আপনারা জানেননা আপনারা কী ধ্বংস করছেন

Tue, Jan 19, 2021 12:01 AM

আপনারা জানেননা আপনারা কী ধ্বংস করছেন

মুস্তাফিজ রহমান: কমলাপুর রেল স্টেশন ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছেঃ

 ষাটের দশক প্রায় ফুরিয়ে আসছে সেই সময়... পূর্বাভাসে দ্রোহকাল, মিছিল-মিটিং, শ্লোগানের আনাগোনা- "জেলের তালা ভাংবো শেখ মুজিবকে আনবো"...

 মশাল মিছিল, প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন, মুষ্টিবদ্ধ শপথ, ভারী বুট, জলপাই কালারের হেলমেট, বেডফোর্ড ট্রাক ভর্তি চৌকোন মুখ মিলিটারী, খাকী পুলিশ দেখে দেখে, চোখ মেলেই অগ্নিগর্ভ টানটান টেনশনে আকীর্ণ শৈশবে আমাদের নানাভাই অধ্যাপক মোহাম্মদ হানিফের সাথে সবাই মিলে নানাবাড়ী ভৈরব বাজার যাবার সময় কমলাপুর রেল স্টেশনটি প্রথম দেখেছিলাম।

 বিশাল ছাতা কিংবা মেলে দেয়া পদ্মফুলের পাঁপড়ি খুলে যাচ্ছে আকৃতির কংক্রিটের শেলগুলোর বিন্যাস দেখে বালকের অভিভূত বিস্মিত দৃষ্টি!

 এর আগে নানা দাদা বাড়ীতে যেতাম- আসতাম অধূনা বিলুপ্ত ফুলবাড়িয়া কিংবা তেজগাঁও রেল স্টেশন হয়ে। বৃটিশ আমলের ওই দুটো পুরনো ছোট স্থাপনার তুলনায় কমলাপুরের নতুন স্টেশনটি যে এক বিভাবরী রাজপ্রাসাদ।

পূর্ব বঙ্গের প্রায় মফস্বঃলী গ্রাম গ্রাম চেহারার ঢাকা শহরের শরীর জুড়ে জেগে উঠা রত্নখচিত শুভ্র এক রাজহাঁস য্যানো!

তারপর কত্তবার এই স্টেশনের হ্লুদ-সবুজের মিশেল দেয়া সে যুগের  গ্রীন এরো, মেরুন বর্ণের উল্কা মেইলে শীতের কুয়াশামাখা ভোরবেলায় বাক্সো-প্যাটরা, সুটকেস বেঁধে মায়ের সাথে নানাবাড়ীতে যাওয়া আসা। সাথে নানাভাই, কখনোবা বড় মামা আফজালুর রহমান। মেজো ফজলু মামা কিংবা সেজ বাচ্চু মামা। সেই আদর করা, গল্প শোনানো মামারা, স্নেহ সমুদ্র নানা- নানী কেউই আজ আর পৃথিবীতে নেই। পরলোকে সবাই চিরশান্তি লাভ করুন... ট্রেনের জানালা দিয়ে ছুটে আসে কেবল বাল্যকালের ভোরবেলা, রোদ, হু হু হাওয়ায় নেই নেই  দিন। 

বুঝিবা ঢাকাই একমাত্র শহর- সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে যার কুৎসিত দর্শন প্রধান এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করতেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায় কিন্তু  কমলাপুর রেলস্টেশন দেখলে মন ভালো হয়ে যায়!

এহেন স্মৃতিময় কমলাপুর রেলস্টেশনটি ভেঙ্গে ফেলে কি সব নাকি বানানোর পরিকল্পনা চলছে! ক্যানো? এটিকে রেখেইতো কত ভাল কার্যকরী স্থাপত্য পরিকল্পনা করা যায়। না করতে পারলে সেই স্থপতি, স্থাপত্য ফার্ম, পরামর্শক শোচনীয়ভাবে ব্যার্থ!

কমলাপুর রেল স্টেশন ভেঙ্গে ফেলার সাথে সাথে লুপ্ত হয়ে যাবে আমাদের বাল্য, শৈশব, যৌবনের হাজারো স্মৃতি, সেইসাথে বাংলাদেশতো বটেই উপমহাদেশের আধুনিক স্থাপত্যের অনুপম এক নিদর্শন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছেঃ-

আমাদের বেশিরভাগই এসএসসি এইচএসসির পরে টিএসসিতে নানা কাজে-অকাজে আনাগোনা, ঘোরাফেরা করলেও আমার সৌভাগ্য হয়েছিল বাল্যকালে সর্বপ্রথম বড় মামা আফজালুর রহমানের সাথে টিএসসি যাওয়া। সেটাও ষাটের দশকের শেষের দিকে কোন এক সময়।

মনে পড়ে বড় মামা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন উনার সাথে বেবিট্যাক্সি করে টিএসসিতে গিয়েছিলাম। ভেতরে ঢুকে লজ্জায় মরি মরি! হাফপ্যান্ট, বাটার নটি বয় সু পরা আমার সমবয়েসী কেউই নেই! ভেতরটা একেবারে পরিষ্কার, ঝকঝক করছিল। টেবিলে বসিয়ে রেখে মামা গেলেন খাবার আনতে। সবাই আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন। কেউ কেউ এসে নাম ধাম জিজ্ঞেস করছিলেন। অনেকে আবার মাথায় গালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন।  চারপাশে এত বড়দের মেলায় ঘাড় হেলিয়ে লজ্জায় প্রায় মরে যাচ্ছিলাম। বড় মামা ট্রেতে করে খাবার দাবার নিয়ে আসলেন। আহা এত মজার হট প্যাটিস সাথে গোলাপী লাল সস! এখনো সেই  স্বাদ-স্মৃতি জিভে লেগে আছে! ঢাকায় কি যে ভাল ভাল খাবার পাওয়া যেত তখন!

পাঞ্জাবী পড়া দীর্ঘদেহী রোগামত একজন কালো দাঁড়ি কাঁধে ঝোলা নিয়ে মামার সাথে কুশল জিজ্ঞাসা করলেন, শুনলাম উনার নাম সম্ভবত নির্মলেন্দু গুণ!  শাড়ী পড়া কয়েকজন সুবেশী মেয়ে স্মিত হেসে মামার সাথে টুকটাক কথা বলে অন্য টেবিলে যেয়ে বসলেন। অধোমুখী হয়ে বোকার মত ভাবছিলাম হায়াল্লা এত এত মেয়েদের মধ্যে কাকে মামা বিয়ে করবেন? ঝকঝকে শীত রোদে ভেসে যাচ্ছিলো চারদিক। ক্যাফেটেরিয়ার উঁচু উঁচু জানালা দিয়ে আলো এসে পড়ছিল মেঝেতে।

বিখ্যাত গ্রীক আমেরিকান স্থপতি কনস্টাইটিন ডক্সিয়াডিস সায়েবের নকশায় গড়ে উঠা

বাংলাদেশের গ্রামীন উঠোনের মত বিন্যাসে টিএসসির সবুজ লন, করিডোর, ক্যাফেটেরিয়া, সুইমিং পুল, ভল্টাকৃতি অডিটোরিয়াম, স্থানীয় ও আঞ্চলিক আবহাওয়া জলবায়ুর দিকে লক্ষ্য রেখে বাতাস চলাচল,  স্থাপতিক উপাদান, দেশজ নির্মাণ উপকরণ  তাপমাত্রা সহনীয় দ্বিস্তর ছাদযুক্ত  চার তলা দালানটি  অসাধারণ স্থাপতিক দক্ষতায় সুবিন্যস্ত। আজিমপুর কলোনীর উল্টোদিকে ইডেন কলেজ সংলগ্ন গার্হস্থ্য অর্থনৈতিক মহাবিদ্যালয়টিও স্থপতি ডক্সিয়াডিস সায়েবের উল্লেখযোগ্য কীর্তি।

 এহেন টিএসসিকেও ভেঙ্গে ফেলে উনারা কি এমন হাতিঘোড়া-বজরাপানসি গড়বেন তা আমরা ভাল করেই জানি। করিডোরের মেঝে ছোঁয়া টিএসসির ঘাস ঢাকা সবুজ লনের মত নান্দনিক একটা না ঘেরা না উন্মুক্ত একটা 'অবিরাম স্পেস' তৈরী করা যে কোন দেশের যে কোন স্থপতির কাছেই আরাধ্য... ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ, আপনারা জানেননা আপনারা কী ধ্বংস করছেন অথচ আমরা জানি আমরা কী হারাচ্ছি!

লেখক: মুস্তাফিজ রহমান, কবি

লেখকের ফেসবুক পোষ্ট থেকে


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান