহমদ শরীফ স্যার, ডক্টর আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্যার, ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ স্যার, ডক্টর সাঈদ-উর- রহমান স্যার, সাইদুর রহমান ভূঁইয়া স্যার, ডক্টর সানজীদা আপা, ডক্টর আহমদ কবীর স্যার, ডক্টর নূরুর রহমান খান স্যার, রাজিয়া সুলতানা আপা, ডক্টর মনসুর মুসা স্যার, সিদ্দিকা মাহমুদ আপা, বেগম আকতার কামাল আপা, ডক্টর সৈয়দ আকরম হোসেন স্যারদের মতো বরেণ্য, খ্যাতিমান শিক্ষকদের ছাত্র হতে পারা এক গর্ব, অহংকার ও আনন্দের বিষয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১লা জুলাই ২০২১ এ প্রতিষ্ঠার ১০০ বৎসর। শুভ শতবর্ষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়!

 

ই-মেইলঃ mdkamaluddin@yahoo.com


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Future Station Ltd.
উপরে যান