ব্র্যাকের মেন্টরিং প্রশিক্ষণ আজ সময়ের দাবি

Sun, Oct 18, 2020 9:52 PM

ব্র্যাকের মেন্টরিং প্রশিক্ষণ আজ সময়ের দাবি

মোঃ কায়ছার আলী :মানুষ একতাবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে চায়। জীবনের একটা সময় প্রত্যেকে নিজেদের বন্ধুর মত প্যান্ট-শার্ট, চশমা পরিধান করে তাদেরকে অনুসরণ করতে পছন্দ করে তখন মানব শিশু একটা কঠিন সময় অতিবাহিত করে। সে সময়টাকে টিনএজ বা এডোলসেন্স পিরিয়ড (থার্টিন টু নাইনটিন) বলে। এই কিশোর বয়সে তারা নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চায়। তারা জবাবদিহিতা, দায়বদ্ধতা বা নীতি নৈতিকতার ধার ধারে না। সে সময় তারা সমবয়সী বন্ধু বান্ধবদের প্রতি অন্ধ ভক্ত হয়ে যায়। পিতা-মাতা ও অভিভাবকদের কড়া শাসন তাদের পছন্দ হয় না। ফলে একটা মনঃস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। কেউ কেউ প্রিয় শিক্ষক শিক্ষিকাদের কথা একটু শুনে। তবে বেশি বেশি উপদেশ শুনতে চায় না। শিক্ষক ও অভিভাবকেরা চান ভাল শিক্ষার্থীরা যেন নিজেদের পড়াশোনার সাথে তাদের সমবয়সী শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিয়ে যাবার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই বিষয়টিকে সমবয়সী সহযোগীতা (ইংরেজিতে চববৎ অঢ়ঢ়ৎড়ধপয গবঃযড়ফ) বলা হয়। সমবয়সী সহযোগীতার মাধ্যমে যেসব ছেলে মেয়ে অন্য ছেলে মেয়েকে পরামর্শ দেয় তাদেরকে ইংরেজিতে মেন্টর এবং বাংলায় পরামর্শক বলা হয়। আর এই চলমান প্রক্রিয়াটিকে বা যার মাধ্যমে মেন্টর তাদের কাজটি সম্পূর্ণ করবে তাই হল মেন্টরিং। মেন্টর শব্দের আরেক অর্থ সারথী। আর এই সারথী নামটি দিয়েছেন কুড়িগ্রাম তথা বাংলাদেশের কৃতি সন্তান সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। সারথী মানে একসাথে চলা। একত্রে চলতে গেলে তাদেরকে উপদেশকারী উত্তম বন্ধু, বিশ্বস্ত সঙ্গী, সমবয়সী, সমমনা এবং মূল্যবোধ সম্পন্ন না হলে পরিপূর্ণ ভাবে মানায় না। পৃথিবীর প্রথম জন্মান্ধ গ্রীক মহাকবি হোমারের “ওডিসি মহাকাব্যে একটি চরিত্র গ্রীক আইল্যান্ড ইথাকার রাজা ইউলিসিস। তিনি ট্রয়ের যুদ্ধে গেলে তার ছেলে টেলিমেকাস কে তার বিশ্বস্ত, বিজ্ঞ বন্ধু মেন্টর এর কাছে রেখে যান। মেন্টর রাজার ছেলেকে নিজের মত করে দেখাশোনা, লালন পালন সহ সামগ্রিক বিকাশ ঘটান। মেন্টরের নেতৃত্ব দেওয়ার মত সকল গুনাবলী ছিল। নেতা সবাই হতে পারে না। যোগ্য নেতৃত্ব না হলে অনুসারীরা কারো নেতৃত্ব সহজে মেনে নিতে চায় না। কিশোর বয়স থেকে নেতৃত্বের গুণাবলী অর্জন করে একজন মেন্টার তার সহপাঠীদের নিজের মত করে এগিয়ে নিয়ে একসাথে চলবে এটাই মেন্টরিং প্রশিক্ষণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। মহৎ এ কর্মকান্ড সুষ্ঠ ভাবে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নিজেকে নিঃস্বার্থ ভাবে বিলিয়ে দিয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও ব্র্যাক তার পেইস প্রোগ্রামের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠান প্রধান, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সম্মানিত সদস্য, বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর দেখা গেল সম্মানিত শিক্ষকদের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কিছু ছাত্র/ছাত্রী বিদ্যালয়ে অনিয়মিত উপস্থিতি, লেখাপড়ায় অমনোযোগী, বড়দের সম্মান না করা, পরীক্ষায় বসতে অবহেলা, নেশা সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। সে সময় শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূলবোধের চরম অবক্ষয় ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্র্যাক পেইস মেন্টরিং কার্যক্রম শুরু করে। তারা ছয় দিনের টার্ক ভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল। এই কার্যক্রমে প্রতিটি ব্যাচে একই স্কুলের বিভিন্ন শ্রেণীর ২৫-৩০ জন শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যাতে তারা সরাসরি বিষয়গুলো জানতে পারে এবং নিজেদের বিদ্যালয়ে প্রয়োগ করতে পারে সেজন্য শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট স্কুলের একজন শিক্ষককেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক এবং মেন্টরিং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের পার্থক্য হচ্ছে অন্যান্য ক্ষেত্রে শিক্ষক প্রাপ্ত প্রশিক্ষণ সরাসরি ক্লাসে প্রয়োগ করেন কিন্তু মেন্টরিং প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শিক্ষক মূলত ছাত্র-ছাত্রীদের দিয়েই কাজ গুলো করান। লেখাপড়ায় যারা ভালো যাদের সহযোগীতামূলক মনোভাব আছে। সদস্যদের ভালোভাবে বোঝাতে সক্ষম, দলের অন্যান্য সদস্যরাও যার কথা বেশি শোনে তাদের দিয়েই মেন্টর তৈরি করা হয়। মেন্টরগণ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে অন্যান্যদের ছোট ছোট দল গঠন করে (৫ থেকে ১০ জন) অপেক্ষাকৃত কম মানের শিক্ষার্থীদের সার্বিক সহযোগীতা করে। কৈশোর বয়সে শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য লেখাপড়ার পাশাপাশি গান, আবৃতি, খেলাধুলা, অভিনয়, ছবি আকাঁ, বির্তক প্রতিযোগিতা, উপস্থাপনা ইত্যাদি সহপাঠ্যক্রমিক কাজগুলো শেয়ার করে থাকে। এই কাজের মাধ্যমে লেখাপড়ার কোন ক্ষতি হয়না, বরং বিনোদনের মত তা কাজ করে। মেন্টরকে অবশ্যই সৃজনশীল, মূল্যবোধ, নীতি নৈতিকতা বিবেক সম্পন্ন, মেধাবী, নিয়মিত উপস্থিতি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নিজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সম্মিলিত ভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়। বছরে ৩-৪টি দেয়াল পত্রিকা, বির্তক প্রতিযোগীতা, লিখিত ভাবে দল গঠন করে দলের নাম, দলনেতার নামসহ অন্যান্য সদস্যদের নাম উল্লেখ করে দায়িত্ব প্রদান, আনন্দদায়ক সাপ্তাহিক সভার আয়োজনসহ বিভিন্ন দিবস, জাতীয় দিবস, সহশিক্ষা পাঠ্যক্রম কার্যাবলীর বাস্তবায়ন বা অন্যান্য অনুষ্ঠান উদ্যাপনের উদার মন মানসিকতা থাকতে হবে। পৃথিবী বিখ্যাত কিছু মেন্টর (১ম জন) ও মেন্টির (২য় জন) নাম উল্লেখ করছি। দার্শনিক সক্রেটিস-দার্শনিক প্লেটো, সুরকার জোসেফ হেইডেন-সুরকার বিটোভেন, ফাদার ভ্যানডারপিট-মাদার তেরেসা, ব্যবসায়ী ওয়ারেন বাফেট-ব্যবসায়ী বিল গেটস্, ডক্টর বেঞ্জামিন মেইস-মানবাধিকারকর্মী ড. মার্টিন লুথার কিং প্রমুখ। আজ আমাদের দেশের সমগ্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে অসংখ্য মেন্টর এবং মেন্টি আছে, নেই শুধু পরিকল্পনা মাফিক সঠিক প্রশিক্ষণ। মেন্টরিং প্রশিক্ষণে সারাদেশে কিছু নির্বাচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আলো জ্বালিয়েছিল ব্র্যাক। তাদের লাইব্রেরী আজও আছে, নেই দেখভালের লাইব্রেরিয়ান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আজ ব্র্যাকের কর্মকান্ড গুলো নিভু নিভু করছে যদিও তা মোটেই কাম্য নয়। অনাদর, অবহেলা আর অযতেœর ধুলোবালিতে মুক্তোর দানাগুলো (ভবিষ্যত প্রজন্ম) তাদের উজ্জ্বলতা সঠিক পরিচর্যার জন্য যেন মলিন না হয় সেদিকে দায়িত্ববানদের তথা সরকারকে বিশেষভাবে নজর দিতে বিনীত অনুরোধ করছি।।

লেখকঃ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান