"জাপানে মসজিদ কয়টি?"

Sun, Apr 4, 2021 1:46 PM

"জাপানে মসজিদ কয়টি?"

শোয়েব সাঈদ: প্রশ্নটিকে সাধারণ জ্ঞানের বা মৌখিক পরীক্ষায় কোন নির্বোধ প্রশ্নকর্তার নিরীহ একটি প্রশ্ন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু না, প্রশ্নটি কোন নিরীহ প্রেক্ষাপটের নয়, এর পেছনে রয়েছে নিরাপত্তার নামে ইসলাম/মুসলিম ফোবিয়া/বিদ্বেষ যার যথেচ্ছ ব্যবহারে পটু মার্কিন ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের অপ্রতিরোধ্য স্বেচ্ছাচারিতার কাহিনী। 

ইমিগ্রেশনের দায়িত্ব প্রাপ্তরা সারা বিশ্বেই প্রবল ক্ষমতাধর, বিশেষ করে বৈধ-অবৈধ পন্থায় ক্ষমতা অনুশীলনের জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অফিসারদের ধরে নেওয়া হয় সৃষ্টিকর্তার পরেই ক্ষমতাশালী। কৌশলটাই হচ্ছে  ক্ষমতার উত্তাপটা প্রদর্শন। 

পেশাগত কাজে বিগত দেড় দশকের বেশী সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হয়েছে দেড়শ বারেরও বেশী; ছুটতে হয়েছে অসংখ্য শহর, বিমানবন্দর এমনকি ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েস্টের ছোট্ট টাউনশীপে পর্যন্ত, নিয়মিত।

যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের অভিষেকটা হয় দেড় যুগ আগে টোকিও থেকে লস এঞ্জেলেস হয়ে লাস ভেগাসে বিজনেস ট্রিপের মাধ্যমে। লস এঞ্জেলেস থেকে ৭৫ মিনিটের ফ্লাইটে ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু পাহাড় পর্বত ডিঙ্গিয়ে একেবারে খাঁ খাঁ করা ধূসর মরুভূমি উপর দিয়ে নামতে হয় মূলত  অর্থ বিত্ত, ভোগ বিলাস আর খোলামেলা বেশভূষার মরুনগরী লাস ভেগাসে। ঝলমলে লাস্যময় ক্যাসিনো নগরী লাস ভেগাস দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ শুরু করলে পুরো যুক্তরাষ্ট্রটিকে মনে হতে পারে লাস ভেগাসের মতই রূপকথার দেশ।

কিন্তু লাস ভেগাস থেকে ৪ দিন পর উটাহ অঙ্গরাজ্যের রাজধানী মরমন ধর্মের মক্কা বলে পরিচিত ছিমছাম নিরিবিলি সল্টলেক সিটি ভ্রমণে বুঝে যাই যুক্তরাষ্ট্র মানে কিন্তু লাস ভেগাস নয়।   মরমনদের কেন্দ্রীয় চার্চ ঘুরে আমার মনে হল পুরুষদের বহুবিবাহ খ্যাত এই ধর্মের সাথে  খ্রিস্টান  ধর্মের সম্পর্কটি মুসলিমদের সাথে কাদিয়ানীদের সম্পর্কের মতই দ্বন্দ্বময়, ভবিষ্যতে এই বিষয়ে বিস্তারিত লিখবার ইচ্ছে রইল।

দ্বিতীয় বারের মত যখন যুক্তরাষ্ট্রে আসি, ইটিনেরারিটা ছিল টোকিও থেকে সানফ্রান্সিসকো হয়ে লাস ভেগাস।  জাল অর্থাৎ জাপান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে বেশ কয়েলজন সহকর্মীর সাথে সন্ধ্যায় টোকিও থেকে রওয়ানা হয়ে প্রায় ৯ ঘণ্টার ফ্লাইটে ৮২২৭ কিমি পাড়ি দিয়ে সকাল ১১ টার দিকে সানফ্রান্সিসকোতে পৌছা। লাস ভেগাস কিন্তু ট্রেড শো আর কনফারেন্সের জন্যে বিশ্বখ্যাত একটি নগরী, ফলে বার বারই যেতে হচ্ছে ওখানে।

সানফ্রান্সিসকোতে ইমিগ্রেশন লাইনে সুবোধ বালকের মত ধৈর্য সহকারে দাঁড়িয়ে ছিলাম, এশিয়া আর ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় এই অভ্যেস্তটি অনেক আগেই রপ্ত হয়ে গিয়েছিল। লাইনে আমার সামনে পেছনে ছিল কয়েকজন সহকর্মী। আমার পালা আসতেই  গুড মর্নিং বলে  প্রিয় জন্মভুমি বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্টটি  বেশ ভারিক্কি চেহারার ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার হাতে দিলাম। শুনেছি মেজাজ খারাপ ইমিগ্রেশন  কর্মকর্তার পাল্লায়  পড়লে  গুড মর্নিং এর মত নিরীহ সম্ভাষণটূকুও  ঝামেলা বাঁধাতে পারে, উত্তর আসতে পারে হোয়াই মর্নিং ইস গুড? আসলে এগুলো সবই পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক খেলা। 

ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা পাসপোর্টটি ঘাঁটলেন অনেকক্ষণ, মনে হল আমার নামটি উনার মনে ধরেছে বা দ্বিধান্বিত। পাসপোর্টটি ফেরত দিয়ে কাস্টমসের দিকে নয়, উল্টোদিকে একটি রুম দেখিয়ে ওখানে যেতে বললেন। মাঝ পথেই একজন কর্তা এগিয়ে এসে আমাকে রুমে নিয়ে গেলেন। রুমে প্রবেশ করে বুঝলাম আমি সেকেন্ডারি ইন্টেরোগেশনের কবলে অর্থাৎ সন্দেহভাজন যাত্রীদের দ্বিতীয় দফার কঠিন জিজ্ঞাসাবাদের ধাপটি উৎরে যেতে হবে।

অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখলেন, খুব ভিড়ও ছিলনা। আসলে উপেক্ষা আর অপেক্ষা করানোই উনাদের একটি কৌশল। কাউন্টারে আমার ডাক পড়ল।আমার যুক্তরাষ্ট্রের ৫ বছরের ভিসাটি ছিল টোকিওর যুক্তরাষ্ট্র দুতাবাস থেকে। ভিসা নেবার সময় যে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছিল সেই সব প্রশ্ন সহ অনেক অবান্তর  প্রশ্নে ধৈর্যের উপর চাপ বাড়ছিল। চাপের আরও কারণ ছিল সানফ্রান্সিসকো থেকে লাস ভেগাসের ফ্লাইট মিস হবার সম্ভবনা। লাগেজ নিয়ে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে চেক ইন ছিল সময় সাপেক্ষ।

আমার গায়েব হয়ে যাবার এই অবস্থায় চিন্তিত জাপানি সহকর্মীরা আমার অবস্থা দেখতে জালের ম্যানেজারকে পাঠালেন যদিও বর্ডার সিকিউরিটির দায়িত্বে নিয়োজিতদের কাজে এয়ারলাইন্সের কিছুই করার নেই। কিন্তু পেশাদার জাপানিরা তাঁদের যাত্রীর প্রতি কর্তব্যবোধ থেকেই খোঁজ নিতে গেলেন।

জিজ্ঞাসাবাদের শেষের দিকে আরও দুজন অফিসার যোগ দিলেন। একজন আমাকে  জিজ্ঞাসা করলেন জাপানে মসজিদ কয়টি? এই প্রশ্নে আমার বুঝার বাকী রইলনা ধর্মের নামে সন্দেহভাজনের গ্যাঁড়াকলে হেনস্তা হচ্ছি। ধৈর্য হারালাম, উত্তর দিলাম আমি পরিসংখ্যানবিদ নই। আমার এই ট্যারা উত্তরে খুব শান্ত এবং গম্ভীরভাবে একজন অফিসার বললেন, জেন্টেলম্যান আমাদের সহযোগিতা করলে ভবিষ্যতে  এই পরিস্থিতির মুখোমুখি আর হতে হবে না।

এরপর  ধৈর্য রেখেই উনাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেছি। উনারাও উনাদের কথা রেখেছেন।  দেড় যুগের অসংখ্যবার যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে সেকেন্ডারি ইন্টেরোগেশনের কবলে আর পড়তে হয়নি। আমার মুসলিম নাম কিংবা কোন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীর  নামের সাথে মিলের কোন কারণে কিংবা প্রথম ইমিগ্রেশন বুথের কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে দ্বিধার কারণে সেকেন্ডারি ইন্টেরোগেশনের মাধ্যমে সন্দেহের অবসান হয়েছে হয়তো।

জাপানে মসজিদ কয়টি প্রশ্নটি  ইমিগ্রেশন কনট্যাক্সটে ছিল ভীষণ সাম্প্রদায়িক। আমার মুসলিম পরিচয়ের কারণেই এই প্রশ্নটির অবতারণা। মার্কিন সংবিধান এমনকি সার্ভিস আইনে এই  ধর্ম, বর্ণ  আর জাত-পাতের প্রতি ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণ শাস্তিযোগ্য। কিন্তু এই অন্যায়টি যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন সার্ভিসে বহুল প্রচলিত একটি প্রথায় পরিণত হয়ে গেছে। ধর্মের বাইরে এশিয়ানদের সার্বিকভাবে এই ধরণের পরিস্থিতি সচরাচর মোকাবিলা করতে হয়। জাতিসংগে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সহ বহু হর্তাকর্তাকে এই বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে।        

জালের ম্যানেজার ভদ্রমহিলা আমাকে আমার সহকর্মীদের সাথে মিলিয়ে দিয়ে উনার দায়িত্ব পালন করলেন। অনেকটা দৌড়ের উপর থেকে লাস ভেগাসের ফ্লাইটটি ধরতে হয়েছিল।


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান