স্মৃতিগদ্য/ রাতের ট্রেন

Sat, Apr 24, 2021 1:18 PM

স্মৃতিগদ্য/ রাতের ট্রেন

সঙ্গীতা ইয়াসমিন: রাত ন'টা পঁচিশ, দু' সেকেন্ডের জন্য স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা বাসটা মিস করলাম। আসলে ইচ্ছে করেই বাসটা ছেড়ে দিলাম।এক সেকেন্ডের নাই ভরসা! এখন ভুল করারই সময় নেই, চারিদিকেই আতঙ্ক, যদি এক সেকেন্ড আগে পৌঁছাতে গিয়ে বাসের মধ্যে বাড়তি ভীড় বাড়াই! সেই আতঙ্কই পা'টাকে আটকে দিল। আর ক'টা দিন বেশি যদি বাঁচি! বেঁচে থাকা কঠিন, তবে জীবন সুন্দর! মৃত্যু যত কাছাকাছি আসে জীবন ততই সুন্দর হয়ে ওঠে।   

 

স্টেশনে দাঁড়িয়ে ইনফরমেশন বোর্ডে পরের বাস আসার সময় গুণছি।আশ পাশ ভালো করে দেখে নিলাম, আমি ছাড়া আর মাত্র একজন যাত্রী দাঁড়িয়ে আছে, মনে মনে খুশিই হলাম। বোর্ড জানাচ্ছে আর মাত্র পাঁচ মিনিট পরেই আসবে ১১৬সি বাস। এই পাঁচ মিনিটের কাঁটাটি কিছুতেই যেনো নিচে নামতে চাইছে না, শূণ্যে ওর বড় আপত্তি, আটকে আছে একই গন্তব্যে। এমনিতে স্টেশনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে মন্দ লাগে না।তবে, এখন যেকোনো কারণেই কোথাও দু'দন্ড অপেক্ষা করা মানেই হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি অহেতুক বৃদ্ধি করা।এখন সময় বড় বিপক্ষে, হৃৎপিণ্ডকে এ সময়ে বিরক্ত করা একদম ঠিক নয়। সুতরাং সময় যত গড়ায় মনকে অন্যত্র ব্যস্ত রাখলেই আতঙ্ক ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা যায়।

 

হঠাতই কু-ঝিক-ঝিক শব্দে হেলেদুলে, ছন্দে ছন্দে, একে বেঁকে স্টেশনের ভেতরে শরীর গলিয়ে দিল বোয়াল মাছের মাথাকৃতির সবুজ-সাদা রঙের তিনতলা 'গো' ট্রেন। ট্রেন স্টেশনে থামার সাথে সাথেই ঢং ঢং করে আরও কিছুক্ষণ ঘণ্টা বাজল। এই ঢং ঢং ঘণ্টার শব্দ, এই কু-ঝিক-ঝিক ছুটে চলা রাতের ট্রেন তো কেবলই ট্রেন নয়; এতো মায়াময় স্মৃতির অপরূপ পাহাড়। রাতের ট্রেনে চড়ার কত গল্পই তো জমে আছে স্মৃতির খাতার প্রতি পাতায়। হৃদয় অ্যালবামের ধূলি মলিন ভাঁজে ভাঁজে এখনও তারা আছে তেমনি চকচকে। একদিন যারা সেজেছিল জীবনের থরে থরে, কত না আদরে! বয়ে চলা দিনগুলোতে রামধনু রঙ ছড়াতে।

 

রাতের ট্রেন মানেই খুলনা-রাজশাহী; রাতের ট্রেন মানেই কপোতাক্ষ, রূপসা-সীমান্ত। আমাদের জীবনের সীমানা পেরিয়ে কতশত মুখ ও মনের সীমানায় উড়ে বেড়িয়েছে সীমান্ত আর রূপবতী রূপসা, সেকথা ঐ অবোধ ট্রেন জানে না। জানে না সে, কত অবুঝ প্রেম-বিরহের গাঁথা লেখা হয়েছে তারই শরীর ঘিরে, কত বিচ্ছেদ-যাতনার গল্প আবর্তিত হয়েছে তাকে ঘিরেই।

 

শুরুতে অবশ্য কপোতাক্ষ তার স্বচ্ছ টলটলে দেহল্লরি নিয়ে আবির্ভূত হয়নি আমাদের জীবনে। তবুও সেই কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস! আমাদের জীবনের প্রথম আন্তঃনগর ট্রেন! এক অন্যরকম  সুখানুভূতি। কয়লার গাড়ি থেকে বাষ্প ইঞ্জিন, কী আনন্দ! ঘাটে ঘাটে থামা নেই, নির্দিষ্ট স্টেশন ছাড়া যেখানে সেখানে ফেরিওয়ালার অকারণ হৈ চৈ নেই। বেশ একটা প্রাইভেসী নিয়ে ভদ্রস্ত হয়ে আনন্দভ্রমণ। মধুকবির প্রিয় কপোতাক্ষের মতোই এঁকেবেঁকে ছুটে চলত সে গ্রামের পরে মাঠ, মাঠের পরে সবুজ বন পেরিয়ে।

 

যদিও মহানন্দাকে নিয়ে মহা আনন্দেই যাত্রা শুরু হয়েছিল আমাদের তারুণ্য আর যৌবনের। আমাদের দূরন্ত যৌবনে মহানন্দা ছিল মামার ট্রেন! বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে মামার ট্রেন কি ইচ্ছে করেই একটু বাড়তি সময় দাঁড়াত কি না কে জানে? হলে ফেলে আসা মানিব্যাগ, প্রেয়সীর ঠোঁটের শেষ চুম্বন, কিংবা বন্ধুর ঠোঁটের সিগ্রেটের সুখটান দিতে দিতে আয়েশ করেই ভাগ্নেরা চড়ত ফিরতি পথের যাত্রী হয়ে। সে এক সময় ছিল বটে, বারো ঘন্টার ভ্রমনযজ্ঞ চব্বিশ থেকে ছাব্বিশ হলেও মন্দের ভালো। আরও খানিক বেহিসাবি জীবনের হিসেবী খাতায় বর্ধিত কলেবরের কাটাকুটি জমা পড়ত। মহানন্দায় চড়ে ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া ভাগ্নেরা মামার জোরেই খুলনা-রাজশাহী যাতায়াত করত অনায়াসে। টিকেট চেকারের সাধ্য কী তায় ভাড়ার জন্য ভাগ্নেদের আটকায়?

 

এখানে সেসব হবার জো নেই। কীকরে সম্ভব? সবকিছুই নিয়মমাফিক, সবকিছুই কাঁটায় কাঁটায় হিসেব কষে চলে।এখানে তিনতলা স্টেশনের পাতাল রেল চলে মাটির নীচ দিয়ে, যেটা চড়েই আমি এইমাত্র এলাম।এর পরে দোতলায় চলে লোকাল ট্রেন, বাসের পাশাপাশি লোকার স্টেশনে থামে সে। যেটাকে সাটল ট্রেন বললেও ভুল হয় না। এর সাথে মেইন ফ্লোর দিয়ে, অর্থাৎ সমতলে যায় দূর পাল্লার ট্রেন। যা আমাদের ইন্টারসিটির মতোই তাকে সবাই 'গো' ট্রেন বলেই চেনে। এই ট্রেনটি তিনতলা। পাঁচ ডলার দিলেই অনেক দূরে ভ্রমণ করা যায় অতি স্বচ্ছন্দ্যে।

 

গো ট্রেনের যাত্রা বিরতি দেখতে দেখতেই আমার কাঙ্ক্ষিত বাসটি চলে এলো। বাসে উঠতে গিয়েও মনে হল পেছনে ফিরে ফিরে সবুজে-সাদায় মেশানো ট্রেনটিকে দেখি নিষ্পলক। ততক্ষণে আমি আর এখানে নেই, চলে গেছি অনেক দিন পেছনে।স্মৃতির পাখনায় উড়াল দিয়ে রাতের ট্রেন নিয়ে গেলো আমায় ফেলে আসা দিনের কাছে একেই বোধ হয় বলে স্মৃতিগন্ধ! গন্ধহীন বোধও গন্ধ ছড়ায়, স্পর্শের অনুভব দিতে পারে হৃদয়ে, স্মৃতিরই কেবল এমন অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে। নিমেষেই  পর্দা সরে গেল চোখের সামনে থেকে। দৃশ্যপটে ভেসে এলো কপোতাক্ষ, সীমান্ত অথবা রূপসাকে ঘিরে আমার-আমাদের ঘটনাবহুল দিনপঞ্জির পাতা এক এক করে। আমি যার বহুদিনের চেনাজন, অতি পরিচিত এক নিয়মিত যাত্রী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকে গেলেও বহুকাল ট্রেনে চড়েছি, চাকরিকালীন দরকারে কিংবা শ্বশুরালয়ে যাবার কালে। স্মৃতি হাতড়িয়ে তবু সেই ছাত্রজীবন, বন্ধুদের সাথে সেই হই হই করে আড্ডা দেবার দিনগুলিই মনে পড়ে। স্মৃতির মণিকোঠায় সেইসব দিন কনকচাঁপা হয়ে ফুটে আছে।

 

ট্রেন শুধু স্মৃতিকাতরতাই নয়, ট্রেনের সাথে মানুষের জীবনেরও নিগুঢ় এক সাদৃশ্য খুঁজে পাই আমি। ট্রেনের ভিন্ন ভিন্ন বগিতে যেমন ভিন্ন ভিন্ন সুবিধাসহ ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণী থাকে, তেমনি মানুষের জীবনেও ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে নানামুখী ভূমিকা থাকে। গোটা জীবনে নানামুখী সম্পর্কে জড়ায় মানুষতাঁরাও ট্রেনের সহযাত্রীদের মত পাশাপাশি বসে থেকে জীবনের অনেকটা পথ পাড়ি দেয়। কেউ কেউ হৃদয়ের খুব গভীরে থাকে, কেউ বা থাকে আলাপচারিতায়। কখনও কারো সাথে খুব সখ্য হয়, ফোন নাম্বার বিনিময় হয়, কথাও হয় কালেভদ্রে। আবার কখনও একেবারেই অচেনা থেকে একটা জীবনের লম্বা পথে  দীর্ঘ একটা যাত্রা শেষ হয়।

 

মানুষের হৃদয় প্রকোষ্ঠের সাথেও ট্রেনের বগির মিল আছে। এক এক মানুষ হৃদয়ের এক এক প্রকোষ্ঠে থাকে। ঠিক ট্রেনের চেয়ার কোচ, সৌখিন, সুলভ, বার্থ প্রথম শ্রেণী, দ্বিতীয় শ্রেণীর মত। একই হৃদয় থেকে উৎসারিত প্রেমের নামও মানুষ ভেদে তাই ভিন্ন হয়। ভালোবাসা শ্রেণীভেদে নাম বদলায়, আর তাই এক জীবনের অতলে বহু মানুষের ঠাই হয়। বাবা-মায়ের সাথে বলি স্নেহ, ভাইবোন-বন্ধুর সাথে ভালোবাসা-মায়া, আবার প্রেমিকের কাছে সেই অন্তরঙ্গতার নাম হয়ে যায় প্রেম মানুষের হৃদয় এক বিশাল খাঁচা, আট কুঠুরী নয় দরোজার সুদীর্ঘ ট্রেন। ট্রেনের দীর্ঘ দেহের মতই দীর্ঘ জীবনে কেউ কেউ থাকে চেতনে, অবচেতনে, বোধে, কিংবা দ্বিধায়। এতো যে মনের অলিগলিতে আনাগোনা এর সব একদিন শেষ হয়। ট্রেন যখন লাস্ট স্টেশনে পৌঁছায়।

 

জীবনের ঘন্টা বাজলেই যে যার গন্তব্যে নেমে পড়ে, ঠিক স্টেশনের মতই। যে যেখানে নামবে বলে টিকেট কেটেছে তাঁকে সেখানেই নামতে হয়। কেউ কখনও অনির্ধারিত গন্তব্যে নামতে পারেন না। সবকিছুই ছকে বাঁধা। বহু যত্নে সব টিকেট আগে থেকেই ইস্যু করে রাখা। যার যার স্টেশনের ঘণ্টা নির্ধারিত রুটিন মেনেই বাজে, আর যাত্রীরা সেভাবেই প্রস্থান করেন। এর সবই পরিচালনা করেন এক মস্ত কারিগর। আমরা কেবল নিমিত্ত।

 

কোভিডও আমাদের জীবনের এক নতুন টিকে। ভয়াতঙ্কে দিন পাড় করি, যদি এবার বেঁচে যাই! আহা, সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে মন যেতে নাহি চা। তবু তো যেতেই হবে শেষ ট্রেনের শেষ স্টেশন এসে গেলে। তবু যতক্ষ দেহে আছে প্রাণ, দুহাতে সরা পৃথিবীর জঞ্জাল।

 

সঙ্গীতা ইয়াসমিন, লেখক, টরন্টো, কানাডা।

এপ্রিল ২৪, ২০২১

 


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান