ভাষা আন্দোলনের তৃতীয় দাবি এখনও অপূর্ণ

Sun, Feb 21, 2021 10:27 PM

ভাষা আন্দোলনের তৃতীয় দাবি এখনও অপূর্ণ

ড. মীজানুর রহমান :১৯৪৮ থেকে শুরু করে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের মূলত তিনটি দাবি ছিল। এই তিনটি দাবিতে আন্দোলনকারীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন থেকে মিছিল বের হয়েছিল। সেই মিছিলেই দাবি তিনটি ছিল- এক. রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই; দুই. রাজবন্দিদের মুক্তি চাই; ৩. সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু চাই। ভাষা আন্দোলনের ব্যানার-প্ল্যাকার্ডে মূলত এই তিনটি স্লোগানই ছিল। ওই তিনটি দাবির মধ্যে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দ্বিতীয় দাবি, রাজবন্দিদের মুক্তির বিষয়টি তো আগেই ফয়সালা হয়েছে। তাদের আমরা ভাষাসৈনিক হিসেবে সম্মান করেছি। ভাষা আন্দোলনের তিনটি দাবির মধ্যে ওই দুটি দাবি সম্পূর্ণরূপে পূরণ হয়েছে। কিন্তু তৃতীয় দাবিটি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু বা ব্যবহার বাস্তবায়ন হয়নি।

 ভাষার মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র পাওয়ার পর বাংলা ভাষাকে যেভাবে সর্বস্তরে চালু করার কথা ছিল, তা ততটা হয়নি। ভাষা নিয়ে আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে অনেকের যে অভিপ্রায় ছিল, আমরা তার ততটা পূরণও করতে পারিনি। আমাদের প্রধান প্রধান ক্ষেত্র যেখানে বাংলা ভাষা চালু করার কথা ছিল, তা হয়নি। আইন-আদালত, বিশেষ করে উচ্চতর আদালতে বাংলা ভাষার প্রয়োগ হচ্ছে না। অবশ্য দুই-একজন আইনজীবী বাংলায় রায় দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মামলার রায়গুলো যাদের ওপর বর্তায় অর্থাৎ বাদী ও বিবাদী উভয়েই বাঙালি। কিন্তু তারপরই সেখানে বাংলা ভাষার প্রয়োগ নেই। এমন অনেক লোক আছেন, যারা বাংলাও ঠিকমতো বোঝে না, তাদের জন্য রায় লেখা হয় ইংরেজিতে। আদালতে বাংলা ভাষা প্রয়োগ না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের সবচেয়ে শঙ্কার বিষয়, দেশে উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষার ব্যবহার নেই। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম, তখনই অনেক বেশি বাংলা ভাষা ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু এখন বাংলা ভাষার ব্যবহার কমে আসছে। উচ্চশিক্ষায় ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ে বাংলার ব্যবহার একেবারেই নেই। সেখানে একটি পাঠ্যপুস্তকেও বাংলা অক্ষর নেই। এর মূল কারণ, পাঠ্যপুস্তকের বড় ধরনের সংকট। উচ্চশিক্ষায় বেশিরভাগই পাঠ্যপুস্তক ইংরেজিতে। সে জন্য এই সমস্যা আরও প্রকট। ব্যবসা-বাণিজ্যের যেসব পাঠ্যপুস্তক রয়েছে, সেগুলো একসময় অনেকে বাংলা করার চেষ্টা করেছিলেন। যেমন ব্যবস্থাপনা এবং হিসাববিজ্ঞানের কিছু বই বাংলায় বের হয়েছিল। 'বাজারজাতকরণ' বিষয়ে বাংলায় কোনো বই ছিল না। সত্যিকার অর্থে ১৫ বছর আগে 'বাজারজাতকরণ' বিষয়ে আমি বাংলায় একটি বই লিখি। কিন্তু এই ধারাটা পরবর্তী পর্যায়ে একেবারেই থেমে যায়। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, বেসরকারি ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরস্পর প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়া। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যখন ব্যবসা-বাণিজ্য শিক্ষা ইংরেজি মাধ্যমে শুরু করে, তখন এটাকে অনুসরণ করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে বাংলা আর ব্যবহার না হওয়ায় যারা বাংলায় ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ক বই লিখলেন, তারাও উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। এতে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য শিক্ষার ভাষা হয়ে যায় ইংরেজি। ব্যবসা যেহেতু এখন আন্তর্জাতিক বিষয়, কাজেই কেউ কেউ আবার ইংরেজির পক্ষে কথা বলেন। আমাদের ব্যবসার সঙ্গে আমদানি-রফতানি জড়িত; কাজেই ইংরেজি লাগবে। কিন্তু এর বিপরীত ভাষ্যও কিন্তু আছে। যারা ইংরেজিতে পড়াশোনা করে, তাদের মাত্র কয়েকজন আমদানি-রফতানির সঙ্গে জড়িত। বিদেশে এই আমদানি-রফতানির জন্য কেবল চিঠিপত্র লিখতে হয়। ইংরেজির সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের কোনো সম্পর্ক নেই। ইন্টারনেটে ইংরেজিতে যোগাযোগের জন্য এক ধরনের পদ্ধতি আছে, তা অনুসরণ করলেই হয়। সবার ইংরেজি জানার দরকার নেই; কিন্তু আমরা সবাই ইংরেজির ওপর জোর দিচ্ছি।

আমেরিকা, কানাডা, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া পৃথিবীতে এই চারটি দেশের বাইরে আর কোথাও ইংরেজি নেই। ইংল্যান্ডের নদীর ওই পাড়ে ফ্রান্স। কিন্তু সেখানে কেউ ইংরেজিতে কথা বলে না। জার্মানি, ইতালিতেও কেউ ইংরেজিতে কথা বলে না। ইউরোপে প্রায় সব দেশ একে অপরের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু সেখানেও তারা সবকিছুতেই নিজেদের ভাষা ব্যবহার করে। তবে তারা ভালো ভালো ইংরেজি বইগুলো নিজেদের মাতৃভাষায় অনুবাদ করে নিয়েছে। আর এই কাজ করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। বাংলা একাডেমিতে একসময় পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর জন্য আলাদা বিভাগ ছিল। সে সময় বাংলা একাডেমির লোকজন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মতো লেখকদের পেছনে ঘুরে ঘুরে পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করত। আজ থেকে ১৫ বছর আগে বাংলা একাডেমির তাগিদে কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ বই আমি যখন লিখি, তখন তাদের লোক প্রতিদিন আমার অফিসে পাণ্ডুলিপির জন্য বসে থাকত। তখন বাংলা একাডেমির কর্মকর্তাদের বই ছাপানোর জন্য টার্গেট নির্ধারণ করে দেওয়া হতো। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম অর্জন হলো এই বাংলা একাডেমি। কিন্তু তারা অন্যান্য বিষয়ে যেভাবে জোর দিয়েছে, সে তুলনায় একাডেমিক পাঠ্যপুস্তকের বিষয়ে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে পারত। এতে প্রত্যেক বছর আমরা একটি বিষয়ে একটি করে বই বের করতে পারতাম। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে ১০০ বা ১২০-এর মতো বিষয় পড়ানো হয়। এসব বিষয়ে বছরে একটি করে বই বের হলে গত কয়েক বছরে ১২০০ পাঠ্যপুস্তক বাজারে পাওয়া যেত। একজন একটি করে বই লিখতে সক্ষম এমন লোক বাংলাদেশে আছে। এই কাজটি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে রুটিন মোতাবেক করতে হবে। আমরা পদ্মা সেতু নিজেদের অর্থায়নে করতে পারি; কিন্তু পাঠ্যবই তৈরি করতে পারব না- এটা হয় না। বিদেশে নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের অনেক ভালো শিক্ষক আছেন। তাদের যদি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ মহল থেকে চিঠি দেওয়া, সম্মানসূচক প্রণোদনা এবং স্বীকৃতি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে তাদের কাছ থেকে পাঠ্যবই বের করে আনা কঠিন কোনো কাজ হবে না। বাংলা একাডেমি প্রত্যেক বছর বইমেলায় অনেক বই বের করে। কিন্তু এসব বইয়ের অনেকই আছে, যার কোনো আলো নেই। অনেকই অপাঠ্য। হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, 'এইগুলো পড়লে আলোকিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এগুলো আগুনে পুড়ালে হয়তো কিছু আগুন জ্বলবে।' এগুলো কাগজ ও কলমের অপচয়। আমাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি সম্প্রসারণ করতে হবে। এখন ইউনিয়ন পর্যন্ত স্বাস্থ্য এবং তথ্যসেবা পৌঁছে গেছে। এই স্বাস্থ্যসেবা ও ইন্টারনেট সুবিধা যারা পাচ্ছেন, তাদের ভাষা তো বাংলা। রোগীরা চিকিৎসকের কাছে আসেন, চিকিৎসক তাদের ব্যবস্থাপত্র লেখেন ইংরেজিতে। এগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কোনো সম্পর্ক নেই। চিকিৎসক নিজে বাঙালি, তার রোগী দরিদ্র বাঙালি। কাজেই সেখানে ইংরেজি ব্যবহারের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। প্রথমত, আমাদের কতগুলো বিষয় আইনগত বাধ্যবাধকতার ভেতর নিয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত. আমাদের মনমানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। মাঝেমধ্যে ইংরেজি বলতে এবং লিখতে পারা মানে বড় কিছু হয়ে যাওয়া- এই মনমানসিকতা থেকে বের হয়ে আসা খুবই জরুরি। আর একটি বিষয় হলো, বিশ্বায়নের যুগে আমাদের শিল্প-সাহিত্য চর্চা। এ বিষয় এখন সারাবিশ্বে আদান-প্রদান হচ্ছে। এক দেশের সাহিত্য অন্য দেশে অনূদিত হচ্ছে এবং প্রভাব পড়ছে।  বাংলা অনেক সমৃদ্ধ ভাষা। এর শব্দভাণ্ডার অফুরন্ত। রয়েছে বৈচিত্র্য ও মাধুর্য। শিক্ষিত সমাজ, শিক্ষকদের এবং গণমাধ্যমের জন্য একটি পরিমিত বাংলা ভাষা দরকার। শিক্ষকরা যদি নিজেই ভালো বাংলা না বলতে পারেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের শেখার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের গ্রামে ও শহরে মাধ্যমিক এবং প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা পড়ানোর মতো ভালো কোনো শিক্ষক নেই। এটি একটি বড় সংকট। একসময় স্কুলে পণ্ডিত মশাইরা ছিলেন, যারা বাংলা পড়াতেন। শব্দের উৎপত্তি, বাংলা ব্যাকরণে তাদের ভালো দখল ছিল। রাজনৈতিক নানা কারণে সেই পণ্ডিত মশাইরা এখন দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। এসব শিক্ষক অত্যন্ত অধ্যবসায়ী ছিলেন। আমরা তথ্যপ্রযুক্তির ওপর জোর দিয়েছি; কিন্তু ভাষার দিকে খেয়াল নেই। এতে আমরা না পারছি ভালো বাংলা বা ইংরেজি শিখতে এবং বলতে। আমরা এখন দাবি করছি, জাতিসংঘের ভাষা হবে বাংলা। সে জন্য যদি পরিভাষা তৈরি করতে না পারা যায়, তাহলে আমরা সমস্যায় পড়ব। এ জন্য আইন, বিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয়ে পরিভাষার সন্ধান করতে হবে। কারণ জাতিসংঘে নানা আইন প্রণয়ন করে থাকে। বাংলাকে জাতিসংঘের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আগে আমাদের উচিত হবে, বাংলাকে আরও সমৃদ্ধ করা।

ব্যাংকের ভাষা ইংরেজি করার কোনো দরকার নেই। কারণ সেখানে বাঙালি গ্রাহকরাই লেনদেন করে থাকেন। যারা এলসি খুলবে তাদের জন্য কেবল ইংরেজি থাকলেই চলবে। আর্থিক লেনদেনসহ যাবতীয় বিষয় বাংলা ভাষায় সম্পন্ন হলে প্রতারণা ও জালিয়াতি কমবে এবং সবাই সুবিধা ভোগ করবে। অনেক কাজের সঙ্গে ভাষা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ব্যাংক থেকে নানা কাগজ দেওয়া হয়; কিন্তু ইংরেজি হওয়ার কারণ অনেকে বুঝতেই পারেন না কোনটা আসলে কি? শেয়ারবাজারের যাবতীয় কার্যক্রম ইংরেজিতে। কিন্তু সেখানে তো তেমন কোনো বিদেশি লোকজন জড়িত নয়। আর যদি থাকেও, তাহলে তাদের নিজস্ব লোক থাকার দরকার। উচ্চশিক্ষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের জন্য বাংলা একাডেমির আলাদা একটি সেল গঠন করতে হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব-নিকাশ, বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরিসহ সব কার্যক্রম বাংলায় করতে হবে। ভাষা আন্দোলনের দাবি ছিল সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করা। কিন্তু আমরা তা করতে পারিনি। কাজেই এখন জাতীয় দায়িত্ব নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করতেই হবে। যে জাতি মাতৃভাষাকে গ্রহণ করে না, সে জাতি এগিয়ে গেছে- এ রকম কোনো নজির বিশ্বের ইতিহাসে নেই। চীন, কোরিয়া, জাপানসহ অন্যান্য জাতি নিজেদের মাতৃভাষাকে ব্যবহার করেই উন্নত হয়েছে। অন্যের কাছ থেকে ধার করা ভাষা ব্যবহার করে তারা উন্নত হয়নি।

লেখকঃঅধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।  


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান