এ কোন আলোর পথে বাংলাদেশ?

Sun, Apr 4, 2021 12:44 PM

এ কোন আলোর পথে বাংলাদেশ?

সঙ্গীতা ইয়াসমিন :এই মূহুর্তে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ হল, হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম সচিব মাওলানা মামুনুল হক এক নারীসহ সোনারগাঁওয়ের এক রিসোর্টে জনসাধারণের হাতে ধরা পড়েছেন।যে ঘটনার ভিডিওটি একদিন আগেই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। দেশের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমে এ বিষয়ে সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে।মামুনুলের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যের ফলে বিষয়টি এখন সকলের মুখরোচক আলোচনায় সরস হয়ে উঠেছে। যদিও ব্যক্তিগতভাবে মামুনুলের এই নারীঘটিত কেলেঙ্কারী নিয়ে আমার আদতেই কোনো আগ্রহ নেই, তথাপিও এ বিষয়ে দুটো কথা বলার ইচ্ছে পোষণ করছি সঙ্গত কারণেই।

ইতোমধ্যে, হেফাজতের দলীয় নেতা কর্মীরা তাঁদের কেন্দ্রীয় এই নেতাকে পুলিশের হাত থেকে বীরদর্পে ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন নিরাপদ আশ্রয়ে, সুতরাং এই মহান নেতার সামাজিক এবং রাজনৈতিক অবস্থায় আপাতত কোনো ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। সেদিক দিয়ে মামুনুল ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক শিষ্য তৈরিতে একজন সফল নেতা এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

এবার প্রসঙ্গে আসি, শুরুতেই বলেছি এই মাওলানার নারীঘটিত বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই, বরং আমি মনে করি, দুজন বয়স্ক নারী-পুরুষ স্বেচ্ছায় কে কার সাথে কী ধরনের সম্পর্ক স্থাপন করবেন সেটি একান্তই ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয়।সে বিষয়টি কখনওই সমাজ, রাষ্ট্র, কিংবা আইন নির্দিষ্ট করে দিতে পারে না। কোনো সভ্য সমাজে এ বিষয়ে কোনো বিধি নিষেধ থাকা উচিত নয়। মামুনুল যে নারীকে নিয়ে রিসোর্টে গিয়েছিলেন যতক্ষন পর্যন্ত সেই নারী তাঁর বিরুদ্ধে হয়রাণীর কোনো অভিযোগ না উত্থাপন করছেন, কিংবা মামুনুলের প্রথম স্ত্রী এই বিষয়ের আইনের সাহায্য প্রার্থনা না করছেন ততক্ষণ এই বিষয়টি কোনোভাবেই আইনী বিষয় নয়, এবং সেই হিসেবে এটি অপরাধও নয়। উপরন্তু, এই বিষয়ে, রিসোর্টের মধ্যে যারা মামুনুলকে হাতেনাতে ধরে অপমান অপদস্ত করেছেন তাঁদের দায়-দায়িত্ব এবং নৈতিকতা সম্বন্ধে প্রশ্ন করা যেতেই পারে। আপাত দৃষ্টিতে তাঁরা এটি মোরাল পুলিশিং হিসেবে দেখলেও এটি আদতে সে পর্যায়ে পড়েই না। বরং এটি নোংরামীর এক চরম উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যা আমাদের সমাজের জন্য বহুল চর্চিত একটি বিষয়। ঘটনার সময়ে যদিও মামুনুলকে তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিষয়টির যথার্থতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিল, তবুও কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে এই গোয়েন্দাগিরীর অধিকার আদতেই তাঁদের আছে কি না সেটা খতিয়ে দেখা দরকার।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে মামুনুলের তবে কোনো অপরাধ নেই? সে কি নির্দোষ? এ প্রশ্নের জবাবে আমার অবস্থান আগেই পরিস্কার করেছি। তবে, মামুনুলের নিজের বক্তব্যেই যখন সন্দেহের বীজ লুকিয়ে আছে, তখন আমারও প্রশ্ন আপনাদের কাছে, ইসলাম কি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে হালাল করেছে? মামুনুল যে ধর্মীয় ব্যনারে রাজনীতির ব্যবসাটি করে যাচ্ছেন সেই ধর্ম কী এই ব্যভিচারিতাকে সমর্থন করে? যদি না করে তবে, আপনারা যারা মামুনুলদের ধর্মীয় গুরু মানেন, তাঁদের প্রতি অন্ধবিশ্বাসে মাথা নীচু করেন তাঁরা দয়া করে প্রশ্ন তুলুন। ধর্মের নামে এই ভণ্ডামীকে জোরেশোরে ‘না’ বলুন। হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সচিবের পদে থেকেও মামুনুল বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না বলেই বিশ্বাস করি। তবে, মামুনুল কিন্তু দলের কাছে নির্দোষ, এবং দল তাঁর প্রতি পূর্ণ আস্থাবান সে বিষয়টিও প্রমাণিত।

ক্ষতির দিক বিবেচনা করলে যা হবার তা আমাদের হয়েছে, এবং আখেরে এই ক্ষতির মাত্রা আরও কতদূর গড়াবে তার আলামত আমাদের সম্মুখে উপস্থতিত সে কথা জোর দিয়েই বলতে পারি। মামুনুল হকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ হল, এই দেশে শরীয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা করা। যা দেশকে, আমাদের সমাজকে হাজার বছর পেছনে নিয়ে যায়, ইতোমধ্যে নিয়ে গেছে। যে শরীয়াহ আইনে নারীকে ভোগ্য পণ্য হিসেবেই দেখা হয়ে থাকে, নারীকে সেবাদাসী হিসেবে কেবল ফূর্তি করার মেশিন হিসেবেই অন্তপুরে রাখার কথা বলে। যাদের হাতে ফুলের মত ছোট্ট ছোট্ট শিশুরাও হয় ধর্ষণ ও বলাৎকারের শিকার। যারা শিক্ষকতার নামে, ধর্মীয় জ্ঞান বিতরণের নামে রাজনৈতিক ফায়দা হাছিল করছে, যারা বাংলার ধর্মান্ধ সরলপ্রাণ জনগণের আবেগ নিয়ে খেলছে। যারা দেশে মধ্যযুগীয় বর্বরতার সন্ত্রাসী রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ইসলামের নামে ধর্মীয় সম্প্রীতীর বদলে ছড়াচ্ছে ধর্মীয় হিংসা এবং সাম্প্রদায়িক ঘৃণা। প্রতিনিয়ত হিংসার বীজ বুনে এমন একটি ধ্বংসাত্মক সমাজের দিকে নিয়ে গেছে বাংলাদেশকে যেখানে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নয়, যুদ্ধাবহ, ভীতিকর, এবং অস্থিতিশীল অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। যেখানে আলো নেই কোনো, আছে শুধু গহীন অন্ধকার। কিন্তু ধর্ম তো কূপমন্ডুকতা দূর করে আলো জ্বালানোর কথা বলে অন্তরে! তবে, এ কোন ধর্মের জয়গান গাইছে তাঁরা?

মামুনুলদের বিচার হওয়া উচিত, এবং তা রাষ্ট্রীয় আইনী ব্যবস্থায়ই। যারা ধর্মের বিষ ঢেলে সমাজকে কলুষিত করে, খুন, ধর্ষণ, বর্বরতায় যাদের পাপ নেই কোনো, তাঁরা সমাজের শত্রু, মানবতার শত্রু এবং ধর্মেরও শত্রু। সুতরাং এই জঘন্য ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তির জোর দাবী জানাই।

উল্লেখ্য, মাত্র এক সপ্তাহ আগেই মামুনুলের নির্দেশে ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গীত বিদ্যায়তন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া হয়েছে। এই ইসলামের নামেই এদেশে ভাস্কর্য ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, ভাঙা হয়েছে শহীদ মিনার, ভাঙা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যও। এই ধর্মের নামে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার হয় এদেশে। অগ্নিসংযোগ, নির্যাতন, অবৈধ দখল কিংবা হামলা হচ্ছে যখন তখন। আর সেসব হয় কখনও প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে কিংবা বিচারহীনতার আস্কারায়। এদেশে ধর্মের দোহাই দিয়ে শরীয়ত বয়াতীরা হয় গ্রেফতার। ঘরবাড়ি ভাঙে রণপ্রসাদ বাউলের। ধর্মের লেবাসে সকল অন্যায়- অনাচার আমরা মুখ বুজে সইছি কেন? কাকে ভয় আমাদের? তবে কি ক্ষমতার মোহে আমরা অন্ধ? মসনদের লোভ? মামুনুলরা কোন ধর্মের জু জু দেখায় আমাদের? আর কতকাল আমরা সেই জু জুর ভয়ে ভীত হব? নুব্জ্য হব?কেনো আমরা কালোকে কালো আর সাদাকে সাদা বলব না?

যারা মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে গলা টিপে হত্যা করে, শিল্প সংস্কৃতির চর্চাকে যারা পাপ মনে করে যারা নারীকে ভোগ্যপণ্য বানিয়ে গৃহাভ্যন্তরে ঢুকিয়ে রাখার কথা বলে, তারাই আবার নারীকে বে আব্রু করে, বলাৎকার করে, তখন তারা কোন ইসলামের চর্চা করে? এ প্রশ্ন রেখে গেলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বরাবরেই।

দুঃখের সাথেই বলতে হয়, সরকার যাকে রাজনৈতিক কৌশল বলছেন, আমরা তাঁকে দুর্বলতা বলতে দ্বিধা করি না। হেফাজতের সাথে রাজনৈতিক সখ্য সাপের সাথে বন্ধুত্ব কি না সে কথা ভাববার সময় পেরিয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য কারা ভাঙেন, সেটা প্রশাসন বের না করতে পারলেও জনগণ ঠিকই জানেন। যখন বঙ্গবন্ধু কন্যা ক্ষমতায়, তখন এদেশে কার বুকের পাটা এতো বড় যারা পিতার ভাস্কর্য ভাঙেন! কাদের ভয়ে প্রধানমন্ত্রীকে হাইকোর্টের সম্মুখ থেকে ভাস্কর্য সরাতে হয়েছিল? এই দেশে শরীয়াহ আইন প্রতিষ্ঠিত হলে প্রধানমন্ত্রীকেও ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার এই নতজানুতা কি ধীরে ধীরে সেই পথেরই ইংগিত দিচ্ছে না?

পরিশেষে এ কথা বলে শেষ করতে চাই, এখনও রাশ টেনে না ধরলে নিজেরই কাটা খালে নিজেকেই পড়তে হবে, দিনশেষে আওয়ামীলীগকেই সেই মূল্য দিতে হবে। আর একথা তো সত্য, আওয়ামীলীগ হেরে গেলে হেরে যায় বাংলাদেশ। আমরা এখনও স্বপ্ন দেখি একটি অসাম্প্রদায়িক, আধুনিক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের, যা আপনার নেতৃত্বেই পেতে পারে প্রিয় স্বদেশ।

সঙ্গীতা ইয়াসমিন,লেখক, টরন্টো, কানাডা

 

 


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান