আমার দ্বিজ- একটি কৃত্তিকা কথা

Mon, Jun 21, 2021 1:21 AM

আমার দ্বিজ- একটি কৃত্তিকা কথা

সঙ্গীতা ইয়াসমিন : দ্বিজ- ‘দ্বিতীয়বার জন্মলাভ’ বাস্তবে মানবজীবনে এর অস্তিত্ব না থাকলেও এই গুঢ় ভাবার্থক শব্দটি নারীর জীবনে নিশ্চিতভাবেই অস্তিত্বমান। বিশ্ব সংসারের এই পাঠশালায় নারী জীবনের পরীক্ষার অন্ত নাই; সহজে মুক্তি মেলে না নারীর, জন্মের ঋণ শোধ করে যেতে হয় মৃত্যুবধি। একজন মেয়েশিশুর ধীরে ধীরে পূর্ণ নারী হয়ে ওঠার সাথে মাতৃত্বের মত গুরুভার একটি শব্দ, একটি মমতাময় রূপ অবিচ্ছেদ্যভাবে তাঁর শারীরিক-মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ের সাথে জড়িয়ে থাকে। সমাজ, সংস্কৃতিভেদে এ খুব একটা তারতম্য দেখা যায় না। সুতরাং, একজন নারীর জীবনে মা হবার ঘটনাটি তাঁর দ্বিতীয় জন্ম বৈ অন্য কিছুই নয়।

 

রেগুলার চেক আপের জন্য আলট্রাসাউন্ড করতে যাবার দিনটি ছিল অতি আনন্দ- উত্তেজনার। আমাদের দুজনের অতি উৎসাহিত মুখের দিকে তাকিয়ে সনোলজিস্ট কিছুক্ষ ভাবলেন তারপরে, খানিকটা বিষন্ন বদনে আমতা আমতা করে জানালেন, আমাদের অনাগত শিশুটি কন্যা সন্তান! আমরা দুজনেই অপার আনন্দে হেসে উঠলাম যেনো শান্তির বারতা নিয়ে আসছে সে। আমাদের হাসিতে সনোলজিস্ট বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা প্রথম সন্তান মেয়েই চেয়েছিলেন। আমরা তাঁকে ততোধিক নিরুৎসাহিত করেই হেসে ঝলমল করে জবাব দিয়েছিলাম- সে আমাদের স্বপ্ন কৃত্তিকা আমাদের আপন আলোয় ভরা ছোট্ট আকাশে।

 

আজ থেকে সতেরো বছর আগে ঠিক এই দিনে আমার দ্বিতীয় জন্ম হয়েছিল। জুনের ২১, ২০০৪ সাল সেদিন সোমবার গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে সূর্য্যের আলো ঝলমলিয়ে আমার শূণ্য ঘরে এলো সে সুন্দর!  মরফিনের অচেতনে বিবশ শরীরে ঘুমন্ত আমি তখনও জানি না কী কী ঘটে গেছে আমার সাথে! আমার ঘুম ভাঙিয়ে ডাক্তার সাহেবা বললেন, “দেখুন আপা, আপনার কী সুন্দর একটি মেয়ে বেবী হয়েছে!” সেই প্রথম নয়ন মেলে দেখিনু তারে!

 

সময় ঘড়িতে খুব লম্বা সময় হয়তো নয়, মাতৃত্বের এই পথচলা। পৃথিবীর অনেক মায়ের মতন আমিও মা হয়েছি। এর কি আদৌ কোনো বিশেষত্ব আছে? যা নিয়ে আমার এতো কথকতা! এতো ব্যাকুলতা! কেনো আজ উথলে ওঠে হৃদয় বড় বেদনায়, বড় ভালোবাসায়, বড় ব্যথায়, কষ্টানন্দে!

 

“তুমি কি জানো মা আমি এই বছর কত ইয়ার্স টার্ন করব?” সতেরো বছর বয়সী একজন নাবালিকা তার মা কে এমন সরল প্রশ্ন করে? এ বয়সী শিশুরা জীবন ও জগতের অনেক বিষয়ই জেনে যায় সময়ের প্রয়োজনে। হ্যাঁ আমি আমার কন্যার কথাই বলছি। এই অনিন্দ্যসুন্দর শিশুটি, যার মা আমি, সে একজন বিশেষ শিশু।

 

আমার দ্বিতীয় জন্মের এই সুদীর্ঘ জার্নিটিও তাই খানিকটা আলাদা, খানিকটা বিশেষ তো বটেই। আজও এই ২০২১ এ দাঁড়িয়ে আমরা ‘বিশেষ শিশু’ কথাটি উচ্চারণের সময়ে একটু নিচু গলায়, একটু সহানুভূতি মিশিয়েই করি। কেননা, জন্ম থেকে আমরা শিখেছি কিছু বিষয় ‘স্বাভাবিক’ আর কিছু ‘অস্বভাবিক’। স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক এই শব্দদ্বয়ের দ্বৈরথে আমাদের চোখ, কান, ও মনের ভেতরে যেকোনো বিষয় সম্পর্কে কিছু পূর্ব ধারনা ও ছবি তৈরি হয়ে থাকে, যা অনেকটা প্রোগ্রামড। আমরা চাইলেও সেখান থেকে সরে আসতে পারি না। আর সেকারণেই আমরা জেনে, না জেনে আমাদের লব্ধ জ্ঞান ব্যবহার করে সাধারণের চোখে ভিন্নতর মানুষদেরকে তাদের আচরণ, জন্ম ও কর্মের জন্য দায়ী করি, তুচ্ছজ্ঞান করি, করি অসম্মানও। কিন্তু ওরাও তো প্রকৃতির সন্তান! জন্মের জন্য দায় তো ওদের নয়! নয় বাবা- মায়েরও। ওদেরও আছে সৃষ্টির অসম্ভব ক্ষমতা!  

 

বাংলাদেশের সমাজে ডিফারেন্টলি অ্যাবল মানুষদেরকে অবহেলা করার এই চিত্র অতি স্বাভাবিক। আমার জানামতে, বিশেষ শিশু জন্মদানের অপরাধে এখনও মাকেই দায়ী করা হয়। স্বামীকে দ্বিতীয়বার বিবাহে প্ররোচিত করেন পরিবারের সদস্যরা। এ ছাড়াও সামাজিকভাবে সেই মা সন্তান জন্মের দায় কাঁধে নিয়ে একলা চলেন আজীবন। কেউ দেখে না মায়ের চোখেও ঝরে অশ্রু অনর্গল। মাও যে ভেতরে ধারণ করেন অন্তঃসলিলা। কেউ জানে না নীরব সে দহন!

 

স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ৪০০ মিটার দৌড়ে প্রথম হওয়া মেয়েটি জীবনের দৌড়ে হেরে যেতে যেতে যখন নিতান্তই শেষ অবলম্বন হিসেবে আঁকড়ে থাকে একটি স্বপ্নবীজের মোহ। সেই স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনার কোনো অংশীজন থাকে না পাশে। তখন সে যাত্রা হয়ে ওঠে দুরূহ। নিরানন্দের সে যাত্রায় আত্মশ্লাঘা থাকে। নিজের সাথে যে লড়াইটা লড়তে হয় তাঁকে সেখানে নিজেই নিজের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রতিমুহূর্তে আমার মনে হত, আমি যেনো ডানা ভাঙা পাখি! নীড় হারিয়ে, ঝড় শেষে উঠে দাঁড়িয়ে আবার বাসা বোনার তাগাদায় নিজেকেই রোজ একটু একটু তৈরি করি পরম মমতায় তার হাতটি ধরার। তাকে একটু একটু করে এই পৃথিবীর আলোয় আলোকিত করার জন্য আমি ঈশ্বরের কাছে দু’হাত তুলে প্রার্থনা করি- “ দুঃখ যদি দিলে দয়াল শক্তি দিও সহিবারে”। আমি বিশ্বাসও করি যিনি আমাকে এই গুরুভার দিয়েছেন তিনি জানতেন আমিই পারব এ ভার বহন করতে।

 

মানুষের খুব কাছে যাবার বাসনা ছিল আমার প্রবল। সেই সাধ মেটাতেই বেসরকারি সংস্থায় কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সেই যৌবনেই। দু’চোখে বুনে দেওয়া বাবার সকল স্বপ্ন ধূলিস্যাত করে দিয়ে আমি হয়েছিলাম কেবল একজন উন্নয়নকর্মী। ভালোবাসতাম আমার পেশাকে। ভালোবাসার সেই কাজ, আমার প্রিয় মাতৃভূমি, যার কাছে অনেক ঋণ আমার! আমার প্রিয় শহর, মানিক মিয়া এভেনিউ, রবীন্দ্র সরোবর, শহীদ মিনার, শিল্পকলা একাডেমী তোমাদের সকলের স্মৃতিকে জলাঞ্জলি দিয়ে, পেছনে ফেলে তেরশত নদীর বয়ে চলা আমি দেশান্তরি হলাম। কারণ, আমি মা! আমার মাতৃত্বের যে বেদনা, যে দায়ভার, তা আমাকে আমার জন্মদাত্রীর কাছ থেকে আমার প্রিয়তম মাতৃভূমির কাছ থেকে হাজার মাইল দূরে নিয়ে এলো। আমি হেরে গেলাম আমার দ্বিতীয় জন্মের কাছে। আমাকে ক্ষমা করো আমার জননী- মা আমার!    

 

জীবনের প্রাপ্তি আর প্রত্যাশার মিলে হতাশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে পৃথিবীর বাতাস। অপূরণীয় স্বপ্নের পাহাড় পথ আগলে দাঁড়ায় জীবনের পথে। আমাদের অজান্তেই নিজেদের অনর্জিত স্বপ্নের বোঝা চাপিয়ে দিই সন্তানদের ঘাড়ে দিয়েছি আমিও! কেবল যা কিছু পাইনি, বেদনার পুঞ্জীভূত ভার হয়ে আছে গোপনে যা, জেনেছি সেই না পাওয়াগুলোই’ জীবন! বলেছি আমার আত্মজাকে- একেই জয় কর মা! দুঃখের তীমিরে জ্বালিয়ে অন্তর হয়ে ওঠো ঐশ্বর্যময়ী, বেদনারও যে অনুপম মহত্ব আছে ভালোবাসো তাকে। “মানুষ হয়ে ওঠ সোনা, মানুষেরেই ভালোবেসে।”

 

আমাদের একমাত্র কন্যা "প্রজ্ঞা পারমিতা লগ্ন" আজ ১৭ এ পা দিল। সে শিখেছে জীবন ও জগতের অনেক যন্ত্রণা সহজেই গ্রহণ করতে, তেমনি পৃথিবীর অতি জটিল হিসেব বোঝে না সে। তার অসংখ্য প্রশ্নের মধ্যে বহুল উচ্চারিত প্রশ্নটির জবাব আমি দিতে পারি না! অসহায়ত্ব কুঁড়ে কুঁড়ে খায়- “ মা, আমি কেনো স্পেশ্যাল নিড শিশু? আমি কেনো অন্যদের মত নই মা? এটা কি আমার অপরাধ? আমি কেনো অন্য শিশুদের মত ভালো রেজাল্ট করে বড় কিছু হতে পারব না?” পৃথিবীতে কোন মায়ের শক্তি আছে এই প্রশ্নের সদুত্তর দেবার আমি জানি না। আমার মৌনতা আর কিছু স্বান্তনা বাণী এখন আর তাকে স্বান্তনা দিতে পারে না। সংসারের আর দশজনের থেকে সে যে আলাদা, তার সেই বোধটুকুর সক্ষমতা আমাকে একই সাথে আনন্দ দেয়, আবার ডোবায়ও বেদনার অতলান্তিক গহ্বরে।

সেই অসহায়ত্ব নিয়ে নির্বিকার আমি তাকিয়ে থাকি অসীমের পানে! দিন যায়, সময় ধীরে ধীরে বাড়ি যাবার পথে এগোয়। ভাবনারা মায়াজালে জড়িয়ে আমাকে অবশ করে রাখে। আমিহীন পৃথিবীটা কেমন হবে ওর! ভালো থাকিস মা আমার- স্বপ্ন কৃত্তিকা।   

আজকের এই বিশেষ দিনে আমি আমার প্রিয় পাঠক, পরিবার, বন্ধু-স্বজনদের কাছে আশীর্বাদ প্রত্যাশী। সেই সাথে আমার প্রিয় পরিবারের কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পৃথিবীর সব বিশেষ শিশুর মায়েরা এক একজন নিজের আকাশেই অনন্য নক্ষত্র। ভালো থাকুক সব মা, এবং সব বিশেষ শিশু। আমাদের শিশুরা হয়ে উঠুক কেবলই শিশু, কোনো মোড়কে তাদের চিনতে চাই না আর। মঙ্গল হোক সকলের।

 

সঙ্গীতা ইয়াসমিন, লেখক, টরন্টো, কানাডা।

 


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Future Station Ltd.
উপরে যান