আপনি জানেন না, আপনার মন কাজ করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে

Wed, Apr 21, 2021 11:55 PM

আপনি জানেন না, আপনার মন কাজ করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে

মশিউল আলম: বাংলাদেশের ‘শিক্ষিত’ লোকদের একটা অংশের মধ্যে বিজ্ঞান-বিরোধী কথাবার্তা প্রচার করা ফ্যাশনের মতো ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। আমার অনুমান, এর একটা কারণ, তাঁরা বিজ্ঞানকে ধর্মের প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে দেখেন।

কিছু মানুষ চিকিৎসাবিজ্ঞানকে লক্ষ করে বলেন, মানুষের মৃত্যু যখন ঠেকাতে পারো না, তখন এত বাহাদুরি কীসের? কিংবা, মানুষকে জীবন দিতে পারো না তো এত লাফালাফি কেন? ইত্যাদি।

মানে, তাঁরা হয়তো ভাবেন, চিকিৎসাবিজ্ঞান সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে। তাঁরা ভুল ভাবেন।

বিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁদের অধিকাংশের ধারণা ঠিক নয়। তাঁদের অভিযোগ, বিজ্ঞান আজ যা বলে, কিছু সময় পরে তা ঠিক থাকে না কেন? বিজ্ঞানের জ্ঞান তাহলে কীসের জ্ঞান?

আসলে বিজ্ঞান তো জ্ঞান নয়, জ্ঞান অর্জনের একটা পদ্ধতি, ইংরেজিতে বলে মেথড। সেই পদ্ধতির খুব সূক্ষ্ম রূপ আছে, আবার একেবারেই মোটা দাগের স্থূল রূপও আছে। স্থূল রূপে আমরা সবাই সেই পদ্ধতি ব্যবহার করি। দৈনন্দিন জীবনের কাজকর্মে ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে, স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন  প্রত্যেক মানুষের মন কাজ করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। যাঁরা বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের অপছন্দ করেন, তাঁদের মনও।

আমি যা বলার চেষ্টা করছি, তা উদাহরণ দিয়ে বললে হয়তো বুঝতে কিছুটা সহজ হবে। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী টমাস হেনরি হাক্সলি আজ থেকে দেড়শ বছরেরও আগে ‘দা মেথড অব সায়েন্টিফিক ইনভেস্টিগেশন’ শিরোনামে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেখানে তিনি যে উদাহরণ দিয়েছিলেন, সেটাই এখানে ব্যবহার করা যাক:

ধরা যাক, আপনি একটা আপেল কেনার জন্য ফলের দোকানে গেলেন। একটা আপেল তুলে নিয়ে কামড় দিলেন, আপনার টক লাগল। আপনি দেখলেন, ফলটা শক্ত এবং সবুজ রঙের। আপনি আরেকটা আপেল নিয়ে কামড় দিয়ে দেখলেন এটাও টক। এটাও আগেরটার মতোই শক্ত ও সবুজ। তখন দোকানি অন্য একটা আপেল আপনার দিকে বাড়িয়ে ধরে বলল, ‘এইটা খাইয়া দেখেন।’

কিন্তু আপনি রাজি হলেন না। কারণ আপনার মন ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে যে এই আপেলটাও আগের দুটোর মতোই টক হবে, কারণ ওটাও দেখতে সবুজ, এবং ধরে নিলেন এটাও শক্ত।

কীভাবে আপনার মন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাল?

হাক্সলি বলছেন, একটা পদ্ধতি অনুসরণ করে। আপনার মন প্রথমে যে কাজটা করেছে, সেটাকে ইংরেজিতে বলায় হয় ইনডাকশন। পরপর দুই বারের অভিজ্ঞতায় আপনি দেখেছেন যে শক্ত ও সবুজ আপেলের স্বাদ টক। প্রথমবারের কামড়ে আপনার এই অভিজ্ঞতা হয়েছে, দ্বিতীয় বারের কামড়ে আপনার এই একই অভিজ্ঞতা নিশ্চিত হয়েছে।

তারপর আপনার মন এই অভিজ্ঞতার জেনারেলাইজেশন বা সাধারণীকরণ করেছে। সেটা হলো: সব শক্ত ও সবুজ আপেলের স্বাদ টক হয়।

আপনার কাছে এটা একটা সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। ফলে, এর পর থেকে শক্ত ও সবুজ আপেল দেখলেই আপনি বলবেন, “সব শক্ত ও সবুজ আপেল টক, এই আপেলটা শক্ত ও সবুজ, সুতরাং এই আপেল টক।”

চিন্তার এই ধারাকে যুক্তিশাস্ত্রবিদেরা বলেন “সিলোজিজম”। এর বিভিন্ন অংশ ও নাম আছে: মেজর প্রিমিস, মাইনর প্রিমিস, কনক্লুশন বা সিদ্ধান্ত।

দেখাই যাচ্ছে, এটা খুবই সরল, খুবই প্রাথমিক স্তরের চিন্তার ধারা। কিন্তু এটাই সায়েন্টিফিক ইনভেস্টিগেশন মেথডের প্রাথিমক ভিত্তি। এই পদ্ধতিতে আপনি আপনার অভিজ্ঞতা আরও ব্যাপক পরিসরে খতিয়ে দেখতে পারেন।

হাক্সলি যেমন বলছেন, ইংল্যান্ডের যেসব অঞ্চলে প্রচুর আপেল ফলে, সেসব অঞ্চলের লোকজনকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। তিনি বলছেন, সমারসেটশায়ার ও ডভেনশায়ারের লোকেরা বলেছে, শক্ত ও সবুজ আপেলের স্বাদ টক। নরম্যান্ডির লোকেরাও বলেছে শক্ত ও সবুজ আপেলের স্বাদ টক। উত্তর আমেরিকার লোকেরাও বলেছে, শক্ত ও সবুজ আপেলের স্বাদ টক।

ফলে, ‘শক্ত ও সবুজ আপেল টক হয়’—এটা আপনার কাছে একটা সায়েন্টিফিক ফ্যাক্ট হয়ে উঠেছে। আপেল সম্পর্কে জ্ঞান লাভের এটাই সায়েন্টিফিক মেথড বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। আমাদের সবার মন এই পদ্ধতিতে কাজ করে।

তারপর একবার অস্ট্রেলিয়া বেড়াতে গিয়ে হোটেলের রেস্টুরেন্টে ব্রেকফ্যাস্টের সময় আপনি দেখলেন, এক সুন্দরী রেস্টুরেন্টে ঢুকেই অন্য কোনো কিছুর দিকে হাত না বাড়িয়ে একটা আপেল তুলে নিয়ে কসমস শব্দ করে খেতে লেগেছে। তার চোখেমুখে এমন তৃপ্তির অভিব্যক্তি যে আপনি অবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে রইলেন।

‘টক ফল আপনার পছন্দ?’ শেষমেশ আপনি তাকে জিগ্যেস না করে থাকতেই পারলেন না।

তরুণী অবাক হয়ে বলল, ‘টক? না তো!’

আপনি বললেন, ‘এরকম একটা সবুজ আপেল, আপনি বলছেন টক নয়?’

তরুণী বলল, ‘একটুও টক না।’

আপনি বললেন, ‘হতেই পারে না। আমি সারা ইংল্যান্ড, সারা আমেরিকায় খোঁজ নিয়ে দেখেছি, সবখানে সবুজ আর শক্ত আপেল টক হয়।’

 তরুণী বলল, ‘কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার সবুজ ও শক্ত আপেল টক নয়। আপনার বিশ্বাস না হলে নিজের মুখে খেয়ে দেখতে পারেন।’

আপনি একটা আপেল কামড়ে একটুখানি খেয়ে দেখলেন, সত্যিই টক নয়, বরং হালকা মিষ্টি। তারপর আরেকটা, তারপর আরেকটা। পরপর তিনটা সবুজ ও শক্ত আপেল নিজে কামড়ে খেয়ে আপনি দেখলেন, টক নয়, হালকা মিষ্টি স্বাদ।

ইংল্যান্ডে আপনার মন যে পদ্ধতি ব্যবহার করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে ‘পৃথিবীর সব শক্ত ও সবুজ আপেলের স্বাদ টক হয়’, অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে সেই একই পদ্ধতিতে সে আগের সিদ্ধান্ত সংশোধন করে নিল এইভাবে: পৃথিবীর কিছু অঞ্চলের সবুজ ও শক্ত আপেল টক হয়, আর কিছু অঞ্চলের সবুজ ও শক্ত আপেল হালকা মিষ্টি স্বাদের হয় (টক হয় না)।

যেসব মানুষ অভিযোগ করেন, ‘বিজ্ঞান আজ যা বলে কাল তা ঠিক থাকে না কেন?’ তাঁরা এই মোটা দাগের উদাহরণটা বিবেচনা করে দেখতে পারেন।

আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আগের ফ্যাক্ট বা হাইপোথিসিস পরের গবেষণার দ্বারা বাতিল বা সংশোধিত হয় মোটের ওপর এই পদ্ধতিতে।

লেখক: মশিউল আলম, সাংবাদিক ও কথা সাহিত্যিক।

লেখকের ফেসবুক পোষ্ট থেকে


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান