জাতীয় পতাকা দিবস জাতীয় দিবস কেন নয়?

Sun, Feb 28, 2021 8:12 PM

জাতীয় পতাকা দিবস জাতীয় দিবস কেন নয়?

শফিকুল ইসলাম খোকন :যদি কাউকে প্রশ্ন করা হয়- বাংলাদেশকে ভালোবাসো? উত্তরে আসবে ‘হ্যাঁ’ যদি কাউকে প্রশ্ন করা হয়- জাতীয় পতাকাকে ভালোবাসো? উত্তরে আসবে ‘হ্যাঁ’। ঠিক তেমনি যদি কাউকে প্রশ্ন করা হয়- জাতীয় পতাকার আকার, ব্যবহারের নিয়ম জানো? উত্তরে...। একজন স্বাধীনচেতা মানুষ, স্বাধীন বাংলাদেশের দাবিদার নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব রয়েছে স্বাধীনতার ইতিহাস-ঐতিহ্য জানা, সংরক্ষণ করা তেমনি রয়েছে জাতীয় পতাকাকে সম্মান এবং ব্যবহারের নিয়ম জানা। দুঃখের বিষয় হচ্ছে দেশে কতো দিবস সরকারি-বেসরকারিভাবে পালিত হয়ে। কিন্তু আজ পর্যন্ত জাতীয় পতাকা দিবস শুধু কাজ কলমেই আছে এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে এ দিবসটি পালন করতে দেখা  যায়না।

 

৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার যে স্বাধীনতা সূর্য অস্ত গিয়েছিল, তা একাত্তরের মার্চে পুনরায় উদিত হয়। বাঙালি পরাধীনতার শৃঙ্খল চূর্ণবিচূর্ণ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য স্বাধীনতার লড়াইয়ে শরিক হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সেদিন সমগ্র জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। এ ধরনের ঐক্য আমাদের জাতির সুদীর্ঘ ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। বিশ্বের ইতিহাসে এক অনন্য। আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আমাদের স্বাধীনতা এনে দেয় নতুন চেতনা এবং মূল্যবোধ। যে জাতি মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে নিজের মাতৃভূমিকে স্বাধীন করে, সে জাতি কোনো দিন পিছিয়ে থাকতে পারে না। নতুন প্রজন্মের জন্য অপেক্ষা করছে নতুন দিন, এক সুখী-সমৃদ্ধ-উন্নত বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে ‘আর আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলা’র আহ্বান  জানিয়েছেন। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ সুতরাং জাতির অসহযোগ আন্দোলনকে সশস্ত্র আন্দোলনের দিকে নিয়ে যায়। জাতির এই লৌহকঠিন ঐক্যবদ্ধ প্রস্তুতির কারণেই তখনকার সেনাবাহিনী থেকে বিদ্রোহ করেন বাঙালি বীর সন্তানরা, এমনকি সুদূর পাকিস্তান থেকেও মৃত্যুকে উপেক্ষা করে সেনাবাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। জনগণের অন্তরাত্মার প্রস্তুতি অনুভব করেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বিদ্রোহ করার নৈতিক শক্তি তাঁরা পেয়েছেন বাঙ্গালী জাতি। বঙ্গবন্ধুর ভাষনেই জীবন বাজি  রেখে ঝাপিয়ে পড়ে মুক্তিকামী মানুষ পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে। শুরু হয় স¦াধীনতা, ৯ মাস যুদ্ধ শেষে লাল-সবুজের স্বাধীন রাষ্ট্র পায় বাংলাদেশ।

 

আমি একজন নতুন প্রজন্মের নাগরিক। আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, মুক্তিযুদ্ধ করিওনি। তবে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে আমাকে কাঁদায়। সব সময় আমাকে ভাবিয়ে তোলে। যে জাতি জীবনের বিনিময় দেশ স্বাধীন করেছে, সে জাতি কখনোই হেরে যাওয়ার নয়; হারতে শেখেনি, হারতে পারেও না। ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আমি শুনেছি। যতবারই শুনি ততবারই দেহের ভিতরে মন নামক প্রাণটি ভাবিয়ে তোলে, বিবেক তাড়িত করে। প্রশ্ন করে- ‘‘তুমি মুক্তিযুদ্ধ দেখনি, মুক্তিযুদ্ধ করোনি, কিন্তু যা দিয়ে গেছি, তা  কি তুমি সংক্ষণ করছো? সম্মান দিচ্ছ? না কি সব পেয়ে ভুলে গেছ’’। বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আর বাঙালি জাতির জীবনে সোনালি দিন হচ্ছে ১৯৭১ সালের মার্চের অগ্নিঝরা দিনগুলো। নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম আর আন্দোলনের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে একাত্তরের গৌরবময় দিনগুলো আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু আমরা কি সেই স্বাধীনতা নামক শব্দটি ভুলে যেতে বসেছি? আমরা সেই লাল-সবুজের পতাকাকে সংরক্ষণ করছি, ইতিহাস-ঐতিহ্য কি বুকে আগলে রাখছি। আমি একজন নতু প্রজন্মের নাগরিক হিসেবে মনে করি- ‘‘না পারিনি, পারছিও না। প্রশ্ব হচ্ছে দায়িত্ব কার? কে সংরক্ষণ করবে। নতুন প্রজন্মকে জানান দেয়ার দায়িত্ব বা কাদের? আর সেই দায়িত্ববোধ থেকে কতটুকুই দায়িত্ব পালন করছি, নতুন প্রজন্মের মাঝে কতটুকু স্বাধীনতা- বিজয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে তুলে ধরছি?’’

 

একটি জাতীয় পতাকা একটি জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয়, স্বাধীন- সার্বভৌম রাষ্ট্রের একটি স্বীকৃতি। জাতীয় পতাকা হলো জাতির আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা এবং শহীদদের সম্মানের প্রতীক। জাতীয় পতাকা বিশ্বের কাছে মাথা উচু করে, বিশ্বের কাছে দেশকে পরিচিত করে। আমরা কি দেখছি, সেই জাতীয় পতাকাকে আমরা মুল্যায়নের চেয়ে অবমুল্যায়নই বেশি করছি। তার কারণ হতে পারে দু রকমের একটি হলো পাতাকার নিয়ম-কানুন না জেনে বা যেনেও না জানার ভান করে এরিয়ে যাওয়া। আমরা দেখছি, কখনো কখনো আবেগের বসে জাতীয় পতাকা ঠেলাগাড়ি রডের সাথে বেঁেধ রাখা, ছোট খাটো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নিয়ম না মেনে পাতাকা টানো, পাতার সাথে নির্ধারিত বাঁশ বা অন্য  কিছু ব্যবহার না করে অবেহলার মতো কোন রকম ভাঙ্গা বাঁশ, লাঠি,ভাঙ্গা প্লাষ্টিকের পাইপ দিয়ে পতাকা টানো হচ্ছে। এ বিষয় কঠোর হস্তক্ষেপ না থাকা এবং আইন জানার কারণেই এ রকমটা হচ্ছে।

 

তবে আইনে সুনির্দিস্টভাবে বলা হয়েছে। জাতীয় পতাকা বিধিমালা-১৯৭২ (সংশোধিত ২০১০)-এ বলা আছে, জাতীয় পতাকা গাঢ় সবুজ রঙের হবে এবং ১০:৬ ফুট  দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের আয়তক্ষেত্রাকার সবুজ রঙের মাঝখানে একটি লাল বৃত্ত থাকবে। লাল বৃত্তটি পতাকার দৈর্ঘ্যের এক-পঞ্চমাংশ ব্যাসার্ধ বিশিষ্ট হবে। এবং লালবৃত্তটি ঠিক কোন অংশে থাকবে, সেটিও উলে­খ করা আছে। আইনে পতাকার রঙ, ছোট গাড়ি, মাঝারি বা বড় গাড়িতে এর আয়তন সবই লেখার পাশাপাশি পতাকা উত্তোলনের বিষয়েও বলা আছে। ইচ্ছে করলেই যেকেউ গাড়িতে পতাকা ব্যবহার করতে পারবেন না। বিধিমালার ‘৪ এর (১) নিম্নবর্ণিত দিবস এবং উপলক্ষে বাংলাদেশের সর্বত্র সরকারী ও বেসরকারী ভবনসমূহে এবং বিদেশে অবস্থিত কূটনৈতিক মিশনের অফিস ও কনস্যুলার পোস্টসমূহে নিম্নরূপ পদ্ধতিতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করিতে হইবে: (ক) মহানবীর জন্ম দিবস (ঈদ-এ-মিলাদুন্নবী); (খ)২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবস; (গ) ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস; (ঘ) সরকার কর্তৃক প্রজ্ঞাপিত অন্য যে কোন দিবস। ১ (২) নিম্নবর্ণিত দিবসসমূহে ‘পতাকা’ অর্ধনমিত থাকিবে: (ক) ২১শে ফেব্রুয়ারী শহীদ দিবস; (খ) ১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবস; এবং (গ) সরকার কর্তৃক প্রজ্ঞাপিত অন্য যে কোন দিবস।’ কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অনেকই জায়গায়ই অসচেতনার কারণে অনেক ব্যতিক্রম ঘটে। তবে এটি সত্য যে, জাতীয় পতাকা ব্যবহার রয়েছে সর্বোচ্চ প্রশংসনীয় পর্যায়, কিন্তু এ ক্ষেত্রে মনিটরিং, নিয়ম ও বিধি মানা হচ্ছে না মানতে দেখা যাচ্ছে না। 

 

আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে, জাতীয় পতাকার প্রতি অবমাননা প্রদর্শন করা বা জাতীয় পতাকার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন না করলে ওই ব্যক্তিকে ১ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। ২০১০ সালের জুলাই মাসে এই আইন সংশোধিত হয়। এই সংশোধনীতে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত শাস্তি এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ডের বিধান রাখা হয়। না জেনে, না বুঝে আর অতি উচ্ছ¡াসে যারা পতাকা ব্যবহারবিধি লঙ্ঘন করেন, তাদের অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে এই শাস্তির বিধান যথাযথ হতে পারে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি বাণিজ্যিক কোনো প্রচারণায়, বিজ্ঞাপনে জাতীয় পতাকার ব্যবহার বিধিবহির্ভূতভাবে করে থাকে, তার জন্য ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে, যাকে অনেকেই অপ্রতুল মনে করছেন।

 

আগেই বলেছি জাতীয় পতাকা একটি রাষ্ট্রের পরিচয়, জাতীয়তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রতীক। কিন্তু আমাদের দেশে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতীক ব্যবহারের বিধি সম্পর্কে জনগণ জানে না কিংবা জেনেও মানে না; অথচ এর ব্যবহারের জন্য রয়েছে সুস্পষ্ট বিধিমালা। আইনে এতো বিধি বিধান থাকলেও বাস্তবে এর রুপ দেখা যায়নি। দেখা যায়নি তেমন কোন শাস্তি দিতে। জাতীয় পতাকা নিয়ে এ রকমের একটি আইন আছে তা অনেকেই জানেনা। আমরা মনে করি- জাতীয় পতাকা ব্যবহারের নিয়মের বিষয় জনগণকে সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য সভা-সেমিনার করা উচিত। আইনটি সবার জানা দরকার এবং পতাকা আইন অনুযায়ী ব্যবহার হচ্ছে কিনা সেটি মনিটরিং দরকার। ইউনিয়ন-ওয়ার্ড ভিত্তিক নির্ধারিত একটি দিনে শুধুমাত্র পতাকা নিয়ম-আইনসহ নানা বিষয়ে সচেতন করার জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেয়া উচিত। স্কুল ভিত্তিক পাঠদানেও এর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এছাড়াও মাঠ পর্যায় যে সকল টেইলার্স ব্যবসায়ী রয়েছে যারা জাতীয় পতাকা তৈরী করার ক্ষেত্রে কাজ করছে তাদেরকেও সচেতন করা উচিত, সব ক্ষেত্রে জাতীয় পতাকার প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা।  এ ক্ষেত্রে সুধু সরকার বা প্রশাসন নয় জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। তা নাহলে একদিন স্বাধীন -সার্বভৌমের ইতিহাস ঐতিহ্যস ভুলে যেতে বাধ্য।

 

পরিশেষে বলতে চাই- জাতীয় পতাকা শুধু একটি কাপড় নয়, এটি দেশের স্বাধীনতার প্রতীক। তাই পতাকার অবস্থা ব্যবহারযোগ্য না হলে তা মর্যাদাপূর্ণভাবে সমাধিস্থ করতে হবে। জাতীয় পতাকা ব্যবহারের এসব বিধি ভঙ্গ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। স্সবাধীন-সার্বভৌমের অস্তিত্বকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার, তেমনি জাতীয় পতাকার সম্মান অক্ষুন্ন রাখার দায়িত্ব আমাদের সকলের। অনেক জীবন ও ত্যাগের বিনিময় জাতীয় পতাকা অর্জিত হলেও পতাকে যেমন অনেকাংশে মুল্যায়ন করা হচ্ছেনা তেমনি এতো দিবসের ভিরেও জাতীয় পতাকা নিয়ে একটি দিবস পালন করতেও দেখা যায়না। আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীন-সার্বভৌম রক্ষাসহ জাতীয় পতাকার মান অক্ষুন্ন রাখবো এটাই কামনা করছি।

লেখকঃ সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও স্থানীয় সরকার বিষয়ে গবেষক

 


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান