হাতপাখা ও পাখির ছানা/ ছোটগল্প

Tue, Mar 16, 2021 9:58 PM

হাতপাখা ও পাখির ছানা/ ছোটগল্প

সাঈদ চৌধুরী : তীব্র গরম ও দাবদাহ শেষে স্বস্তির বৃষ্টি হয়েছে। বাতাসের দমকা হাওয়া ঘরের ভেতরে এসে লাগছে। বেলকনি থেকে বৃষ্টির সাথে ছোট-বড় শিলাগুলো আকাশ থেকে মাটিতে পড়ার দৃশ্য অবলোকন করছে আদনান। প্রাণে স্বস্তি মিললেও শিলা বৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতির আশংকায় চিন্তিত গ্রামবাসী!

বর্ষপঞ্জির হিসেবে এখনো বসন্ত চলছে। গরমে শীতল হাওয়ার পরশ দেয়ার যন্ত্রটি বিকল হয়েছে মাসেক দিন আগেই। শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বেড়ে উঠছে আদনান। এসি ছাড়া গরমে একেবারে অনভ্যস্ত। গ্রামে এসে খানিকটা অসহনীয় হয়ে গিয়েছিল।

পেশাদার টেকনিশিয়ান দিয়ে এসি চেকআপ বা সার্ভিসিং করিয়ে নেয়ার সুবিধা নেই। প্রচুর ধুলা-বালিতে এয়ার ফিল্টার অচল হয়ে পড়েছে।

কাইয়ুম বলল, ক্রয়ের পর থেকে মনে হয় কেউ গ্যাস রিফিল করেনি। বৈদ্যুতিক সংযোগ, সকেট, ফিল্টার কোন কিছুই পরীক্ষা হয়নি কখনো। কুলিং বা ঠান্ডা করার ক্ষমতা হারিয়ে এসি গরম বাতাস দিচ্ছে। ভোল্টেজ লো না হাই? কম্প্রেসর কি ওভারলোডে চলছে? স্মার্ট এসিতে সহজেই দেখা যায়। কিন্তু এটিতে কিছুই বুঝা মুশকিল।

এনাম চাচাত ভাই রেজাউল করিমের ঘর থেকে পুরাতন একটা পাখা এনে দেয়। এই হাতপাখাই ছিল আদনানের নিত্য সঙ্গী।

ফজলু ফাজলামু করে বলে, ভাগ্যিস একটা পেয়েছেন। রেজা বাড়িতে না হলে কী উপায় ছিল? আজকাল আর কারো ঘরে হাতপাখা নেই। সেই যুগ বহু আগে শেষ হয়ে গেছে।

এনাম উত্তর দেয়, সুপ্রাচীন কাল থেকে গ্রামীন জীবনে হাতপাখার গুরুত্ব ছিল। মেয়েরা সুন্দর সুন্দর পাখা বানাতেন। এখন গ্রামে পাখা নেই। পরিবর্তনের অশনি সংকেত!

শহরে এমনকি রাজধানীতে কত বাহারি পাখা মিলে। আড়ংয়ের নান্দনিক নকশার তালপাখা, হাতপাখা ও শীতলপাটি প্রাণ জুড়ায়!

ছোট বেলায় আমরা যখন বাড়িতে ছিলাম, চৈত্র-বৈশাখের গরমে স্বস্তির পরশ বোলাতে সবাই হাতপাখা ব্যবহার করতেন। সুগন্ধি কাঠের তৈরি পাখা ছিল আমাদের। সৌন্দর্য প্রেমী মেহমান এলে চৌধুরী বাড়ির পাখা দেখে বিমোহিত হতেন। দাদাছাব করিমগঞ্জ গেলে বন্ধু মহাজনদের বাহারি পাখা উপহার দিতেন। হাতপাখা ও শীতলপাটি না হলে গরমে গ্রামীণ আমেজ অনুভূত হয়না।

রফিক বলল, শধু বাংলাদেশ নয়, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রকমারি পাখার ব্যবহার আছে। কোরিয়ায় অভিজাত পাখা তৈরী হয় চন্দনের সাথে আগর কাঠ, হাতির দাঁত, জেড পাথর ও প্রবাল দিয়ে। ভারতের চন্দন কাঠ আর লাওস থেকে আগর কাঠ সংগ্রহ করে সুদক্ষ কারিগররা সূক্ষ্ণ কারুকাজ করেন। কাঠের জমিনে বিভিন্ন বাণী ও ছবি আকা থাকে। ভাঁজ করে সিন্দুকে রাখা হয় এমন হাতপাখা।

আমাদের প্রধান সিন্দুক ছিল দাদাছাবের পালং। সেগুন কাঠের তৈরী পালংয়ের ভেতর গুরুত্বপূর্ণ ও সখের জিনিস রাখতেন। তিন চার মাসে একবার এসব খুলে নতুন করে গুছিয়ে নিতেন। চামড়ার জুতা, ব্যাগ ও গয়নাপত্র আলাদা করে রাখতেন।

দাদার পর আব্বা এই পালংয়ে উত্তরাধিকারী হন। তিনি আম্মাকে নিয়ে এটি আরো পরিপাটি করে রেখেছেন। পোকা বা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ দূর করতে সিন্দুকে সুগন্ধি ও ন্যাপথালিন ব্যবহার করা হয়।

নুরজাহান স্মৃতিচারণ করে বলে, আম্মা শাড়ি-ওড়না কখনো আলমারি বা সিন্দুকে রাখতে চাইতেন না। হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখলে কাপড়ে ভাঁজ পড়ে কম। আর পুরাতন হবার আগেই গরিবদের বিলিয়ে দিতেন। তবে দাদির আমলের স্মৃতির কয়েকটা শাড়ি অর্গানাইজার বাক্সে গুছিয়ে রাখতেন।

আলমারিতে রাখা কাপড়গুলো বেশিদিন গেলে অনেকটা স্যাঁতসেঁতে হয়ে পড়ে। বহুদিন বন্ধ জায়গায় রাখার ফলে সাদা কাপড়ে এক ধরণে লালচে দাগ পড়ে যেত। আব্বা সাদা পাঞ্জাবিগুলো মাঝে মাঝে খুলে হালকা রোদে শুকিয়ে নিতেন।

পালংয়ের বিছানার উপর আব্বা নরম ও মনোরম শীতলপাটি ব্যবহার করতেন। বালাগঞ্জ থেকে বিশেষ ভাবে অর্ডার দিয়ে তৈরী হত এই পাটিগুলি। সিলেটের শীতলপাটি শীতল করে মন। গরমকালে আমাদের অঞ্চলের অভিজাত ও বিত্তবান পরিবারে শীতলপাটি ব্যবহৃত হয়।

শীতলপাটির কদর সিলেট থেকে বিলেত পর্যন্ত। গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে আরাম জুড়াতে এর বিকল্প নেই। এখনো প্রবাসী আত্মীয় স্বজনকে সোনা-গয়না দেয়ার চেয়ে একটা ভাল শীতলপাটি দিলে বেশি খুশি হন। সিলেটের শীতলপাটি জগতখ্যাত। বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ।

মাহমুদা একটি মিহি শীতলপাটি দেখিয়ে বলে, মুর্তা গাছের ছাল দিয়ে কী নিপুন ভাবে তৈরি হয়। ধারালো দা দিয়ে মুর্তা কেটে ছাল বের করে নেয়া হয়। স্থানীয় ভাবে একে মুর্তাবেত বলে। এগুলো ঘন্টাখানেক গরম পানিতে সেদ্ধ করা হয়। তারপর বেতগুলো রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। ডিজাইনের প্রয়োজনে বিভিন্ন রঙ মিশানো হয়। রোদেলা দুপুরে দল বেঁধে তিন-চারজন মহিলা মিলে পাটি বুনেন। চায়ের সাথে মুড়ি বা কাটাতুস আর বিয়ে বাড়ির গল্প হয় বুনুনের সময় সঙ্গী।

শীতলপাটির দাম দেড় হাজার টাকা থেকে শুরু করে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত আছে। ফরমাশ দিয়ে পছন্দ মতো তৈরি করতে খরচ আরো বেশি। নকশা ভেদে ১ মাস থেকে ৬ মাস সময় লাগে। ৪ হাত বাই ৫ হাত পাটিতে সাধারণত ১৫০টি মুর্তাগাছ লাগে। পয়সা, সিকি, আধুলি, টাকা, নয়নতারা, আসমানী, শাপলা, সোনামুড়ি, টিক্কা ইত্যাদি রকমারি নামে ও প্রকারে শীতলপাটি পরিচিত।

বুননের সময় পাটিতে নানা জাতের নকশা ও মোটিফ তুলে ধরা হয়। এগুলো আমাদের লোকজ শিল্পের সঙ্গে ধর্মীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন। মসজিদ, মিনার, তারা ইত্যাদি উপাদান ঘুরে ফিরে আসে। চন্দ্র-সূর্য, গাছাপালা, ফুল, পাখি, মাছ, ময়ূর, হাতি, নদী, প্রকৃতি, কৃষি ব্যবস্থা- সব কিছুর প্রতিফলন দেখা যায় এই শিল্পকলায়। মোগল ও বৃটিশ আমলের লোকশিল্পের সঙ্গে আধুনিক ঘরানার সংমিশ্রণে নতুনত্ব বিদ্যমান।

অভিজাত পাটি হিসেবে ‘লালগালিচা’ ও ‘মিহি’ পাটি খুবই মসৃণ ও সুখ্যাত। এটা এতটাই মসৃণ, মিহি পাটির ওপর দিয়ে সাপ চলতে পারে না।

রুপালি বেতের শীতলপাটি মুর্শিদ কুলি খাঁ সম্রাট আওরঙ্গজেবকে উপহার দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুপরবর্তী প্রথম স্বাধীন নবাব ছিলেন তিনি। বাংলাদেশে আসা বিদেশিদের কাছে স্মারক হিসেবে সিলেটের শীতলপাটি প্রথম পছন্দ। আদিকাল থেকেই এই প্রথা চলে আসছে।

রফিক বিশদ বর্ণনা দিয়ে বলে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপে বসেছিল অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় ইউনেসকোর আন্তসরকার কমিটির (ইন্টারগভর্ণমেন্টাল কমিটি ফর দ্য সেফগার্ডিং অব দ্য ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ) ১২তম অধিবেশন। ৪ থেকে ৯ ডিসেম্বরের সে অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। অধিবেশন থেকে বাংলাদেশের জন্য খুশির বার্তা আসে ৬ ডিসেম্বর। সারা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় সিলেটের শীতলপাটিকে অন্তর্ভুক্ত করে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো।

ইউনেসকোর ওয়েবসাইটে ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজের (আইসিএইচ) পাতায় বলা হয়েছে, চলতি বছরের অধিবেশনে আর্জেন্ট সেফগার্ডিং বা জরুরি সুরক্ষা, রিপ্রেজেনটেটিভ সেফগার্ডিং বা প্রতিনিধিত্বমূলক সুরক্ষা ও রেজিস্ট্রার অব গুড সেফগার্ডিং প্র্যাকটিসেস বা ভালো সুরক্ষা অনুশীলনের জন্য নিবন্ধন তালিকায় শীতলপাটি সহ বিভিন্ন দেশের ৪২টি ঐতিহ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

শীতলপাটির আলোচনায় ছন্দপতন ঘটায় মিছবাহুল করিম। ব্যাপক ঝড়ে কাবু হয়ে বাড়ি ফিরেছে। শিলাবৃষ্টিতে তার ছাতা এফোঁড় ওফোঁড় হয়েছে।

বজ্রবাহি মেঘ উর্ধ্বমুখী বায়ু প্রবাহের ফলে বায়ুমন্ডলের শীতলতর স্থানে প্রবেশ করে পানির কণাগুলো ধীরে ধীরে বরফে পরিণত হয়েছে। এই বরফের টুকরোগুলো বৃষ্টির সাথে পাথরের মত ভূপৃষ্ঠে পতিত হচ্ছে। চৈত্র-বৈশাখের প্রচণ্ড গরমে বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা বেশি হলে শিলাবৃষ্টি হতে দেখা যায়। বসন্তের শেষ থেকে গ্রীষ্ম ঋতুর সঙ্গে হাত ধরাধরি করে এ ঝড়ের আগমন ঘটে। আহা কী বজ্রগর্ভ মেঘ! গরু ঘরের টিন সেডে কালবৈশাখী গুমুড় গুমুড় আওয়াজ!

প্রচন্ড বৃষ্টিতে ভিজে মিছবাহর বেগতিক বেহাল দশা দেখে এনাম রাস্তায় ছাউনি তৈরির প্রস্তাব করে। মিছবাহ প্রাণখোলা হাসিতে স্বাগত জানায়।

এনাম সৌদি আরবে বড় হয়েছে। মদীনায় বড় বড় ছাতা দেখেছে। হজ ও ওমরাহ পালনের সুবিধার্থে মসজিদে নববীর আঙিনায় স্থাপিত ভাঁজ করা ছাতার আদলে আমাদের বড় রাস্তার পাশে ছাতা তৈরী করতে চায়। বৃষ্টিতে লোকজন আশ্রয় নিতে পারবে!

তাদের আলোচনা যখন চলছে, তখনো অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একাডেমীর সামনের পুকুর পাড়ে গাছগুলি মাথা নেড়ে যেন একে অপরকে বলছে, কে জানে আজ সকালে এরকম আবহাওয়া হবে!

ফলের গাছগুলি ঝোপঝাড়ের উপর অসহায় ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। দিন দুপুরে রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে।

এক সপ্তাহের জন্য গ্রামে এসেছি। দুই দিন চলে গেল আত্মীয় মেহমানদের কারণে। একদিন একাডেমীর অনুষ্ঠান। গতকাল গরম ও দাবদাহ আর আজ শিলাবৃষ্টি।

মিছবাহ বলল, সন্ধ্যার আগে বৃষ্টি থামবেনা। চাচ্চুর হাওর দেখার কর্মসূচি মনে হয় বাতিল। এখন ঘরে বসে ভাপা পিঠা খাওয়া যায়। তার কথায় সমস্বরে সকলেই সম্মতি প্রকাশ করেন।

গ্রামাঞ্চলে সাধারণত নতুন ধান উঠার পর পিঠা পায়েসের আয়োজন হয়। শীতে বা বৃষ্টিতে পিঠার বাহারি উপস্থাপন ও আধিক্য দেখা যায়। ভাপা পিঠার মজাই আলাদা। আদনানেরও খুব পছন্দ।

সিলেট শহরে আম্বরখানার পিঠার দোকানে সব সময় ভিড় লেগেই থাকে। রাস্তাঘাটেও আজকাল ভাঁপা পিঠা পাওয়া যায়। তবে খুব স্বাস্থ্যপ্রদ নয়। আর গ্রামীণ স্বাদ তো নয়ই!

চালের গুড়া দিয়ে জলীয় বাষ্পের আঁচে তৈরি করা হয় ভাঁপা পিঠা। মিষ্টি করার জন্য খেজুরের গুড় আর স্বাদ বৃদ্ধির জন্য নারকেলের শাঁস দেয়া হয়। একটি পাত্রে চালের গুঁড়া, লবণ ও অল্প পানি দিয়ে ভালো ভাবে মাখতে হয়। দলা পাকিয়ে গেলে চলবেনা, ঝরঝরে হতে হবে।

নুরজাহান বুয়াকে নিয়ে বারান্দার কোনে খোলা যায়গায় সবার সামনেই পিঠা তৈরী শুরু করল। চালের গুঁড়া চালনিতে হাত দিয়ে ঘষে ঘষে চালতে থাকে। আস্তে আস্তে সুজির দানার মত বের হল। কোরানো নারিকেলের অর্ধেকটা চেলে নেয়া চালের গুড়ার সাথে মিশিয়ে নিল। এইবার হাড়িতে পানি ভরে জ্বাল দিয়ে পানি ফুটে ভাপ ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করল। ভাপা পিঠার জন্য বিশেষ এক ধরনের হাড়ি ব্যবহার করছে। হাড়িটির ঢাকনার ঠিক মাঝখানে একটা ফুটো আছে। কিনারায় বাতাস চলাচল আটকে দেয়ায় ভাপটা ফুটো দিয়েই বের হচ্ছে।

পিঠার জন্য ছোট বাটিতে এক ফোটা তেল মেখে কিছু মাখানো চালের গুড়া দিয়ে তার উপর গুড় ছিটিয়ে দিল। আবার চালের গুড়া দিয়ে ঢেকে আলতো হাতে চেপে সমান করে ভাপা পিঠার আকার তৈরি করল। এরপর বাটিটা ভেজা পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে গরম পানির হাড়িতে উপুড় করে বসিয়ে দিল। ৫/৭ মিনিট ভাপে সেদ্ধ হলে ঢাকনা সরিয়ে আঙ্গুল দিয়ে চেপে দেখে বলল, প্রস্তুত!

শেষ মূহুর্তের এই দেখাদেখির আগেই খেতে ইচ্ছে করছে!

আমরা অপেক্ষা করলেও আদনান হাড়িতে হাত দেয়ায় গরম ছেঁকা লেগেছে। হাত পুড়ে যাওয়ার মত অবস্থা। রান্নার সময় হাত পোড়ানো বা ছেঁকা খাওয়ার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। ছোট্ট শিশুর মত বিলাপ করছে। উপস্থিত সকলে তার জন্য পেরেশান হলেন। কেউ ডেটল, কেউ ঠান্ডা পানি নিয়ে এলেন। সকলেই তার কষ্টে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন এবং তার প্রতি আন্তরিকতা দেখালেন। অবশেষে রফিকের ম্যাজিক মলমে ঠান্ডা হল।

একদল ছোট্ট পিঁপড়া হেটে যাচ্ছে। হয়ত ভাপা পিঠার গ্রাণ পেয়েছে। গ্রামে সব ধরনের খাবারের আশপাশে এগুলোকে দেখতে পাওয়া যায়। এরা সব কিছুই খায়। এদেরকে সর্বভূক বলা যায়। তবে ফসলের অপকারী কীটপতঙ্গ খেয়ে কৃষকের উপকারও করে।

মাহমুদা সামান্য খাবার দিয়ে পিঁপড়াগুলো দূরে আটকাতে চাইল। এটা দেখে সবাই মৃদু হাসলেন। আমার কাছে ভালই লাগল।

আস্তে আস্তে আরো পিপড়া জড়ো হতে থাকে। ছোট, মধ্যম ও বড় আকারের। কয়েকটা অস্বাভাবিক, বড় মাথা ও শক্ত চোয়াল। এগুলো নিজেদের দেহের চেয়ে শতগুণ ভারী ওজন বহন করতে দেখা যাচ্ছে। ‘সৈনিক’ পিঁপড়া বলা যায়। যুদ্ধাংদেহী মনোভাব!

বিজ্ঞানীরা প্রকৃতিতে পিঁপড়ার আগমন ও তাদের ছড়িয়ে পড়া নিয়ে বহু গবেষনা করেছেন। পৃথিবীতে কীটপতঙ্গ প্রজাতির সংখ্যা ১০ লাখের ওপরে। পিঁপড়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কীটপতঙ্গ গোষ্ঠীর সদস্য। পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র পিঁপড়ার বিস্তার। মাথা, ধড় ও উদর - এই তিন ভাগে বিভক্ত এদের দেহ। আরো আছে তিন জোড়া পা ও দুই জোড়া পাখা। পাখাগুলো ছোট বা অপরিণত বলে বেশির ভাগ সময় আমাদের চোখের আড়ালে থাকে। পিঁপড়ার দলবদ্ধতা দেখে আমি সব সময় মুগ্ধ হই। আমার প্রিয় মৌমাছির সঙ্গে পিঁপড়ার বেশ মিল খুঁজে পাই।

আণবিক বিজ্ঞানী রেজাউর একটি মজার তথ্য দিয়েছেন, পিঁপড়ার বিয়ে! সলজ্জ মুখে রুমাল চাপা দিয়ে বর যেমন দল বেধেঁ হেঁটে চলেন কনের বাড়ি। পিঁপড়াও নাকি তাই করে। কোনো ফাঁকা জায়গা বা সড়কের খানিকটা অংশজুড়ে পিঁপড়া উড়ছে। বেসামাল হয়ে ছোটাছুটি করছে। এমন দৃশ্য দেখে আমরা অনেকেই হয়তো এটাকে তুচ্ছ জ্ঞান করি বা উপেক্ষা করি। কিন্তু পিঁপড়াদের এই মহড়া-উৎসব, এই শুন্যে ওড়াউড়ি ‘বিবাহ উৎসব’ ছাড়া আর কিছু নয়!

‘পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে’ এই প্রবাদ বাক্যটি সমাজে বহুল প্রচলিত। দূর্বলদের অগ্রগতি থামানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাক্যটিকে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করলেও পিঁপড়ার ক্ষেত্রে তা ইতিবাচক। প্রাণী বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলা হয় ‘নাপশিয়াল ফ্লাইট’ বা ‘পরিণয়-উড্ডয়ন’। সহজ করে বলা যায়, ‘বিয়ের উড়াল’। এই পরিণয় উড্ডয়ন আসলে পিঁপড়ার প্রজনন তন্ত্রের অতি প্রয়োজনীয় উপলক্ষ।

হাড়িতে ছেঁকা খেয়ে হাত পুড়ে যাবার মত দশা হলে আদনান হাতের ভাপা পিঠা ছুড়ে মেরেছিল। সেটা নাকিবের জামায় পড়েছে। তখন কেউ দেখেনি।

হঠাৎ নাকিব রাগে ফোঁপাতে লাগল। কচি গলায় কান্না কান্না শুরে বলছে, আমার পোশাকটি নষ্ট হয়ে গেছে, আমার নতুন টুপিও!

আদনান কোন কিছু না বলে নিজের বেগ থেকে একটি খেলনা এনে তাকে উপহার দিল। তাতেই নাকিব খুশি।

তারপর আদনান একটা ফানুস চেয়ারের উপরে রাখল। ফানুস থেকে আলো এত উজ্জ্বল হল, ঘরের বারান্দা আলোকিত হয়ে উঠল।

ছোট বেলায় শীত এলে শুরু হতো পিঠা উৎসব। রাত জেগে গ্রামীন বারবিকিউ পার্টি। আনন্দের মাত্রাকে বাড়িয়ে দিত ফানুস উৎসব। ফানুস এখন জায়গা করে নিচ্ছে বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানে। বর্ষবরণেও আকাশে ফানুস দেখা যায়। ভাপা পিঠার সাথে ফানুসটি যেন একটা স্মৃতিময় আবহ সৃষ্টি করেছে!

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। আকাশে গুমোট অন্ধকার। যদিও সন্ধ্যে হতে অনেক বাকি। আমাকে অবাক করে অপ্রত্যাশিত এক খালাত ভাইয়ের আগমন। পিঠা পর্বের শেষাংশে যুক্ত হয়েছে। প্রাথমিক গালগল্পের পর তাকে নিয়ে সামনের বাংলোতে একটু বিশ্রাম নিলাম।

আমার ঘুম আসতে সময় লাগেনা। বেশি হলে আধা মিনিট। কিন্তু পাশের বিছানায় খালাত ভাইকে মনে হল ঘুমানোর জন্য বেশ প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিছানায় যাবার আগে দেহ-মনকে চাপমুক্ত করছে। এটা নাকি সে প্রতিদিনই করে। যাতে তার শরীর এবং মন্তিষ্ক বুঝে যায় যে, ঘুমাবার সময় হয়েছে।

হালকা গরম পানিতে স্নান, মেডিটেশন বা ধ্যান করা, কারো সাথে কথা বলা, ডায়েরি লেখা, বই পড়া বা আলো কমিয়ে দিয়ে নাশিদ শোনা। একটা কিছু তার লাগবে।

আমি তাকে একটা গল্প বললাম। যেন তার মনের চাপ দূর হয়ে শিথিল ভাব আসে। আমার গল্প শেষ হবার আগেই হামিদের নাক ডাকা শুরু হল।

বিচিত্র স্বরে বিচিত্র লয়ে ডেকে যাচ্ছে। শব্দ কখনো বাড়ছে, কখনো কমছে। আমার ঘুমের একেবারে দফারফা!

হঠাৎ স্পিড বেড়ে গেল। জবাই করা গরুর আওয়াজ। উচ্চ রক্তচাপ এমনকি স্ট্রোকের ঝুঁকির আলামতও হতে পারে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম।

শুনেছি, অ্যালকোহল জিভের পেশিগুলোকে শিথিল করে দেয়ার কারণে শ্বাস-প্রশ্বাসের নালি সংকুচিত হয়ে নাক ডাকা রোগ হয়। কিন্তু সেতো মদ্যপ হবার কথা নয়।

ধূমপান থেকে টারবাইনেটস নামে নাকের বিশেষ এক ধরনের টিস্যু স্ফীত হয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। সম্ভবত সিগারেটের অভ্যাস আছে। তবে নাক ডাকার সবচেয়ে প্রধান কারণগুলোর একটা হল অতিরিক্ত ওজন। এটা তার আছেই।

আমি হামিদের দিকে অনেক্ষণ ধরে তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎ সে শোয়ার ভঙ্গি বদলিয়ে আমার দিকে মোড় নিল। আর নাক ডাকাও থেমে গেল। আমিও স্বস্তি পেলাম।

বিশ্রামের সাধ আর গল্পের পাট ততক্ষণে চুকে গেছে ।

ঘরের বাইরে একটু পায়চারি করতে গিয়ে রাস্তার পাশে লোকজনের আওয়াজ শুনতে পেলাম। বৃষ্টি কমে গেছে বলে সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তার পাশের দোকানে জড়ো হয়েছে। কথায় কথায় রাজনীতির চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করছে তারা। খালেদা-হাসিনা থেকে শুরু করে টেলিভিশন টক শো-তে পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা ও সংঘাতময় বক্তব্য, আল্লামা সাঈদী ও আজহারির বয়ান সবই তাদের আলোচ্য। রাজা-উজির মারা ছাড়া এই বিকেল কী আর করবে?

ডা. ফরিদ ফার্মেসী থেকে ঘরে ফিরে শালিক পাখির ছানা দেখার জন্য আদনানকে ডেকেছে। আমিও গেলাম। ঘরের কোনে একটি গাছের ডালে পাখির বাসা। গাছের পাতা থেকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। টিপ টিপ টিপ! কী মধুর শব্দ। তার সাথে পাখির ছানার কিচিরমিচির আওয়াজ। ঘরের ছাদে আরেকটি বাসা সংযুক্ত করা হয়েছে। যেখানে পাখির খাবার রাখা হয়।

তিনটি পাখি ছানার নড়াচড়া দেখে আদনান বেশ পুলকিত। মা পাখিটি তার বাচ্চাগুলি নিরাপদ আছে কিনা, উঁকি মেরে দেখছে। পাখির ছানাগুলো ছাদের খাবার ঘরটির সাথে পরিচিত হয়ে উঠছে। তাদের নীড়ের মত করে তৈরী বাসা।

আদনান পাখির নরম চুলগুলি দেখতে দেখতে হেসেছিল। দুর্দান্ত আনন্দ পেয়েছে! পাখির বাসায় একটি সুন্দর ডিম দেখতে পেয়ে তার আনন্দ আরও দ্বিগুন হয়েছিল।

আদনানের আগ্রহ দেখে বাড়ির অন্য শিশুরা হেসে ও হাততালি দিয়ে উল্লাসে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

মা তার বাচ্চা পাখির উপর বসে তাদের নীড়কে উষ্ণ করছে।

আদনান কাছে গেলে পাখিটি চলে গেল। মনে হয়েছিল, নীড়ের মধ্যে কিছু লোমশ জমে আছে। বাচ্চারা তখন তাদের মাম্মার জন্য চিৎকার করছিল।

ফরিদ জানে, কীভাবে তাদের যত্ন নেয়া হয়। তাকে দেখে পাখির ছানাগুলোর মুখ উন্মুক্ত হয়ে উঠেছে। তার সাথে যেন কিছু বলাবলি করছে!

বাংলোয় ফিরে দেখি পাড়ার অনেকে আমার অপেক্ষায়। তাদের ঘরোয়া আড্ডা বেশ জমেছে। স্বভাব কবি মানিক শিলাবৃষ্টি নিয়ে দারুণ কবিতা শুনালেন। তারপর আমার পালা। সবার অনুরোধে গত শরতে লেখা ‘আত্মার অলিন্দে‘ কবিতাটি আবৃত্তি করলাম।

ভালোলাগে ক্ষেতের ফসল/ ভালোলাগে শ্রমিকের হাসি/ প্রজাপতি ঘুরে ফিরে কাশবনে।

ভালোবাসি জ্যোৎস্নায়/ ভালোবাসি গোধুলী বেলায়/ উৎফুল্ল চন্দ্রিমা রাতে।

মেঠোপথ ধুলোবালি খুপরিঘর/ অনাথ আশ্রমে অনুদান/ শিহরণ জাগে আত্মার অলিন্দে।

গুল্মশোভিত জন্মভূমিতে আমার প্রাণ জোড়ায়।

আমার জ্বলন্ত স্বপ্নগুলিকে ছড়িয়ে দিই/ যেখানে আকাশ ভেদ করেছে ধূমকেতু/ একটি বটবৃক্ষ যেথায় নিয়েছে ঠাই।

মেঠো পথে মৃদু ঠাণ্ডা হাওয়ার দুলুনি/ শেফালি সাজে সেজে ওঠেছে শরৎ ঋতু/ উদ্বেগহীন জীবনে আমি হারিয়ে যাই।

দূরের একটু দূরে বাতাসে বিস্ময় মেখে/ ডালিয়া ও কদম যেন সুরভী ছড়ায়/ মৌমাছিরা ফুলে-ফলে মধু আহরণ শেষে/ পাখিদের মতো নীড়ে ফিরে গোধুলী বেলায়।

মনের মুকুরে জন্মভূমির নামটি লিখে/ শীত বিকেলের আগুনের মতো ভালোবাসি/ অবাক হয়ে সোনালী সূর্য আমাকে দেখে/ গুল্মশোভিত এই গাঁয়ে বারবার ফিরে আসি।

ঝুমুর ঝুমুর হাততালিতে কাব্যপর্ব শেষ হল। মাঝরাত অবদি চলল প্রাণময় আড্ডা।

পরের দিন আমরা শহরে চলে এলাম। আদনান তার বাবা-মা‘র কাছে মাঝরাত অবধি পাখির গল্প করেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমার কাছে এসে বলল, চাচ্চু পাখির ছানাগুলো এখন কী করছে? বড় হবে কবে? উড়তে শিখেছে কিনা? শত প্রশ্ন!

প্রাত ভোজে আমরা সকলে মিলিত হলাম। আদনানের মা কবি হালিমা বললেন, রাতে আদনানের জন্য ঘুমাতে পারিনি। বিছানায় শুয়ে শুয়ে কল্পনার পাখির সাথে কথা বলেছে। শালিক পাখির আওয়াজ শুনার জন্য মাথার কাছের জানালাটা আলতো করে খুলে রেখেছিল। কাকডাকা ভোর থেকে জানালার দিকে ঝুঁকে আছে।

দুপুরে বন্দর বাজার থেকে আদনানের জন্য বাচ্ছা সহ দুটি পাখি নিয়ে এলাম। সে কী আনন্দ! অদ্ভুত, অবণর্নীয়।

আদনান যেন আকাশ হাতে পেয়েছে। সে এখন ছানাদের খাবার দেবে। উড়তে শেখাবে। তাদের নিয়ে ফুল বাগানে ঘোরবে!

আদনান আজকাল খেলতে যায়না। প্রতিদিন স্কুল ছুটির পর দ্রুত বাসায় ফিরে। বই খাতা টেবিলে ফেলে ছুটে যায় পাখির কাছে। বন্ধুদের জানিয়েছে, এখন তার খুব আনন্দ আর আনন্দের দিন।

পাখির ছানারা যখন কথা শিখবে, তখন তাকে মামা বলে ডাকবে। আহা! তখন কতই না আনন্দ হবে!

এভাবেই দিন যায়, মাস যায়। পাখির প্রতি আদনানের আগ্রহ বাড়তে থাকে। ঘুম থেকে উঠেই এক দৌঁড়ে পাখির ঘরে যায়। পিছন দরজা দিয়ে বেরিয়ে খাবার এনে দেয়। পাখির সাথে গড়ে উঠে তার গভীর সখ্য।

আদনান খাঁচায় পাখি বন্দি করে রাখার কোন মানে খুঁজে পায়না।

একদিন পিন্জিরা থেকে ছেড়ে দেয় পাখিগুলোকে। তার মা মনে করেছিলেন এই বুঝি চলে যাবে, আর ফিরে আসবেনা। কিন্তু পাখিগুলো সেদিন কোথাও যায়নি।

মূল ঘরের পিছনে পাখির ঘর। স্ত্রী পাখিটি বাচ্চাদের খাবার দেয়। তারপর পুরুষ পাখি আমগাছের ডালে ছানাগুলিকে উড়াল শিখায়। মাঝে মাঝে পাশের গাছের ডালে বসে ঠোঁট দিয়ে গা চুলকায়।

এসব দেখে আদনান পুলকিত হয়। প্রতিদিন পাখির ছবি তুলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে।

কয়েক দিন পর পাখি ডিম দেয়। সুন্দর সুন্দর ডিম। মা পাখি সেই ডিমে তা দেয়। ডিম থেকে দুটি ছানা হয়। কী সুন্দর ছানাগুলো।

আদনান ছানা দুটির নাম রাখে। একটা রবি, আরেকটি ববি।

স্কুল শেষ হলেই পাখির কাছে চলে আসে আদনান। সারাক্ষণ ছানাদের আশে পাশেই থাকে।

এক দিন পুরুষ পাখি বাসা থেকে বের হয়, আর ফিরেনি। সকাল গড়িয়ে দুপুর। দুপুর গড়িয়ে রাত।

আদনান পাখির চিন্তায় সারা রাত ঘুমায়নি। কেন ফিরে এলো না? কোনো বিপদ মসিবত হলো কি না? দূর্ভানায় পড়ে যায় সে।

এদিকে ছানারাও বাবার জন্য কিচিরমিচির করে কান্নাকাটি করতে থাকে।

সকাল যায়। দুপুর যায়। দুপুর গড়িয়ে বিকেলের সূর্যটা অস্তমিত হয়। একদিন। দুইদিন। তিনদিন। পাখিটি আর ফিরে আসেনি।

আদনানের বুঝতে বাকি রইল না যে, সে আর ফিরে আসবে না। নিশ্চয় দুষ্টু লোকের হাতে ধরা পড়েছে। এই ভেবে সে অনেক কাঁদে।

বাবা পাখিটি না আসায় আদনান ভাবে মা পাখিকে শান্তনা দিতে হবে। কিন্তু মানুষের ছায়া দেখলেই মা পাখি আজকাল উড়াল দেয়।

একদিন ভোরে আদনান একপা দুইপা করে চুপি চুপি পাখির বাসায় হানা দেয়। তখন ফুরুৎ করে পাখিটি বেরিয়ে যায়। বহু দূর উড়ে গিয়ে একটি গাছের ডালে বসলো। তার মাঝে অনেক আতঙ্কের ছাপ!

আদনান পাখির জন্য যতটা তৎপর হয়, পাখিটিও যেন ততটা ভীত ও আতংকিত হয়ে পড়ে। অনেক্ষণ অপেক্ষার পরও কিছুতেই নীড়ে ফিরল না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে মন ভারি করে আদনান ঘরে ফিরে।

রাত পোহালেও পাখিগুলি আর ফিরেনি। রবি আর ববিও আসেনি!

পাখির জন্য আদনান নীরবে কাঁদতে থাকে। তার চোখ গড়িয়ে জল পড়ে। কান্নায় যেন বুক ফেটে যায়। কাঁদতে কাঁদতে কখন রাত ফুরিয়ে সকাল হয়, তা সে টেরই পায়নি।

ভারাক্রান্ত আদনানকে তার বন্ধু আজ একটি গানের কেসেট দিয়েছে। স্কুল থেকে ফিরে কেসেটে শুনছে কবি নজরুলের গান ‘চড়ুই পাখির ছানা’। এর ভেতরের গল্পটা যেন তার পাখির মতই। শুনতে শুনতে কল্পনার জগতে হারিয়ে যায় আদনান। কেসেট প্লেয়ার বাজে

মস্ত বড় দালান-বাড়ির উই-লাগা ঐ কড়ির ফাঁকে/ ছোট্ট একটি চড়াই-ছানা কেঁদে কেঁদে ডাকছে মা’কে।

‘চুঁ চা’ রবে আকুল কাঁদন যাচ্ছিল নে’ বসন-বায়ে,/ মায়ের পরান ভাবলে-বুঝি দুষ্ট ছেলে নিচ্ছে ছা-য়ে।

অম্‌নি কাছের মাঠটি হতে ছুটল মাতা ফড়িং মুখে,/ স্নেহের আকুল আশিস-জোয়ারে উথলে ওঠে মা’র সে বুকে।

আধ-ফুরফুরে ছাটি নীড়ে দেখেছে মা তার আসছে উড়ে,/ ভাবলে আমি যাই না ছুটে, বসি গে’ মা’র বক্ষ জুড়ে।

হৃদয়-আবেগ রুধতে নেরে উড়তে গেল অবোধ পাখি,/ ঝুপ করে সে গেল পড়ে-ঝরল মায়ের করুণ আঁখি।

হায়রে মায়ের স্নেহের হিয়া বিষম ব্যথায় উঠল কেঁপে,/ রাখলে নাকো প্রাণের মায়া, বসল ডানায় ছাটি ঝেঁপে/ ধরতে ছোটে ছানাটিরে ক্লাসের যত দুষ্টু ছেলে;/ ছুটছে পাখি প্রাণের ভয়ে ছোট্ট দুইটি ডানা মেলে।

বুঝতে নারি কি সে ভাষায় জানায় মা তার হিয়ার বেদন,/ বুঝে না কেউ ক্লাসের ছেলে- মায়ের সে যে বুকভরা ধন।

পুরছে কেহ ছাতার ভিতর, পকেটে কেউ পুরছে হেসে,/ একটি ছেলে দেখছে, আঁসু চোখ দুটি তার যাচ্ছে ভেসে।

মা মরেছে বহুদিন তার, ভুলে গেছে মায়ের সোহাগ,/ তবু গো তার মরম ছিঁড়ে উঠলো বেজে করুণ বেহাগ।

মই এনে সে ছানাটিরে দিল তাহার বাসায় তুলে,/ ছানার দুটি সজল আঁখি করলে আশিস পরান খুলে।

অবাক-নয়ান মা’টি তাহার রইল চেয়ে পাঁচুর পানে,/ হৃদয়-ভরা কৃতজ্ঞতা দিল দেখা আঁখির কোণে।

পাখির মায়ের নীরব আশিস যে ধারাটি দিল ঢেলে,/ দিতে কি তার পারে কণা বিশ্বমাতার বিশ্ব মিলে!

 


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান