রাষ্ট্র পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে- সেই আলোচনা জরুরী

Sun, Nov 22, 2020 12:26 PM

রাষ্ট্র পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে- সেই আলোচনা জরুরী

শরিফুল হাসান: বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার নিয়ে ফের আলোচনা চলছে। আলোচনা চলছে বেগমপাড়া নিয়ে। রাজনীতিবিদরা বেশি টাকা পাচার করে এমন প্রচলিত ধারণা থাকলেও আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সরকারি চাকুরেরা বেশি টাকা পাচার করছে। এরই মধ্যে আজ অর্থপাচারকারীরা জাতীয় বেইমান ও দেশের শত্রু মন্তব্য করে দেশের উচ্চ আদালত আগামী ১৭ ডিসেম্বরের মধ্যে পাচারকারীদের একটা তালিকা দিতে বলেছে।

টাকা পাচার নিয়ে বহুবার লিখেছি। সরকারি কর্মকর্তা নাকি রাজনীতিবিদ কে বেশি পাচার করে সেই আলোচনার চেয়েও জরুরী রাষ্ট্র পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে? এই সমস্যারই বা সমাধান কী?

এই তো এই বছরের ৫ আগস্টই একটা লেখায় বলেছিলাম, মন্ত্রী-সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে সব জনপ্রতিনিধি এবং সচিব থেকে শুরু করে সব সরকারি কর্মকর্তাদের একটাই পাসপোর্ট হবে বাংলাদেশের। বাংলাদেশ ছাড়া আর কোন দেশের পাসপোর্ট থাকতে পারবে না। দেশের বাইরে তাদের কোন বাড়ি এবং সম্পদ থাকবে না। তারা নিজেরা এবং তাদের সন্তানদের সবার আগে দেশের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাবেন। তারা গণপরিবহনে চড়বেন। তাদের সন্তানেরা পাবলিক স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া তারা সবসময় সরকারি সব সেবা নিতে বাধ্য থাকবেন। দেখবেন বাংলাদেশটা বদলে যাবে।

ভেবে দেখেন, আপনি জনপ্রতিনিধি, মন্ত্রী-সংসদ সদস্য-আমলা কথায় কথায় তারা দেশের মঙ্গলের কথা বলেন, দেশসেবা করছেন বলেন অথচ নিজেরা সরকারি হাসপাতালে যান না। সরকারি স্কুলে সন্তানদের পড়ান না।

বছর ছয়েক আগে ঢাকার সবগু‌লো সরকা‌রি প্রাইমা‌রি স্কুলের অবস্থা নিয়ে একটা লিড রিপোর্ট করেছিলাম। আমাদের বেশিরভাগ সরকারি কর্মকর্তাদের স্ত্রীরা সেখানে শিক্ষক।কিন্তু তাদের সন্তানরা সেখানে পড়েন না। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক তো দূরের কথা সেখানকার আয়া-দপ্তরীরাও তাদের সন্তানকে সরকারি প্রাইমারিতে পড়ান না। তার মানে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের আস্থা নেই। সরকারি হাসপাতাল থেকে শুরু করে সব জায়গায় একই অবস্থা।

আমি মনে করি এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একটাই উপায়, জনপ্রতিনিধি ও সরকারি চাকুরিজীবীদের সরকারি সেবা নিতে বাধ্য করা। আমি ভীষনভাবে বিশ্বাস করি জনপ্রতিনিধি ও সচিব আমলারা এক মাস বাসে চড়লে বাস সেবার মান উন্নত হয়ে যাবে। একমাস তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে সেখানকার সমস্যা বুঝবেন, সমাধানও বের হবে।

দেশের প্রতিটা সমস্যার সমাধান একইভাবে হবে।

নীতি নির্ধারকরা আশা করছি বিবেচনা করবেন। আরেকটা কথা এই দেশ থেকে যারা বিদেশে টাকা পাচার করে, যারা বেগমপাড়ায় কিংবা মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম করে তারা কেউ কিন্তু এই দেশের কৃষক বা সাধারণ মানুষ নয়। তারা সব প্রভাবশালী মানুষ। কাজেই তাদের নামের তালিকাটাও জনগনকে দিতে পারেন।

আমার মনে আছে, বছর চারেক আগে সিপিডি তাদের এক গবেষণায় বলেছিল, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৫ হাজার ৫৮৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার। টাকার অঙ্কে যা ৪ লাখ ৪১ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। এই অর্থ এবারের বাজেটের চেয়েও ১ লাখ কোটি টাকা বেশি। তারা আরও বলেছিলম স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মধ্যে অর্থ পাচার সবচেয়ে বেশি হয়েছে বাংলাদেশ থেকেই।

তখন আরও জেনেছিলাম, সুইস ব্যাংকসমূহে বাংলাদেশি নাগরিকদের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা নাকি দ্বিগুণ বেড়েছে। আর মালয়েশিয়ায় ‘মাই সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচিতে গত ১৩ বছরে ৩ হাজার ৬১ জন বাংলাদেশি অর্থ পাঠিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। এর চেয়ে বেশি মানুষ গেছে চীন ও জাপান থেকে।

চিন্তা করেন চীন-জাপানাদিরে পরেই বাংলাদেশি। অবশ্য শুধু মালয়েশিয়া নয় অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করে নাগরিকত্ব নেওয়ার সুযোগ নিচ্ছেন অসংখ্য বাংলাদেশি। রাষ্ট্রের কাছে আমার শুধু চাওয়া কারা এই মানুষ তাদের নামের তালিকাটা প্রকাশ করেন। আর আমাদের সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধের একটাই পাসপোর্ট হোক বাংলাদেশের। আমি জানি না রাষ্ট্র কখনো এগুলো করবে কী না। কারণ পাচারকারীরা তো আর আমজনতা নয়, তারাই যে এই দেশের নীতি নির্ধারক। তবুও আশায় থাকি যদি কোনদিন তাদের হুশ ফেরে।

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক।

লেখকের ফেসবুক পোষ্ট


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান