শব্দ মুক্তা এবং একটি অভিধান

Thu, Apr 29, 2021 12:22 PM

শব্দ মুক্তা এবং একটি অভিধান

মুজিব রাহমান : হাজার বছরের বিবর্তনের ঐতিহ্যে সমৃদ্ধিশালী বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার। ভাষাচর্চার ইতিহাসে অভিধানচর্চা- অভিধান রচনাও একটি মাইলফলক অর্জন।

 বাঙালির সন্তান-সন্ততিদের বেড়ে ওঠার পথে এ সম্পন্ন ভাষার প্রতিটি শব্দই একটি অভিজ্ঞতা। শব্দ শুনতে শুনতেই আমাদের জানা-বোঝার জগত বিস্তৃতি লাভ করে, চিন্তা-ভাবনার পরিসর ঋদ্ধ হতে থাকে। ত

এ প্রসঙ্গে কবি-সমালোচক আবু হেনা মোস্তফা কামালের একটি কথা উদ্ধৃত করছি:

' গণমাধ্যম কর্মী, কারিগর, প্রযুক্তিবিদ ও বিজ্ঞানীসহ সকল পেশা ও মননজীবী যখন তাঁদের চিন্তা-চেতনার অন্যতম বাহন হিসেবে মাতৃভাষাকে গ্রহণ করেন তখন সেই ভাষার শক্তি ও সম্ভাবনা বেড়ে যায় এবং নিরলস ও উদ্ভাবনাময় অনুশীলনে উন্মোচিত হয় নতুন নতুন দিগন্ত।'

দেশমাতৃকার সামগ্রিক উন্নয়নের একটি বড় এককও সর্বস্তরের মাতৃভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা। আর  মাতৃভাষা তার সমৃদ্ধির জন্যে নানান বিষয়ের অজস্র প্রয়োজনীয় শব্দ গ্রহণ করে নানান ভাষা থেকে। বাংলা ভাষায় আগত একটি বিদেশি শব্দের উৎস-ভাষা যা-ই হোক না কেন তা বিতর্কাতীভাবে ভাষাকে সমৃদ্ধি করেছে। করছে। উল্লেখ্য, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে প্রায়শ ব্যবহৃত হচ্ছে আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি, তুর্কি, ইংরেজি, সংস্কৃত, পর্তুগিজ, ফরাসি, ল্যাটিন, হিব্রু, সুরিয়ানি, চীনা, জাপানি, ইতালি, গ্রিক, জার্মান, ডাচ, আর্মেনীয়, রুশ ইত্যাদি বহুসংখ্যক বিদেশি ভাষার শব্দ।

বাংলাভাষার বিদেশি শব্দ সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,

 'যখন কেউ বলে ওর দরদ আছে, তখন মনে মনে আরব দেশকে সাত সেলাম দিতে সাধ হয়। এমন কথা তো সংস্কৃতেও মিলবে না।'

ঠিক একইভাবে পুষ্পের চেয়ে, ইরানি গোলাপের চেয়ে মোলায়েম মিঠে অজস্র আরবি-ফারসি, তুর্কি শব্দ একাকার হয়ে আছে এখানে। সীমাসরহদ্দ নিয়ে মামলা করে না বাংলা ভাষা। স্বদেশী-বিদেশী, হালকা-ভারী সব শব্দই ঘেঁষাঘেঁষি করে আছে বাংলা ভাষার উদার আঙ্গিনায়। এমনই বলেছেন রবীন্দ্রনাথ।

উল্লেখ্য, আরবি-ফারসি-সংস্কৃত-হিন্দি ভাষায় পারদর্শী সপ্তদশ শতাব্দের কবি আলাওল তাঁর 'সপ্ত পয়কর' কাব্যে শব্দকে মুক্তোর সঙ্গে তুলনা করে লিখেছেন:

কবি সে ডুবারু কাব্য সিন্ধু শব্দ মুক্তা।

বহু যত্ন করিয়া কবি তোলেহ চারু যুক্তা।।

মূলত, মধ্যযুগেই বাংলা ভাষায় বিদেশী ভাষার উপাদান প্রবেশ করে। জীবন ও ভাষার যুগপৎ জঙ্গমতার কারণেই সময়ের প্রবাহে আরবি, ফার্সি, পর্তুগিজ, ইংরেজি ইত্যাদি নানা ভাষার বহু শব্দ আজ বাংলা ভাষার অঙ্গীভূত। সে-সব আত্তীকৃত শব্দকে আদৌ আর বিদেশি শব্দভুক্তিতে তালিকাবদ্ধ করা বা বিদেশি বলা যায় কিনা তা বিতর্কাধীন - আলোচনার টেবিলে। বাংলা ভাষার শব্দ হিসেবে আত্তীকৃত হলেও উৎস-ভাষা নির্দেশ তো থাকছেই।

প্রকৃতই, ভাষার গুরুত্বপূর্ণ একক হচ্ছে শব্দ। আমরা প্রত্যেকেই শব্দ ব্যবহার করি, খরচ করি, বিনিয়োগ করি। গোড়ায়, একটি ভাষার শক্তি-সামর্থ্য নির্ভর করছে তার শব্দ-সম্ভারের উপর। আগেই উল্লেখ করেছি,বাংলা ভাষার এক গুরুত্বপূর্ণ কবি আলাওল শব্দকে 'মুক্তা'র মতো মহার্ঘ মনে করতেন।

অস্বীকার করার উপায় নেই, শব্দজাগর মানুষের কাছে শব্দ অমূল্য।

বাংলাভাষার শব্দজগত স্বকীয় এবং পরকীয় শব্দে সমৃদ্ধ। সেল্ফিতে, ভাইরালে, কলে-মিসকলে, লোড আর আপলোডে ভরপুর আমাদের প্রতিদিনের ভাষার সংসার। 'পোস্ট'টাতো দিতেই হবে। গতদিনের 'স্ট্যাটাস'টা 'লাইক'শূন্য ছিলো। 'সোশাল মিডিয়া' আর 'ডিজিটাল ব্যানার' - না কোনটাকেই আজ আর বেগানা মনে হয় না। মনে হয় না অনাহূত, অনাত্মীয়!

বরং দেশজুড়ে ভাষাজুড়ে এ-সব শব্দাবলি সাড়ম্বরে সমাদৃত!

এবারের  বাঙলা একাডেমির সুপরিসর বইমেলা থেকে যে-কয়টি বই সংগ্রহ করেছি সে-সব বইয়ের মধ্য হতে একটি বই নিয়ে মূলত এই লেখা। এই গ্রন্থটি হচ্ছে, জুন ২০২০ সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত, মোহাম্মদ হারুন রশিদ সংকলিত ও সম্পাদিত, কুড়ি রকমের বিদেশি ভাষার প্রায় ষোলো হাজার ভুক্তি সমৃদ্ধ 'বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ব্যবহৃত বিদেশি শব্দের অভিধান'।

বাংলাপিডিয়ার প্রধান সম্পাদক ড. সিরাজুল ইসলাম তাঁর একটি প্রবন্ধে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ব্যবহৃত বিদেশি শব্দের সংখ্যা প্রায় দশ হাজার বলে উল্লেখ করেছেন।

অভিধানের প্রতি আমার পক্ষপাত রয়েছে। একটি নূতন অভিধান সংগ্রহ করতে পারলে আনন্দ অনুভব করি। আনন্দ জাগে মনোজগতে। শব্দের প্রতি ভালোবাসা সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসার একটি গুরুত্ববহ দিক বলা যায়। পৃথিবীর অনেক সমৃদ্ধ ভাষাই বহুভাষার বহুবর্ণ শব্দ-সমবায়ে সমৃদ্ধ। ৭,০০০ বছরের পুরনো ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের এক সদস্য-ভাষা ইংরেজি। বিগত ১৫০০ বছর ধরে বিকশিত হচ্ছে ভাষাটি। জার্মান দুটো গোত্রের উপভাষা অ্যাংলো-স্যাক্সন বা প্রাচীন ইংরেজি থেকে ভাষাটির যাত্রা শুরু। নরম্যান বিজয়ের পর ফরাসি ভাষা ছিল ইংরেজদের রাজভাষা, সরকারি ভাষা।

বাংলা ভাষাকেও অনেক পথ ও রক্তাক্ত সংগ্রাম শেষে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা অর্জন করতে হয়েছিল। আর ফারসি ও ইংরেজি ভাষাও এক সময় এদেশে রাজভাষার মর্যাদা উপভোগ করেছে, প্রভাব-প্রতাপ খাটিয়ে গেছে।

'বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ব্যবহৃত বিদেশি শব্দের অভিধান'-এর প্রসঙ্গকথায় বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী লিখেছেন:

'বাংলাদেশ ও ভারত ছাড়া বিশ্বে প্রায় পঁয়ত্রিশ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। জনসংখ্যার বিবেচনায় পৃথিবীতে বাংলা ভাষার অবস্থান চতুর্থ অথবা পঞ্চম স্থানে। এই ভাষা পৃথিবীর উন্নত ভাষাগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলামের জন্মদাত্রী। পৃথিবীর যে-কোনো জীবন্ত ভাষার সঞ্জীবনী শক্তি বিবর্তনের মধ্য দিয়েই স্ফূর্ত ও মূর্ত হয়।"

বাংলা ভাষাও অজস্র বিদেশি ভাষার শব্দ-ধন্য ভাষা।

হাবীবুল্লাহ সিরাজী আরও যোগ করেছেন:

" বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে কত পরিমাণ বিদেশী শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা নিয়ে আজও পূর্ণাঙ্গ কোন অভিধান রচনা হয়নি। এ যাবৎ প্রকাশিত এ ধরণের সকল অভিধানে তিনশ থেকে সর্বোচ্চ চার-পাঁচ হাজারের মতো বিদেশি শব্দের ভুক্তির উল্লেখ পাওয়া যায় এবং বিদেশি শব্দ বলতে শুধু আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি, তুর্কি শব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বিদেশি শব্দের সর্বাধিক সাড়ে আট হাজার ভুক্তি পাওয়া যায় বাংলা একাডেমি থেকে ২০১৫ সালে প্রকাশিত 'বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত আরবি ফারসি উর্দু শব্দের অভিধান'-এ।"

অভিধানটির শুরুতে অভিধান সংকলক-সম্পাদক ড. মোহাম্মদ হারুন রশিদ একটি নাতিদীর্ঘ রচনায় অভিধান প্রণয়নে বাংলা একাডেমির স্বপ্নদ্রষ্টা জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ র পুরোধা ভূমিকা পালনের কথা উল্লেখ করেছেন। এবং তার রচনায় এ-যাবৎ বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত বিদেশি শব্দের অভিধানসমূহের একটি আনুপূর্বিক তথ্যবহুল বিবরণ উপস্থাপন করেছেন। তিনি তাঁর ভূমিকায় লিখেছেন:

"বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে কোনো ভাষা ভিন্ন সংস্কৃতির শব্দাবলিও গ্রহণ করে। ষোলো শতকে এদেশে পর্তুগিজরা এসেছিল। তারা চলে গেছে কিন্তু অত্যাবশ্যকীয় অনেক শব্দ উপহার হিসেবে দিয়ে গেছে। এগুলো বাংলা ভাষা থেকে বাদ দেওয়া যায় না; যেমন: বালতি, জানালা, চাবি, সাবান, পাউরুটি, আনারাস ইত্যাদি।

১৭৫৭ সালে সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত প্রায় দুশো বছর ইংরেজগণ এদেশ শাসন করেছে। সে-সময় বহু ইংরেজি শব্দ স্বাভাবিক নিয়মেই বাংলা ভাষায় প্রবেশ করেছে, যেমন - স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, চেয়ার, টেবিল, ট্রেন, স্টেশন, বাস, ট্রাক, কার ইত্যাদি। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে, এই ইংরেজরা চলে গেলেও, গত প্রায় সাত দশকে আমাদের বাংলা ভাষায় প্রবেশ করেছে কয়েক হাজার ইংরেজি শব্দ, যেমন - কম্পিউটার, ফ্লপি, সিডি, মেগাবাইট, গিগাবাইট, প্রোগ্রাম, হার্ডওয়ার, সফটওয়ার, কপিয়ার, প্রিন্টার, মাউস, কিবোর্ড, মনিটর, মোবাইল, ডিশ অ্যান্টেনা, ইন্টারনেট, ফেসবুক, ওয়াইফাই, সেলফি, ল্যাপটপ ইত্যাদি। অতি সম্প্রতি অতিমারি-সূত্রে আরও কতিপয় ইংরেজি শব্দ,  যেমন - লকডাউন, গ্লাভস, মাস্ক, হ্যান্ডস্যানিটাইজার, পিপিই, হোম কোয়ারেনটিন ইত্যাদি শব্দ বাংলা ভাষার বিদ্যমান শব্দ সম্ভারে যুক্ত হয়েছে।"

যে অভিধানটি ঘিরে কথার সূত্রপাত সে-অভিধানটির কয়েকটি ভুক্তিতে চোখ বুলিয়ে নেয়া যেতে পারে:

সাম্পান বি. চট্টগ্রাম অঞ্চলের জলপথে যাতায়াতের উপযোগী এক ধরনের ছোটো নৌকা। [ চী. সাঙপাঙ]

জ্যামিতি বি. ভূমির পরিমাণ বিষয়ক শাস্ত্র; ক্ষেত্রতত্ত্ব।

[স. জ্যা + মিতি; ই. geometry]

রোয়াক, রক বি. ঘরের সামনের খোলা জায়গা বা স্থান। ( দলে দলে লোক রোয়াকের উপর উঠবার চেষ্টা করছে - সৈ.মু)। [ আ. রুওয়াক]

রেকি বি. যুদ্ধক্ষেত্রে আক্রমণের পূর্বে শত্রুপক্ষের অবস্থান সম্পর্কে অনুসন্ধান। [ ই. recce ]

দমকল বি. ১. নদী, পুকুর ইত্যাদি থেকে পানি তোলার যন্ত্র; পাম্প। ২. আগুন নিভানোর জন্য পানি নিক্ষেপের যন্ত্র ( বুকের ভিতর জ্বলছে আগুন দমকল ডাক্, ওলো সই - ন.ই.)।

[ফা. দম্ + হি. কল]


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান