করোনাকালীন শিক্ষা ও নিয়মিত অধ্যয়ন

Mon, Aug 31, 2020 2:44 AM

করোনাকালীন শিক্ষা ও নিয়মিত অধ্যয়ন

জুলফিকার বকুল :  মানুষ কেবল চোখ দিয়েই দেখেনা,এর পিছনে রয়েছে তার সক্রিয় মন ও মস্তিষ্ক। রয়েছে একটা দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত।মানুষ যা কিছু দেখে, শোনে এবং জানে সেটাকে সে নিজের অভ্যন্তরীন মৌলিক চিন্তা ও ধ্যাণ ধারণার সাথে সামঞ্জস্যশীল করে নেয়।অতঃপর সেই চিন্তা ও ধ্যান ধারনার ভিত্তিতেই গড়ে উঠে তার জীবন পদ্ধতি। তাই পরিপূর্ণ জীবন পদ্ধতি গড়ে তুলতে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। সাধারণ অর্থে জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনই হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে মনীষীরা বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন।

দার্শনিক সক্রেটিস এর মতে," শিক্ষা হলো মিথ্যার বিনাশ আর সত্যের আবিস্কার। "

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে," শিক্ষা হলো তাই যা আমাদের কেবল তথ্যই পরিবেশন করে না বিশ্বসত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে"। জন ডিউই বলেছেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য আত্মোপলব্ধি "।

প্লেটোর মতে, " শরীর ও আত্মার পরিপূর্ণ বিকাশ ও উন্নতির জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তা সবই শিক্ষার উদ্দেশ্য অন্তর্ভুক্ত। মনীষীদের মতামতের ভিত্তিতে ইহাই প্রতীয়মান হয় যে, শিক্ষা একটি জীবনব্যাপি প্রক্রিয়া।

মানুষ তার পূর্ণাঙ্গ জীবনে যা কিছুই আহরণ করে, আত্মস্থ করে তা শিক্ষার মাধ্যমেই করে।অর্থাৎ যে কোন জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমই হলো শিক্ষা।

বিশ্বব্যাপি করোনা কালীন বিপর্যয়ের মাঝে শিক্ষা কার্যক্রম যেমন ব্যাহত হচ্ছে তেমনি জীবনের নিরাপত্তা বিবেচনায় শিক্ষা কার্যক্রম গতিশীল রাখার বিকল্প ব্যবস্থাও খোঁজা হচ্ছে। আমাদের দেশেও পরীক্ষা পদ্ধতির বিকল্প ভাবনা সহ শিক্ষানীতির সংশোধনের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।পরীক্ষাকে আমরা সাধারণত পড়ালেখার শেষ ধাপ হিসেবে চিহ্নিত করি।আর এর ফল হিসেবে খাতা-কলম নির্ভর পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়।ফলে শিক্ষার্থীরা দিন দিন পরীক্ষা নির্ভর হয়ে যাচ্ছে।এ ক্ষেত্রে শিক্ষার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। পরীক্ষা একটি স্তর বা ধাপ পরিবর্তনের সিঁড়ি হতে পারে কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানার্জন শুধুমাত্র পরীক্ষা কেন্দ্রিক হতে পারে না।মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য শিক্ষার্থীর চেতনাকে নাড়া দিয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। তিনি বলেছেন, " শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি, জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন এবং সুনাগরিক তথা বিশ্ব নাগরিক হওয়া"।

প্রকৃত আর সনদ ভিত্তিক শিক্ষা দুটোই আমাদের প্রয়োজন আছে।কিন্তু প্রকৃত শিক্ষাই একটি কাংখিত সনদ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে এ কথা ভুলে গেলে চলবে না।একটি সনদ কেবল তার যোগ্যতা অর্জনের আশ্বাস দেয়,কিন্তু প্রকৃত শিক্ষায় কতটা শিক্ষিত হয়েছেন সনদ সেই নিশ্চয়তা দিতে পারে না।

সময় এসেছে গতানুগতিক পরীক্ষা কেন্দ্রিক ভাবনা থেকে বেড়িয়ে আসার।প্রকৃত শিক্ষা অর্জন প্রতিটি শিক্ষার্থীর নিজের জীবনের জন্য প্রয়োজন। তাই ঘরে বসে বিজ্ঞান, তথ্য -প্রযুক্তি ও সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে পাঠোভ্যাস গড়ে তুলে নিজেকে ইতিবাচক লক্ষ্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হওয়ার এখনই সময়।শুধু প্রয়োজন প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ় মনোবল। ঘরে বসেও শিক্ষক, সহপাঠী, গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম ইত্যাদির মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত জটিল বিষয়গুলো শেয়ার করে জেনে নেয়া সম্ভব। কিন্তু স্কুল -কলেজ বন্ধ তাই পড়ালেখাও বন্ধ থাকতে পারে না।এ ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হবে শিক্ষার্থীর।আর শিক্ষার্থীর ক্ষতি মানেই দেশ ও জাতির ক্ষতি। কারণ, আজকের শিশু -তরুণরাই আগামী দিনের দেশ ও জাতির অগ্রগতির মূল নায়ক।তাই শিক্ষার্থীকে সময় অপচয় না করে নিজেকে দেশের সম্পদ ও সম্পত্তিতে পরিনত করা একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য।প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা পরীক্ষা না হওয়া কখনও নিয়মিত অধ্যয়নের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেনা।সময়কে ফাঁকি দেয়া মানেই নিজেকে ফাঁকি দেয়া।পৃথিবীতে কোন সমস্যাই চিরস্থায়ী নয়।হয়তো করোনাও খুব শিগগিরই বিদায় নিবে,নয়তো সমস্ত প্রতিকূলতাকে মাথায় নিয়েই সামনে এগুতে হবে।তাই শিক্ষার্থীকে হতে হবে তেজদীপ্ত,সাহসী,উদ্যোমী ও চ্যালেন্জ মোকাবেলায় বদ্ধপরিকর।

প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য তার পরিবার হচ্ছে সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর পরিবারের প্রতিটি সদস্যই হচ্ছে একেক জন বড় শিক্ষক। তাই শিক্ষার্থীকে সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় সাপোর্টের মাধ্যমে তার আত্মোপলব্ধি জাগ্রত করা পরিবারের সদস্যদের গুরুদায়িত্ব।

অ্যারিস্টটল শৈশবে গৃহেই পড়াশোনা করেছেন। ১৭ বছর পর পিতা-মাতাকে হারিয়ে দার্শনিক প্লেটোর একাডেমিতে ভর্তি হন।দার্শনিক মতবাদের ভিত্তি তাঁর পরিবার থেকেই হয়েছিল। অবশেষে হয়ে যান বহু দার্শনিক তত্ত্বের প্রবক্তা।

গণতন্ত্রপ্রেমী মহান রাষ্ট্রনায়ক আব্রাহাম লিংকন সৎমায়ের আগ্রহে লিখতে,পড়তে শিখেছিলেন।পরবর্তীতে তিনি লিখেছেন,' আমার স্কুল জীবন এক বছরের বেশি ছিলনা'।নিজ গৃহে পড়ুয়া এই মহান মানুষটিই একসময় আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন।

একজন সচেতন অভিভাবক তার স্নেহ,ভালবাসা, শাসন,উৎসাহ, প্রেরণা ও সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে তার সন্তানকে আগামী দিনের সম্পদ হিসেবে তৈরি করতে পারেন।যা একজন বাবা-মার দায়িত্ব -কর্তব্যও বটে।

শিক্ষার্থীর বেড়ে উঠা,সৃজনশীলতা ও মননশীলতার অগ্রগতিতে একজন শিক্ষকের ভুমিকা হবে সবসময় আন্তরিক,বিচক্ষণ ও দায়িত্বশীল।শিক্ষক হবেন শিক্ষার্থীর জন্য একজন অনুকরণীয় আদর্শ মানুষ।তবেই শিক্ষার্থীর চিন্তাশীল উদ্ভাবনী মেধা বিকাশে একজন শিক্ষক অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারবেন।

দেশের এমন দুর্দিনে শিক্ষক -শিক্ষার্থীর পারস্পরিক মেলবন্ধন শিক্ষা পদ্ধতিতে দুর্যোগকালীন সময়ে গতিশীলতা বজায় রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। বর্তমান সময়গুলোকে যথাযথ ভাবে কাজে লাগাতে শিক্ষার্থীকে বই পড়ায় অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করা জরুরী প্রয়োজন। আর এ কাজে একজন শিক্ষকের দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিসীম।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী বলেছেন, ' একদিন বই পড়তে পড়তে মানুষ জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিনত হতে পারে।তাই বই হয়ে উঠুক প্রাণের বন্ধন,জীবনের আপনজন।

মার্ক টোয়েইন বলেছেন,' বই পড়ার অভ্যাস নেই আর পড়তে জানেনা এমন লোকের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই'।

তাই করোনাকালীন সময়ে শিক্ষক -শিক্ষার্থী, অভিভাবক এর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রকৃত জ্ঞান অর্জন ও আত্মচেতনাকে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে শিক্ষার্থীর নিয়মিত অধ্যয়ন হয়ে উঠুক প্রগতিশীল ও প্রজ্ঞাময়।শিক্ষা বান্ধব জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার প্রকৃত জ্ঞান অর্জন ও মেধাবী জাতি গঠনের নিমিত্তে শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মানে মাইলফলক হিসেবে অবদান রাখবে এমনটিই প্রত্যাশা করছি।

 লেখক: শিক্ষক,ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল, ডুয়েট ক্যাম্পাস,গাজীপুর


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান