বাংলায় দেখি স্বপ্ন আমি বাংলায় গাই গান

Thu, Feb 18, 2021 11:03 PM

বাংলায় দেখি স্বপ্ন আমি বাংলায় গাই গান

সঙ্গীতা ইয়াসমিন : পরবাসে বাংলা বলার সুযোগ কম একথা যেমন সত্য তেমনি বাংলাকে অন্তরে ধারন না করে, লালন না করে এর আভিজাত্য, এর নির্যাস নিতে না জানলে বাংলার প্রতি প্রেম-অনুরাগ জন্মাবে না কোনোকালেই। আমরা সুযোগের অভাবের দোহাই দিয়ে যতই এই ভাষাকে আড়ালে রাখব ততোই সে হয়ে যাবে পেছনের সারির। বাংলা রয়ে যাবে অবহেলিত মানুষদের ভাষা হয়ে। পৃথিবীর বুকে অসংখ্য ভাষার ভীড়ে হারিয়ে যাবে একদিন এই মধুময় ঐশ্বর্যময় ভাষাটি, যদি আমরা বাঙালিরাই প্রবাসে এর ব্যবহার সচেতন ভাবেই কমিয়ে দিই।  

এটি একান্তই আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ, আমরা ভাবি বিদেশে যখন এসেছি আমাদের সন্তানেরা শুদ্ধ ইংরেজী বলতে-লিখতে-পড়তে পারুক এইই তো আমাদের চাওয়া উচিত।তবেই না ভবিষ্যত উজ্জ্বল হবে। তাই আমাদের অনেক অভিবাসী বাবা-মা ঘরোয়াভাবেও, বাংলায় কথাবলায় উৎসাহ তো দেনই না, বরং বাংলা না বলাটাকেই স্ট্যাটাস মনে করেন। পরবাসে বাংলা চর্চার কথা বলতে এলেই আমার ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের ভাষা নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কবিতাটির কথা মনে পড়ে যায়।

“ছেলে আমার খুব ‘সিরিয়াস’ কথায়-কথায় হাসে না

জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।

উপরোক্ত কবিতার ভাবার্থ হল, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের নিজের ভাষার প্রতি উদাসীনতা, হীনমন্যতা, তথা নিজ ভাষা ব্যবহারের প্রতি মানসিক দরিদ্রতার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণমাত্র। মূলত কবি আমাদের মত হতভাগা বাঙালিদের মনের কথাটাই তুলে ধরেছেন এই কবিতায়, যা প্রকারান্তরে আমাদের ভাষার প্রতি, নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি অশ্রদ্ধার দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে।

 ‘নানান দেশের নানান ভাষা,

বিনে স্বদেশীয় ভাষা, পুরে কি আশা?

রামনিধি গুপ্তের মতো আমারও নিজের ভাষা ছাড়া তৃষ্ণা মেটে না। অফিসে কাজ করতে করতে আপন মনে কতদিন যে সহকর্মীকে বাংলায় কিছু বলে ফেলেছি, আর সে বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তারপর ফিক করে হেসে দিয়ে বলত, “ ইউ আর অ্যাট ইওর ওয়ার্ক প্লেস ডিয়ার।” বাংলায় অনেকক্ষণ কথা বলতে না পারলে আমার হাঁসফাঁস লাগে।

শুধু বিদেশেই নয়, দেশেও সেই কৈশোর থেকেই আমরা এক লাইনের একটি বাক্য সাধারণত বাংলায় বলি না, তার মধ্যে দু’চারটে ইংরেজী শব্দ ঢুকিয়ে দিই, এতে করে বাক্যটা ওজনদার হয়, সেই সাথে আমি নিজেও। নিজেকে খানিকটা  ব্রাহ্মণ-পুরোহিত ধরনের মনে হয়, একটু মর্যদা বেড়ে যায়। এই চর্চা আমাদের সমাজের বহু আগে থেকেই। বাংলাদেশের সমাজে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশুনা করা ছেলেমেয়ের সাথে বাংলা মিডিয়ামে পড়া ছেলেমেয়েদের সামাজিক মর্যদাগত, অবস্থানগত তফাত বিশাল। বরাবরই ভাষা ও সংস্কৃতির ব্যপারে আমাদের বিদেশ প্রীতিটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের। দুইশ বছর ইংরেজের পদলেহন করার ফলে আমাদের ইংরেজী প্রীতিটাও মিশে গেছে অস্থি মজ্জায়।

প্রশ্ন উঠতে পারে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশী মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, যে ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হয়েছে, যে ভাষায় আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য সবই হচ্ছে, প্রযুক্তিগত উতকর্ষতা অর্জন করেছে যে ভাষাভাষী মানুষেরা সেই ভাষা রেখে নিজের ভাষা নিয়ে এতো ঢাক-ঢোল পেটানোর কী আছে? আদতেই কিছু কি নেই?  আজ যদি প্রশ্ন করি পৃথিবীর এমন কোন জাতি আছে যারা নিজের ভাষায় কথা বলার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেনি? যারা রক্ত দিয়েই মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার অর্জন করে ইতিহাসে নিজেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রেখেছিল? দুঃখের বিষয় হল, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই ইতিহাস জানবে না। প্রয়োজন পড়বে না জানার।

উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে  ইউনেস্কোর সাধারণ পরিষদে আমাদের মহান শহীদ দিবস ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দিয়ে অনন্য মর্যদায় ভূষিত করে। এর পরে ২০০২ সাল থেকেই বিশ্বব্যাপী নানা দেশে এই দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে, এই গৌরবের ভাগিদার আমিও, এই আনন্দে আমারও আছে ভাগ। কিন্তু আমাদের সন্তানেরা এর ভাগে অংশীদার হতে জানবে না!

ইউনেস্কো আয়োজিত  ২০২১ এর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রতিপাদ্য , Fostering multilingualism for inclusion in education and society,” ইউনেস্কো বিশ্বাস করে টেকসই সমাজ উন্নয়নের জন্য সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বৈচিত্র্যতা রক্ষণাবেক্ষণ ও তার চর্চার পরিবেশ বজায় রাখা খুবই জরুরি। এতে করে মূলধারার সাথে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তাগুলোর সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত অন্তর্ভুক্তি সহজতর হয়, যা বিশ্বব্যাপী একটি শান্তিপ্রিয় সমৃদ্ধ সমাজ গঠনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।

উল্লেখ্য, সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী প্রথম বাঙালি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে জন্ম নিয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতেন, বাংলা ভাষার আছে অনন্য রূপ-মাধুর্য, অন্তরশক্তি। এর অন্তর্নিহিত ভাব উপলব্ধি করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘‘ইংরাজিতে যাহা শিখিয়াছ তাহা বাংলায় প্রকাশ কর, বাংলা সাহিত্য উন্নতি লাভ করুক” তিনি জ্ঞান বিজ্ঞানের সকল শাখায় বাংলা ব্যবহার করা সম্ভব বলেই দৃঢ়তা প্রকাশ করতেন। মাতৃভাষাকে তিনি সবার আগে স্থান দিতেন, তাঁর মতে, “আগে হতে হবে বাংলার শক্ত গাঁথুনি,তারপরে বিদেশী ভাষার গোড়াপত্তন।” তিনি ইংরেজী শিক্ষার বিরোধিতা করেননি কখনই। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, যাকে আমরা মহাকবি এবং অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক হিসেবে জানি, তিনিও বিদেশ প্রীতির জন্যে বাংলা ভাষাকে ত্যাগ করে একদিন দেশের মাটিতেই ফিরে এসেছিলেন, এবং বাংলা ভাষার ভাণ্ডারে তিনি বিবিধ রতন খুঁজে পেয়েছিলেন।

একজন বিশ্ব নাগরিক হতে গেলে সর্বপ্রথম আমাদেরকে জানতে হবে নিজের শেকড়। জানতে হবে আমাদের ইতিহাস-ইতিহাসের উজ্জ্বলতম গৌরবগাঁথা। যে সন্তান বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি জেনে বুঝে বড় হচ্ছে বিদেশের মাটিতে, সেও মনে প্রাণে বাঙালিই হবে। যে জাতি নিজের শেকড় চেনে না, সে তো অন্যের দেশে পরগাছা-পরজীবীর মতোই জীবন কাটাবে। কোথাও সে নিজের গাঁটছড়া বাঁধতে পারবে না। নিজেকে বিচ্ছিন্ন ভাববে সমগ্রকের মধ্যে থেকেও।

বাঙালি জাতির স্বাধীনতা প্রাপ্তির সূতিকাগার রচিত হয়েছিল মহান ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে! বায়ান্নয় জাতিস্বত্তার যে বীজ রোপন করা হয়েছিল সেই বীজ ফুল ফেঁপে অঙ্কুরোদগম করে ১৯৭১ এ পরিপুষ্ট গাছে পরিণত হল। আর আমরা ফিরে পেলাম স্বাধীন মুক্ত স্বদেশ ভূমি। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের এই যে ইতিহাস তা গৌরবের, ত্যাগেরআমাদের সন্তানদের সেই ত্যাগের ইতিহাস জানা জরুরিসুতরাং, আজকের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ২১ ফেব্রুয়ারি,  ইউনেস্কো স্বীকৃত মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ ডে’ টির একচ্ছত্র গৌরব যে কেবল বাঙালীর, সেই বীজটি ঢুকিয়ে দিতে হবে আমাদের সন্তানদের মগজে-মননেঅভিভাবক হিসেবে সেই দায় তো আমাদেরই

দুঃখজনকভাবে সত্য যে, আজকাল ভাষা দিবস পালন হয়ে গেছে অনেকটা লৌকিক আচার পালনের মত। আমাদের কর্পোরেট বেনিয়ারা নানা ঢংয়ে পসরা সাজায়, বিজ্ঞাপন বানায়, মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অব্দি ভাষা দিবসের পণ্যে মুড়ে রাখি নিজেদের, গান করি, স্লোগান দেই, আবৃত্তিও করি। কিন্তু সত্যিকারের রঙ কি আর মর্মে এসে লাগে? যে রঙ ছড়িয়ে যাবার কথা ছিল সবখানে? ওই তো একটি দিনই! একটি দিনেই আমরা পান্তা ইলিশের বাঙালি, একটি দিনেই আমরা একুশের বাঙালি।

কানাডায় আদিবাসী ভাষাসহ প্রায় ২০০ এরও অধিক ভাষা রয়েছে যার মধ্যে বাংলাও একটি। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি প্রাপ্তির পরে ২০০২ এ জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ২৬৬ টি সদস্য রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক দিবস পালনের  বিষয়ে বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করা হয়। হতাশার কথা হল, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ব্যক্তিগত অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ছাড়া কানাডায় সরকারী ভাবে এই দিনটি পালনের কোনো উদ্যোগ ইতিপূর্বে গৃহীত হয়নি। যদিও ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো ফেডারেল সরকারের কাছে একটি বেসরকারী বিল উত্থাপিত হয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে জাতির উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ এখন প্রাপ্য আমাদের মহামান্য প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে

আফসোসের সাথে লক্ষ্য করেছি অভিবাসী অধ্যুষিত শহর টরন্টোতে প্রচুর বাঙালী থাকা স্বত্ত্বেও  আমরা সেই শৈশবের মতো করে  দীর্ঘদিন একটি পোর্টেবল শহীদ মিনার তৈরি করে তাতেই দলে দলে বিভাজিত হয়ে(?) নানা বর্নে-গন্ধে রঙ ছড়িয়ে ব্যানার হাতে করে সাদা কালোয় সেজেগুজে ফেব্রুয়ারির বিশ তারিখ রাত বারোটা এক মিনিটে পুস্পস্তবক অর্পণ করি। এই দৃশ্য বড়ই বেদনা দায়ক। তবে, আশার কথা হল এই যে, আইএমএলডির উদ্যোগে টরন্টো শহরে বড় শহীদ মিনার স্থাপিত হচ্ছে, যা কোভিডের কারণে এখনো নির্মানাধীন। আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্মিলিত প্রচেষ্টাগুলো একদিন বড় সফলতা এনে দিতে পারে এ তারই দৃষ্টান্ত। সুতরাং প্রবাসে বাংলাকে অধিক গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হলে ব্যাপক সমাদৃত করতে হলে আমাদেরকে যেতে হবে আরও খানিকটা দূর। সে লক্ষ্যে আরও কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে যা এখন সময়ের দাবী।

১। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসটি সরকারী উদ্যোগে প্রাদেশিক এবং ফেডারেল সরকারে পরিপূর্ণ মর্যদায় পালন করার পরিপত্র জারি করা উচিত

২। প্রতিটি প্রাদেশিক রাজধানী এবং বড় শহরে অন্ততপক্ষে একটি করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার স্থাপন করা, যাতে দিবসটিকে ঘিরে আলোচনা অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ইতিহাস বিষয়ক আলোচনা হতে পারে। যার মাধ্যমে এই প্রজন্মের শিশুরাসহ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী দিবসটি সম্বন্ধে জানতে পারবে এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসার ঘটবে।

৩। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ইতিহাস ও উৎপত্তি বিষয়ক টেক্সট পাবলিক স্কুলের কালিকুলামে বয়স ও শ্রেণীভেদে সংযুক্ত করতে হবে। সমাজ বিজ্ঞান কিংবা ভূগোল পাঠের আওতায়।

৪। একুশে ফেব্রুয়ারিকে প্রতি বছর সরকারি ছুটির দিন হিসেবে নির্ধারিত করতে হবে।

পরিশেষে বলব, নিজের শেকড় উপড়ে ফেলে দিলে সেই গাছ বেশিদিন বাঁচে না, তাই আমাদের লক্ষ্য রাখা উচিত আমাদের সন্তানেরা যেন

বাংলা যেন কেমন-কেমন, খুউব দুর্বল প্যানপ্যানে

কবে যেন হয় ‘বেঙ্গলি ডে’, ফেব্রুয়ারি মাসে না?”  

এমন প্রশ্ন করে না বসে! আমরা যেনো তাঁদেরকে শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে না ফেলি! তাহলে এর চেয়ে বড় হন্তারক আর কেউই হবে না । প্রার্থনা করছি আমরা যেন নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠতে পারি, ধরে রাখতে পারি আপন গৌরব স্ব-স্ব অবস্থানে থেকেই। পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেনো আমি বাঙালি। সেটাই হোক আমার গর্বের পরিচয়।   

লেখক: সঙ্গীতা ইয়াসমিন, কলাম লেখক

টরন্টো, কানাডাফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২১


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান