হেফাজত নেতাদের গ্রেফতারে কেউ কথা বলছে না, কেনো?

Thu, Apr 29, 2021 8:55 PM

হেফাজত নেতাদের গ্রেফতারে কেউ কথা বলছে না, কেনো?

পলাশ রহমান : ঢাকার একটা টিভিতে মুফতি ফয়জুল্লাহর কথা শুনলাম। তিনি বলেছেন, হেফাজতের সদ্য ভেঙ্গে দেয়া কমিটি অবৈধ ছিল। ওই কমিটির সদস্যরা হেফাজতকে চর দখলের মতো করে দখল করেছে।

আমার মনে হয় ফয়জুল্লাহর কথা বুঝতে হলে জেএমবি, হরকত ইত্যাদী সংগঠনগুলো আগে বুঝতে হবে। জানতে হবে কিছু ইতিহাস।

জামায়াত এবং কওমিপন্থীদের কিছু দলছুট মানুষ মনে করতেন গণতান্ত্রিক পন্থায় রাজনীতি করে বা আন্দোলন সংগ্রাম করে রাষ্ট্রে ইসলাম কায়েম করা যাবে না। ইসলাম কায়েমের জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ করতে হবে। তাদের ওই চরমনীতিতে বিশ্বাসীরা সবাই যে নির্মূল হয়ে গেছে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। তাদের সামনের সারির নেতারা হয়তো নির্মূল হয়েছে, কিন্তু যারা হয়নি বা যারা এখনো চরম-চেতনা ধারণ করে তারা কোথায়?

আহমদ শফি সাহেবের মৃত্যুর পরে তারাই মূলত চর দখল করার মতো করে হেফাজত দখল করেছে। তারাই অক্সিজেনের পাইপ খুলে শফি সাহেবের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। তারাই শত বছরের ঐতিহ্য ভেঙ্গে হাটহাজারি মাদরাসায় নজিরবিহীন তান্ডব করেছে। তারাই হেফাজতকে পুঁজি করে সরকার ফেলে দেয়ার স্বপ্ন দেখে। হেফাজতের প্রোগ্রামগুলোয় তান্ডব করে। এসব তথ্য গোয়েন্দাদের অজানা থাকার কথা নয়। কারণ শর্টকাটে ক্ষমতায় যাওয়ার খোয়াব দেখা হুজুরের অভাব নেই দেশে।

মামুনুল হক আজিজুল হক সাহেবের ছেলে। তিনি মনে করেন, তার বাবা ছিলেন দেশের প্রায় সব আলেমদের শিক্ষক। সুতরাং ইসলামপন্থীদের নেতৃত্ব দেয়ার অধিকার একমাত্র তিনিই রাখেন। তিনিই বড় নেতা। মোটা রাজনীতিক। এমন মনোভাবের সূচনা হয় আজিজুল হক সাহেব বেঁচে থাকতে। সে সময়ের মামুনুলরা মনে করতেন ইসলামপন্থীদের নেতৃত্ব দেয়ার অধিকার শুধুমাত্র আজিজুল হক সাহেব রাখেন। এসব নিয়ে তখন থেকেই ইসলামপন্থীদের মধ্যে বেশ ঠ্যালাঠেলি হতো। হাতাহাতি, মারামারিও হয়েছে অনেক বার। বিশেষ করে ইসলামি ঐক্য জোটের কোনো কর্মসূচি থাকলে এই ঠ্যালাঠেলি বেশি লক্ষ করা যেতো। আজিজুল হক এবং সৈয়দ ফজলুল করিম সাহেবের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরণের স্নায়ু যুদ্ধ হতো।

সে সময়ের স্নায়ুযোদ্ধারা এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইসলামপন্থীদের। সুতরাং হেফাজত বা মামুনুলদের অধপতনের সমীকরণ খুব একটা সহজ নয়।

অন্যদিকে উপমহাদেশের প্রবীণ দল জমিয়ত মনে করতো তারাই একমাত্র আলেম ওলামাদের দল। এই দলের বাইরে যে আলেমরা থাকবে তারা দলছুট। তাদের কওমি ঘরানার বাইরের মানুষ ভাবার একটা মানষিকতা ছিল। যা এখনো আছে। কিন্তু সমস্যা হলো জনসমর্থনের দিক থেকে জমিয়ত বা আজিজুল হক সাহেবের দল থেকে ফজলুল করিম সাহেবের দল ভারি ছিল। এখনো আছে। যা মেনে নেয়া অনেকের পক্ষেই সহজ ছিল না। এখনো নেই।

আজিজুল হক সাহেব বড় মাপের আলেম ছিলেন, কিন্তু তাকে বড় মাপের রাজনীতিক বানাতে গিয়ে বা ভাবতে গিয়েই মূলত তার দলের পতন হয়। জমিয়তও বড্ড বেশি অহংকারে ডুবে গিয়েছিল। তারা প্রবীণ দল। আলেমদের দল ভাবতে গিয়ে তারাও পিছিয়ে যায়। পাছে তরতর করে এগিয়ে যায় ফজলুল করিম সাহেবের তুলনামূলক নতুন দল।

এর মধ্যে দেশের বড় আলেমদের ঘাড়ে ভূত চাপে। তারাও জামায়াতের মতো শর্টকাটে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়েন। সকল নীতি-আদর্শ শিকেয় তুলে তারা ইসলামি ঐক্য জোট নিয়ে চার দলে যোগ দেন। মুফতি আমিনি সাহেব ধানের শীষ নিয়ে সংসদে যান। প্রতিদিন তার মন্ত্রী হওয়ার খবর উড়তে থাকে বাতাসে। মাথা ঘুরে যায় আরো অনেকের। কেউ নৌকায়, কেউ ধানের শীষে ভোট করার জন্য উন্মাদ হয়ে যান। আজ যে ফয়জুল্লাহ চর দখল করা মতো করে হেফাজত দখলের কথা বলছেন তাকেও আমরা দেখেছি নৌকার টিকেট পেতে ব্যাপক দৌড়-ঝাপ করেছেন।

সুতরাং হেফাজতের আজকের অবস্থার জন্য একজন মামুনুল হক দায়ী নন। এর দায় অনেকের। যারা নীতি আদর্শ বিসর্জন দিয়ে শর্টকাটে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, মোটা দাগে দায় তাদের। তারাই প্রশ্রয় দিয়েছেন চরম চেতনায় বিশ্বাসীদের। তারাই ইসলামি ঐক্য জোট ভুক্ত দলগুলোকে খেয়ে এখন মাথা চিবুচ্ছেন হেফাজতের।

আমরা অনেক বার পত্রিকায় পড়েছি শফি সাহেবের ছেলে আনাসের দূর্নীতির গল্প। কিন্তু আজ পর্যন্ত তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পক্ষে বিপক্ষে কোনো কথাই তিনি বলেননি। কেউ তার বক্তব্য সামনে আনার দৃশ্যমান চেষ্টাও করেনি। সবাই ব্যাস্ত থেকেছে হেফাজতকে ব্যবহার করে শর্টকাটে ক্ষমতায় যাওয়ার। যেমন ফয়জুল্লাহরা চাচ্ছেন চর দখলকারীদের সরিয়ে ভূমি দখলকারীদের সামনে আনতে। যাতে এবার নৌকার টিকেট ফসকে গেলেও আগামীতে না যায়।

প্রতিদিনই নীরবে আলেমদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। অথচ কেউ কথা বলছে না। কথা বলার কোনো পরিবেশ বা সম্পর্ক হুজুরদের মধ্যে নেই। কারণ একটাই শর্টকাটে ক্ষমতায় যাওয়ার বাসনা এবং পুরনো স্নায়ুযুদ্ধ।

লেখক: পলাশ রহমা, ইতালীতে বসবাসরত সাংবাদিক।


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান