প্রাণের বইমেলা জাগ্রত থাক সৃষ্টিশীল চেতনায়

Fri, Jan 8, 2021 6:31 PM

প্রাণের বইমেলা জাগ্রত থাক সৃষ্টিশীল চেতনায়

জুলফিকার বকুল :'বইমেলা'  কোটি বাঙালি হৃদয়ের  অনুভূতিতে সারা জাগানো একটি নাম।যে নামের আয়োজনে শহর থেকে গ্রামবাংলার ইতিহাস,ঐতিহ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, তথা জীবনগাঁথার স্মৃতি, জীবন্ত হয়ে অন্তরালের ক্যানভাসে দৃশ্যমান হয়।এ যেন মহা মিলন মেলা।আত্মিক টানে নিজের অজান্তেই ছুটে আসে বইপ্রেমী সত্তা। প্রতিটি স্টল হয়ে উঠে একেকটি মুখরিত আঙিনা।যে আঙিনায় পাঠকরা যেন নিমন্ত্রিত অতিথি।কেউ বইয়ের প্রচ্ছদ দেখে কল্পলোকে একপলক হারিয়ে যায়,কেউ আবার দু-একটি পাতায় দৃষ্টি দিয়ে নিজেকে নিয়ে যায় চিরচেনা কোন ভালবাসার রাজ্যে,কেউ ফিরে পায় হারানো অতীত,কেউবা খোঁজে সম্ভাবনার ভবিষ্যত। কি নেই এখানে! এ রাজ্যে সব আছে।ইচ্ছে করলেই সুখ,দুঃখ, হাসি,কান্না, বিরহ,প্রেম, ভালবাসা, প্রেরণা, অনুপ্রেরণা সব কেনা যায়। শুধু প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেই এখানে খুব কম দামে, সুলভ মূল্যে একজন জীবন্ত মানুষকে ভার্চ্যুয়ালী কিনে নেওয়া যায়। যে মানুষটি প্রিয় বন্ধু,একান্ত  কাছের মানুষ হয়ে সার্বক্ষণিক পাশে থেকে জীবনবোধের চেতনায় একাকার থাকে,জীবনকে পরিপূর্ণতায় সমৃদ্ধ করে মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে বাঁচতে শেখায়। অধ্যাপক ড.মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী তাঁর লেখা একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন , ' একদিন বই পড়তে পড়তে মানুষ জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিনত হতে পারে।তাই বই হয়ে উঠুক প্রাণের বন্ধন,জীবনের আপনজন।'

মার্কাস টুলিয়াস সিসারো এর উক্তি থেকে পাওয়া যায়,A room without books is like a body without a soul.

প্রকৃতপক্ষে বই তখনই মানুষকে আলোর পথে নিয়ে যায় যখন সে তার অন্তরের মাঝে একটি জানার জগৎ তৈরি করে আত্ম ভুবনে নিজেকে উপলব্ধি করার প্রয়াস সৃষ্টি করে।আর তখনই সার্থকতার ছোঁয়ায় কম্পিত হৃদয়ে জাগে প্রাণোচ্ছল সুখানুভূতির শিহরণ।মানুষ হয়ে উঠে সত্যসন্ধানী।জ্ঞান পিপাসার তৃষ্ণা মেটাতে মানুষের অন্তরালের মানুষকে খুঁজতে থাকে।ছুটে আসে হাজার মানুষের ভিড়ে স্বপ্নের মানুষটির সানিধ্যের প্রত্যাশায়।

বইমেলা যে শুধু জ্ঞানই বিলিয়ে দেয় তা নয়।এখানে এসে মানুষ প্রশান্তির পরশে প্রিয়জনদের সাথে ভাব বিনিময়ে নিজেকে উজাড় করে দেয়।ব্যস্ত শহরের যান্ত্রিক জীবনের মধ্য থেকে একটু সময় করে, অন্তর্নিহিত কৌতূহলে মন রাঙানোর পাশাপাশি মানসিক উৎকর্ষতা সাধনের লক্ষ্য নিয়ে, নানা রঙে রাঙিয়ে হৃদয়ের মেলবন্ধনে প্রাণের মেলাকে সার্থক ও প্রানবন্ত করে তোলে।নতুন প্রজন্মের চেতনায় জাগ্রত হয় জ্ঞান আহরণ স্পৃহা সহ বইয়ের প্রতি মমত্ববোধ। ক্ষুদে পাঠক থেকে শুরু করে প্রবীণদের উপস্থিতিতে মেলায় প্রতিফলিত হয় তারুণ্যের তারুণ্যতা।এ যেন অন্য রকম এক সম্প্রীতির সম্ভারে উদ্বেলিত সাগরের বুকে ঢেউয়ের হাতছানি।ঝর্ণা যেমন চায় মুগ্ধ চোখ তেমনি বই চায় সেই পাঠক,যে তাঁর হাতের পরশে অপলক দৃষ্টিতে কেবল আপন করে নেয়ার অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে।

বইমেলার আয়োজন আছে বলেই দেশ বরেণ্য লেখক, সাহিত্যিকদের সাথে দেখা এবং কথা হচ্ছে। অনুপ্রেরণায় অনেক নতুন লেখকদের আবির্ভাব হচ্ছে। নতুনদের লেখায় উঠে আসছে নতুনত্বও।আসলে লিখতে গেলে ভাল পাঠক হতে হয়,অনেক পড়তে হয়।তাই নতুন লেখক যত সৃষ্টি হবে ততই পাঠক সংখ্যাও বাড়বে।আর নতুনরাই একসময় পুরোনো হয়।কাজেই নতুন লেখকদের চিন্তা ধারা প্রকাশে বইমেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একটি শব্দ কিংবা শব্দের তৈরি বাক্য যেমন পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে ঠিক তেমনি একটি বই বা তার বুকে লিপিবদ্ধ একটি বাক্য একজন মানুষের জীবনকে ইতিবাচকভাবে বদলে দিতে পারে। তরুণদের দাঁড়াই যুগে যুগে পরিবর্তন এসেছে।তথ্য-প্রযুক্তির যুগে তরুন লেখকরাই নতুনত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে দেশপ্রেমের প্রত্যয় নিয়ে বাঙালি জাতিকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করবে এমনটিই বিশ্বাস।বইমেলাকে ঘিরে নতুন প্রজন্মের মাঝে যে আশা-আকাঙ্ক্ষার উদয় হয় তা পূরণের নিমিত্তে উৎসাহ ও উদ্দীপনায় প্রেরণা যোগানোটা আমাদের মহত্বের পরিচয় বহন করে।

অনেক ঘাত- প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা,প্রাণের প্রিয় বাংলাদেশ। এ দেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় স্বগৌরবে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব দরবারে।একদিন উন্নত, শিক্ষিত জাতি হিসেবে আমরা প্রথম সারিতে পৌছাব।যে স্বপ্ন আমরা প্রতিনিয়ত বুকে ধারণ ও লালন করে যাচ্ছি।  তাই দেশের জনসমষ্টিকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিনত করতে জ্ঞানার্জনের বিকল্প নেই।মনের অন্ধকার, কুসংস্কার দূর করে সাফল্যের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়াই আমাদের একমাত্র কাম্য।বই মানুষকে ইতিবাচক ভাবনায় ভাবিয়ে তোলে।যে ভাবনা তার জীবনকে সুসংগঠিত ও সুনিয়ন্ত্রিত করে দেশের সম্পদে পরিনত করে।তাই বইমেলা জাতীয় জীবনে গভীর মর্মার্থ ও তাৎপর্য বহন করে। গত ২০২০ সালের বইমেলায় ছিল খুবই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। বিশ্বব্যাপি করোনা মহামারীর কারণে আগত ২০২১ সালের বইমেলা নিয়ে এখনও লেখক,প্রকাশক,পাঠকদের মনে রয়েছে সংশয়। প্রাণের মেলা তার অতীত ঐতিহ্য ধরে রেখে পাঠক হৃদয়ের অদম্য চাওয়া পূরণ করতে পারবে কি!

যেখানে মানুষের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড থেমে নেই সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলার আয়োজন জাতীয় জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না।তাই, বইমেলা এগিয়ে চলুক তার আপন গতিতে,প্রতিবারের মতই নির্ধারিত সময়ে জেগে উঠুক বইপ্রেমী হৃদয়ের স্পন্দন, বইমেলার অনিন্দ্য স্বাদের তৃপ্তিতে ভুলে যাক অতীতের যত বেদনা,চির সবুজের দেশে রক্তিম সূর্যের আলোকিত শিখায় বইমেলা বয়ে আনুক অনাবিল শান্তির অনুকূল সময়।

লেখক: জুলফিকার বকুল,শিক্ষক, ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল, গাজীপুর।

 


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান