বঙ্গবন্ধুর আক্ষেপ

Sat, Oct 10, 2020 10:32 PM

বঙ্গবন্ধুর আক্ষেপ

চৌধুরী জহিরুল ইসলাম : বঙ্গহন্ধুকে ভালবাসে না কে? বঙ্গবন্ধুকে নেতা মানে না কে? কেমন হতে পারতো বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী? কোন মন্ত্রে জাতি উজ্জিবিত হতে পারতো নতুন আরেকটি শতব্দির জন্য? বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা কেমন উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারতেন জাতির ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য?

এসব প্রশ্ন কি কখনো বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা করেছেন? নাকি তার মন্ত্রী, নীতিনির্ধারকরা? নাকি কখনো প্রয়োজন মনে করেছেন জাতির জন্য বঙ্গঁবন্ধুর ত্যাগ তিতিক্ষা ও আদর্শকে স্মরণ করার?

ভবনের চূড়ায় লম্বা ব্যানার টানিয়ে দিলেন। সেই ব্যনার বাতাসে ঝুলবে। ঝুলতে ঝুলতে এক সময় পুরনো হয়ে ধূলোয় লুটাবে! টেলিভিশনের পর্দার কোণে বঙ্গবন্ধুর লগো টানিয়ে দিলেন। বড় বড় ব্যানার ফ্যাস্টুনে জুড়ে দিলেন সড়ক দ্বীপ। তাতেই কি স্বার্থক হয়ে উঠবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী?

গতবছর ঠিক এমনি দিনে ঢাকায় গিয়েছিলাম এক মাসের জন্য। চার মাস পর এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে আবার গেলাম নিজের তিনটি বইয়ের প্রকাশনা উপলক্ষে। রাস্তায় চলতে ফিরতে বঙ্গবন্ধুর বিশাল বিশাল প্রতিকৃতি আর ব্যানার দেখলাম সরকারি ভবনগুলোর চূড়া থেকে ঝুলতে!

এসব দেখে আঁৎকে উঠেছিলাম। যে ভবনগুলোর কর্মচারি কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের পয়সায়, জনগণের করের টাকায় সেবা দেবেন, তাঁরাই কিনা দলীয় ভাবাবেগে আপ্লুত! কোন কর্মচারি সমিতি কত লম্বা ব্যানার টানাবে তারই প্রতিযোগিতা? এই প্রতিযোগিতা কি আসলেই বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে? তার ত্যাগ ও কর্মনিষ্ঠাকে বুকে ধারণ করে?

আশ্চর্যের বিষয় বাংলাদেশের মিডিয়ায় এই কদর্য ভাবাবেগ নিয়ে কোনই আলোচনা হতে দেখলাম না! সবাই স্রোতের টানে, গড্ডালিকা প্রবাহে সব মেনে নিয়েছেন। এমন কি বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম নিয়ে বাংলাদেশের মিডিয়ায় কথনো নিরপেক্ষ কোনো আলোচনা হয়েছে বলেও আমার নজরে আসেনি।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বাড়াবাড়িকে আমার মনে হয়েছে আতিশয্য। বরং এর পেছনে দুর্নীতি ও জনগণের কাছে জবাবদিহিহীনতার একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা। এমনিতেই গণতন্ত্র প্রায় নির্বাসনে। সুশাসনের অভাব। সেবাসংস্থাগুলো দুর্নীতিতে আকীর্ণ!

এর উপর বঙ্গবন্ধু প্রীতিকে কর্মচারি-কর্মকর্তারা তাদের দক্ষতা ও কর্মনিষ্ঠা প্রমাণের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। নিজেদেরকে ব্যাপকভাবে আওয়ামী লীগের পতাকার ছায়ায় নিয়ে এসেছেন। এ কারণে অযোগ্যরাই এখন ছড়ি ঘুরাচ্ছেন যোগ্যদের মাথার উপর!

আওয়ামী লীগের গত বারো বছরের টানা শাসনে সমালোচক এবং বিরুদ্ধবাদীরা ক্রমেই কোনঠাসা হয়েছেন। উগ্র এবং দুর্নীতিপপায়ণ, উড়ে এসে জুড়ে বসারাই সর্বস্তরে কর্তৃত্বের আসনে। যারা সৎ এবং নীতি-আদর্শের রাজনীতিতে ছিলেন অভ্যস্ত, তারা এখন কোনঠাসা!

আজ যখন সামাজিক অনাচার, ধর্ষণ ও মূল্যবোধের অবক্ষয় সহ্যের সীমা অতিক্রম করছে, তখন দেখা যাচ্ছে এগুলোর পেছনেও আছে নীতি-মূল্যবোধহীন এক শ্রেণীর আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ নেতা। অথচ বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের ত্যাগে গড়া এ সংগঠনটির এমন হওয়ার কথা ছিল না!

আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ কিংবা শ্রমিক লীগের নেতা-কর্মীদের কাছে বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শের সামান্য ছিঁটেফোটাও আজ আর অবশিষ্ট আছে বলে মনে হয় না! কেন্দ্র থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত একটি দলীয় গোষ্ঠী ছলেবলে কৌশলে কত দ্রুততার সঙ্গে কোটিপতি হওয়া যায়, সে চেষ্টাতেই লিপ্ত!

দেশে বেকারত্ব বাড়ছে হুহু করে। চরম হতাশ ও হতদ্যোম দেশের তরুণ প্রজন্মের সামনে কোনো রাজনৈতিক নির্দেশনা নেই। বঙ্গবন্ধু কন্যা যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১২ বছর আগে ক্ষমতায় এসেছিলেন তার সিংহভাগ আজ বিস্মৃত।

দেশে বেশ কিছু ভাগ্যবান কোটিপতি সৃষ্টি হয়েছেন সব পেশা ও প্রাতিষ্ঠানিকতাকে পঙ্গু করে। সাংবাদিকতা, বুদ্ধিবৃত্তি, শিক্ষা, সংস্কৃতি কিংবা যে কোনো অঙ্গনে দলবাজীতে সিদ্ধহস্তরা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন বাকি সবাইকে। এরা ভাবছেন- এদের ক্ষমতা বুঝি চিরকাল এমনই থাকবে! এরা এমন কি নিকট ইতিহাসের খবরও রাখে না!

বঙ্গঁবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছিল কিছু উগ্রপন্থী উচ্চাভিলাষী মেজর। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে তার প্রিয় বাঙালী জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল আওয়ামী লীগের যে কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, সেই একই গোষ্ঠী ভিন্ন নামে, ভিন্ন পরিচয়ে আজো দৃশ্যমান। এরা বঙ্গবন্ধু কন্যাকে ঠেলে দিচ্ছে সেই একই জনবিচ্ছিন্নতার পথে।

গত বইমেলায় উপস্থিত থেকে বঙ্গবন্ধুর উপর লেখা কয়েকটি বই কিনেছি। বেশিরভাগ বই বেড়িয়েছে বঙ্গবন্ধু কন্যার আনুকূল্য লাভের উদ্দেশ্যে। ঢাকায় যেমন অনেক ব্যবসায়ী গ্রুপের দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়, কিংবা টেলিভিশন চ্যানেলের জন্ম হয় সরকারের সেবাদাশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার জন্য।

গত বই মেলায় ছিল প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সেরকমই নগ্ন প্রতিযোগিতা। একটি নামকরা প্রকাশনা সংস্থা কেবল কভার পাল্টে বঙ্গবন্ধুর উপর শতাধিক বই প্রকাশনার শীর্ষে  নিজেদের আসন পাকাপোক্ত করেছে। এসব দেখে বই মেলার উপর আমার আগ্রহ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে!

বুদ্ধিবৃত্তিও আজ আর জনগণের কাছে দায়বদ্ধ নেই। অথচ বুদ্ধিবৃত্তির সততা ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথিকৃৎ। বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু তার নিজের জীবনকে ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর করেছেন!

দূর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে এই ত্যাগের কোনো মূল্য আছে বলে মনে হয় না। তাইতো এরা ধর্ষণ, চোট্টামী, দুর্নীতির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে মোটেও কার্পণ্য করেন না।

এদের পূর্বসুরীরা একইভাবে বঙ্গবন্ধুর কাঁধে সওয়ার হয়ে বঙ্গবন্ধুকে জনবিচ্ছিন্ন করেছিল। আজ একইভাবে শেখ হাসিনাকেও এরা জনবিচ্ছিন্ন করতে চায়। শেখ হাসিনা কি তাঁর পিতা ও পরিবারের করুণ পরিণতি বিস্মৃত হবেন?

পরিশেষে বঙ্গবন্ধুর একটি আক্ষেপের কথা বলে এ লেখার ইতি টানব। বঙ্গবন্ধু জেলে থাকা অবস্থায় একদিন জেলগেটে তাঁর স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা তাঁতে বলেছিলেন- “বসেই তো আছ। লেখ তোমার জীবনের কাহিনী।”

উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- “লিখতে যে পারি না; আর এমন কি করেছি যা লেখা যায়! আমার জীবনের ঘটনাগুলি জেনে জনসাধারণের কি কোনো কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।”

উপরের এই কথাগুলো তুলে ধরেছি “বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী” বইটির প্রথম পাতা থেকে।  নতুন প্রজন্ম, বঙ্গবন্ধু অনুসারী, তাঁর দলের নেতাকর্মী কিংবা তাঁকে বিক্রি করে খাওয়া বুদ্ধিজীবী নামক ব্যবসাজীবীদের উদ্দেশ্য করে বলব- তোমরা বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় মৃত্যু নিশ্চিত করো না। বঙ্গবন্ধুর আক্ষেপ যেন সত্য না হয়।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট থেকে বঙ্গবন্ধুকে নির্বাসিত করার বহু অপচেষ্টা হয়েছিল। তোমাদের আচরণ যেন সেই অপচেষ্টাকে আবার ফিরিয়ে না আনে। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম থেকে প্রকৃত শিক্ষাটা অর্জনের চেষ্টা করো। প্রতিটি বঙ্গবন্ধু কর্মী যেন ধ্যানে, মননে এবং কর্মে হয় সমাজের একনিষ্ঠ সেবক। এই হউক বঙ্গবন্ধু জন্ম শতবার্ষিকীর মর্মবাণী।

নিউইয়র্ক, ১১ই অক্টোবর ২০২০


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান