স্মৃতির মনিমালা-মন্দ ভালোয় কাটছে দিন

Sat, Jul 24, 2021 4:23 PM

স্মৃতির মনিমালা-মন্দ ভালোয় কাটছে দিন

জামিউর রহমান লেমন: (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো।– বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।)

উনিশ-শ আশি সালের শেষের দিকে,আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শহীদুল্লাহ্ হলের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড নিয়ে ব্যস্ত, মিছিল মিটিং এ গণসঙ্গীত করা একটা নেশায় পরিণত হয়েছিল। কি পেলাম কি পেলাম না এতো কিছু ভাবনার সময়নেই, মাত্র উনিশ বিশের একজন যুবক,যার মাথায় সংস্কৃতি চর্চ্চার পোকা দানা বাঁধা,তার কি আর আগে- পিছের কোন ভাবনা থাকে।

সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে ডুবে থেকে পড়াশুনাটা একরকম উচ্ছন্নে গিয়েছিল। নিয়মিত ক্লাশটা করতাম,তবে লাইব্রেরি ওয়ার্ক,রাতজেগে পড়াশুনা এসবের ধারধারতাম না। সেসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয ক্যাম্পাস ছিল সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের স্বর্গ রাজ্য। বিকেল হলেই টিএসসি-কে মনে হতো সংস্কৃতির পাঠশালা। গান,নাচ,নাটক,আবৃত্তি চর্চ্চার শোরগোল শুনা যেত একেবারে সোরওয়ার্দী উদ্যানের গেট থেকে।

একদিন সম্ভবত ছাত্র ইউনিয়নের অনুষ্ঠানে কলাভবনে আমি সবেমাত্র গান করে মঞ্চ থেকে নেমেছি, প্রিয় কবি রুদ্রদা ও শিল্পী বাবু রহমান আমাকে আগলে ধরলেন বললেন“তুই এতো হেংলা পাতলা ছেলে,ওরকম ভারি গান কি করে গাইলি –সাবাস” আমি গেয়েছিলাম “সাথীদের খুনে রাঙ্গা পথে দেখ

হায়নার আনাগোনা”। আমার গানে তখন নেচেছিল পুরো কলাভবন চত্বর। নিজের প্রতি বিশ্বাস বেড়ে গেল,সেই বিশ্বাসের পথ ধরে পড়াশুনাটা মোটামুটি গৌণ হয়ে গেল, গান বাজনা মূখ্য হয়ে দাঁড়ালো। ছায়ানটে আমার রবীন্দ্র শিক্ষক সানজিদা খাতুন,গানের প্রথম বছরের চুড়ান্ত পরীক্ষা নিতে গিয়ে বললেন,“তোমাকে দিয়ে রবীন্দ্র সঙ্গীত কতটা হবে জানিনা তবে গণসঙ্গীত চালিয়ে যাও,গলা তোমার অনেক উচুতে”।

সম্ভবত একাশির শেষের দিকে কার্জন হল ক্যাফেটরিয়ায় একদিন দুপুরের খাওয়া সারছি, হঠাৎ দেখি একজন অল্প চুলের লোক পাশের টেবিল থেকে আমাকে ডাকছে। আমি প্লেট সহ উঠে গেলাম।তাঁর পাশে বসতেই তিনি বললেন, “আমি তোমাকে চিনি” এই একটি মাত্র কথায় লোকটাকে আমার আপন মনে হলো, আমাকে চেনে! কি আশ্চর্য্য? উনি বললেন “শোন ভাই,আমার একটা স্বপ্ন আছে” সেটা কি জানতে চাইলে উনি বললেন “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটা অন্যরকম সাংস্কৃতিক দল গড়ে তুলতে চাই,যারা মানুষকে উজ্জিবিত করবে, সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশে কাজ করবে, আমি চাই কার্জন হল চত্ত¡র থেকে তুমি সেই দলে থাকবে” আমার ইতিবাচক সম্মতিতে তিনি টুক করে তার ডায়েরিতে আমার নাম হলের রুম নম্বর লিখে নিলেন। বললেন “ একটা প্রাথমিক সভা হবে টিএসসিতে, টিএসসি-র পরিচালক জামান স্যার থাকবেন, তোমাকে জানানো হবে।

সেই থেকে শুরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের সাথে পথচলা, সম্ভবত আমি ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের প্রথম সাতজনের একজন।আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয় সঙ্গীত বিভাগের, মনে আছে মহড়া কক্ষে মহড়া করতাম কয়েকটি কবিতা নিয়ে, এর মধ্যে মনে পড়ছে দুটি কবিতার কথা, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য - আর আমার সুরারোপিত কবি দিনেশ সেনের কবিতা, বেয়নেট হোক যত ধারালো কাস্তেটা সান দিও বন্ধু। বন্ধু আনিস কবিতা দুটো বেশী পাঠ করতো, আমার সুরের মোহে পড়ে সেও মহড়ায় সুরে সুর মেলাতো। আনিসের গানের গলাও ভাল ছিল, সে আর আমি একই সাথে ছায়ানটে রবীন্দ্র সঙ্গীতে ভর্ত্তি হয়েছিলাম।

দলের প্রধান লিয়াকত আলী লাকি তার স্বপ্নের পথ ধরে তখন দ্রত হেঁটে চলেছেন,কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো ক্যাম্পাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের শিল্পীরা। আমি গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে সাংস্কৃতিক জোট এর র‌্যালী সহ বিভিন্ন প্রতিবাদ মিছিলে  গানে অংশ নিয়েছি, আমার সাথে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছে র‌্যালীতে অংশ নেয়া সবাই। “মাগো ভাবনা কেন” গানটি যেন সারা ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাস সঙ্গীতে হয়ে উঠলো। লাকী ভায়ের এ্যাকোডিয়ান,অভিজিৎ ,অরিজিৎ এর ঢোল,গৌর এর বাঁশী ছিল সেসব র‌্যালীর আকর্ষন।

আমরা- দলের প্রধান লাকী ভায়ের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্গীত ও নাট্যকলা বিভাগ খোলার জন্য সঙ্গীত র‌্যালীর মাধ্যমে আবেদন করেছি,করেছি ক্যাম্পাস প্রদক্ষিন। আমাদের প্রতিবাদের বিষয়ছিল, অনতিবিলম্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্গীত ও নাট্যকলা বিভাগ চালু করা হোক। আর সেই আন্দোলনের ফসল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আজকের সঙ্গীত,নাট্যকলা,নৃত্যকলা বিভাগ। ক-জন সে বিষয়টি মনে রেখেছেন!

আমাদের সাংস্কৃতিক কার্য্যক্রম পরিচালনার কারণে, বদলে গেল ক্যাম্পাসের গান বাজনার ধরন। সবাই অভ্যস্ত হয়ে উঠলো বৃন্দ কবিতা আবৃত্তি, রবীন্দ্র নজরুল, গণসংগীত, দেশের গান উপভোগ করতে। অবাক কান্ড এক ঘন্টার বৃন্দ আবৃত্তি, অথবা সোনাই মাধব নাটক টি এস সি অডিটোরিয়ামে-  পিন ড্রপ সাইলেন্স।

ঢাকা সহ সারাদেশে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চ্চার বিকাশে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের অবদান যে অনেক একথা বলার অবকাশ নেই।

দেশাত্ববোধের চেতনায় উজ্জিবিত করতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের ভুমিকা না বললেই নয়, আমাদের গান নাটক শুধু ক্যাম্পাসেই নয় সকল মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম তৈরীতে সহায়ক হয়ে উঠে। আমাদের পথ নাটক রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার তার মধ্যে অন্যতম একটি নাটক,এই নাটকের চরিত্র লাকি ভাই,জাহাঙ্গীর ভাই,মনির ভাই,শ্যামল,সাইফুল সহ আরো অনেকের চেহারা এখনো চোখে ভাসে। নাটকটির সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব ছিল আমার উপরে, যখন আমি শুরু করতাম “থাকিলে ডোবা খানা হবে কচুরি পানা” তখন উপস্থিত দর্শকারাও সমস্বরে গাইতেন। সেই ভাললাগা স্মৃতি আজো আমায় মোহআচ্ছন্ন করে, খুব মনে পড়ে এক একুশের রাতে অন্যান্যদের সাথে সারা রাত সাংস্কৃতিক দলের কক্ষে জেগে থাকার কথা,পুরো রাত জুড়ে,গান বাজনার কথা, সাথে ছিলেন আমার স্ত্রী-অভিনয় ও সঙ্গীত শিল্পী নাজিয়া ফারহা মিনু। এখনো কোথাও আনন্দগানে একত্রিত হলে সে মনের অজান্তে সেদিনগুলির কথা বলে ফেলে, বলে “আমাদের লাকি ভাই কেমন আছেন”। লাকি ভাই আপনার-ও-কি আমাদের কথা এভাবেই মনে পড়ে?

প্রিয় লাকি ভাই সেই আপনি মনের মধ্যে যে  স্বপেরœ বীজ বুনে দিয়েছিলেন, সেটাকে এখুনো লালন করছি, যতটুকু সৎ থাকা যায় থাকতে চেষ্ঠা করছি, যতটুকু মানুষের জন্য করা যায় ততটুকু করতে চেষ্ঠ্যা করছি, পাওয়া না পাওয়ার হিসাব করিনি আজো, আর তাইতো এখুনো মন্দ ভালোয় কাটছে দিন।।


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান