সন্ধ্যে প্রদীপের আলোয় আলোকিত হোক পাঠ্যবইয়ের পাতা

Fri, Nov 13, 2020 12:37 PM

সন্ধ্যে প্রদীপের আলোয় আলোকিত হোক পাঠ্যবইয়ের পাতা

জুলফিকার বকুল : শিক্ষা মানুষের উন্নত জীবন গঠনের পথকে প্রসারিত করে।কারণ, শিক্ষার মাধ্যমে সমাজের ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় হয়।সমাজের অন্তর্গত মানুষের মধ্যে গড়ে উঠে সুস্থ পারস্পরিক সম্পর্ক। শিক্ষার মাধ্যমেই সমাজের বৃহত্তর স্বার্থ ও নাগরিক অধিকার বজায় থাকে। সমাজ জীবনে সম্প্রীতি সৃষ্টি হয়।উপযুক্ত শিক্ষার প্রভাবে সমাজের মানুষ সমাজ সচেতন, দায়িত্বশীল ও কর্তব্য পরায়ণ হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।এ জন্য যথার্থ শিক্ষিত একজন মানুষ সংকীর্ণ ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব মুক্ত থাকতে পারে।তাই শিক্ষা হলো সমাজের উচ্চতর সোপানগুলোতে উন্নীত হওয়ার জন্য সাহায্যকারী ও গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার। যা দ্বারা সমাজের মানুষের সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়।এটি একটি নিরবিচ্ছিন্ন চলমান প্রক্রিয়া যা অর্জনের মাধ্যমে সমাজস্থ ব্যক্তি মার্জিত, পরিশীলিত,রুচিবোধসম্পন্ন,জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত, আত্মনিয়ন্ত্রিত সুনাগরিক হয়ে গড়ে উঠে।তাই সামাজিক জীবনে শিক্ষার মর্মার্থ অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। আর ব্যক্তি জীবনে শিক্ষা মানুষকে কতটা উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে তা বাস্তবতার আলোকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনুধাবন করা যেতে পারে।তবে যাইহোক, মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টিই শিক্ষার মূল লক্ষ্য এ কথা চির শাশ্বত।

এই লব্ধ জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজন শিক্ষালয়।যেখানে শিক্ষার্থী তার চরিত্র গঠন ও ব্যক্তিত্বের বিকাশ সাধনের সুযোগ পায়।একটি বিদ্যালয় শিক্ষার্থীর বয়স,মানসিক প্রকৃতি,অনুরাগ ও রুচি অনুযায়ী জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে।এখান থেকেই শিক্ষা লাভ করে শিক্ষার্থী বৃহত্তর সমাজ জীবনে প্রবেশ করার পথ তৈরী করে। কাজেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনের জন্য একটি শিক্ষার্থীকে নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যাবসায় ও নিয়মিত অধ্যয়ণের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের মূল্যায়ণের জন্য নিজেকে প্রস্তত করতে হয়।কারণ, একটি ভাল ফলাফল তার আগামি দিনের লক্ষ্যে পৌছাতে প্রেরণা ও গতিশীলতা তৈরী করে।

একটা সময় শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট একটি রুটিন মাফিক পড়ালেখা করতো। গ্রামে দেখতাম স্কুল ছুটির পর বই-খাতা বাড়ীতে রেখে কোন রকমে খাওয়া শেষ করে শিক্ষার্থীরা ছুটে চলে যেত খেলার মাঠে।খেলাধূলা চলতো ঠিক সন্ধ্যা হওয়ার আগ মূহুর্ত পর্যন্ত। এরপর সবাই ফিরে যেত যার যার বাড়ীতে। বাড়ীতে গিয়ে হারিকেনের চিমনি মুছে ফিতায় আগুন দিতেই জ্বলে উঠতো চারি দেয়ালে আবদ্ধ কাঁচের মধ্যে আলোকিত প্রদীপ। এটা ছিল শিক্ষার্থীর জন্য নিত্য দিনের কাজ।নইলে অভিভাবকদের বকা, কোন কোন সময় লাঠিও খেতে হতো।তারপর পড়ার টেবিলে উচ্চস্বরে চলতো পাঠবইয়ের পাঠ। পরীক্ষার সময় হলে ভোর রাতেও জ্বালাতে হতো ঐ সোনালী রঙের প্রদীপ শিখাটিকে।

আজ সেই খেলার মাঠ আছে কিন্তুু সে মাঠের সর্বত্র জুড়ে আছে প্রযুক্তির খেলা।যে খেলায় কেউ ফেইসবুক, কেউ ইউটিউব, কেউ বা আছে ইমোতে একাকার হয়ে।প্রযুক্তির আশীর্বাদে সেই হারিকেন অবমূল্যায়িত হলেও ঘর জুড়ে রয়েছে দীপ্তিময় সাদা আলোর বিচরণ।যে আলোয় বিশ্বকে হাতের মুঠোয় অনায়াসেই পাওয়া যায় আপন করে।পাঠ্য বইও আছে হয়তো, কেবল নেই সেই অভিভাবক। নেই সেই সময়। সময়ের পরিবর্তন মানুষকে প্রযুক্তির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মানুষের জীবনযাত্রা হয়েছে আরামপ্রদ।কিন্তু বইয়ের সাথে শিক্ষার্থীর সখ্যতার বিচ্ছেদ হয়েছে কালের আবর্তে। বইয়ের প্রতি যে মমত্ববোধ,যত্নশীলতা ও আগ্রহের টান ছিল তা এখন অনেকাংশে দুর্বল হয়ে গেছে।তথ্য-প্রযুক্তির বিস্ময়কর আবিষ্কার নতুনত্বের প্রতি মানুষ অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।কিন্তু  ইলেকট্রনিকস ডিভাইস জ্ঞানের ভান্ডারকে নিয়ন্ত্রণে নিলেও বই চিরকালই জ্ঞানের সংরক্ষক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে যাবে।তাই বই সবসময়ই মানুষের পরম বন্ধু। যা শুধু মেধা বা জ্ঞান বৃদ্ধি করে না বরং বই পড়লে মানুষ হয়ে উঠে কর্মোদ্যম, সহনশীল ও সহমর্মি। একটি ভাল বা দামী মোবাইল কিংবা কম্পিউটারে ভাল-মন্দ দুটোই থাকে।কিন্তু একটি ভাল বা মূল্যবান বইয়ে শুধু ইতিবাচক ভাবধারা বর্ণিত থাকে।ফলে একটি ভাল বই পড়ার সময় নেতিবাচক চিন্তা মেমোরিতে জায়গা নিতে পারে না।

প্রযুক্তি তখনই আশীর্বাদ স্বরুপ যখন তার অবদান মানব কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।এ আশীর্বাদকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীরা যদি তথ্য ও জ্ঞান অর্জনের জন্য এসব ডিভাইস ব্যবহার করে তবে নতুন ও তরুণ প্রজন্মকে বিশ্বায়নের যুগে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।আর যদি প্রযুক্তির নেতিবাচক দিক অনুসরণ করে জীবনকে চালিত করে তবে তা হবে ধ্বংশাত্মক আত্মঘাতী পদক্ষেপ। অপর দিকে একটি ভাল বই একটি ভাল মন তৈরী করতে পারে।জাগ্রত করে মানবিক মূল্যবোধ।তাই শিক্ষার্থীর জন্য নিয়মিত নিয়মানুবর্তিতার সাথে বই পড়া তার জীবনের জন্য প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিভিন্ন তথ্য,ধারণা,ব্যাখ্যা ইত্যাদির সাহায্য নেওয়ার জন্য মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার করা যেতে পারে।কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে অধ্যয়ণকালীন সময় কোন ভাবেই যেন এর অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারে সময় ও একাগ্রতা নষ্ট না হয়।একটা নির্দিষ্ট সময় করে বিনোদন মূলক কিছু দেখা বা বন্ধুদের সাথে কথা বলা যেতে পারে।তবে বিনোদন মূলক ইভেন্টগুলো সাময়িক আনন্দ দেয়ার পাশাপাশি যেন শিক্ষনীয় বা শিক্ষা সম্বন্ধনীয় উৎসাহ প্রদান করে সে দিকে বিশেষ নজর রাখাটা জরুরি। কারণ,তাকে ভুলে গেলে চলবে না যে সে একজন শিক্ষার্থী। তার শিক্ষাজীবনের অর্জনগুলোই পরবর্তী কর্মজীবন ও ব্যক্তি জীবনে প্রতিফলিত হবে।জ্ঞান চর্চা মানুষকে যেমন মহাপ্রাণ করে তোলে তেমনি চিত্তকে মুক্তি দেয়।মানবাত্মাকে জীবনবোধে বিকশিত করে।জাগ্রত করে মনুষ্যত্ববোধ।শিক্ষার্থী থাকাকালীন অবস্থায় তার একমাত্র কাজই হলো জ্ঞান আহরণের জন্য ছুটে চলা।এজন্য   শিক্ষার্থীকে পড়ার টেবিলে পাঠ্যবইয়ে মনোযোগী হতে হবে ঠিক আগেকার মতই। শুধু বসতে হবে সময়ের গতিধারায় সৃষ্টি হওয়া নতুন পরিবেশে নতুন কোন আলোকিত প্রদীপের বিচ্ছুরিত আলোর নিচে কোন এক সুসজ্জিত টেবিলে।তখন পাশে কোন শিক্ষক বা শিক্ষিত ব্যক্তি ছিলনা আর এখন পাশে আছে প্রযুক্তির তৈরী অভিজ্ঞ শিক্ষক। এটা তো চরম সৌভাগ্য। যার নির্দেশনা ও বদৌলতে  জানা এবং শেখার আগ্রহ থাকবে অন্তহীন।নিজের মাঝে বিশ্বকে খোঁজার আনন্দ তাকে সপ্ন জয়ের পথের সুনির্দিষ্ট সন্ধান দিবে।তারুণ্য মহা দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাবে সাফল্যের দিকে।এ দেশ গর্বিত সন্তানদের নিয়ে মাথা উচু করে দাঁড়াবে বিশ্ব দরবারে। শিক্ষিত, উন্নত জাতি হিসেবে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হবে লক্ষ শহীদের রক্তে গড়া বাঙালির প্রিয় বাংলাদেশ।

লেখক: জুলফিকার বকুল,শিক্ষক, ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল, গাজীপুর।

 


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান