বাংলাদেশ আর করোনা ভাইরাস ভ্যাকসিন  বাণিজ্য

Thu, Jan 7, 2021 10:12 PM

বাংলাদেশ আর করোনা ভাইরাস ভ্যাকসিন  বাণিজ্য

ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার: সর্বশেষ পাওয়া খবরের ভিত্তিতে মনে হচ্ছে ভারত সরকার শেষ পর্যন্ত করোনা ভাইরাস ভ্যাকসিন রফতানির ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে (বিবিসি নিউজ, জানুয়ারী ৫, ২০২১)। কিছু দিনের মধ্যেই দেশটি নিজ দেশে টিকাদানের  কাজ শুরু  করবে এবং এ বছরের জুন মাসের মধ্যেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শনাক্তকারী প্রায় ৩০০ মিলিয়ন  ব্যক্তিকে টিকাদানের কাজ সম্পন্ন করবে। সেই সাথে দেশটি বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ এশিয়া এবং পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও ভ্যাকসিন রফতানির কাজ শুরু করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কোভ্যাক্স এর কাছে পূর্ব প্রতিশ্রুত ভ্যাকসিন সরবরাহ যা সমতার ভিত্তিতে পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জরুরি ভিত্তিতে বিতরণের জন্য পাঠানো হবে।

গত প্রায় এক বছর ধরে COVID-19 এর তান্ডবের মধ্যে এই খবরগুলো সবার মধ্যেই আশার সঞ্চার করবে সেটাই স্বাভাবিক। ভারত সহ পৃথিবীর অন্যান্য ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী দেশ থেকে কোভ্যাক্স ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা হবে এবং দেশে ভ্যাকসিন আসবে। ধারণা করা হচ্ছে 'কস্ট শেয়ারিং' ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনী-দরিদ্র সহ সকল দেশই কোভ্যাক্সের মাধ্যমে অন্তত ২০ শতাংশ মানুষের ভ্যাকসিনের চাহিদা পূরণ করার সুযোগ পাবে৷ কোভ্যাক্স সংগৃহীত এবং সরবরাহকৃত ভ্যাকসিন নিয়ে কোনো প্রকার মধ্যস্বত্ব অথবা অপ্রয়োজনীয় বাণিজ্য করার কোনো সুযোগ নাই|  যার যার দেশের সরকারই থাকবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। করোনা ভাইরাস ভ্যাকসিনকে কেন্দ্র করে যাতে কোনোরকম অসাধু বাণিজ্য চক্র গড়ে উঠতে না পারে সেটা নিশ্চিত করাও কোভ্যাক্স সহ আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাদের মূল উদ্দেশ্য।

এখন আসি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এবং প্রসঙ্গটির অবতারণা করতে চাই অতি সম্প্রতি দেওয়া বাংলাদেশের দুইজন এবং ভারতের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার পরস্পরের সাথে সাংঘর্ষিক বিবৃতির বরাত দিয়ে।

প্রথমত, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সচিব জনাব আব্দুল মান্নান বলেছেন, ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট এর সাথে অক্সফোর্ড টিকা কেনার যে চুক্তি হয়েছে সেটা জি-টু-জি, অর্থাৎ সরকারের সাথে সরকারের। এর কারণ হিসেবে উনি বলেছেন, যেহেতু চুক্তিতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী জড়িত তা জি-টু-জি না হয়ে অন্য কিছু হয় কিভাবে (দৈনিক প্রথম আলো, ৪ জানুয়ারী)! সচিব সাহেব হয়তো ভুলে গিয়েছেন দুই দেশের দুই প্রধানমন্ত্রীর সক্রিয় উপস্থিতিতে অনেক বাণিজ্যিক চুক্তিও সম্পাদিত হয়। সুতরাং জি-টু-জি চুক্তির সমর্থনে উনি যে যুক্তি দেখিয়েছেন তা সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য।

দ্বিতীয়ত, গুলশানে নিজ বাসভবনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেক্সিমকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমার ঢাকা কলেজের অগ্রজ জনাব নাজমুল হাসান পাপন এমপি সাংবাদিকদের বলেছেন, ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে করোনা ভাইরাস ভ্যাকসিন আনার চুক্তিটি অবশ্যই জি-টু-জি নয়। বরঞ্চ এটি একটি বাণিজ্যিক চুক্তি। বেক্সিমকো সিরাম ইনস্টিটিউট এর প্রস্তুতকৃত অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন ক্রয় এবং সরবরাহের একমাত্র বৈধ এজেন্ট এবং এক্ষেত্রে তারা বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতা করছে। স্বাস্থ্য সচিব মহোদয়ের বোঝায় অথবা বলায় অস্পষ্টতা থাকলেও জনাব নাজমুল হাসান পাপনের বক্তব্য এ ব্যাপারে একেবারেই স্পষ্ট।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের ভূমি প্রতিমন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে ভারতীয় হাই কমিশনার জনাব বিক্রম কুমার বলেছেন যে ভারত থেকে কবে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস ভ্যাকসিন আসবে সেটা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তিনি আরো বলেছেন, সরকার এবং অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত থাকায় ভ্যাকসিন আসতে কিছুটা সময় লাগতে পারে (দৈনিক মানব জমিন, ৭ জানুয়ারি)। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, হাইকমিশনার সাহেবের বক্তব্য বিবিসির কাছে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের দেওয়া জানুয়ারির ৫ তারিখের বক্তব্যের সাথে পুরোপুরিই সাংঘর্ষিক। সব দেখে মনে হচ্ছে, সব সময়ের মতো  বাংলাদেশকেই বহন করতে হবে সমম্বয়হীনতার বিরূপ ফলাফল।

এখন সবার প্রশ্ন হচ্ছে, সব সময় আমরা বাংলাদেশিরাই কেন অস্বচ্ছতা আর অস্পষ্টতার শিকার হবো? যেখানে বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সকল সচেতন বাংলাদেশিরা জানেন, বেক্সিমকোই ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের একমাত্র আইনসিদ্ধ পরিবেশক (যার কোনো প্রয়োজনই ছিল না) এবং এই বাণিজ্যিক ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন আমদানির জন্য ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমদানি পত্রে স্বাক্ষর করেছে। এরপরও কোন আইনের ভিত্তিতে স্বাস্থ্যসচিব মহোদয় বলছেন, ভ্যাকসিন আমদানির চুক্তিটি জি-টু-জি? দেশের এবং দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষার জন্য এবং কোভ্যাক্সের মূলনীতি অনুযায়ী করোনা ভাইরাস ভ্যাকসিন বাণিজ্যিকীকরণের আওতার বাইরে রাখার প্রকৃত সদিচ্ছাটাই হয়তো সচিব মহোদয়ের কথার মাধ্যমে বেরিয়ে এসেছে।

কিন্তু দুৰ্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে অশুভ করোনা ভাইরাস ভ্যাকসিন বাণিজ্যিকীকরণের মধ্যে বাংলাদেশ ঢুকে পড়েছে। সেখান থেকে পরিত্রাণের কোনো পথ আমাদের সামনে হয়তো আর খোলা নেই!

লেখক: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার, বিশ্ব ব্যাংকের সিনিয়র হেলথ স্পেশালিস্ট।

লেখকের ফেসবুক পোষ্ট থেকে নেয়া


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান