পথে যেতে যেতে...

Wed, Jun 9, 2021 1:02 AM

পথে যেতে যেতে...

সঙ্গীতা ইয়াসমিন: “যেতে যেতে পথে পূর্ণিমা রাতে চাঁদ উঠেছিল গগণে,

দেখা হয়েছিল তোমাতে আমাতে কী জানি কী মহালগণে।”

প্রকৃতিতে এখন সেই মহালগনই বিরাজ করছে। যার নাম বসন্ত। বসন্তে আমাদের প্রিয় বসুন্ধরা যৌবনবতী হয়। যৌবনে পৃথিবীর সব অঞ্চলের প্রকৃতিই তার সবটুকু রং-রস, রূপ-গন্ধ ঢেলে সাজায় আপনার মুখ। এ যেন এক বিশাল ক্যানভাসে এক অনন্ত যৌবনা নারীর মোহময়ী স্নিগ্ধ রূপ। প্রতিদানের আশা না করেই কেবল দেওয়াতেই যার আনন্দ সে আমাদের চিরদিনের, চিরকল্যাণময়ী বসুন্ধরা। সে কেবল ছড়িয়ে যায়, বিলিয়ে দেয়, ভরিয়ে দেয় সবটুকু উজাড় করে। অমল আনন্দে ভেসে বেড়ায় নিঃসীম শূণ্য করে তার করপূট।

 

আমার শহরে অফিসিয়ালি এই ঋতু শুরু হয়েছে মার্চের মাঝামাঝি; যদিও মনে আমার চিরবসন্ত সারাটা কাল। কানাডার প্রধান চারটি ঋতুতে বাংলাদেশের মত কোনো নির্দিষ্ট মাসের শুরু হিসেবে এখানে ঋতু গণনা হয় না। এখানকার আবহাওয়া নীরিক্ষার বিচারে আবহয়াওয়া বিশারদদের গণনা-গবেষণার তথ্যানুযায়ী ঋতুরা নামে দিনপঞ্জির পাতা ফুঁড়ে। ঋতুরাজের এই আগমনও একই নিয়মের আওতায় পড়ে। এর শুভারম্ভেই প্রকৃতি  আপন মহিমায় জানিয়ে দেয় আবহাওয়ার আনুকূল্য। ঋতুরাজ প্রকৃতি মেতে ওঠে সৃষ্টির আনন্দজজ্ঞে সহজাত স্বভাবে।

 

সর্বনাশা কোভিডাতঙ্ক আমাদেরকে পুরে দিয়েছিল নিভৃত্যে, গৃহকোণে। দীর্ঘ বন্দিত্বের এই বিরহকাল আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন করেছিল, বিক্ষিপ্তও খানিক। এবছর আমাদের আরও একটু বেশিই তাড়িয়েছিল যেনো ঋতুরাজের আগমনীর পথে শঙ্খধ্বনি বাজাতে। সেকারণেই মার্চের প্রথম সপ্তাহেই টের পেয়েছিলাম ভালোবাসার আলতো পরশ। প্রকৃতি যেনো আমাদের মনের খবর আগেভাগেই টের পায়। তাই নিজেকে সাজানোর পায়তারায় মগ্ন হয়ে সে গেয়ে ওঠে- এ রঙ আমি ছড়িয়ে যাবো শাখায় শাখায়, পাতায় পাতায়। এ রঙ আমি ছড়িয়ে দেবো কুঞ্জে কুঞ্জে, গুঞ্জে গুঞ্জে।

 

দীর্ঘতম শীতের চাদরে ঢেকে থাকা পৃথিবী বিষন্নতার ধুম্রজাল ভেদ করে ধীরে ধীরে অবগুণ্ঠন খোলে। এ সময়ে বহুবর্ষজীবি অনেক উদ্ভিদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পত্রপল্লবে বিকশিত হয়ে নিজেকে মেলে ধরে প্রকৃতির আপন ভুবনে। মানুষও কুয়াশার চাদর মাড়িয়ে প্রজাপতি দিন ওড়াতে ছুটে চলে আনন্দ হিল্লোলে। রোদের তাপে গা ভিজিয়ে বীচে সূর্যস্নান, লেকের স্বচ্ছ জলে সাঁতার, নৌকো চালানো, মাছ ধরা, কিংবা আরও এক ধাপ এগিয়ে কেউ কেউ আদিম বন্যতায় ডুবে গিয়ে জঙ্গলে রাত কাটায় এ সময়ে। দিনের প্রায় পুরোটা সময়েই কমিউনিটির পার্কগুলোতে ছেলে-বুড়ো, তরুণী-কিশোরদের দৌড়ঝাঁপ, খেলাধূলা কিংবা ব্যয়ামে ভরে থাকে নিত্যদিনের চিত্রলিপি।

 

এ সময়ে তাপমাত্রার পারদ ধীরে ধীরে দুই অংকের ঘরে পৌছানোর প্রমাদ গোণে বসন্তের কিশলয়। দিবসের দৈর্ঘও লম্বা হতে থাকে। দিনকে দিন কঙ্কাল সার বৃক্ষও পুষ্পপল্লবে শোভিত হয়। ঘাসফুল, তৃণলতা, গুল্ম থেকে শুরু করে ফুল গাছে তো বটেই এই বসন্তে বুড়ো কাঠ বৃক্ষ সকলেই নিজেকে মেলে ধরে আরও সৌন্দর্য ঢেলে; আরও প্রেমময়ী, মায়াবতী আর রূপবতী হয়ে ওঠে। কোনো কোনো বড় বৃক্ষে নতুন পাতার বদলে কেবল ফুলের কুঁড়িই দেখা যায়। বাহারি সব রঙ-ঢঙয়ের ফুল রূপে-রসে, থরে থরে সাজিয়ে রাখে প্রকৃতির এই সুবিশাল ফুল্ল বাগিচা। সেসব দৃশ্য ক্যামেরায় তুলে আনার অযোগ্য। কী অদ্ভুত সুন্দর আকৃতি, রঙ এবং আয়তনে ভরে থাকে চারপার্শ্বের সবুজের-অবুঝ বেলাভূমি! এমন নিখুঁত পারিপাট্যে সাজানো কেবল সেই দক্ষ কুশিলবের পক্ষেই সম্ভব। কেবল চোখের দৃষ্টি কিংবা ক্যামেরার লেন্স এর যথার্থ সৌন্দর্য তুলে আনতে অপারগ। সেটুকু ব্যর্থতা গুঁজে রাখি হৃদয়ালিন্দের কুসুমপুরে। ঘরে ফিরতে ফিরতে আবারও অনুভব করি মোহময় মুগ্ধতায় ডুবে থাকার হাতছানি। সেই রেশ ধরে প্রতিদিনই ছুটে যাই বার বার নেশাগন্ধে আকুল হয়ে মন ভেজাতে। বসন্তের এমন হৃদয়দোলানো রূপে আন্দোলিত হয়েই কবিগুরু সকলকে এর সারথী হতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন,

 

“ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল,

স্থলে জলে বনতলে লাগল যে দোল।

দ্বার খোল্, দ্বার খোল্॥

রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোক পলাশে,

রাঙা নেশা মেঘে মেশা প্রভাত-আকাশে,

নবীন পাতায় লাগে রাঙা হিল্লোল।

দ্বার খোল্, দ্বার খোল্।।

 

আটঘণ্টা এক নাগাড়ে ডিভাইসের দিকে তাকিয়ে থেকে আমারও সবুজের প্রেম হাতছানি দেয়। প্রকৃতির কোমল ছুঁয়ে এই স্নিগ্ধ রূপ লাবণ্য প্রাণভরে হৃদয় অলিন্দে শুষে নিতে উদ্বেলিত হয় অন্তর। পথে যেতে যেতে কত নাম না জানা ফুলেরা এসে চুমে দিয়ে যায় চলার ছন্দ! নানা আঙ্গিকে, নানা জৌলুসে নিজের আকুতি জানিয়ে যায় সে এক মহাসম্মিলনের আধার। নিতান্তই ঘাসফুল, তৃণলতা যদিওবা হয় সেও অনন্ত প্রেমময়। বসন্তের ডালিতে আনন্দ পসরায় এ এক অদ্ভুত ব্যঞ্জনাময় সুরের দ্যোতনা মূর্ত হয়ে ওঠে।

 

আদতে প্রকৃতির চেয়ে বড় শিল্পী আর কোথাও নেই। এই আজব কারিগর যখন আপন হাতে রাঙিয়ে দেয়, আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে নিজেরই রঙ আর তুলির সুক্ষ্ম কারুকাজে আঁকেন এই সুবিশাল ক্যানভাস তখন এর মাহাত্ম্য আমাদের পক্ষে ধারণ করা দুঃসাধ্যই! আমরা কেবল এর রূপ-রস গন্ধ নিয়ে জীবনের অমৃত সঞ্জীবনী সূধা পান করতে পারি। আজানু কৃতজ্ঞতায় অপরের কল্যাণে নিয়োজিত হবার ব্রত নিতে পারি। বস্তুত, প্রকৃতি আমাদের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। কবিগুরুর সাথে সুর মিলিয়ে বলি- “রাঙিয়ে দিয়ে যাও গো যাবার আগে।”

 

মানুষের জীবনের সাথে এই ঋতুরাজের অতি চমৎকার সাদৃশ্য আছে। প্রকৃতির এই ঋতুরাজে সে যেমন অনিন্দ্যসুন্দর রূপময়ী হয়, ভালোবাসায় মোহাচ্ছন্ন করে রাখে, বিলিয়ে দেয় সকল সৌন্দর্য উজাড় করে আপন সৃষ্টিতে। তেমনি মানুষের জীবনেও বসন্ত বিকশিত হবার, বাসনায় ঢেলে দেবার, প্রমোদে ঢেলে দেবার মৌসুম। ঋতুচক্রের মত মানুষের জীবন চক্রেও বসন্ত অতি ক্ষণস্থায়ী। স্বল্পায়ু বলেই বসন্তের রূপ চিরযৌবনা, সে যেমন প্রকৃতির তেমনি মানুষেরও। কবি হেলাল হাফিজ থেকে ধার করে  বলি- “এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তাঁর শ্রেষ্ঠ সময়- এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তাঁর শ্রেষ্ঠ সময়।”

এই যৌবনে নিজেকে গড়েপিঠে ঠিক মানুষটি তৈরিতে সবটুকু সময়-শ্রমের পুঁজি ব্যয় করতে হয়। প্রথমত নিজের জন্য দ্বিতীয়ত সমাজ, দেশ, ও বিশ্বমানবতার জন্য। আক্ষরিক অর্থে যুদ্ধে নয়, তবে, যৌবনের এই স্বর্ণালী সময়ে ভাতঘুমে না কাটিয়ে নশ্বর এই জীবনকে আরেকটু রাঙিয়ে নিয়ে বিদায় নেবার আগে কিছু ঋণ শোধ করে যেতে হয়।

আমাদের তরুণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বলেছেন, “ আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ র্স্পধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি।।” এই আঠারোতেই দুকূল ছাপিয়ে যৌবন আসে, আসে বসন্ত। ফুলে বসন্ত আসে বার বার, জীবনে বসন্ত আসে শুধুই একবার। তাই জীবনের বসন্তকে ধারণ ও উপস্থাপন করার মধ্যেই মানব জন্মের সার্থকতা নিহিত। প্রকৃতিতে যা কিছু সুন্দর তার সবই ক্ষণস্থায়ী, সব স্বল্পায়ু। নইলে পুনরাবৃত্তির তান্ডবে সেও হয়ে যেত আটপৌরে-অতি সাধারণ।

 

প্রকৃতির বিশাল সৃষ্টির মাঝে মানুষই অতি তুচ্ছ, অতি সাধারণ। শেখার আছে অনেক নদীর কাছে, বৃক্ষের কাছে, ফুলের কাছে, পাখির কাছে। মানুষের জমা করা অনেক ঋণ আছে।

 

সঙ্গীতা ইয়াসমিন, লেখক, টরন্টো, কানাডা।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান