বিশ্বাসের হাত ধরে অন্ধকার আনন্দ-যাত্রা!

Sun, Nov 1, 2020 2:38 PM

বিশ্বাসের হাত ধরে অন্ধকার আনন্দ-যাত্রা!

ফরিদ আহমেদ: প্রতিটা ধর্মই মানুষকে দিয়েছে সৃষ্টির সেরা জীবের মর্যাদা। ইসলাম ধর্মেতো আশরাফুল মখলুকাত নামের একটা শব্দ-গুচ্ছই তৈরি হয়েছে এ নিয়ে। জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, বুদ্ধিতে মানুষ সবার থেকে সেরা। শুধু ধর্মগুলো নয়, বিবর্তন কিংবা বিজ্ঞান থেকেও আমরা জানি মানুষ অন্য যে কোনো প্রাণীর চেয়ে বুদ্ধিমত্তায় এগিয়ে রয়েছে বহুগুণ। তার রয়েছে যুক্তিবোধ, তর্ক করার ক্ষমতা, সৃষ্টিশীল ভাবনা ভাবার অসীম সক্ষমতা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবার প্রবণতা।

এমন একটা উন্নত প্রাণী, যে কিনা জানা যে কোনো প্রাণীর চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান, তারও রয়েছে জড় ভাবনা ভাবার এক সীমাহীন ঝোঁক। বিচিত্র কোনো কারণে সে বিশ্বাস করতে পছন্দ করে। এই বিশ্বাস কোনো যুক্তি থেকে আসে না, আসে না কোনো গবেষণার মাধ্যমে সত্য হয়ে। সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই সে বিশ্বাস করে, বিশ্বাস করে সুখ পায়, স্বস্তি অনুভব করে। সে বিশ্বাস করে আকারহীন কোনো ঈশ্বর আছে, পাথর-খণ্ডে প্রাণ আছে। নিজের বানানো মাটির মূর্তিকেও দেব-দেবী বানিয়ে সেকি পূজা-পার্বণ করার ভক্তিময় প্রয়াস তার।  যেখানে যুক্তিতর্ক করে, যাচাই-বাছ করার মাধ্যমে সত্যকে গ্রহণ করার কথা মানুষের, সেখানে বিশ্বাসী মানুষেরা বিশ্বাসকে আগে বিশ্বাস করে তারপর সেই বিশ্বাস যে সত্য, সেটা প্রমাণের জন্য হন্যে হয়ে যুক্তি খোঁজে, বিজ্ঞানের কাছে ধর্ণা দেয়।  শুধুমাত্র একটা বিশ্বাস হলেও কথা ছিলো, নানা ধরনের বিচিত্র বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয় সে। এই বিশ্বাসের জন্য নিজের জানতো কবুল করতেই পারে, অন্যের জান নিয়ে নিতেও দ্বিধা করে না তারা।

হুমায়ুন আজাদ তাঁর 'বিশ্বাসের জগত' প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “পাঁচ হাজার বছর ধরে মানুষ জন্ম নিয়েই দেখছে তার জন্যে প্রাণপণে প্রস্তুত হয়ে আছে পূর্বনির্ধারিত বিভিন্ন বিশ্বাসের জগত। নিজের জন্যে কোনো বিশ্বাস খুঁজে বের করতে হচ্ছে না তাকে, জন্মেই দেখছে পরিবার ও সমাজ, কখনো কখনো রাষ্ট্র, তার জন্যে বিশ্বাস তৈরি ক'রে রেখেছে, মনে করছে ওইটিই শ্রেষ্ঠ বিশ্বাস, এবং তাকেও পোষণ করতে হবে ওই বিশ্বাস। মানুষ জন্ম নিচ্ছে, বেড়ে উঠছে, পূর্বপ্রস্তুতি বিশ্বাসের মধ্যে; তার জন্যে বিশ্বাসের জামাকাপড় শেলাই করা আছে, তার দায়িত্ব ওই জামাকাপড়ের মধ্যে ঢুকে প'ড়ে শান্তি পাওয়া। বিশ্বাসী হওয়া প্রশংসিত ব্যাপার; প্রথাগতভাবে ভালো মানুষ, সৎ মানুষ, মহান মানুষ বলতেই বোঝায় বিশ্বাসী মানুষ। তারা কী বিশ্বাস, তা বিবেচনার বিষয় নয়, বিবেচনার বিষয় হচ্ছে তারা বিশ্বাস করছে; তাই তারা ভালো, সৎ এমনকি মহৎ। পৃথিবী জুড়ে মানুষ গ'ড়ে তুলেছে বিচিত্র বিশ্বাসের জগত, বিশ্বাস দিয়ে তারা ভাগ ক'রে ফেলেছে বিশ্বকে, তারা কাউকে বিশ্বাসের জগতের বাইরে থাকতে দিতে রাজি নয়। একটা কিছু বিশ্বাস করতে হবে মানুষকে, বিশ্বাস না করা আপত্তিকর। আপনার পাশের লোকটি স্বস্তি বোধ করবে যদি জানতে পারে আপনি বিশ্বাস করেন, তার বিশ্বাসের সাথে আপনার বিশ্বাস মিলে গেলে তো চমৎকার, আর খুবই অস্বস্তি বোধ করবে, কোনো কোনো সমাজে আপনাকে মারাত্মক বিপদে ফেলবে, যদি সে জানতে পারে আপনি বিশ্বাস করেন না। বিশ্বাস কয়েক হাজার বছর ধ'রে দেখা দিয়েছে মহামারী-রূপে; পৃথিবীর দীর্ঘস্থায়ী মহামারীর নাম বিশ্বাস।"

মানুষের মতো একটা বুদ্ধিমান, যুক্তি-বোধসম্পন্ন প্রাণীর ক্ষেত্রে কোনো যাচাই-বাছাই না করেই এ'রকম অন্ধের মতো কোনো কিছুতে বিশ্বাস করাটা বেশ আশ্চর্যজনকই। এই আশ্চর্যজনক ঘটনাটা ঘটানো হয় জন্মের পর থেকে। প্রতি মুহূর্তে একটা বাচ্চার বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, সমাজ, কিংবা রাষ্ট্র তার মনের মধ্যে গেঁথে দিতে থাকে তাদের বিশ্বাসের বীজ। যে বিশ্বাস একদিন তাদের মধ্যেও ঢুকিয়ে দিয়েছিলো তাদের বাবা-মা কিংবা আশেপাশের মানুষ। যে কারণে, দুই একটা ব্যতিক্রম বাদে মুসলিম পরিবারে জন্মানো কেউ যেতে পারে না ইসলাম ধর্ম বিশ্বাসের বাইরে, বোরাকের ডানায় ভেসে সাত আসমান পার হবার আজগুবি গল্পে বিশ্বাস করতে হয়। হিন্দু ধর্মে জন্ম নেওয়া কারো পক্ষেও সম্ভব হয় না মাটির তৈরি সামান্য মূর্তিকে দুই পায়ে দলে যাবার। নিজেদের সামান্য জড় সৃষ্টির সামনে নতজানু হয়েই জীবন কাটে তাদের। পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের এই বিশ্বাসের জগতের বাইরে নিয়ে গিয়ে কোনো বাচ্চাকে বড় হতে দিলে, নিশ্চিতভাবেই সেই বাচ্চা বিশ্বাস-হীন হয়ে বেড়ে উঠবে। কাজেই, জন্মেই আমি এই ধর্মের প্রেমে পড়ে গিয়েছি, এটাই সেরা ধর্ম, এগুলো বিশ্বাসী মানুষের নিজেকে প্রবোধ দেওয়া ছাড়া কিছুই নয়। ফ্যাক্ট হচ্ছে, আজকে যিনি ইসলামের জন্য জান কবুল করে দিচ্ছেন, হিন্দুদের মূর্তিপূজা নিয়ে হাসাহাসি করছেন, তাঁর বাবা-মা হিন্দু হলে, হিন্দু পরিবারে বেড়ে উঠলে, এই একই মানুষ পরম ভক্তিভরে মূর্তির পায়ের কাছে গড়াগড়ি খেতেন।

স্যাম হ্যারিসের নাতিদীর্ঘ একটা বই আছে। বইটার নাম 'লেটার টু এ ক্রিশ্চান ন্যাশন'। সেই বইতে  তিনি বলেছেন, খৃস্টানরা বিশ্বাস করে বাইবেল হচ্ছে ঈশ্বর রচিত গ্রন্থ, যীশু মৃত্যুর পরে আবার ফিরে আসবেন। অন্য সব ধর্মকে, ধর্মগ্রন্থকে এবং প্রেরিত পুরুষদের ভ্রান্ত বলে মনে করে তারা। অন্যদিকে, একজন বিশ্বাসী মুসলমানও একজন বিশ্বাসী খৃস্টানের মতো করেই নিজস্ব ধর্মে বিশ্বাস করে। অথচ, সেই বিশ্বাসকে বিশ্বাস করতে খৃস্টানদের মধ্যে প্রবল আপত্তি দেখা দেয়। কোরানে বারেবারে বলা আছে এটা আল্লাহ-র লিখিত একমাত্র প্রকৃত-গ্রন্থ। মুহাম্মদ হচ্ছে তাঁর প্রেরিত পুরুষ। এইসব দাবিকে ভুল প্রমাণ করতে না পারলেও এই বিশ্বাসকে বর্জন করতে খৃস্টানদের কোনো আপত্তি নেই। বরং এগুলো ভ্রান্ত বিশ্বাস বলে মনে করে তারা। মুসলমানদের ঘাড়ে প্রমাণ করার দায় চাপিয়ে দেয়। কিন্তু, নিজেদের বিশ্বাসের পক্ষেও তারা কোনো প্রমাণ দিতে পারে না। নিজেদের বিশ্বাসকে প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস করতে সমস্যা নেই, কিন্তু অন্যের বিশ্বাসকে প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস করা যাবে না কিছুতেই। মজার বিষয় হচ্ছে, খৃস্টানরা ঠিক যে কারণে ইসলাম ধর্মকে মিথ্যা বলে ভাবে, ঠিক একই ধরনের কারণে মুসলমানরাও খৃস্টান ধর্মকে মিথ্যা হিসাবে বিবেচনা করে। স্যাম হ্যারিসের বক্তব্য হচ্ছে, আমি একই দৃষ্টিকোণ থেকে সব ধর্মকেই মিথ্যা বলে মনে করি।

বিশ্বাসের সাথে অন্ধকারের এক গভীর সম্পর্ক দেখতে পেয়েছিলেন হুমায়ুন আজাদ। বিশ্বজগতে আলো জ্বালার পরিবর্তে বিশ্বাস যে অন্ধকারকেই ছড়িয়ে দিচ্ছে চারিপাশে, সেটা নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিলো না তাঁর মনে। তাঁর ভাষায়, “বিশ্বাসের সাথে অন্ধকারের সম্পর্ক গভীর, বিশ্বাস অন্ধকারের আত্মজ; আলোর সম্পর্ক তার কম বা নেই। অন্ধকারের কাজ হচ্ছে বস্তুকে অদৃশ্য করা, তার রূপরেখাকে রহস্যময় করা; আলোর কাজ তাকে দৃশ্যমান করা; অন্ধকার রহস্য সৃষ্টি করে, আলো ঘোচায় রহস্য। আলোকিত ঘরে রহস্য নেই, দিনের বেলা রহস্য নেই; কিন্তু অন্ধকার ঘরে রহস্য বোঝাই, রাত রহস্যে পূর্ণ। বিশ্বজগত মানুষের কাছে অন্ধকার ঘর বা রহস্যময় রাতের মতো, তার অধিকাংশ এলাকা মানুষের অজানা, আর যতোটুকু জানা, তাও সবাই জানতে চায় না, অন্ধকারই তাদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়।"

বিশ্বাসের হাত ধরে অন্ধকার আনন্দ-যাত্রায় অংশ নিতে আগ্রহের কমতি নেই মানুষের। আপত্তিটা বরাদ্দ থাকে শুধুমাত্র আলোময় পথে হাঁটার ক্ষেত্রে।

লেখকের ফেসবুক পোষ্ট


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান