দত্তকপ্রথা :শিশুপাচার।বাংলাদেশের চুপ থাকা

Tue, Feb 16, 2021 6:24 PM

দত্তকপ্রথা :শিশুপাচার।বাংলাদেশের চুপ থাকা

সোহেল মাহমুদ: দুই বছরের মনোরাকে সুইডেনের নিকভিস্ট দম্পতি দত্তক নিয়ে গিয়েছিলেন ১৯৭৮ সালে। এমন আরো অসংখ্য শিশুকে পৃথিবীর নানা দেশে দত্তক দেয়ানেয়া হয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কিছুসময় পর পিতামাতাহীন কিংবা পরিত্যক্ত শিশুদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু সরকারের বিশেষ প্রকল্প "ইন্টারকান্ট্রি চাইল্ড এডপশন প্রজেক্ট" একসময় শিশুপাচারের একটা মাধ্যম হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের দত্তক প্রক্রিয়া নিয়ে যে তথ্য উপাত্ত পেয়েছি, তাতে আমার প্রবৃত্তি বলছে, অনেক জঘন্য আর বর্বর কাণ্ড ঘটেছে এই দত্তক নিয়ে। নেদারল্যান্ড সবশেষ যে ঘোষণা দিয়েছে, তাতে বলা আছে বাংলাদেশ থেকেও যে শিশুগুলো দত্তক নেয়া হয়েছে সে দেশে তাতে অনিয়ম হয়েছে ব্যাপক। কি অনিয়ম? অনেক শিশুকে চুরি করা হয়েছে, নয় কিনে নেয়া হয়েছে। এটা ডাচ সরকারের দুই বছরের অনুসন্ধানের তথ্য।

বাংলাদেশ থেকে শিশুপাচার হচ্ছে এ দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে উঠেছিলো ১৯৭৮ খৃস্টাব্দে। তখন একটা ডাচ এনজিও'র বাংলাদেশী প্রধানকে বলা হচ্ছিলো শিশুপাচার চক্রের মূলব্যক্তি। একটা শিশুআশ্রমকে ঘিরে বিশাল একটা চক্র, যাতে ডাচ দূতাবাস ও ডাচ এনজিও, বাংলাদেশের সমাজকল্যাণ বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় মাঠপর্যায়ের পাচারকারী, দালাল, "ছেলেধরা", আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা জড়িত ছিলেন বলা হচ্ছে।

বাংলাদেশ দত্তকপ্রথা বন্ধ করে সম্ভবত ১৯৮৪ খৃস্টাব্দে। এইচ এম এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর। দত্তক ইসলামধর্ম সিদ্ধ নয়, এমনটাই ছিলো সরকারের ভাষ্য। অবশ্য, বাংলাদেশ থেকে নেদারল্যান্ডে দত্তক বন্ধ করে দেয়া হয় এরও কয়েক বছর আগে, ১৯৮০ সালে। কেন? এ নিয়ে তখন প্রশ্ন তোলা না হলেও এখন জানা যাচ্ছে, মুসলমান শিশুকে খৃস্টান ধর্মাবলম্বীর ঘরে দত্তক দেয়া ইসলামধর্ম অনুমোদন দেয় না উল্লেখ করে নেদারল্যান্ডে দত্তক দেয়া বন্ধ করা হয়। অথচ, সে সময়ের পরও ফ্রান্স, ডেনমার্ক, সুইডেন, ইংল্যান্ডসহ পৃথিবীর বহু দেশে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী পরিবারের মুসলমান শিশুদের দত্তক দেয়া হয়েছে। সেখানে ধর্ম যায় নাই? কাহিনী আসলে ভিন্ন। ডাচ এনজিও'র বিরুদ্ধে শিশু পাচারের অভিযোগ ওঠায় সরকার পর্যায় থেকে সেসময় এ সিদ্ধান্ত আসে। সরকার শিশুপাচারের সুবিধাভোগী ছিলো না। যারা ছিলো, তারা নিজেদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অন্যদেশগুলোয় শিশুপাচার অব্যাহত রাখে। এবং, সরকারে প্রভাব বিস্তার করে শিশুপাচারের ক্রমাগত অভিযোগকে ধামাচাপা দিয়ে রাখে।

দত্তকপ্রথার সাথে অন্যায় অনিয়ম জড়িত। লেনদেন জড়িত। অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতাও জড়িয়ে আছে। চক্রের কাছে শিশুরা পণ্য। বিদেশী ক্রেতাদের বেশিরভাগই শিশুগুলোকে সংগ্রহের ইতিহাস জানে না। তাদের কাছে বলা হয়েছে, শিশুগুলো হয় পরিত্যক্ত, নয় এতিম।

২০০৫ খৃস্টাব্দে সারা পৃথিবীতে দত্তকের সংখ্যা ছিলো ৪৬ হাজার। ২০১৫ তে সেটা ৭২% কমে নেমে আসে ১২,০০০ জনে। দত্তক খুব দ্রুত লাভজনক বাণিজ্যে পরিণত হবার কারণে একসময় দেশে দেশে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন দানা বাঁধে। ফলে, গত দুই দশকে আইন করে বিদেশে দত্তক বন্ধ করেছে রাশিয়া, চীন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ পৃথিবীর বহু দেশ। শিশুপাচার আর নির্মমতার কারণে দত্তক নিয়ে এরও আগে, ১৯৯৩ খৃস্টাব্দে হেগ কনভেনশন সাক্ষরিত হয়। ২০১৬ খৃস্টাব্দ নাগাদ ১০৩টি দেশ এতে সই করে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে দেশে দেশে দত্তক দেয়ানেয়ায় একটা অভিন্ন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

একটা ভালো ব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে দেশে দেশে পুরনো অনিয়মের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান, তদন্ত শুরু হয় নানা তরফে। দাতা এবং গ্রহিতা দু'দেশেরই সরকার, নিরপেক্ষ সংস্থা আর গণমাধ্যম মিলে নামে এ যুদ্ধে। দত্তকপ্রথায় শৃঙ্খলা ফেরাতে মাত্র সেদিন যে দেশ নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারাও নানা কায়দায় অনুসন্ধান করছে অনিয়মের। অথচ, চারদশক আগে বাংলাদেশ যুগান্তকারী একটা সিদ্ধান্ত নিয়েও এ দত্তক-অনিয়মে কোন তদন্তে যায়নি। এমনকি, ডাচ সরকার তাদের সবশেষ রিপোর্টে বাংলাদেশের দত্তকব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পরও এ নিয়ে সরকারের কোন বক্তব্য নজরে পড়েনি। কেনো?

ছবিতে মনোরা। দত্তক সুইডিশ মায়ের সাথে। মনোরা দুই দশক ধরে তার জন্মদাতা বাবা-মাকে খুঁজছে।

লেখক: সোহেল মাহমুদ: নিউইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশি সাংবাদিক


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান