বাইডেন জিতলে কী হবে মধ্যপ্রাচ্যে

Sat, Oct 10, 2020 1:52 PM

বাইডেন জিতলে কী হবে মধ্যপ্রাচ্যে

এলেন লাইপসন : গোটা বিশ্বই হয়তো ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র খুবই বেহাল দশায় পড়েছে। তারপরও ২০২১ সালের জানুয়ারিতে জো বাইডেন সরকারের সম্ভাব্য ক্ষমতায় বসার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে কিছুটা সময় ব্যয় করতে দোষ নেই। পররাষ্ট্রনীতিতে অভিজ্ঞ পণ্ডিত ও সাবেক কর্মকর্তাদের একটি দল এখন জো বাইডেন কীভাবে ট্রাম্প-উত্তর একটি পররাষ্ট্রনীতির নকশা তৈরি আর তা প্রয়োগ করতে পারেন সে নিয়ে কাজে ব্যস্ত। বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সম্পর্কে তাদের সলাপরামর্শের কেন্দ্রীয় বিষয় কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য নয়। বস্তুত, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, দল নির্বিশেষে মার্কিন নেতারা এ পরামর্শই দিয়ে আসছেন যে, ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকারের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা তথা কমিয়ে আনার সময় এসেছে।

 

ইরাক ও আফগানিস্তান অভিযানের ক্লান্তি এই মধ্যপ্রাচ্যবিমুখতার পেছনের মূল কারণ হলেও জ্বালানি বিষয়ে অধিকতর স্বনির্ভরতা এবং বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা বিষয়ে মার্কিন দায়দায়িত্বের বিষয়ে আরও বেশি জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিও এখানে প্রভাব ফেলেছে। এই পরিবর্তনের আভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে ওবামা প্রশাসনের চেয়ে বেশি এগিয়ে ছিল ট্রাম্প প্রশাসন। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের হুমকির জন্যই যুক্তরাষ্ট্রের নিজেকে সংগঠিত করা দরকারজাতীয় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ মহলের সর্বত্র ক্রমেই জোরালো হওয়া মতৈক্যটি এই ধারণার পালে হাওয়া দিয়েছে। ওবামার আমলের পূর্ব এশিয়ামুখী ‘পিভট’ নীতি থেকে শুরু করে আজ সেই নীতি এসে পৌঁছেছে ট্রাম্প প্রশাসনের চীনের সঙ্গে কঠোর ভূরাজনৈতিক দ্বৈরথে।

 

পাল্টা ভারসাম্যের এই প্রবণতার সঙ্গে প্রথমত সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রতি পুরনো হুমকি বিবেচিত ইরান, যার মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক কর্মকাণ্ড থেকে লেবানন ও সিরিয়ায় সুরক্ষিত অবস্থান আর ইয়েমেনে সুবিধাবাদী কার্যক্রম। ওবামা প্রশাসন তেহরানের সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমিত করতে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিকে কাজ লাগানোর আশা করেছিল। ট্রাম্প হেঁটেছেন তার বিপরীত দিকে। তবে সাম্প্রতিককালে আক্রমণাত্মক বক্তৃতা এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টায়ও কিছু ফল আসার প্রত্যাশা এ দুয়ের মধ্যে ছোটাছুটি করছেন তিনি।

 

দ্বিতীয় প্রবণতাটি হচ্ছে ইসরায়েল এবং কয়েকটি উপসাগরীয় দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নতুন কৌশলটি, যাকে ট্রাম্প প্রশাসন তার কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে আগ্রহী। যদিও এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালের বেশ আগে। এটা ভালো খবর নিশ্চয়ই। তবে যারা ফিলিস্তিন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরেকটু বেশি নৈতিক দায়দায়িত্বের তাগিদ বোধ করেন তাদের কাছে এই সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ কুশনারের ‘শান্তি পরিকল্পনার’ বৃহত্তর ব্যর্থতার সান্ত্বনা পুরস্কার ছাড়া আর কিছু নয়।

 

তাহলে প্রেসিডেন্ট হলে বাইডেন কীভাবে এই সমস্যাসংকুল পথে চলবেন? এজন্য মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি সমস্যাপীড়িত জায়গার খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ করাই শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের আগামীর পররাষ্ট্রনীতির কাঠামোটির তিনি কী রূপ দেন তার সার্বিক পথনকশার ওপর আলো ফেলাও জরুরি।

 

বাইডেন স্বীকার করেছেন, তিনি ঘড়ির কাঁটা ২০১৬ সালে ফিরিয়ে দিতে পারবেন না। ট্রাম্পের গা-জোয়ারি আচরণের কারণে কিছু মেরামতির কাজও তাকে করতে হবে। এই বৃহত্তর নীতিগুলোর মধ্যে রয়েছে মৈত্রীজোট পুনর্গঠন, ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদ মোকাবিলা করতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া, সামরিক প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব আর্থিক প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্বস্বাস্থ্য ও সন্ত্রাসবাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বহুপক্ষীয় ফোরামে কাজ করা। এই বাহ্যিক লক্ষ্যগুলোর পাশাপাশি, বাইডেনকে কাজ করতে হবে মার্কিন সমাজের অন্তস্তলে এবং সরকারের ভেতরে আস্থা পুনরুদ্ধার করা নিয়ে। তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলোতে আবারও অরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে কাজ করবেন।

 

ইউরোপ এবং এশীয় মিত্রদের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্য জোট মেরামত কাজের জন্য কঠিন জায়গা নয়। জো বাইডেন মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান নেতাদের সঙ্গে ইতিবাচক ব্যক্তিগত সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবেন। তাকে কংগ্রেসের এমন জোরালো মনোভাবকে মোকাবিলা করতে হবে যে, দশকের পর দশকের দীর্ঘকালীন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত অংশীদারত্ব সত্ত্বেও এই সম্পর্কটি একবিংশ শতাব্দীর মূল্যবোধকে ধারণ না-ও করতে পারে। বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর অনেক নেতা হয়তো ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনকেই পছন্দ করবেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত রাখার জন্য তারা হয়তো বাইডেনের সঙ্গেও খাপখাইয়ে নেবেন। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের কাছেই যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনাটি উদ্বেগজনক ব্যাপার।

 

গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের ওপর নতুনভাবে জোর দেওয়া হলে মধ্যপ্রাচ্য বাইডেন প্রশাসনকে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। এটি তিউনিসিয়া, মরক্কো এবং জর্ডানের মতো স্বল্পসংখ্যক গণতন্ত্রমুখী রাষ্ট্রকে সহায়তা করবে। নতুন মার্কিন সরকারের জন্য লেবাননও কিছু কাজ দেখানোর সুযোগ করে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সমস্যাক্লিষ্ট দেশটিকে আস্থা পুনরুদ্ধার এবং প্রশাসন ও রাজনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে কিছু বড় ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারবে।

 

ইরানও বাইডেন প্রশাসনের জন্য হবে এক কঠিন পরীক্ষা। কেবল ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির বিষয়ে মার্কিন অঙ্গীকার পুনরুদ্ধার করাই যথেষ্ট হবে না। বাইডেনের পরমাণু অস্ত্রবিস্তার রোধ বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা এই চুক্তিতে সংশোধনী প্রস্তাব আনার এবং মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে মিলে এটি রক্ষা করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারেন। অন্যদিকে ইরানের আঞ্চলিক আচরণ দেখভালের দায়িত্ব হবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিভাগের আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের। অন্যদিকে সিরিয়ার ইতিহাস আর বর্তমান বাস্তবতা সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দ্রুত কোনো কূটনৈতিক সাফল্য পাওয়ার অনুকূল নয়। সিরিয়াকে ঐতিহাসিকরা সম্ভবত দেখবেন বারাক ওবামার সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতিগত ব্যর্থতা হিসেবে। এহেন দেশটিতে গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটাতে কিছু করার আছে কি না তা বাইডেনকে দেখতে হবে। তার পরামর্শদাতারা বিশেষ করে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইতে সিরীয় কুর্দি মিত্রদের সঙ্গে ট্রাম্পের আচরণের সমালোচনা করেছেন। সিরিয়ার যেসব অঞ্চলে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই সেখানে সহায়তা দেওয়ার দিকে মনোনিবেশ করতে পারে বাইডেন সরকার। তাদের জাতিসংঘ বা রাশিয়ার নেতৃত্বে দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করার প্রয়াসে সহায়কের (নেতৃত্বের নয়) ভূমিকা নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

আর পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বিষয়গুলো যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে হয়তো ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্ন বা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার মতো প্রভাবিত করবে না। তারপরও এটি সম্ভাব্য নতুন অনিশ্চয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস যার সঙ্গে যুক্ত ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান অংশীদাররা। সব মিলিয়ে বলা যায়, আঞ্চলিক বিরোধগুলোর সমাধান এবং বৃহত্তর দ্বন্দ্বসংঘাত এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র যে একটা গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে বিশেষ কোনো সামরিক প্রতিশ্রুতি ছাড়াইতা দেখানোর সুযোগ পেতে পারে সম্ভাব্য বাইডেন সরকার।

 

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে ভার্জিনিয়ার জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক

 

খালিজ টাইমস থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

সূত্র: দেশরুপান্তর


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান