করোনা ভ্যাকসিন গ্রহনে আমাদের অনীহা কেন?

Sat, Jan 23, 2021 7:52 PM

করোনা ভ্যাকসিন গ্রহনে আমাদের অনীহা কেন?

ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম: করোনা ভ্যাকসিন গ্রহনে কি শুধু বাংলাদেশিদেরই অনীহা? অন্যান্য দেশের মানুষেরা কি ভ্যাকসিনটি স্বতস্ফূর্ত ভাবে গ্রহন করছে? বাংলাদেশে শতকরা কত জন মানুষ ভ্যাকসিন গ্রহনে আগ্রহ প্রকাশ করছে? এই সংখ্যাটি কি আমরা জানি? ভ্যাকসিন গ্রহনে যারা অনীহা প্রকাশ করছে, তারা কেন তা করছে এর তথ্য উপাত্ত কি আমাদের কাছে আছে? কোন সার্ভে বা গবেষণার ফলাফল কি আমাদের হাতে আছে?

ইনজেকশনের মাধ্যমে যে ভ্যাকসিন দেয়া হয়, তা গ্রহনে বরাবরই মানুষের ভেতরে এক ধরনের অনিচ্ছা দেখা যায়। এটা নতুন কিছু না। এটা মানুষের এক সহজাত প্রবৃত্তি। কোন সুস্থ্য মানুষই তার দেহে সূঁচ ফুটাতে চায় না যতক্ষন না সে এর প্রয়োজনিয়তা অনুধাবন করে। আমরা কি কোভিডের ভয়াবহতা অনুধাবন করতে পেরেছি? আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ কোভিডে মারা গেল ৮ হাজার মানুষ। মৃত্যু এখনও বন্ধ হয়নি।

সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে আজ অব্দি কোভিডে মারা গেছে ৪ লক্ষ ২৬ হাজার মানুষ। প্রতিদিন মারা যাচ্ছে ৩ থেকে ৪ হাজার। যুক্তরাজ্য ভিত্তিক ‘ইউগভ ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ ডাটা অ্যানালিস্ট’ প্রতিষ্ঠানের নভেম্বর-জানুয়ারিতে চালানো সার্ভেতে দেখা যায় যে এত ভয়াবহতার ভেতরেও যুক্তরাষ্ট্রে ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহী মাত্র ৫১ শতাংশ মানুষ! অর্থাৎ দেশটির অর্ধেক জনগোষ্ঠিই ভ্যাকসিনে অনীহা প্রকাশ করছে। কারণ একটাই। মানুষের মাঝে ভ্রান্ত ধারণা।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যে নভেম্বরে যেখানে ভ্যাকসিন গ্রহনে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল ৬১ শতাংশ মানুষ, ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরে জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাড়িয়েছে ৮১ শতাংশে। তবে পূর্ব লন্ডনে বসবাসকারী বৃটিশ-বাংলাদেশী জনগোষ্ঠির মধ্যে ভ্যাকসিন গ্রহনে রয়েছে চরম অনীহা। এই জনগোষ্ঠির মাত্র ৪০-৪৫ শতাংশ ভ্যাকসিন গ্রহনে আগ্রহী!

নভেম্বরে ফ্রান্সে ভ্যাকসিন গ্রহনে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল মাত্র ৩২ শতাংশ মানুষ, যা অবশ্য জানুয়ারিতে বেড়ে হয়েছে ৪৬ শতাংশ। ইতালিতেও ভ্যাকসিন গ্রহনে আগ্রহীর সংখ্যা নভেম্বরের চেয়ে ১৯ শতাংশ বেড়ে জানুয়ারিতে দাড়িয়েছে ৭১ শতাংশের উপরে। তবে ইউরোপে গত দুই মাসে মানুষের মাঝে সবচেয়ে বেশী ভ্যাকসিনের আগ্রহ বেড়েছে সুইডেনে, যা ছিল নভেম্বরের চেয়ে ২১ শতাংশ বেশী। দেশটিতে এখন ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহী ৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ গোটা ইউরোপে গত ২ মাসে মানুষের মাঝে ভ্যাকসিন গ্রহনে আগ্রহ বেড়েছে গড়ে ১৫-২০ শতাংশ।

ইন্ডিয়া, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়াতে ভ্যাকসিন গ্রহনে আগ্রহ রয়েছে গড়ে ৬০ শতাংশ। তবে, এশিয়ার কিছু দেশ, যেমন হংকং, থাইল্যান্ড, সিংগাপুর, তাইওয়ান, ফিলিপাইন প্রভৃতি দেশে ভ্যাকসিন গ্রহনে আগ্রহ কমেছে। অন্যদিকে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভ্যাকসিনে আগ্রহ রয়েছে ৬০-৭০ শতাংশ মানুষের।

বিভিন্ন মিডিয়াতে কথা হচ্ছে যে বাংলাদেশে মানুষ ভ্যাকসিন গ্রহনে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। কিসের ভিত্তিতে এটা বলা হচ্ছে? কত জন মানুষ ভ্যাকসিন গ্রহনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে? এটা কি আমরা জানি? এর উপরে কোন সার্ভে কি হয়েছে?

বাংলাদেশে যেখানে করোনা সমন্ধে ভ্রান্ত ধারণা, কুসংস্কার, কোভিড রোগের প্রতি গুরুত্ব না দেওয়া, এমন ধরণের মানসিকতা বিরাজমান। সেখানে মানুষ ভ্যাকসিনে আগ্রহ দেখাবে না, এটাই তো স্বাভাবিক! একারনেই ভ্যাকসিন গ্রহনযোগ্যতার প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য একটা সার্ভে অবশ্যই করতে হবে। আগে কত শতাংশ ভ্যাকসিন নিতে চায়, কত শতাংশ নিতে চায় না বা দ্বিধায় আছে, সেটা জানতে হবে।

ধরা যাক, বাংলাদেশে ৪০ শতাংশ মানুষ ভ্যাকসিন নিতে চাচ্ছে আর ৬০ শতাংশ চাচ্ছে না। এবং এই ৬০ শতাংশের মধ্যে ৩০ শতাংশ নেবে কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় আছে। কেন তারা দ্বিধায় আছে, সেটা জেনে তাদেরকে সঠিকভাবে বোঝানো গেলে তারাও কিন্তু ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহী হবে। তখন আগ্রহীদের সংখ্যা ৭০ শতাংশে উন্নীত হবে।

আমরা দেখেছি, বিশ্বের অনেক দেশে আগ্রহীর সংখ্যা নভেম্বরের চেয়ে জানুয়ারিতে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। আর এটা হয়েছে তাদেরকে সঠিকভাবে বোঝানো, এবং তাদের মাঝে সচেতনতা তৈরি করার মাধ্যমে। আমার ধারণা বাংলাদেশের মানুষ ভ্যাকসিন নেবে। কিন্তু, তারা এখন দ্বিধার মধ্যে আছে। তারা ভাবছে, ভ্যাকসিনে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি না, ভারতের ভ্যাকসিন ভালো হবে কি না ইত্যাদি।

সম্প্রতি মিডিয়াতে দুটো সংবাদ পাশাপাশি এসেছে যে, ভারত বায়োটেক তাদের ভ্যাকসিনের ট্রায়াল বাংলাদেশে করতে চায়; আর সেরাম ইনস্টিটিউটের ভ্যাকসিন বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে। এই দুইটা নিয়ে মানুষের মনে জট লেগে গেছে, যেটা স্বাভাবিক। মানুষ ভাবছে, এটা ভারতের ভ্যাকসিন, এটা নেওয়া নিরাপদ হবে কি না। তাই অবশ্যই এটা পরিষ্কার করে জনগণকে বোঝাতে হবে যে, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার যে ভ্যাকসিন যুক্তরাজ্যে ব্যবহার হচ্ছে, বাংলাদেশেও ভারত থেকে সেই একই ভ্যাকসিন এসেছে, যেটা উৎপাদিত হয়েছে সেরাম ইনস্টিটিউটে।

এই মূল বিষয়টি এখন প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে জনগনকে অবহিত করতে হবে। আগে একটা সার্ভে করে বাংলাদেশে মানুষের অবস্থাটা বুঝতে হবে। এরপর সেই অনুযায়ী এগোতে হবে। তাদের অনীহার কারণ বের করে সেই অনুযায়ী তাদেরকে বোঝাতে হবে। পাশাপাশি এমপি, মন্ত্রীসহ জনপ্রতিনিধিদেরও ভ্যাকসিন নেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এতে ভ্যাকসিন সম্পর্কে মানুষের মনে আস্থা তৈরি হবে। জনসচেতনতা তৈরিতে সরকারের পাশাপাশি সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষক, ধর্ম প্রচারক, তারকা, সংস্কৃতিকর্মীদেরও এগিয়ে আসতে হবে। তারা ভ্যাকসিনের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালালে, কথা বললে জনগণও ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহী হয়ে উঠবে।

করোনা মহামারীকে প্রতিহত করার জন্য ভ্যাকসিনের কোন বিকল্প নেই।

ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান