আমরা আছি মাইনকারচিপায়!

Tue, Jun 8, 2021 5:21 PM

আমরা আছি মাইনকারচিপায়!

রুমী আহমেদ: আজ আমার মেয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করছিলো - বাবা আমরা এবার বামানা তে যাচ্ছি কিনা! আমি বললাম- না! যখন সে জিজ্ঞেস করলো কেন - ওকে দেয়ার মত কোন সদুত্তর আমার জানা ছিল না!

বামানা হচ্ছে উত্তর আমেরিকাতে অবস্থানরত বংলদেশি ডাক্তারদের একটা বার্ষিক গ্যাদারিং! এটা মোটামুটি আমার সামার রিলাক্সেশন এর পার্ট হয়ে গিয়েছিলো গত কয়েক বছর!

সারা উত্তর আমেরিকা থেকে ডাক্তাররা আসেন পরিবার নিয়ে - অনেকের সাথে এক সাথে পড়াশোনা করেছি দেশে-অনেকের সাথে একসাথে স্ট্রাগল করেছি এদেশে আসার পর! অনেকে অনেক পুরোনো বন্ধু - অনেক নুতন করে বন্ধু হয়ে গিয়েছেন - বয়স সিনিয়রিটি জুনিওরিটি ছাড়িয়ে! বাচ্চারাও বছর বছর যেতে যেতে অনেক বন্ধু বানিয়ে ফেলেছে! এরা এদেশে বড় হওয়া ছেলে মেয়ে - বিভিন্ন স্টেইট এ থাকে| ওরাও অপেক্ষা করে বছরের এই তিনটা দিন ওরা সবাই একসাথে দলবেঁধে হোটেলে থাকবে আর ফান করবে! পুরুষ - মহিলা অনেকে অপেক্ষা করেন বা ড্রেড করেন - হোটেলে এক ফ্লোর জুড়ে গড়ে ওঠা শাড়ি কাপড় গহনার মেইকশিফট মার্কেট!

আর আছে বাঙালি কালচারাল এক্সট্রাভাগান্জা! পর পর তিন সন্ধ্যায় প্রিয় শিল্পীর কনসার্ট!

এবার হবার কথা ছিল নিউ ইয়র্কে! নিউ ইয়র্কের কনফারেন্স আমার জন্য আবার বিশেষ আকর্ষণীয়!নিউ ইয়র্ক আমার খুব প্রিয় জায়গা! এই কনফারেন্স এর সুবাদে কারো বাসায় না থেকে ম্যানহ্যাটান এ হোটেল এ থাকা হয় - সারা রাত দলবেঁধে টাইম স্কয়ারে আড্ডা - কিছু পর পর স্ট্রীটসাইড চা কফির আঞ্জাম আর ডেফিনিটলি দিনে তিনবার করে জ্যাকসন হাইটস এর বাঙালি খাবার পাড়াতে হামলা! দেখা গেলো রাতদুটার সময় আপনি আপনার দল নিয়ে কোন দেশি রেস্টুরেন্টে বসে মোগলাই পরোটার অর্ডার দিচ্ছেন - তখন বামানা এটেনডি বিশ জনের আরেকদল এসে ঢুকলো ভুনা খিচুড়ির খোঁজে! দুই গ্ৰুপ একসাথে টেবিল লাগিয়ে শুরু হলো তুমুল আড্ডা!

সমস্যটা হচ্ছে বামনার সাংগঠনিক নেতৃত্ব যারা আছেন তাদের মধ্যে দুটো গ্রূপ আছে! এই দুই গ্রূপ খালি গ্রূপিং এর স্বার্থেই গ্রূপিং! এদের মধ্যে না আছে আইডিওলজিকাল ডিফারেন্স, না আছে পলিটিকাল ডিফারেন্স, না আছে রিজিওনাল ভেদাভেদ, না আছে মেডিকেল কলেজ রেজিনালিজম, না আছে স্পেসিয়ালটি ডোমিন্যান্স নিয়ে টানাপোড়েন! এদের মিটিং মানেই ঝগড়া ঝাটি - এই ঝগড়া ঝাটি ফিসক্যাল কনসারভেটিজম নিয়ে না বা বাংলাদেশ বা যুক্তরাষ্ট্রের হেলথকেয়ার পলিসি ডিবেট না!

এদের মূল ঝগড়া হচ্ছে কে প্রেসিডেন্ট হবেন আর কে কয়টা ভোট কন্ট্রোল করব তা নিয়ে - বাই হুক ওর বাই ক্রুক প্রেসিডেন্ট হতেই হবে! এদের সারা বছরের কর্মকান্ড আবর্তিত হয় দুই বছর পরের নির্বাচন নিয়ে!

আমাদের মিরপুর এর এক ট্রাক ড্রাইভার এম পি ছিলেন - এস এ খালেক! তিনি বারবারই নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসতেন তার ভাষার "ডাক্তার কামালের"

 বিরুদ্ধে! খালেক সাহেব দলে দলে বস্তির লোক দের  ভোটার বানিয়ে নিজের ভোট ব্যাংক বানিয়ে রাখতেন!

আমাদের দুই গ্রূপের কর্তাব্যক্তিরা খালেক সাহেব স্টাইলে রাজনীতি করেন আর উত্তর আমেরিকায় প্র্যাকটিসিং লাইসেন্সড ফিজিশিয়ান দের মিরপুরের বস্তির ভোটরদে মত জ্ঞান করেন - ওদের ধারণা আমি এতো শ ডাক্তার কে ভোটার করছি - সুতরাংআমার জয় নিশ্চিত!

যা হোক মূল কোথায় যাই! গতবার (২০২০) ডালাসে কনফারেন্স আর এবার (২০২১) নিউইয়র্কে কনফারেন্স হবার কথা ছিল!

গতবার কভিডের জন্য ডালাস কনফারেন্স হয় নাই! কিন্তু এক গ্রূপের ধারণা নিউ ইয়র্ক কনফারেন্স ওদের নির্বাচনী হিসাব নিকেশে প্রতিকুল তাই অতি চালাকি করে আর ইসি তে মেজরিটির জোরে - কোভিড এর প্যাঁচে ফেলে, আর্থিক ক্ষতির অজুহাতে  এবার নিউ ইয়র্ক কনফারেন্স টা ক্যানসেল করে ডালাস এ নিয়ে গেলো! খালেকিও পলিটিকাল মাস্টার স্ট্রোক! এক রাজনৈতিক প্যাচে প্রতিপক্ষ কুপকাৎ!

আর অন্যদল 'বিচার মানি কিন্তু তাল গাছ আমার' - ইসির ডিসিশন মানি না -কায়দায় নিউ ইয়র্কে কনফারেন্স করতে হবে গো ধরে বসে রইলো আর মামলা ঠুকে দিলো!-শুরু হলো লাগাতার মামলা! ! হিমুর মামাদের মতো মামলা!

এক ডাক্তার আরেক ডাক্তার এর বিরুদ্ধে শো কোজ করে মামলা করছেন - অথচ এদের ছেলে মেয়েরা একই স্কুলে পরে - একই ক্লাশে  যায় - একই সাথে খেলে!

শিশুরা  দেখে বা মা রা বামনা নিয়ে মারা মারি করছেন - এক শিশু তার বাবাকে জিজ্ঞেস করে ও কি ওর বন্ধু .... এর সাথে আর খেলতে পারবে কিনা - কারণ ওর বাবারা  দুই গ্রূপ থেকে মামলাবাজি করছেন!

এখন যা হচ্ছে - কেউ কোনো ত্যাগ স্যাক্রিফাইস করছেন না! ডালাস গ্রূপ বলছে আইনগতভাবে নেয়া ইসির মেজরিটি ডিসিশন - ডালাসে কনফারেন্স হবে, আর না হলে অনেক বড় একটা আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে! আর নিউ ইয়র্ক গ্রূপ বলছে কনফারেন্স ভেন্যুর স্থান নির্ধারণে যে ট্রাডিশন তা ভেঙে চার বছর আগে নেয়া সাধারণ সভার সিদ্ধান্তে হুট্ করে ইসি বদলাতে পারে না! আইনের চেয়ে ট্র্যাডিশন বড়! অন্যদল বলছি সবার উপরে আইন! সবাই আইন মানতে হবে!

এখন যা হচ্ছে দুগ্ৰুপ ই দু শহরে কনফারেন্স এর প্রস্তুতি নিচ্ছেন! যুদ্ধংদেহী অবস্থা! দুপক্ষই যুদ্ধের জন্য রেডি - নিজ সংকল্পে অটল!

দুটো ট্রাইবের মতো হয়ে গেছে! ভাইবারে হাজার হাজার মেসেজ চালা চালি হচ্ছে! কিছু মেসোজ পরে একেবারে লোম খাড়া হয়ে যায়! একজন যেভাবে লিখছেন তা পড়ে মনে হলো তার ট্রাইবের ইসি মেম্বার রা সবাই একেকজন দরবেশ পয়গম্বর পর্যায়ের মানুষ আর বিপক্ষীও ইসির মেম্বার রা সবাই রাক্ষস খোক্কোস প্রজাতির মানুষ! মনে পরে গেলো আমাদের মেডিকেল কাজের প্রথম দিনগুলোর কথা! কলেজে ঢোকার সাথে সাথে আমাদের একটা দলীয় আইডেন্টিটির ইনডকট্রিনেটেড করা হয়ে গেলো আর এভাবে ব্রেইন ওয়াস করা হলো যে আমাদের বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেলো যে প্রতিপক্ষীয় সিনিয়র রা সবাই সাক্ষাৎ দজ্জালের রি-ইনকারনেশন! অনেক পরে মেডিকেল কলেজের শেষ পর্যায়ে গিয়ে আমাদের চোখ থেকে ওই দলান্ধ ট্রাইবালিজম  এর ঠুলি খুললো - হঠাৎ করে দেখতে পেলাম - যাদের কে এতদিন ভেবে এসেছি জল্লাদ প্রকৃতির মানুষ - তারা আসলে ব্যাক্তিগত ভাবে আমাদের মতোই ভালো মন্দ মিলিয়ে মানুষ- কেউ কেউ অসাধারণ বন্ধুবৎসল - কেউ তীব্র মেধাবী!

এখন দুই ট্রাইবের বাহাসের মাঝে পরে আমার মেজরিটি ট্রাইব বিহীন মানুষ পরে গেছি মাইনকারচিপায়! এখন ট্রাইব পরিচয় বিহীন থাকাটাও একটা স্ট্রাগল! ট্রাইব ভুক্ত মানুষ গুলোর বদ্ধমূল ধারণা -- আপনি যদি তার ট্রাইবের সদস্য না হন - আপনি তাহলে অবশ্ব্যই বিপক্ষ ট্রাইবের মানুষ!

এই জটিল বাস্তবতার প্রেক্ষিতে আমার এবার আর বামানা কনফারেন্স যাওয়া হচ্ছে না!

আমার খারাপ লাগে এটা ভেবে যে - এদেশে থাকা এতো উচ্চ শিক্ষিত প্রফেশনাল সবাই! এঁরা এখনো অনলাইন সিকিউর নির্বাচনের উপর আস্থা রাখতে পারছেন না! এদের মধ্যে খালি নির্বাচনে কারচুপির ভয়! প্রেসিডেন্ট না হতে পারার ভয়! আর এরা সাধারণ চিকিৎসক সমাজকে এতো আন্ডার এস্টিমেট করেন! এদের ধারণা সবাই খালেকের বস্তির ভোটারের মতো! যে যাকে ভোটার বানিয়েছে সে রোবটের মত ওই ব্যক্তির প্যানেলে ফুল প্যানেল অন্ধের মত ভোট দিয়ে আসবে!!

  • লেখাটি ফ্লোরিডায় বসবাসরত ডা. রুমী আহমেদ এর ফেসবুক থেকে নেয়া

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান