ভয়ার্ত ২১ আগস্ট: ইতিহাসের কলঙ্কময় অধ্যায়!

Tue, Aug 24, 2021 12:22 AM

ভয়ার্ত ২১ আগস্ট: ইতিহাসের কলঙ্কময় অধ্যায়!

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ : ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। ঐ দিনে বাংলাদেশের ইতিহাসে যুক্ত হয় আরও এক কলঙ্কময় অধ্যায়। সেই দিনের ঘটনায় অকালে ঝরে যায় ২৪টি তাজা প্রাণ। ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১৬ জন নেতাকর্মী। পরে আরও মারা যান ৮ জন। দীর্ঘ ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর প্রহর গোনে ২৪ আগস্ট মারা যান আওয়ামী মহিলা লীগের সভানেত্রী আইভি রহমান। এই তালিকায় আরো অছেন মোস্তাক আহম্মদ সেন্টু, শেখ হাসিনার দেহরক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রহমান, সবার প্রিয়মুখ আদাচাচা হিসাবে পরিচিত রফিকুল ইসলাম, আবুল কালাম আজাদ, হাসিনা মমতাজ রীনা, সুফিয়া বেগম, রিজিয়া বেগম, আমিনুল ইসলাম, রতন শিকদার, আবদুল কুদ্দুছ পাটোয়ারী, মোহাম্মদ হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, লিটন মুন্সী, বিল্লাল হোসেন, আব্বাসউদ্দিন শিকদার, মোতালেব, আতিক সরকার, মামুন মৃধা, আবুল কাসেম, আবদুর রহিম, জাহেদ আলী ও নাসিরউদ্দিন সর্দার।

 

সেই ভয়াবহ ঘটনার ১৭ বছর পর মূল প্রশ্ন হচ্ছে, ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার বিচার কার্যক্রম কী শেষ হয়েছে? আসামীদের কী যথার্থ শাস্তি হয়েছে? পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ঘটে যাওয়া দ্বিতীয় বর্বরতম হত্যাকাণ্ডের বিচারের ফলাফলে কেন দীর্ঘসূত্রতা? সেদিনের হামলায় নিহতদের পরিবারের সদস্যরা অধীর আগ্রহ নিয়ে ন্যায় বিচারের  আশায় অপেক্ষায় দিন গুনছেন। লাশ, রক্তস্রোতের ভয়ঙ্কর স্মৃতি আর শরীরের ভেতরে স্থায়ী আবাস গড়া স্পিস্নন্টারের যন্ত্রণা আজও তাদের তাড়া করে ফিরছে। তাদের স্বপ্নভরা চোখে এখনো বিষাদের কালো ছায়া। আবার অনেকে জঘন্য এই ঘটনার বিচার না দেখেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।

 

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস বিরোধী শান্তি সমাবেশে নারকীয় এই গ্রেনেড হামলায় মানবঢাল তৈরি করে নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনাকে রক্ষা করেছিলেন। দিনটি ছিলো শনিবার। বিকালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে সন্ত্রাস ও বোমা হামলার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সমাবেশ। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সমাবেশে হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল। সমাবেশ শেষে সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল হওয়ার কথা। তাই মঞ্চ নির্মাণ না করে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে একটি ট্রাককে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সমাবেশে অন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্যের পর শেখ হাসিনা বক্তব্য দিতে শুরু করেন। সময় তখন বিকাল ৫টা ২২ মিনিট। 'জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু' বলে বক্তৃতা শেষ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তার হাতে থাকা একটি কাগজ ভাঁজ করতে করতে এগুচ্ছিলেন ট্রাক থেকে নামার সিঁড়ির কাছে। মুহূর্তেই শুরু হলো নারকীয় গ্রেনেড হামলা। বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে থাকে একের পর এক গ্রেনেড। মুহূর্তেই মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় জীবন্ত বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। শেখ হাসিনাকে টার্গেট করে একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায় ঘাতকরা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ১৩টি গ্রেনেড বিস্ফোরণের বীভৎসতায় মুহূর্তেই রক্ত-মাংসের স্তূপে পরিণত হয় সমাবেশস্থল। রক্তগঙ্গা বয়ে যায় এলাকাজুড়ে।

 

ঘাতকদের প্রধান লক্ষ্য ছিলো শেখ হাসিনা। বিষয়টি বুঝতে পেরে ট্রাকে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতারা ও শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিক মানবঢাল রচনা করে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন বঙ্গবন্ধু কন্যাকে। নেতা ও দেহরক্ষীদের আত্মত্যাগে অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান শেখ হাসিনা। গ্রেনেডের আঘাতে প্রাণ কেড়ে নিতে না পেরে ওদিন শেখ হাসিনার গাড়িতে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়েছিল ঘাতকরা। পরিকল্পিত ও টার্গেট করা ঘাতকদের নিক্ষিপ্ত গুলি ভেদ করতে পারেনি শেখ হাসিনাকে বহনকারী বুলেটপ্রুফ গাড়ির কাঁচ। শেখ হাসিনাকে আড়াল করে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে জীবন বিলিয়ে দেন তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রহমান। নারকীয় এই হামলায় প্রাণে বেঁচে গেলেও গ্রেনেডের প্রচণ্ড শব্দের কারণে বাম কান মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত পলাতক আসামি ইকবাল হোসেনকে চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব৷ মুফতি হান্নানের নির্দেশে ২০০৪ সালে গ্রেনেড হামলায় সরাসরি অংশগ্রহণের কথা স্বীকার করেছে ইকবাল৷ র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীর মহাপরিচালক বলেন, ভোর ৩টার দিকে ইকবাল হোসেন ওরফে জাহাঙ্গীর ওরফে সেলিমকে দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)-এর দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ আভিযানিক দল ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলার ১৬ বছর এবং আদালতের রায়ের তিন বছর পর ইকবালকে গ্রেপ্তার করে৷ ২০০৪ সালে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘ইকবাল ২০০৮ সালে দেশ ত্যাগ করে৷ প্রবাসে আত্মগোপনে থাকাবস্থায় প্রথমে সেলিম এবং পরবর্তীতে জাহাঙ্গীর নাম ধারণ করে৷ ইকবাল প্রবাসে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত হলে তাকে ২০২০ সালের শেষের দিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়৷” উল্লেখ্য ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দেয়৷ এছাড়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান, ইকবালসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন এবং আরো ১১ জনকে  বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়৷

 

ইকবাল ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় ছিলেন৷ র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, ‘‘দেশে ফিরে এসে জঙ্গি ইকবাল আইএসডি ফোন ও অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে এবং সর্বহারা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে৷ ২০০১ সালে সে হরকাতুল জিহাদে যোগদান করে৷” ২০০৪ সালে হামলার আগেই ইকবাল ঢাকায় অবস্থান নিয়েছিলেন জানিয়ে র‌্যাব প্রধান বলেন, ‘‘আগস্ট মাসে মুফতি হান্নানের নির্দেশে সে ঢাকায় এসে গোপন আস্তানায় থাকে এবং সেসময় মুফতি হান্নানসহ অন্যান্যদের সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয় ইকবালের৷’’ ইকবাল বলেছে, ‘‘মুফতি হান্নানের নির্দেশে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিল সে৷ মুফতি হান্নান তাকে গ্রেনেড সরবরাহ করেছিল৷ ইকবাল মঞ্চ লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়েছিল৷”

 

অপরদিকে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় হত্যাযজ্ঞের মামলায় দণ্ডিত পুলিশের সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক উপকমিশনার ওবায়দুর রহমান খানকে সর্বোচ্চ আদালত জামিন দেননি। জামিন চেয়ে সাঈদ হাসান ও ওবায়দুর রহমানের করা আবেদন ২০২০ সালের ৬ ডিসেম্বর খারিজ করে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ। সাঈদ হাসান ও ওবায়দুর রহমানকে বিচারিক আদালত দুটি ধারায় চার বছর কারাদণ্ড দেন। এই দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেছিলেন এ দুজন। একই সঙ্গে তাঁরা জামিন চেয়েও আবেদন করেন, যা হাইকোর্টে খারিজ হয়। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে সাঈদ হাসান ও ওবায়দুর রহমান জামিন চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করেন। আপিল বিভাগে আসামিপক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আরশাদুর রউফ। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী জামিলুর রহমান। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন।

 

জানা যায়, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৪ জন জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি-বি) সদস্য। এ ছাড়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন এবং অপর ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেয়া হয়। নথিপত্রে দেখা যায়,  মামলাটিতে জামিনে ও কারাগারে থাকা ৩১ আসামির আত্মপক্ষ শুনানি হয়। শুনানিতে উপস্থিত আসামিরা সবাই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। বিএনপির জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জন পলাতক আসামি আত্মপক্ষ শুনানির সুযোগ পাননি। হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের মামলা দুটিতে রাষ্ট্রপক্ষে ৪৯১ সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়েছে ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। ঘটনার পর, মতিঝিল থানার তৎকালীন এসআই ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে এই মামলাটির তদন্ত ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠে, যা পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে। থানা পুলিশ, ডিবির হাত ঘুরে সিআইডি এই মামলার তদন্তভার পায়। ঘটনার ৪ বছর পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ২০০৮ সালের ১১ জুন মোট ২২ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন সিআইডির জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটির অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করে। সিআইডির বিশেষ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ অধিকতর তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ৩ জুলাই আসামির তালিকায় আরও ৩০ জনকে যোগ করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেন। ২০১২ সালের ১৮ মার্চ তারিখে সম্পূরক অভিযোগপত্রের ৩০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়। খালেদা জিয়ার ছেলে লন্ডনে থাকা তারেককে পলাতক দেখিয়ে তখন অভিযোগ গঠন হয়েছিলো। খালেদা জিয়ার ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম ডিউকও এই মামলার আসামি।

 

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মো. আশরাফুল হুদা, শহিদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরীর সঙ্গে আসামির তালিকায় রয়েছেন জোট সরকার আমলের ৩ তদন্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিন, মুন্সি আতিকুর রহমান ও আব্দুর রশীদ। সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, সাবেক সংসদ সদস্য শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, ঢাকার সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলামও এই মামলার আসামি। আসামিদের মধ্যে জঙ্গি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানের এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মো. মুজাহিদের অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। বাবর, পিন্টুসহ ২৩ আসামি রয়েছেন কারাগারে; জামিনে আছেন সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফ ও সাবেক ৩ আইজিপিসহ ৮ জন। তারেক, কায়কোবাদসহ পলাতক আসামি ১৯ জন।

 

২০১৬ সালের ১৮ আগস্ট জাতীয় সংসদে আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর সাংসদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক কমিটিকে জানিয়েছেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার ২২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেয়া শেষ হয়েছে। আর দু’জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেয়া বাকি। এরপর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন হবে। আওয়ামী লীগ নেতা ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ একইদিন অপর এক আলোচনা সভায় বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর রক্তের মধ্যে কেউ যেন ক্ষমতায় যেতে না পারে, সেই জন্য ২১ আগস্ট শেখ হাসিনাকে হাওয়া ভবন থেকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়। সেই বিচার কাজ খুব দ্রুত সমাপ্ত করা হবে।

 

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এ মামলার মোট সাক্ষী ৪৯১ জন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই মামলার  অন্যতম একজন সাক্ষী। এ মামলার অপর গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। ১২ বছরে ২২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার পর শুরু হয় তদন্ত। কিন্তু তৎকালীন জোট সরকার শুরু থেকেই মনগড়া তদন্ত শুরু করে। তদন্তে সহায়তার জন্য আসা ব্রিটিশ গোয়েন্দা পুলিশ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড এবং আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা (ইন্টারপোল) টিম ঢাকায় আসে। সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের চিহ্নিত করতে দিক নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশের তদন্ত সংস্থা সিআইডিকে। কিন্তু সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে ঘটনার মূল হোতাদের আড়াল করে ঘটনার দায় চাপিয়ে দেয়া হয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর। গ্রেফতার করা হয় আওয়ামী লীগ নেতা সাবের হোসেন চৌধুরী ও ওয়ার্ড কমিশনার মোখলেছসহ অনেকেকে। হোটেল কর্মচারী জর্জ মিয়াকে দিয়ে রচনা করা হয় নাটক। কিন্তু সে নাটক বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে মামলা তদন্তে নতুন মোড় নেয়। পরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়। উন্মোচিত হতে থাকে ঘটনার আসল রহস্য। গ্রেফতার করা হয় জোট সরকারের সাবেক মন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ অনেককে। হুজি নেতা মুফতি হান্নানের গ্রেফতারের পরে ২১ আগস্ট ঘটনার সব রহস্য উন্মোচিত হয়।

২১ আগস্টের ঘটনার প্রেক্ষিতে আমাদের মনে রাখা দরকার যে, ঐ সব অপশক্তি এখনও সক্রিয় দেশে ও বিদেশে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চিন্তা-চেতনার বিরুদ্ধে, আমাদের উদারপন্থি মানবিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে তারা ষড়যন্ত্র করেই চলেছে। ২১ আগষ্টের শহীদদের আত্মত্যাগ থেকে দিক- নির্দেশনা নিয়ে একদিকে সব অপশক্তিকে আমাদের নির্মূল করতে হবে। একই সাথে  যুথবদ্ধভাবে আমাদের প্রয়াসী হতে হবে।  আমাদের অগ্রযাত্রা সুনিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা আশা করতে চাই, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের মতো বিভৎস এবং কলঙ্কময় অধ্যায় বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনও যেন যুক্ত না হয়।।

 

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ: সিনিয়র সাংবাদিক।।


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান