কোভিড দ্বিতীয় ঢেউ

Sun, Nov 22, 2020 10:13 PM

কোভিড দ্বিতীয় ঢেউ

শোয়েব সাঈদ: গত নয় মাস যাবৎ লিখছি কোভিড নিয়ে, চেষ্টায় ছিলাম বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় অনুজীব বিজ্ঞান, ভ্যাকসিন বিজ্ঞান, কোভিডের বৈশ্বিক হালহকিকতের বিষয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য উপাত্তগুলো বাংলায় সহজবোধ্য উপস্থাপনার। কোভিড সমস্যা শীতকাল পেরিয়ে গ্রীষ্মকাল হয়ে আবারো শীতকাল ধরতে যাচ্ছে। মাঝে  উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মকাল, পাক ভারত উপমহাদেশের অতি গরমের সাথে পাল্লা দিয়ে কমে আসছিল কোভিড উপদ্রব। ভারতে সেপ্টেম্বরের পিকের পর সংক্রমণ দ্রুততার সাথে কমছিল। পাকিস্থান আর বাংলাদেশে জুনে ছিল পিক, তারপর কমছিল। বাংলাদেশের জনজীবনে আপাতত দৃষ্টিতে কোভিড হারিয়েছে গুরুত্ব কিন্তু এই গুরুত্ব হারানোর বিষয়টি মানসিক, নির্মূলের মাধ্যমে নয়। শীতের শুরুতে দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ছে দেশে দেশে। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান লড়াই করছে দ্বিতীয় ঢেউের সাথে সাধ্যমত। নভেম্বরের গ্রাফের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে ভারতে গ্রাফের ক্রমশ নিম্নমুখীতা থমকে গেছে এই নভেম্বরে এসে, বাংলাদেশ আর পাকিস্থানে গ্রাফের প্রবণতা এই মুহূর্তে ঊর্ধ্বমুখী।

যুক্তরাষ্ট্রে ঊর্ধ্বমুখীতা বহুমাস যাবৎ, ট্রাম্প প্রশাসনের উদাসীনতা এখানে প্রধান ফ্যাক্টর, বর্তমানে দৈনিক সংক্রমণ দুই লাখ ছুই ছুই করছে। কিন্তু কানাডা কিংবা জাপানে সরকারের উদাসীনতা ছাড়াই গ্রাফ বেপরোয়া ধরণের ঊর্ধ্বগামী। জাপানে সংক্রমণ বহুমাস যাবৎ স্থিতিশীল ছিল কিন্তু  নভেম্বররে অনেকটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কানাডায় অক্টোবর থেকে সংক্রমণ বেয়াড়া ধরণের,  ইউরোপে একই অবস্থা। বুঝার চেষ্টা  করছিলাম দ্বিতীয় ঢেউয়ের এই আগ্রাসনের পেছনের কারণটি।

নিম্ন তাপমাত্রার সাথে কোভিডের বন্ধুত্বের বিষয়ে বিচ্ছিন্নভাবে আলোচনা হয়েছে বটে, কিন্তু উপসংহারে উপনীত হবার মত গবেষণাধর্মী তথ্য উপাত্তের অভাবে জোরালো যুক্তি দেওয়া যাচ্ছে না। করোনা সংকটের প্রথম দিকে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রী সেন্ট্রিগ্রেডকে অনুকূল বলে কিছু পাবলিকেশনে উল্ল্যেখ করা হয়েছে। উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নভেম্বরে ১০ ডিগ্রী সেন্ট্রিগ্রেডের কাছাকাছি এসে যায়, জাপানেও তাই। সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরের শেষের দিক পর্যন্ত আমি টোকিওতে ছিলাম, ওদের কোভিড ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করে কলামও লিখেছি অক্টোবরে। দৈনিক সংক্রমণের মাত্রা জাপানে অক্টোবরে ছিল গড়পড়তায় ৫০০, অথচ এই নভেম্বরে বৃদ্ধি পেয়েছে ৫ গুন। ব্যবস্থাপনার কোন প্রকার অধোগতি ছাড়াই এই নভেম্বরে পরিস্থিতি হঠাৎ খারাপ হবার বিষয়টি নিয়ে ভাবছিলাম। অনুজীবের উপর তাপমাত্রার প্রভাব বহুমুখী। অনুজীব ধ্বংস, সংক্রমণ সক্ষমতা, নিস্ক্রিয় হয়ে যাওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন পর্যায়ে তাপমাত্রার প্রভাব বিবিধ রকমের। ল্যাবরেটরি কেন্দ্রিক গবেষণা ডাটা আর ফিল্ড ডাটার তফাৎটা অনেক সময় বড় ব্যবধান তৈরি করে।  তাপমাত্রার বিষয়টি ভাবনার খোরাক যোগালেও, কোন প্রকার অপরিপক্ক উপসংহারে দিকে যেতে চাচ্ছি না। তবে অর্থনীতির সাথে কোভিড ব্যবস্থাপনার আপোষকামিতার একটি ফ্যাক্টর দ্বিতীয় ঢেউয়ের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। অনুকূল তাপমাত্রা এই ক্ষেত্রে ইন্ধন যোগানোর অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও হতে পারে হয়তো।

দ্বিতীয় ঢেউয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টানতে চাচ্ছিনা, করোনা ব্যবস্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রে সরকার থেকেও নেই। বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির বিশ্ব গুরুর এই অবস্থা কারো কাঙ্ক্ষিত ছিলনা। ক্ষ্যাপাটে  রাষ্ট্রপতি আর হোয়াট সুপ্রিমেসীর বিপুল সমর্থনের মূর্খতা একটি রাষ্ট্রকে বিশ্ব দরবারে কতোটা হাসি তামাশায় খাটো করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র তার উদাহরণ। উদাহরণ দিচ্ছি  কানাডার। সরকারের কোভিড ব্যবস্থাপনায় অবহেলা ছিল না। দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির বিপর্যয় ঠেকাতে সরকার অর্থনীতি আর কোভিড ব্যবস্থাপনায় একটি চেক এন্ড ব্যালন্সের পথে হাঁটছে। মার্চ-এপ্রিল-মে মাসের সংকট কাটিয়ে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই সামারটায় পরিস্থিতির বেশ উন্নতি হয়েছিল, ফলে অর্থনীতির চাকা সচল করতে শিথিল হয়েছে অনেক বিধিনিষেধ। দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমণ হার অনেক বেশী হলেও মৃত্যুর হার অনেক কমে যাওয়াতে বিধিনিষেধ মানতে শিথিলতা বা সচেতনতার অভাব ছিল স্পষ্ট, কিছু উগ্রপন্থীদের মাস্ক বিরোধী আর অক্সিজেনের তথাকথিত দাবীতে মিছিল এরকম নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক আর কালচারাল কারণে দ্বিতীয় ওয়েভে সংক্রমণ মূলত লাগামহীন হয়ে পড়ছে।  সামার ভেকেশনের পর স্কুল কলেজ খুলে দেওয়াটা সম্ভবত সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না। সরকার এখন কঠোর বিধি নিষেধ দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করছে। জুন জুলাই আগস্ট আর সেপ্টেম্বরে প্রথম দিকে বিধি নিষেধ শিথিল থাকার পরও পরিস্থিতি এতটা খারাপ হয়নি, যা সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে শুরু হয়েছে এবং ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। তাপমাত্রার বিষয়টি এজন্যেই আলোচনায় আসছে। অস্ট্রেলিয়ায় শীতকাল তো বেশ ঝামেলা বাঁধিয়ে দৈনিক সংক্রমণ ৭০০ তে উঠে গিয়ে এখন ওদের সামারে গ্রাফ অতি নিম্নমুখী হয়ে  দৈনিক সংক্রমণ ২০ এর নীচে নেমে এসেছে।

এবার ফিরে দেখি জাপানের অবস্থা। গত কয়েক মাস যাবৎ জাপানের পর্যটন শিল্পকে বাঁচাতে চলছে গো টু ট্রাভেল প্রচারণা। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এই প্রচারণায় জড়িয়ে আছেন প্রধানমন্ত্রী সহ জাপান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্তাগণ। বিদেশ ভ্রমণে জাপানিদের অবস্থান বিশ্বে শীর্ষে। কোভিড সংকটে বিদেশ ভ্রমণ সম্ভব না হওয়ায় আভ্যন্তরীণ ভ্রমণে বাড়ছে আগ্রহ। ফলে পঞ্চাশ শতাংশ হ্রাসকৃত খরচে, বিমান, রেল, বাস, হোটেল, রেস্তোরাঁর এই আকর্ষণীয় প্যাকেজ বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। এর ফলে  নীরব হয়ে যাওয়া  বিমানবন্দর সহ বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র আবার সরব হতে শুরু করে। করোনাকালের ক্লান্তি থেকে  মুক্তি পেতে ভ্রমণ পিপাসু জাপানীরা লুফে নিচ্ছে এই অফার। আইন মেনে চলায় অভ্যস্ত জাপানিরা ভ্রমণ করছে আইন মেনেই কিন্তু কোভিডের  সাথে জনসমাগমের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে যা দিনশেষে পরিস্থিতি অবনতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থায় সরকার গো টু ট্রাভেল প্রচারণার লাগাম টেনে ধরছে। সরকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা চাচ্ছে না, একদিকে অর্থনীতি অন্যদিকে ৫ টি “এস” এর উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই ৫ টি এস মূলত কোভিড মাইক্রো ম্যানেজমেন্টের অংশ, দীর্ঘ ৯ মাসের কোভিড সংকটে এটি পরিস্কার হয়ে গেছে ভ্যাকসিন বা ড্রাগবিহীন অবস্থায় মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট অনেক বেশী কার্যকরী। পাঁচটি এস হচ্ছে কম সংখ্যক মানুষ  (Small numbers of people), স্বল্প সময়ের ছোট সমাগম (Short gatherings of approximately one hour), আস্তে কথা বলা (Speak quietly), খাবার এক পাত্র থেকে শেয়ার না করে যার যার পাত্রে পরিবেশন (Split food onto individual plates, rather than sharing from one) মাস্ক, সেনিটাইজারের সঠিক ব্যবহার (Sensible use of face masks, disinfectant and frequent ventilation)।

আমরা ভ্যাকসিনের আশায় আছি। ভ্যাকসিন নিয়ে আমার কয়েকটি কলামের বক্তব্যের একই ধারায় নভেম্বর ডিসেম্বর নাগাদ ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের আশাবাদ পূরণ হতে চলেছে। ফাইজার আর  মর্ডানার ভ্যাকসিনের এফডিএ’র জরুরী  ব্যবহার অনুমোদন সংক্রান্ত মিটিং ডিসেম্বরের মাঝামাঝি নাগাদ আশা করা যাচ্ছে। ভ্যাকসিন উদ্ভাবন তো শেষ কথা নয়,  ভ্যাকসিনের উৎপাদন আর সাপ্লাই চেইনের মত জটিল পরিস্থিতি উৎরানোর জন্যে যথেষ্ট সময়ের দরকার। তাছাড়া এ পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখা আরএনএ  ভ্যাকসিনের  অতি নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ আর বিতরণের বাড়তি জটিলতা ভ্যাকসিন প্রাপ্তিতে বিলম্ব ঘটাবে। কানাডার মত উন্নত দেশগুলো মাইনাস ২০ বা মাইনাস ৭০ ডিগ্রী পরিবহণ, সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় লজিস্টিকে  বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিন্তু এই অবকাঠামো গরীব দেশগুলোর জন্যে দুরূহ এক চ্যালেঞ্জ। অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনে অবশ্য বিতরণ আর সংরক্ষণে তাপমাত্রা (১০ ডিগ্রী সেন্ট্রিগ্রেডের নীচে) কোন সমস্যা নয়।

ভ্যাকসিন প্রাথমিক পর্যায়ে  কোভিড লড়াইয়ে লিপ্ত ফ্রন্ট লাইন কর্মীদের জন্যে উৎসর্গিত হবে। বিশ্বময় সাধারনের নাগালের মধ্যে আসতে ৬ মাস থেকে বছর বা তারও বেশী সময় লেগে যাবে। ভ্যাকসিন সাধারনের নাগালে আসা পর্যন্ত কোভিডের ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণে জাপানিজ মাইক্রো ম্যানেজমেন্টের  ৫টি “এস” মেনে চলা ছাড়া গত্যন্তর নেই।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান