লুইজিয়ানা সীমান্তেই দুই শতাধিক বাংলাদেশি আটক

Wed, Mar 24, 2021 8:23 AM

লুইজিয়ানা সীমান্তেই দুই শতাধিক বাংলাদেশি আটক

 হাকিকুল ইসলাম খোকন : অভিবাসীদের দেশ যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বের মানুষের কাছে এটি স্বপ্নের দেশ। কারো কারো কাছে যুক্তরাষ্ট্র সোনার হরিণের মতো। এই ‘সোনার হরিণ’ ধরতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবছর শত-সহস্র মানুষ দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসার চেষ্টা করেন। কেউ সফল হন, কেউবা ধরা পড়েন ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট পুলিশের হাতে। করোনার কারণে গত প্রায় এক বছর হাজার হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী মানুষ মেক্সিকো সীমান্তে আটকা পড়েছেন ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে। এর মধ্যে লুইজিয়ানা সীমান্তেই দুই শতাধিক বাংলাদেশি আটক রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে খবর পাওয়া গেছে।খবর বাপসনিউজ।

ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর বাংলাদেশি ছয় তরুণ সম্প্রতি নিউইয়র্কে ফিরেছেন। তারা বৃহত্তর নোয়াখালীর বাসিন্দা। নাম ও পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব বাংলাদেশি তরুণ জানিয়েছেন, তারা সীমান্তে আটক হওয়ার পর রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন। তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর করোনা মহামারি এবং তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসনের কড়াকড়ি আরোপের কারণে কারাগারে ছিলেন দীর্ঘদিন। সম্প্রতি তারা আদালত থেকে জামিন নিয়ে মুক্ত হয়েছেন। এ জন্য প্রত্যেককে ৫ হাজার ডলার করে বন্ড দিতে হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকেই এই বন্ড দেওয়া হয়েছে। তবে বন্ডের অভাবে অনেকেই কারাগার থেকে মুক্ত হতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন ওই তরুণেরা।

এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করলে রাষ্ট্রদূত এম শহীদুল ইসলাম বাপসনিউজকে জানান, এ ধরনের খবর দূতাবাসের কাছে নেই। তবে পরবর্তীতে এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন হলে তিনি তা করবেন বলে জানান।

সমাজসেবক ও সাংবাদিক মো :নাসির বাপসনিউজকে জানিয়েছেন, সীমান্তে দুই শতাধিক বাংলাদেশি ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে আটক রয়েছেন বলে আমরা  জানতে পেরেছি।

বাংলাদেশ সোসাইটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুর রহিম হাওলাদার  ও সাধারন সম্পাদক রুহুল আমিন স সিদিদকী বাপসনিউজকে জানিয়েছেন, এর আগে টেক্সাস সীমান্তে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি আটক হয়েছিলেন। মানবাধিকার সংস্থার মাধ্যমে আমরা তাদের মুক্ত করে আইনি সহায়তা দিয়েছিলাম। নতুন করে কেউ আটক হলে তাদের পরিবার যদি আইনি সহায়তা চায়, তাহলে বাংলাদেশ সোসাইটি তাদের সহায়তা দেবে বলে জানান ।

সম্প্রতি নিউইয়র্কে ফেরা তরুণেরা জানিয়েছেন, প্রায় এক বছর আগে দালালের মাধ্যমে ব্রাজিলের ভিসা নিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা সীমান্তে আসেন। এই আসার পথের বর্ণনা অত্যন্ত ভয়াবহ এবং গা শিউরে ওঠার মতো। প্রায় আড়াই মাস বনে-জঙ্গলে কাটিয়ে এপ্রিল মাসে তারা লুইজিয়ানা সীমান্তে পৌঁছান। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে প্রবেশের পর তারা যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইস) হাতে আটক হন। এরপর তাদের ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অন্যান্য অভিবাসী প্রত্যাশীদের সঙ্গে বহু বাংলাদেশি তরুণদের দেখেছেন, যারা বিভিন্ন সময় আইসের হাতে আটক হয়েছেন।

মুক্ত হওয়া তরুণেরা আরো জানিয়েছেন, লুইজিয়ানা সীমান্তে আটক হওয়ার পর করোনা মহামারির কারণে তাদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে। বিশেষ করে, সঠিকভাবে কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। সময়মতো আইনজীবীও পাননি। এর কারণ হিসেবে তারা বলেন, ডিটেনশন সেন্টারে থাকার সময় সরকার থেকে তাদের আইনজীবী দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আইনজীবী স্বল্পতার কারণে আদালতে শুনানির দিন তাদের হাজির করা হতো না। এ কারণে পরবর্তী শুনানির তারিখ পড়তে ৩-৪ মাস দেরি হতো। যে কারণে প্রায় এক বছর ডিটেনশন সেন্টারে থাকার পর সম্প্রতি আদালতের নির্দেশে তারা মুক্তি পেয়েছেন। পরিচিতদের মাধ্যমে ৫ হাজার ডলারের বন্ড দিতে হয়েছে। তবে অনেকে বন্ড দিতে না পারার কারণে এখনো ডিটেনশন সেন্টারে আটক রয়েছে।

তরুণেরা আরো জানান, করোনা মহামারির কারণে তাদের মুক্তি পেতে বিলম্ব হয়েছে। কিন্তু করোনা তাদের যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশকে ত্বরান্বিত করেছে। এর কারণ হিসেবে তারা মনে করেন, যারা যেহেতু ব্রাজিল হয়ে এসেছেন, এ জন্য আইস এজেন্টরা তাদের কাছে আসতে চাইত না। অন্য সময় হলে সীমান্তেই হয়তো তাদের আটকে দেওয়া হতো। তবে নিজেদের ভুলের কারণে বাংলাদেশি অনেক তরুণকে ডিপোর্ট করা হয়েছে বলে জানান। তারা বলেন, যাদের কাছে পাসপোর্ট বা ট্রাভেল ডকুমেন্ট পাওয়া গেছে, আদালত কর্তৃক রাজনৈতিক আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে দ্রুত বহিষ্কার করে নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব বাংলাদেশি ভিটেমাটি বিক্রি করে ২৫-৩০ লাখ টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে সোনার হরিণ ধরতে যুক্তরাষ্ট্রে রওনা হয়েছিলেন। এমন কোনো ঝুঁকি নেই, যা তারা নেননি। বন-জঙ্গল, মরুভূমি ও সাগর পাড়ি দিয়ে তারা বিভিন্ন উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে নিজেদের ভুলে সর্বস্ব খুইয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে।

২ সহস্রাধিককে ডালাস কনভেনশন সেন্টারে প্রেরণ : সঙ্গীবিহীন ৪ সহস্রাধিক কিশোর-কিশোরীকে নিয়ে বিপাকে বর্ডার প্যাট্রল

প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নতুন নীতিমালার ফলে আমেরিকার সীমান্তে ভিনদেশি অনুপ্রবেশকারীদের ঢল নেমেছে। তাই অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বর্ডার প্যাট্রল (ভ্রাম্যমাণ সীমান্ত প্রহরী) রীতিমতো গলদঘর্ম হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, সীমান্তে আটক ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী সঙ্গীবিহীন ৪ হাজার ২০০ অনুপ্রবেশকারী কিশোর-কিশোরীকে নিয়ে সীমান্ত প্রহরীরা বিপাকে পড়েছেন। ভয়াবহতার পরিপ্রেক্ষিতে বাইডেন প্রশাসন শেষ পর্যন্ত মেক্সিকো-আমেরিকা সীমান্তে আটককৃত ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী ২ সহস্রাধিক অনুপ্রবেশকারী কিশোরকে ডালাসের দ্য কেই বেলি হাটচিনসন কনভেনশন সেন্টারে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সিএনএন ১৬ মার্চ জানিয়েছে। ডালাস অফিস অব ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্টের পরিচালক রকি ভ্যাজ ফ্যাসিলিটিটিকে ডিকমপ্রেশন সেন্টার হিসেবে অভিহিত করেছেন।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, সঙ্গীবিহীন অনুপ্রবেশকারী কিশোর-কিশোরীদের গ্রেপ্তারের পর বর্ডার প্যাট্রল জেল বা কারাগারের মতো ফ্যাসিলিটিগুলোতে তাদের আটকে রাখে। পরে আটককৃতদের পরিষেবার দায়িত্বপ্রাপ্ত হেলথ অ্যান্ড হেলথ সার্ভিসের নিকট হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু ফ্যাসিলিটিগুলোর ধারণক্ষমতা সীমিত হওয়ায় বর্ডার প্যাট্রল এবং পরিষেবাদাতা কর্মকর্তা উভয় পক্ষই চরম বিপাকে পড়েছেন। বিশেষত, করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কায় আটককৃতদের গাদাগাদি করে রাখা পুরোপুরি নিষিদ্ধ। তাই বর্ডার প্যাট্রল এবং পরিষেবাদাতা কর্মকর্তারা রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি আলেজান্ড্রো মায়াকাস ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্টকে নির্দেশ দিয়েছেন শিশু-কিশোরদের গ্রহণ, আশ্রয় এবং অন্যত্র সরিয়ে নিতে।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Future Station Ltd.
উপরে যান