একদিন বাঙ্গালী ছিলাম-রে’

Mon, Feb 21, 2022 11:54 PM

একদিন বাঙ্গালী ছিলাম-রে’

শিতাংশু গুহ ঃ| ফেব্রুয়ারী মাস বাংলা ভাষার মাস। একদা আমাদের ওপর উর্দূ চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছিলো, সেটা ৬০’র দশক, বাঙ্গালী তা প্রতিহত করেছে। তখন আমরা বাঙ্গালী ছিলাম বা বঙ্গবন্ধু আমাদের বাঙ্গালী বানাতে সচেষ্ট ছিলেন। তখনকার সময়ে মোনায়েম খাঁন বরিশাল বিএম কলেজে ছাত্রদের বলেছিলেন, ‘তোমরা রবীন্দ্রনাথের কবিতা লিখতে পারোনা’? ওই কলেজের একজন ছাত্র, যিনি পরে আমাদের সাথে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছেন, তাঁর দাবি তিনি নিজে একথা শুনেছেন। কথাটা হুবহু ওরকম না হলেও, মোনায়েম খাঁনের এমত একটি বক্তব্য নানাভাবে তখন পূর্ব-পাকিস্তানে ব্যঙ্গাত্মকভাবে প্রচলিত ছিলো। এটি সত্য ঐ সময় ‘রবীন্দ্র-বর্জন’ এবং উর্দু হরফে বাংলা লেখার প্রচেষ্টা চলছিলো, এবং এর বিরুদ্ধে ব্যাপক ও জোরদার ছাত্র-যুব, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক আন্দোলন ছিলো, ফলে আইয়ুব-মোনায়েমের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়।

এখনকার সময়ে বাংলাদেশে আরবী ভাষা-সংস্কৃতি ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। সবাই বাঙ্গালীত্ব ছেড়ে আরবীয় হবার চেষ্টা করছেন। উর্দু ভাষার বিরুদ্ধে বাঙ্গালী গর্জে উঠলেও আরবী ভাষার বিরুদ্ধে কেন জানি চুপচাপ থাকতে পছন্দ করছেন। চলনে-বলনে, শিক্ষা-দীক্ষা বা পোশাক-আশাকে আরবীয় সাংস্কৃতির অনুপ্রবেশ দেখে পুরানো ওই গানটি মনে হয়, ‘একদিন বাঙ্গালী ছিলাম-রে’। পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙ্গালী মুসলমান বঙ্গবন্ধু’র নেতৃত্বে কিছুকালের জন্যে বাঙ্গালী হতে চেষ্টা করেছিলো, এখন তাঁরা ‘বাংলাদেশী’ যা মূলত: ‘বাঙ্গালী মুসলিম জাতীয়তাবাদ’ বা আরো পরিষ্কার করে সংক্ষিপ্ত বললে, ‘বাঙ্গালী মুসলমান’ হচ্ছেন। তাই সঙ্গত কারণে সংবিধানের পঞ্চম ও অষ্টম সংশোধনী সবার পছন্দ। একই কারণে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি’র আচরণ কেমন যেন প্রতিদিন হুবহু পাকিস্তানের মত হয়ে যাচ্ছে, যা একুশের চেতনার  পরিপন্থী? 

ভাষা মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম; ভাষার পবিত্রতা বা অপবিত্রতা বলতে কিছু নেই? উর্দু ভাষার সামনে ‘পবিত্র’ শব্দটি ছিলোনা, তাই হয়তো আমরা উর্দুর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সক্ষম হয়েছিলাম। আরবী ভাষার সামনে ‘পবিত্র’ শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে, অনেকে তাই করছেন? তাই আরবীয় সংস্কৃতির জোয়ার ঠেকাতে কেউ ততটা আগ্রহী নন? তদুপরি আগে বলিষ্ঠ সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিলো, এখন গ্রামে-গঞ্জে ‘ওয়াজ-মাহফিল’ ছাড়া কিছু নেই? যাত্রা-পালা-কবি গান, মেলা,  গাজীর পট সব হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে। সংস্কৃতি এখন সীমিত এবং শহর কেন্দ্রীক? বিনোদন ক্ষেত্রে পাকিস্তান পিছিয়ে পড়ার সবগুলো কারণ বাংলাদেশে বিদ্যমান, সুতরাং—। শিল্প-সংস্কৃতি’র ক্ষেত্রে পাকিস্তান বা পুরো মুসলিম বিশ্ব পিছিয়ে, বাংলাদেশে এগিয়ে যাবার কোন কারণ নেই? আমাদের শিল্পী-কলাকুশলীরা এজন্যে ভারতমুখী, এটি ক্রমশ: বাড়বে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর সবাই বলতেন, ‘ঢাকা হবে বাঙ্গালী সংস্কৃতি’র পীঠস্থান’- এখন সঙ্গত কারণে কেউ ওকথা মুখেও আনেনা? স্বাধীনতা ও মুক্তি দু’টি শব্দ অনেকটা সমার্থক হলেও এক নয়।, ভৌগোলিকভাবে স্বাধীন হলেও মুসলিম-বিশ্ব মুক্ত নয়, বাংলাদেশ ধর্মীয় রাষ্ট্র না হলেও অবরুদ্ধ। বদ্ধ জলাশয় পঁচে যায়, অবরুদ্ধ সমাজে ভালো কিছু জন্মে না? এবছর সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন একজন মুসলমান, তিনি লন্ডনে থাকেন। মুসলমানরা নিজেদের দেশে ভালো না করলেও অ-মুসলমান দেশে ভালো করছেন। কারণ, অমুসলমান দেশগুলো গণতান্ত্রিক এবং মুক্ত। আকাশের মত উদার ও বাতাসের মত মুক্ত না হলে ‘সকলি গড়ল ভেল’। মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত ‘মুক্তি’ কি জিনিস বোঝা কষ্ট, মানুষ সকল অবস্থাকে মানিয়ে নিতে অভ্যস্থ, সবাই মানিয়ে নেয়! আরবী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ মেনে নেয়ার এ ইচ্ছেটা আর যাই হোক ‘বাঙ্গালীয়ানা’ নয়!

 guhasb@gmail.com;


Designed & Developed by Future Station Ltd.
উপরে যান