স্বেচ্ছাসেবক: আলোকিত দেশ গড়ার অন্তর্নিহিত শক্তি

Mon, Dec 6, 2021 12:42 AM

স্বেচ্ছাসেবক: আলোকিত দেশ গড়ার অন্তর্নিহিত শক্তি

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ : সমাজে বেঁচে থাকার জন্য মানুষের একে অপরের সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজন। মানুষ সর্বদা অপরকে সহযোগিতা করতে চায়। এটি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। তবে একা সহযোগিতা করার চেয়ে কয়েকজন সমমনা ব্যক্তি একত্রিত হয়ে যখন কোনো কাজ করে তখন তা অতীব সহজ হয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে মহামারী করোনাভাইরাসের থাবায় সারা বিশ্ব যখন আক্রান্ত, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যখন ব্যাহত, মানবতার সেবায় বিশ্বব্যাপী উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে স্বেচ্ছাসেবকরা। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। করোনায় কাজ হারানো দুস্থ, অসহায় পরিবারের আলোকবর্তিকা হয়ে জীবনবাজি রেখে কাজ করছেন দেশের স্বেচ্ছাসেবকরা। এছাড়াও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ক্রান্তিকালে ও নানাবিধ সচেতনতায় সৃষ্টিতে তাদের কাজের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক দিবস পালিত হয় প্রতিবছরের ৫ ডিসেম্বর।

১৯৮৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের অধিবেশনে সারা বিশ্বে স্বেচ্ছাসেবীদের অবদানের কথা সর্বত্র তুলে ধরা, যে কোনো দুর্যোগে মানবিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে তাদের দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং স্বেচ্ছাসেবার গুরুত্ব তুলে ধরে নাগরিকদের স্বেচ্ছাসেবায় আগ্রহী করে তোলার উদ্দেশ্যে এ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রতিবছরের মতো এবারও পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক দিবস। গত বছরের এদিনে ‘আইভিডি বাংলাদেশ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ২০২০’ শীর্ষক পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবকদের কাজের স্বীকৃতি এবং তাদের একটি কাঠামোতে আনতে দেশে জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক নীতিমালা তৈরি করা হবে বলে জানান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী। উক্ত অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুঃসময়ে স্বেচ্ছাসেবকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনেক জনকল্যাণমূলক কাজে অংশ নেন। জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন অংশীদারদের স্বেচ্ছাসেবা কার্যক্রমকে মূলধারায় আনা এবং স্বেচ্ছাসেবাকে সরকারি স্বীকৃতি প্রদানে সহায়ক হবে। এ লক্ষ্যে ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং কমিটি গঠন ও কমিটির কার্যপরিধি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে বলে জানান তিনি।

 

স্বেচ্ছাসেবকদের নিঃস্বার্থ অবদান অপরিসীম এবং অনস্বীকার্য। বিভিন্ন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সংঘবদ্ধ হয়ে মানুষ স্বেচ্ছায় বিভিন্ন ধরনের সংগঠন গড়ে তোলে। স্বেচ্ছায় রক্তদান, আর্থিক সহায়তা প্রদান, নিরক্ষরদের অক্ষরজ্ঞান প্রদান, গ্রামের কৃষকদের পরামর্শ প্রদানসহ বিভিন্ন সেবামূলক লক্ষ্যে নানাবিধ সামাজিক সংগঠন গড়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠনসমূহের ব্যাপক কার্যক্রম পরিলক্ষিত হয়। বিভিন্ন গ্রাম, শহর, জেলা বা অঞ্চলকেন্দ্রিক নানা লক্ষ্যের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে উঠছে। তরুণরা মানবতার সেবায় নিজেদের বিলিয়ে দিচ্ছে এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আশার দিক। তবে এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এসব সংগঠনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন বা লক্ষ্য অর্জনের জন্য উপযুক্ত কর্মী বা সদস্য প্রয়োজন। একটি লক্ষ্যে কখনই পৌঁছানো সম্ভব নয়; যতক্ষণ না সে সংগঠনের সদস্যরা উক্ত সংগঠনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিজেকে সম্পূর্ণরূপে দক্ষ ও পরিপূর্ণরূপে নিবেদিত করে। যদিও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা স্বেচ্ছাসেবায় এগিয়ে আসে, তবুও এসব সংগঠনসমূহের সদস্যদের মাঝে কিছু বৈশিষ্ট্য কাম্য। নচেৎ এর উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় এবং গতিশীলতা হারিয়ে যায়। কোনো সংগঠনের সদস্যরা যদি উক্ত সংগঠনের গঠনতন্ত্র-নিয়মনীতি মেনে না চলেন, তবে সেই সংগঠন দ্রুতই খেই হারিয়ে ফেলে। পদের প্রতি লোভ হলো যে কোনো সংগঠনে অভ্যন্তরীণ কোন্দল সৃষ্টির অন্যতম ধাপ। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে কেউ নেতা নয়। প্রত্যেকেই মানবতার সেবায় নিবেদিত প্রাণ। মনে রাখতে হবে, কেবল সাংগঠনিক গতিশীলতার জন্যই এসব পদবিন্যাসের সৃষ্টি।

 

কোভিড-১৯ এর বৈশ্বিক মহামারির কারণে বিশ্বজুড়েই মানুষ এক অভুতপূর্ব হুমকির সম্মুখীন। এখনও বৈশ্বিকভাবে মানুষ আগের জীবনে ছন্দে ফিরে আসতে পারছে না। এক্ষেত্রে, এ অতিমারি প্রতিরোধে বিশ্বজুড়েই স্বেচ্ছাসেবকরা সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নিবেদিত এ স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এ কাজ করছেন।  জাতিসংঘের রেসিডেন্ট কো-অর্ডিনেটর মিয়া সেপ্পো বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবকদের প্রসংগে বলেন, ‘এ যাবতকালে বাংলাদেশের সেচ্ছাসেবকগণ সমগ্র বিশ্বে তাদের যে নিঃস্বার্থ শ্রম দিয়ে গেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে। তবে উন্নতির সুযোগ বা অবকাশ শেষ হয়ে যায়নি, বাংলাদেশের সামনে সুযোগ রয়েছে নিজ স্বেচ্ছাসেবীদেরকে আরও যোগ্য আর দক্ষ করে তোলার। বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশের সেচ্ছাসেবকদের ব্যাপারে অত্যন্ত আশাবাদী, আর তাই অচিরেই বাংলাদেশ এই খাতে আর্থিক ও কাঠামোগতভাবে আরও সমৃদ্ধ হতে যাচ্ছে। এই জনশক্তির সর্বোচ্চ উপযোগীতা আহরণ করতে পারলে অচিরেই বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবকগণ গোটা বিশ্বের সামনে উদাহরণ হয়ে দাঁড়াবেন, এবং আগামীর কঠিনতর চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করার সাহস অর্জন করবেন।’

 

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বেচ্ছাসেবকেরা বিভিন্ন বিষয়ে বাধার সম্মুখীন হয়। তার মধ্যে একটি হলো স্বেচ্ছাসেবক ধরে রাখা। তবে অনেক ক্ষেত্রে মনে হয় স্বেচ্ছাসেবকদের তাদের পেশাগত জীবনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পেশাগত জীবনের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবার কোনো বিরোধ নেই। দ্বন্দ্বের বদলে বরং পেশাগত দক্ষতা দিয়ে সেবা প্রদান করতে পারলে সেবার মান আরও ভালো হয়। এ ছাড়া স্বেচ্ছাসেবকদের কাজের ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ প্রদান না করা একটি বড় বাধা৷ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হলে স্বেচ্ছাসেবকদের কাজগুলো আরও শক্তিশালী ও সাবলীল হয়। ২০১৭ সালে ন্যাশনাল ইউথ পলিসি গ্রহণ করা হয়েছে, যা যুবকদের জন্য খুবই কার্যকর নীতিমালা; যা অনুসরণ করলে তরুণদের কাজগুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। স্বেচ্ছাসেবকদের অধিকাংশ-ই তরুণ এবং শিক্ষার্থী। তাঁদের কেউ পথশিশুদের শিক্ষার জন্য কাজ করেন, কেউ নারী অধিকার আদায়ে, কেউ পরিবেশদূষণ রোধে আবার কেউ বা বিনা মূল্যে দুস্থ রোগীদের রক্তদান সেবায় এগিয়ে যান। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করাই তাঁদের প্রধান ব্রত। যান্ত্রিক জীবনে সবাই যখন প্রতিযোগিতার দৌড়ে ব্যস্ত, তখন একদল তরুণ নিঃস্বার্থভাবে কাজ করছেন মানুষের জন্য। তরুণদের এমন স্বেচ্ছাসেবাকে উৎসাহ দিতে হবে। অনেকেই আছেন, যাঁরা একসঙ্গে অনেক বিষয় নিয়ে কাজ করেন; কিন্তু সেটি না করে যদি দুই বা একটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া যায়, তাহলে সেটি ভালোভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব। একজন সন্ত্রাসী যখন হেঁটে যান, তখন সালামের বহর ওঠে, তাঁর পিতাও সালাম পান। আর যিনি স্বেচ্ছাসেবা করেন, তাঁকে সবাই পাগল বলেন। বাস্তবিক এই চ্যালেঞ্জ সামনে রেখেই এগিয়ে যেতে হবে। সমাজ পরিবর্তনে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের অর্থাৎ স্বেচ্ছাসেবকদের আরও উৎসাহিত করতে হবে। যাঁরা স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেন, তাঁরা একপ্রকার ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ান’। অনেকেই তাঁদের ‘পাগল’ বলেন। তবে এই পাগলরাই সমাজ পরিবর্তনে কাজ করেন। বিপদগ্রস্ত–অসহায় মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। স্বেচ্ছাসেবকদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ওই প্রচেষ্টাই একসময় দেশকে বদলে দেবে, সমাজকে বদলে দেবে, আলোকিত করবে বাংলাদেশকে।।

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ: সিনিয়র সাংবাদিক।। jsb.shuvo@gmail.com


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Future Station Ltd.
উপরে যান