জুলিও কুরি বঙ্গবন্ধু ঃ আমার বিপন্ন ভাবনা!!

Fri, Mar 19, 2021 1:10 AM

জুলিও কুরি বঙ্গবন্ধু ঃ আমার বিপন্ন ভাবনা!!

মোঃ মাহমুদ হাসান : আজ আমার আনন্দের দিন। সত্যি নিদারুণ আনন্দের দিন। আজকের প্রতিটি ক্ষন ই আমার উৎফুল্লতায় পরিপূর্ণ। কেন জানেন? এমন দিন বাংলার মাটিতে আসবে - এটি আমি একদিন কল্পনাও করতে পারিনি। ১৯৮৪ সালের ২৬ শে মার্চের সন্ধ্যায় মহান স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে "জয়বাংলা -জয় বঙ্গবন্ধু" বলার অপরাধে যাদের ভয়ে আমাকে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল, তারা আজ ঘটা করে মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম দিনের পক্ষকাল ব্যাপি অনুষ্ঠান উদযাপনে ব্যতিব্যস্ত। ১৯৮৬ সালে যারা সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন 'জয়বাংলার অনুসারীরা দেশ ও জাতির শত্রু' তারা আজ লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে জাতির জনকের জন্মদিনে আনন্দ আলোকসজ্জা তৈরী করেছেন। এমন সুসময় দেখার পরম সৌভাগ্য কয়জনের হয় বলুন!!

 

জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনা পৃথিবীর এক অবাক বিস্ময়। তাঁর ক্যারিশমাটিক নেতৃত্বে গাধা, ঘোড়া আজ এক ঘাটে জল খায়। 'জাতির জনক' শব্দটি ইসলামের পরিভাষায় নাকি 'শিরক' সমতুল্য!! এমন কথা বলে একসময়ে আমাদের সংগে যারা তর্কে জড়াতেন, তারা আজ অসংখ্য বিশেষণ ব্যবহার করে শেখ মুজিবুর রহমান কে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বলেন। এক সময়ে যারা ধর্মীয় ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিয়ে মওদুদীবাদের মাধ্যমে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু আর তার অনুসারীদের ' ফেতনা' বা 'বাতেল' আখ্যায়িত করে কতল করা ফরজ বলে ঘোষণা দিতেন, তারাই আজ বায়তুল মোকাররম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ওআইসির সদস্যপদ লাভ, স্বাধীনতা উত্তর কালে বাংলার ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সৌদি আরবে গিয়ে হজ্জ সংক্রান্ত জটিলতা অবসানের জন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে দক্ষিন এশিয়ার সেরা ইসলাম প্রিয় নেতা হিসেবে প্রচার করেন।

 

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই, ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের দাগ শুকানোর আগেই যারা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে ভারতের দালাল, আওয়ামীলীগকে জাতীয় শত্রু বলে বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বানাতে চেয়েছিলেন এঁরা ও আজ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী বঙ্গবন্ধু মুজিবের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য দিয়ে অহর্নহ কুরনিশ করেন। গণবাহিনী সৃষ্টি করে হাজার হাজার বাঙালিকে হত্যা করে, ব্যাংক বীমায় ডাকাতি করে, দূতাবাসে হামলা করে বাংলাদেশ কে আতংকের জনপদ বানিয়ে যারা জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্র তৈরী করেছিলেন, পিতা মুজিবের জন্মদিনে এদের উচ্ছাস দেখে আমি বিস্মিত হই; ওদের হাতে কেক কাটার দৃশ্য আর মুখে বঙ্গবন্ধু মুজিবের গুণকীর্তন শুনে আমি বিমোহিত হই।

 

'মুজিবের বাংলায়, রাজাকারের ঠাই নাই'-এই শ্লোগান দেয়ার অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসে যে নরপিশাচরা আমার মেধাবী ভাইটিকে রক্তাক্ত করে উল্লাস নৃত্য করেছিল, সূর্যসন্তান মুজিবের জন্মদিনে তাদের জমকালো আয়োজন দেখে,আর মুজিব আদর্শের গুণকীর্তন শুনে আমি সত্যিই আজ আনন্দে আত্মহারা। ১৯৮৮ সালে সংবাদ পত্রিকায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কে নিয়ে এবিএম মুসার লিখাটি সংরক্ষণের অপরাধে যারা  আমার বন্ধু কে  বিশ্ববিদ্যালয় হলে অবাঞ্চিত ঘোষণা করেছিল, সেই জ্ঞানপাপিরা যখন বঙ্গবন্ধু কর্ণার আর মহীয়সী ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নামে পাঠাগার স্থাপনে ব্যতিব্যস্ত হয়, মুজিব আদর্শের কোন অনুসারী উৎফুল্ল না হয়ে পারে বলুন?

 

অনেকেই হাহাকার করে বলেন বর্ণচোরারা আজ সামনের সারিতে আশ্রয় নিয়েছে! সেই সব সমালোচকদের হ্রদয়ের দহনে আমার সহমর্মিতা  থাকলেও সমালোচনায় ভিন্নমত আছে। বঙ্গবন্ধু মুজিবের প্রশ্নে বাংলাদেশে আজ দৃশ্যমান বিরোধিতা নেই। রাজপথে, অফিসে, আদালতে আমলাতন্ত্রে, রাজনীতিতে সবাই আজ জাতির জনকের গুণকীর্তনে ঐক্যবদ্ধ। এমন পুষ্পশোভিত বাংলাদেশ-কে কবে কখন দেখেছেন বলতে পারেন কি? কিছু সংখ্যক বিশ্বাস ঘাতক কুলাংগার বাদে সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন বলেই বিশ্ব ইতিহাসের বিরল জাতীয়তাবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ভূখণ্ডটির জন্ম দিতে পেরেছিলেন। আজও তাই জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সুখী, সমৃদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় ঐক্যের কোন বিকল্প নেই।

 

বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের ইতিহাসেরই অমোঘ নিয়তি। মিরজাফরের বিশ্বাস ঘাতকতায় নবাব সিরাজুদ্দৌলার জীবনাবসানের মাধ্যমে একদিন স্বাধীন বাংলার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। জাতির জনকের পিতৃবিয়োগে চিৎকার করে গড়াগড়ি দেওয়া মোশতাক পঁচাত্তরের বিয়োগান্তক ঘটনা সৃষ্টি করে হাজার বছরের ইতিহাসে কলংকিত হয়েই থাকবে। পরিবার সমেত জাতির পিতাকে হত্যা করে পঁচাত্তরের ১৫ ই আগষ্টের পর যারা উল্লাস নৃত্যে মেতে উঠেছিলো, তারা যখন শেখ হাসিনাকে 'মানবতার মা' বলেন, the best powerful crysis mannager বলে প্রশংসা করেন, তখন ঘৃনিত মোশতাকের চেহারা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলে সেটি কি খুব অন্যায় হবে বলেন?

 

১৭ ই মার্চ, ১৯২০, বাংলার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের এক অতি-আলোকজ্জল সোনালী দিবস। ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক অার সামাজিক ভাবে অত্যন্ত অনগ্রসর ভাটিবাংলার মতো ই এক নিভৃতপল্লী ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার পাটগাতি ইউনিয়ন এর টুংগীপাড়ায় সেরেস্তাদার শেখ লুৎফুর রহমান ও সায়েরা খাতুনের ঘর আলো করে ছিপছিপে লম্বাটে ধরনের যে শিশুটির জন্ম, কে জানতো কালের পরিক্রমায় সেই হয়ে উঠবে ইয়াহিয়া, আইয়ুব, মোনায়েমের অাতংক,  সাম্রাজ্যবাদী শোষকদের

রক্তচক্ষু,হয়ে উঠবে বাংগালীর মুক্তি সংগ্রামের একচ্ছত্র  অগ্রনায়ক, বাংলাদেশ নামক এক সুজলা, সুফলা মুক্ত ভূখণ্ডের সপ্নদ্রস্তা, শতাব্দীর মহানায়ক জুলিওকুরী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান। কেউ কি জানতো তার ব্যক্তিত্ব, জাতীয়তাবোধ, আর দেশপ্রেম দেখে ফিদেল কাস্ত্রো বলে উঠবেন,"আমি হিমালয় দেখিনি,বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি"।

 

জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানের একশ একতম জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় প্লাবিত হবে তাঁর ই ভালোবাসার বাংলাদেশ। এটি তো অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। প্রচন্ড আত্ববিশ্বাস নিয়ে যে মহানায়ক একদিন বলেছিলেন, 'বাঙালী আমায় মারতে পারে না', পাকিস্তানের কারাগারে জীবনের শেষ ইচ্ছার কথা বলতে গিয়ে যে সূর্য সন্তান বলেছিলেন ' আমার লাশটি তোমরা বাংলার মাটিতে রেখে দিও' সেই  অতিপ্রিয় বাংলার মাটিতেই তাঁর ই আপনজনের বেশে ঘাতকেরা লুকিয়ে আছে, সেটা কি মুক্তির দূত বঙ্গবন্ধু কখনো কল্পনা করেছিলেন?

 

৭১এর পরাজিত শক্তির দূসর,৭৫ এর বিয়োগান্তক ঘটনার বেনিফিসিয়ারী আর তাদের আদর্শিক ধারকদের উচ্ছাসে আমার মতো অনেকেই যদি আজ বিচলিত হয়, আতংকে কেঁপে উঠে; সেটি কি সত্যি ই কি খুব অনাকাঙ্খিত হবে? ৭১ এর পরাভুত পাকিস্তান দায় স্বীকার করে আজও ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। তৎকালীন পাকিস্তানের সহযোগীদের বিরোধিতার কারণে  আজও জাতিসংঘ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে 'জেনোসাইড' বলে মেনে নেয়নি। বেশিদিনের কথা নয়, আওয়ামী লীগ কে নিশ্চিহ্ন করতে ব্যবহৃত  পল্টনের 'আরজেস গ্রেনেড' সে তো পাকিস্তান থেকেই এসেছিল। খুনিরা আজও পাকিস্তানেরই ছত্রছায়ায়। এমন সময়ে বাংলার মাটিতে তাদেরই আদর্শিক অনুসারীরা জাতির পিতার জন্মদিনে উদ্বেলিত হয়ে উঠে, এ যে আমার কাছে বড় বেশী উদ্ভটই লাগে!!

৭১এ সাড়ে সাত কোটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে পিতা এনেছিলেন স্বাধীনতা, ২০২১ এ জাতির জনকের আদর্শিক চেতনায় ১৮ কোটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে তাঁর ই কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াইয়ে বিজয়ী হয়ে উন্নত বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সমৃদ্ধির পথে, ঐক্যের ভীড়ে, ছদ্মবেশী কোন অপশক্তির রোষানল যেন অদম্য শেখ হাসিনার যাত্রাপথ কে কলুষিত করতে না পারে, জুলিওকুরী বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে সেটি ই জাতির প্রত্যাশা। লেখক ঃ কলামিস্ট, উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

 

১৭ ই মার্চ, ২০২১

 

 

 

 


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান