প্রতিদিন হোক বাবা দিবস

Fri, Jun 18, 2021 10:19 PM

প্রতিদিন হোক বাবা দিবস

মো. কামাল উদ্দিন: শৈশবের ভোরে প্রতিদিন আমার পিতা প্রয়াত এ, সাত্তার মিয়া (১৫ই পৌষ ১৩২৬ - ১১ই চৈত্র ১৪১০/ ২৫শে মার্চ ২০০৪) বিছানা থেকে আমাকে তুলে ঘরের মেঝেয় দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলতেন - মসজিদে যা। পৌষ-মাঘের শীতে চাদর জড়িয়ে মসজিদের বারান্দায় বসে সমস্বরে সবার সাথে আরবী পড়তে হতো। সেই শব্দের ঢেউ মসজিদের দেয়ালের বাইরে রাস্তা ও আশে-পাশের বাড়ির উঠানে গিয়ে আছড়ে পড়তো। ১৪ই আগষ্টের সকালে চাঁদতারা পতাকা বাঁশের কঞ্চিতে বেঁধে বলতেন বাঁশটা ধর। স্বাধীনতার পর ২৫শে মার্চ ও ১৬ই ডিসেম্ববরেও তিনি লাল-সবুজ পতাকার জন্য ডাকতেন। শীতের ভোরে বন্দুক নিয়ে বলতেন - চল শিকারে যাই। আহত পাখিটি কুড়িয়ে আনলে পকেট থেকে ছুড়ি বের করে বলতেন - ধর, বিসমিল্লাহ্ বল। বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পরলে মধ্যরাতে ডেকে তুলে লেপ জড়িয়ে দিয়ে বলতেন - আয়, পাখির মাংস দিয়ে ভাত খাবি। শীতকাতর রমজান মাসের ভোর রাতে সেহরী খাবার জন্য ডেকে তুলে বলতেন - আগামীকাল দুপুরে ভাত খেলে তোর দুইটা রোজা হবে। রমজান মাসের শেষ দিন সন্ধ্যায় ডেকে বলতেন - আয় চাঁদ দেখি। দোনলা বন্দুক থেকে দুইটা ও পিস্তল থেকে একটা গুলি ছুঁড়তেন আকাশে। মোটর বাইকে তাঁর পিছনে বসে ছুটতাম মাছ শিকারে। আমাকে শেখাতেন মাছ ধরার ক্রীড়া-কৌশল। সন্ধ্যার পর মোটর বাইকে চড়ে তাঁর পিছনে বসে ডাক্তারের চেম্বার থেকে ফেরার পথে একটু পর পর বলতেন অই তুই ঘুমাস নাই তো। দু'হাতে আমাকে শক্ত করে ধর।

 

মানুষকে আপন করে নেয়ার ক্ষমতা ছিল তাঁর। বাড়িওয়ালা মারা যাবার মুহূর্তে তাঁর স্ত্রী ভোর রাতে জানালায় দিয়ে রেখে যায় স্বর্ণালংকারের পুটলি। মসজিদের ইমাম সাহেব প্রতিমাসে এসে টাকা জমা রাখতেন তাঁর কাছে। মা মেথীর খিচুরী ও শীতের পিঠা বানালে তিনি তাঁর বন্ধুদের ফোনে ডেকে আনতেন। শৈশব-কৈশোর থেকেই তিনি কোরআন পড়তে পারতেন, তারপরও আমার জীবনে তিনবার দেখেছি - দশ বৎসর পর পর মসজিদের হুজুরকে বাসায় এনে কোরআন শুদ্ধ করে পড়ার প্রতি তাঁর এক আকুতি।

 

ছুটির দিনে সারাদিনের জন্য নিয়ে গিয়েছেন টঙ্গী চেরাগ আলী মার্কেটে চাচার বাসায়, ভাওয়াল রাজার বাড়ি, যাদুঘর, নিউমার্কেট অথবা কৃষি মেলায়। ঢাকা নারায়ণগঞ্জ বাস ভাড়া ছিল ৬৫ পয়সা, কাউন্টার থেকে টিকেট কিনলে ৬২ পয়সা। আমাকে টাকা দিয়ে বলতেন - যা টিকেট কিনে আন। চারটা টিকেট কতো টাকা, কতো টাকা দিয়ে টিকেট কিনলি, কতো টাকা ফেরৎ পেলি। মুখে মুখে হিসাব কর। নতুন বাংলা ছবি মুক্তি পেলে সিনেমা হলে ফোন করে বলে রেখেছেন। অফিস থেকে ফোন করে বলেতেন - হলে ম্যানেজারের কাছে গিয়ে চাইলেই টিকেট পেয়ে যাবি। তখন দেখেছি-গাজী কালু চম্পাবতী ও কুঁচবরণ কন্যা। 

 

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে গ্রামে যোদ্ধারা বাড়ি এসে বললেন - "অস্ত্র চাই"। যুদ্ধের শরীর চিঁড়ে গ্রাম থেকে ফিরে এলাম শহরে। দোতলায় তাঁর অফিস, আমরা থাকি তিন তলায়। আমাদের সাথে চাচাও থাকেন সপরিবারে। যোদ্ধারা এসে বললেন - আপনার ভাই কোথায়? আব্বা দৃঢ়তার সাথে জানালেন - তাঁকে চাইলে তো আমার লাশের উপর দিয়ে যেতে হবে। বিস্ময়কর ভাবে তিনি আড়ালে রাখলেন তাঁর ভাইকে।

 

স্বাধীনতার পর তাঁর বই'র ট্রাঙ্ক থেকে একটা, একটা করে বই দেয়া শুরু করলেন। আদম (আঃ), সোলায়মান (আঃ), লুত (আঃ), ঈসা (আঃ), ইউসুফ (আঃ) ও নবীজী'র (সাঃ) জীবনী বলতেন। রামায়ন, মহাভারত থেকেও গল্প শোনাতেন। কখন, কেনো - দেবী দুর্গা তুলসী গাছকে অভিশাপ ও দুর্বা ঘাসকে দিয়েছিলেন বর। পুরাণ থেকে এ গল্পটাও বলেছেন।

 

আমাকে একটি চিঠি দিয়ে বললেন - চিঠিটি ব্যাংকের জিএম'কে দিয়ে আসবি। পরিচয় দিয়ে জিএম-এর চেম্বারে প্রবেশ করে তাঁকে চিঠিটি হস্তান্তর করতেই তিনি তাঁর চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমি চিঠির বাহক মাত্র। পত্র প্রেরককে সম্মান জানানোর জন্য জিএম-এর বিনয় দেখে আমি বিস্মিত। তাঁকে অপছন্দ করে এমন লোকের সাথেও তিনি কথা বলেছেন হাসি মুখে। তাঁকে চা ও পান কিনে দিয়ে আপ্যায়িত করেছেন।

 

বাংলার লোক ঐতিহ্যের প্রতি ছিল তাঁর প্রগাঢ় টান। ভাই-বোনদের সন্তান জন্মগ্রহণ করলে তিনি সবাইকে একটি করে কাঠের ঢেঁকি নিজে তৈরী করে উপহার দিতেন। তাঁর নিজের তৈরী কাঠের একটি ছোট্ট আলমারী ছিল বাসায়, সেটি তিনি হয়তো আমার জন্মের পূর্বেই তৈরী করেছিলেন। পৌরসভার পানির ট্যাপে পানি আসছে না, মাটি খুঁড়ে কাঁদা মাটিতে মাখামাখি হলেন। বৈদ্যুতিক সমস্যা, মেইন সুইচ বন্ধ করে কাজ শুরু করলেন। কাপড় কিনে এনে সেলাই মেশিন নিয়ে বসে মশারী বানালেন। লুঙ্গি কিনে সেলাই শুরু করলেন। কাঠের কাজের কড়াত, হাতুর-বাটাল, প্লাম্বিং কাজের যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক কাজের সামগ্রীর যন্ত্রপাতি রাখার জন্য তাঁর ছিল একটি বড় বাক্স। মোটর বাইকটি পরিস্কার করছেন নিজেই, আমাকে ডেকে বলতেন - আয় কাঁদা পরিস্কার কর। বন্দুক, পিস্তল নিয়ে বসে গেলেন। আয় দেখ, কিভাবে পরিস্কার করি। বাজার থেকে বাঁশের চালুনি ও ঝাড়ু ক্রয় করার পর তার দিয়ে বাঁধেন, তা'হলে এসবের আয়ু দীর্ঘ হবে।

 

মা ষ্ট্রোকে প্যারালাইজ হলে দিনমান তাঁর সেবায় ব্যস্ত ছিলেন তিনি। কয়েকবার মা'র ষ্ট্রোক হলে মা কোমায় ছিলেন, তখন তাঁর বেড-সোর হলে মা'কে তিনি রাইস টিউবে খাবার, ঔষধ, ব্লাড প্রেসার দেখা, ইউরিনে ব্লাড সুগার পরীক্ষা করা, বিছানা পরিস্কার করা, কাপড় পাল্টে দেয়া, বেড-সোরের ক্ষতে ওয়েন্টমেন্ট দেয়া এসবই নিজে করেছেন দ্বিধাহীনচিত্তে ক্লান্তিহীন ও নিরলসভাবে।

 

বৃক্ষ প্রেমিক পিতাকে শৈশব থেকে (১৯৬৮-৬৯ সাল) দেখেছি প্রতিদিনই তিনি গাছ রোপণ করছেন - "সৃষ্টি সুখের উল্লাসে"। ফলবান বৃক্ষ যা আছে, যত ফলের নাম বলা যাবে তার সব গাছ তিনি লাগিয়েছেন। একমাত্র তাল গাছ ব্যতীত। আনারাস ক্রয়ের পর কাঁটাযুক্ত আনারসের উপরের অংশ মাটিতে রেখে প্রাণ সঞ্চারের কি এক প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা তাঁর। প্রথম দিকে অসফল হলে পরামর্শ সংগ্রহে সচেষ্ট হলেন, কেনো আনারস গাছ হলো না? এরপর ফল প্রাপ্তি! গাব গাছের বীচি অঙ্কুরোদগম নিয়েও ছিল দীর্ঘ দিনের প্রচেষ্টা তাঁর। গাবের বীচি অঙ্কুরোদগমের সময় বীচি যথাস্থানে থাকে না। ডাব, গাব ও আনারস রোপনে তিনি কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। তেজপাতা ও বড় এলাচিও ছিল তাঁর তালিকায়।

 

টব, মাটি তো আছেই, মিষ্টির পাতিল, দধির পাতিল, ফিউজ বাল্ব, ফিউজ টিউব লাইট,  ফিনাইলের খালি কৌটা এরা কেউ তাঁর চশমার মোটা গ্লাসের ফাঁক দিয়ে দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে খালে, পুকুরে, ড্রেনে বা ফেরিওয়ালার চাঙ্গারিতে কোনোক্রমেই যেতে পারতো না।

 

রুমন রেজা ও দর্পণ কবীর ফ্রেঞ্চ মার্কেটের দোতলায় নাফিজ আশরাফ ভাইয়ের টেইলারিং দোকানে নিয়ে গেলেন একদিন। নাফিজ ভাইয়ের দোকানটি ছিল প্রগতি সাহিত্য পরিষদের লেখকদের মিলন কেন্দ্র।  নাফিজ ভাইয়ের সাথে পরিচয়ের পর জানলাম -  আব্বার তাঁর পূর্ব পরিচিত। আব্বা তাঁর কাছ থেকে পেন্ট তৈরী করাতেন। তিনি সব সময় পেন্টের ডান দিকে পিস্তল লুকিয়ে রাখার জন্য একটি পকেট তৈরী করিয়ে নিতেন। আশির দশকে বস টেইলার্স থেকে পেন্ট তৈরী করার সময় আমিও পেন্টে ঐরকম একটি পকেট রাখতাম। তখন পাঁচশত টাকার নোটের দুইটা বান্ডিল রাখতাম। এবার দেখেছি এক হাজার টাকার নোটের একটি বান্ডিল অনায়াসে রাখা যায়।

 

পিতৃভক্তি ছিল তাঁর আকাশসম। সূর্যাস্তের পর গ্রামে পিতার মৃতদেহের উপর বাবা ডাকে উপুড় হয়ে আছড়ে পড়লেন। সন্তানের ব্যাকুল ডাক শোনার জন্যই হয়তো তাঁর পিতা সাঝেঁর আকাশে অপেক্ষায় ছিলেন। জানাজার পর অনেকের হাতেই ছিল হ্যাজাক লাইট। অন্ধকার বিদীর্ণ করে আলোর বাহকেরা এগিয়ে যায় পূর্বপুরুষকে অন্ধকার মাটির প্রকোষ্ঠে শায়িত করার জন্য। পিতাকে অনুসরণ করে প্রাণবন্ত এই বিশাল হৃদয়ের মানুষটিও একদিন পৃথিবী ও আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন নীরবে। তাঁর মতো অতো বড় হৃদয়ের অধিকারী আমি তো নই।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান