এটিই সম্ভবত করোনার সবচেয়ে খারাপ রুপ!

Fri, Apr 9, 2021 9:32 PM

এটিই সম্ভবত করোনার সবচেয়ে খারাপ রুপ!

রুবায়েত হাসান তানভি: গতকাল আইসিডিডিআরবি থেকে প্রকাশিত এই পরিসংখ্যানে অবধারিত সত্যটিই বেরিয়ে এসেছে। শতকরা ৬০ থেকে ৮০ ভাগ সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট! এটা তো জানাই আমরা অতিথি পরায়ণ, অতিথি আমাদের নারায়ণ। করোনাভাইরাসের ইউকে, সাউথ আফ্রিকা ও ব্রাজিল ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে পৃথিবীজুড়ে তোলপাড় ও আতঙ্ক শুরু হলেও আমরা কোনো প্রস্তুতি বা বিশেষ উদ্যোগ নেইনি। প্যানডেমিকের প্রথম ঢেউয়ে যেহেতু আমরা ভেসে যাইনি তাই আমাদের শিক্ষাটাও সম্পূর্ণ হয়নি। বিমান বন্দর ও ফুসফুস দুটোরই ‘দুয়ার দিয়াছি খুলিয়া দেখা হয়নাই চক্ষু মেলিয়া’ অনিবার্য এক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা । অবশ্য প্রস্তুতি নিলেও হয়তো দেশে এসব ভাইরাসের প্রবেশ ও সংক্রমণ রোধ করার মতো নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হতোনা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সর্বত্রই এই পরিস্থিতি। সাউথ আফ্রিকা ও ব্রাজিল ভ্যারিয়েন্ট মোটামুটি এখন অরিজিনাল স্ট্রেইন তো বটেই, ইউকে ভ্যারিয়েন্টকেও মুছে দিচ্ছে বিশ্বের মানচিত্র থেকে।

আইসিডিডিআরবির ডাটা থেকে এটাই প্রমাণিত যে বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে বাড়াবাড়ি সংক্রমণ, গুরুতর রোগ ও মৃত্যুর মুলে রয়েছে এই নতুন সাউথ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট ! প্রশ্ন উঠতে পারে প্রথম ঢেউয়ের সময়ে আর বর্তমানে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের এই চরিত্রগত তফাৎ এর কারণ কি? কারণ করোনাভাইরাস এর ধরন পাল্টেছে কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ তো আর পাল্টে যায়নি, পাল্টায়নি আমাদের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থা । প্রথম ঢেউয়ের সময়ে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে গুরুতর রোগ ও মৃত্যুর হার ছিল অনেক কম। যার ব্যখ্যা হিসেবে আগে লিখেছিলাম গরিবের ইমমুনিটির কথা। বলেছিলাম বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে নন-স্পেসিফিক প্রি-একজিস্টিং ইমিউনিটি বা পূর্ব-বিদ্যমান ইমিউনিটির কথা, যা মানুষ প্রতিনিয়ত রোগজীবাণুর সাথে লড়াই করেই অর্জন করে । পরবর্তীতে বাংলাদেশে ঠিক এনিয়ে গবেষণা না হলেও পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এসব ধারণার প্রমান সহ গবেষণাপত্রও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু কিন্তু করোনাভাইরাসের এই বর্তমান ভ্যারিয়েন্ট যেভাবে বাংলাদেশিদের কাবু করে ফেলছে, নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করছি এর কারণ কি?

যদিও সুনির্দিষ্ট  গবেষণা না করে এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া মুস্কিল, কিন্তু খুব সম্ভবত E484K নামে একটি মিউটেশনই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। ঠিক এই মিউটেশনটির কারণেই করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন এর, বিশেষত অক্সফোর্ড এস্ট্রজেনেকার ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর মানে হলো, প্রকৃতিগত ভাবে এবং আমাদের জীবনযাত্রার ধরণের কারণে আমাদের শরীরে যেসব রোগ-প্রতিরোধী ক্ষমতা রয়েছে, E484K মিউটেশনের কারণে ভাইরাস আমাদের সেসব রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কে ফাঁকি দিয়ে বা পাশ কাটিয়ে গুরুতর রোগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে । ভাইরাসের ইভোলুশন নিয়ে গবেষণা করেন এমন বিশেষজ্ঞদের মতে এই সাউথআফ্রিকান বা ব্রাজিল ভ্যারিয়েন্ট ই সম্ভবত করোনাভাইরাসের সবচেয়ে খারাপ রূপ কারণ এসব ভ্যারিয়েন্ট এ যেসব মিউটেশন রয়েছে সেসব মিউটেশন স্বতন্ত্র ভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আবির্ভুত হচ্ছে। এদের বলা হয় কনভার্জেন্ট (convergent) মিউটেশন। এর পিছনে যুক্তি হলো ইতিমধ্যে করোনাভাইরাস কোটি কোটি বার মিউটেশনের সুযোগ পেয়েছে এবং তা করতে গিয়ে ঘুরে ফিরে ভাইরাসের মধ্যে সুনিদৃস্ট কিছু মিউটেশন স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে যেসব মিউটেশন রয়েছে একে একে ইউকে ভ্যারিয়েন্ট , সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট ও ব্রাজিল ভ্যারিয়েন্ট এর মধ্যে। বিশেষজ্ঞদের এসব ভবিষ্যৎবাণী যদি সত্যি হয় উন্নত দেশগুলো ব্যাপক হারে ভ্যাকসিন দেবার মাধ্যমে এবং সামাজিক দূরত্ব ও মাস্ক পড়া নিশ্চিত করার মাধ্যমে এবং ট্রাভেল রেস্ট্রিকশন আরোপ করার মাধ্যমে পরিস্থিতি হয়তো সামাল দিয়ে দিবে। কিন্তু মূল সমস্যায় পড়বে স্বল্প আয়ের ও উন্নয়নশীল দেশ গুলো। বর্তমানে ভারতের দিকে তাকালেই এর প্রমান মিলে যাবে। সবচেয়ে বড় সংকট হলো কার্যকর ভ্যাকসিন এর সংকট। এখন পর্যন্ত পাওয়া প্রাথমিক ডাটা অনুযায়ী ফাইজার বা মডার্না দুটো ভ্যাকসিনই নতুন ভারিয়ান্টগুলোর বিরুদ্ধে সন্তোষজনক কার্যকারিতা দেখাচ্ছে। কিন্তু অক্সফোর্ড এস্ট্রজেনেকার ভ্যাকসিন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে। ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান থেকেও আত্মবিশ্বাসের সাথে তেমন কোনো বক্তব্য আসছে না। একারণে কোন দেশেরই শুধু মাত্র একটা ভ্যাকসিন এর উপর এবং একটা উৎসের উপর নির্ভর করে থাকাটা সমীচীন নয়।

বাংলাদেশ সরকারের উচিত এখুনি জরুরি ভিত্তিতে নতুন ভ্যারিয়েন্ট গুলোরে বিরুদ্ধে যেসব ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে সেসব ভ্যাকসিন পাবার চেষ্টা করা । প্রকৃতির সহায়তায় প্রথম ঢেউ এ রক্ষা হলেও, এই দ্বিতীয় ঢেউয়ে কতটুকু রক্ষা হবে তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। ভ্যাকসিন নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। এর বাইরে আর একটাই বিকল্প তা হলো আমাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হওয়া, স্বাস্থবিধি মেনে চলা।

  • লেখকের ফেসবুক পোষ্ট থেকে নেয়া

Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান