করোনাক্রান্ত কতক মানুষের চিন্তা

Mon, Jul 27, 2020 9:59 AM

করোনাক্রান্ত কতক মানুষের চিন্তা

রানা জামান: তখনো রাত ততোটা গভীর হয় নি। পবিত্র মাহে রমজান থাকায় রাত এগারোটার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ছে অধিকাংশ ধর্মপ্রাণ মুসলমান। আনিলা টাওয়ারের অধিকাংশ বাসিন্দা ঘুমে নিমগ্ন। হঠাৎ কান্নার শব্দে তিন তলার উত্তর দিকের ফ্লাটের ফিরোজা পারভিনের কাঁচা ঘুমটা ভেঙ্গে যাওয়ায় বিরক্ত হলেও বয়স্ক মানুষের কান্না হওয়ায় ভ্রু কুচকে উঠে বসলেন বিছানায়। কান্নাটা আরো স্পষ্ট শোনার জন্য কান খাড়া করলো ফিরোজা পারভিন। মরাকান্না! আঁতকে উঠে বেড সুইচ টিপে একটা বাল্ব জ্বালিয়ে পাশে ঘুমন্ত মিজানুর রহমানের গায়ে বারংবার ধাক্কা দিতে লাগলেন।

মিজানুর রহমান ঘুমকাতুরে মানুষ। শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েন এবং বরাবর তাঁর ঘুমও হয় গভীর। অনবরত স্ত্রীর ধাক্কা খেয়ে অবশেষে জাগতে বাধ্য হলো মিজানুর রহমান। তবে বিরক্তি নিয়ে বললো, কতবার বলেছি আমার কাঁচা ঘুম ভাংবা না! মাথা ব্যথা করে।

গৃহস্থালি কাজের গিন্নিদের স্বামীর ধমকে রাগ হয় না। ফিরোজা পারভিন উৎসুক কণ্ঠে ফিসফিস করে বললো, পাশের ফ্লাটে কেউ মারা গেছে মনে হচ্ছে। খুব কাঁদছে।

মিজানুর রহমান একবার হাই তুলে বললো, ও বাসায় আবার কে মারা যাবে! কেউ অসুস্থ হয়েছে বলে তো শুনি নাই। আমি তাহলে খোঁজ নিয়া আসি।

মিজানুর রহমান খাট থেকে নামতে চাইলে ওর হাত ধরে আটকে ফিরোজা পারভিন বললো, না না এ অবস্থায় বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না!

মিজানুর রহমান বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করলো, কেনো ঠিক হবে না?

যদি করোনা ভাইরাসে মারা গিয়ে থাকে, তাহলে?

তাই তো! তাহলে ফোনে খোঁজ নেই।

মোবাইল ফোনটা বেজে উঠায় এক মূহুর্তের জন্য মরাকান্না থেমে গেলো বাসাটায়। মৃত ব্যক্তির বড় ছেলে নাজিম কান্না থামিয়ে মোবাইল ফোনটা তুললো। কল-করা ব্যক্তিকে চিনায় কলটা গ্রহণ করে বললো, হ্যালো আঙ্কল আমি নাজিম বলছি।

মিজানুর রহমান বললো, তোমার বাবার কি করোনা রোগ হয়েছিলো নাজিম?

নাজিম একটা হেচকি টেনে বললো, না আঙ্কল! বাবার হার্ট এটাক হয়েছিলো। সাথে সাথে শ্বাসকষ্ট এবং মৃত্যু।

হাসপাতালে নেবারও সময় পেলাম না। এখন রাখি আঙ্কল।

কবর কোথায় দেবে ভেবেছো কিছু?

বাবাকে বাড়িতে নিয়ে যাবো।

এটাই ভালো হবে। আমি একটা এ্যাম্বুলেন্স ডেকে দিচ্ছি। তোমরা অন্যসব ব্যবস্থা করো।

নাজিম মোবাইল ফোনটা টেবিলে রেখে মার কাছে এসে বললো, দেশের এই অবস্থায় আত্মীয়-স্বজনদের কেউ বাসায় আসতে পারবে না। কবর দেবার জন্য বাবার লাশ বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে। পাশের ফ্লাটের মিজান আঙ্কল এ্যাম্বুলেন্স ডাকছেন। আমাদের রেডি হতে হবে মা।

রাজিয়া সুলতানা বললো, আমি কিছু ভাবতে পারছি না। তুই যা করার কর।

এ্যাম্বুলেন্স আসার আগেই পুলিশের পিকাপ চলে এলো এপার্টমেন্টের সামনে। ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাক পরিহিত তিনজন পুলিশ ঝটপট উঠে এলো তিনতলায়।

কলবেল বাজায় দরজা খুলে পুলিশ দেখে বিস্মিত হয়ে নাজিম বললো, আপনারা? আমাদের বাসায় কী চান?

পুলিশের একজন বললো, থানায় ফোন গেছে যে এই বাসায় একজন লোক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

নাজিম অত্যাধিক বিস্মিত হয়ে বললো, কী বলছেন আপনি! আমার বাবা তো হার্ট এটাকে মারা গেছে।

এখন ওকথা বলে লাভ হবে না। আপনার বাবার লাশের করোনা ভাইরাস টেস্ট করাতে হবে। বেসরকারিভাবে আপনারা করাতে পারেন। আর সরকারিভাবে করাতে চাইলে আমরা লাশ নিয়া যাবো।

হতভম্ব নাজিম দরজা ভেজিয়ে রেখে মার কাছে গিয়ে বললো, থানা থেকে পুলিশ এসে বলছে বাবার করোনা ভাইরাস টেস্ট করাতে হবে।

রাজিয়া সুলতানা অশ্রুসিক্ত চোখে বললো, কী বলছিস তুই? তোর বাবার তো করোনা হয়নি!

এসব বলে লাভ হবে না মা। ইউনাইটেড হসপিটালের টেস্ট করিয়ে ফেলি।

এবার নাসিমা সুলতানা কাঁদতে কাঁদতে বললো, বাবার লাশ নিয়ে এখন টানা-হেঁচড়া হবে।

পুলিশ প্রহরায় মাহবুব আলমের লাশ নিয়ে যাওয়া হলো ইউনাইটেড হাসপাতালে। রিসিপশন থেকে বলা হলো তিনদিনের আগে টেস্ট করা যাবে না; এ ক'দিন লাশ হাসপাতালের মর্গে রাখতে হবে এবং এর জন্য প্রতিদিনের চার্জ এক হাজার টাকা লাগবে; আর করোনা ভাইরাস টেস্ট চার্জ তিন হাজার পাঁচ শত টাকা, এটা তো সবারই জানা।

তিনদিন লাগবে কেনো টেস্ট করাত?

জীবিত মানুষের প্রায়োরিটি আগে। তাছাড়া ক্রমাগত কেমিস্ট করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হতে থাকায় কেমিস্টের স্বল্পতা চলছে হাসপাতালে।

কিছুই করার এ পরিস্থিতিতে। নাজিম মাথা ঝুলিয়ে বেরিয়ে এলো হাসপাতালের বাইরে। পুলিশ ভ্যানের কাছে এলে সাব-ইন্সপেক্টর লতিফ জিজ্ঞেস করলো, কী বললো কেমিস্ট? কবে দিবে রিপোর্ট?

নাজিম শুকনো কণ্ঠে বললো, তিনদিনের আগে দিতে পারবে না।

এক হাজার টাকা দিলে আগামীকালই পেয়ে যাবেন।

নাজিম কিছু না বলে মানিব্যাগ থেকে এক হাজার টাকা ও রশিদটা সাব-ইন্সপেক্টরের হাতে দিলো। সাব-ইন্সপেক্টর লতিফ টাকা ও রশিদ নিয়ে চলে গেলো হাসপাতালের ভেতরে। একটু পর ফিরে এলো সংশোধিত রশিদ নিয়ে, তাতে ডেলিভারি ডেট দেয়া আছে আগামীকাল।

পরদিন বিকেল পাঁচটায় এসে নাজিম ডেলিভারি কাউন্টারে পাঁচ শ টাকা বাধ্যতামূলক বখশিশ দিয়ে একটি স্লিপ পেলো মাত্র। এই স্লিপ দেখিয়ে স্থানীয় থানা থেকে রিপোর্ট নিতে হবে। একটা সিএনজি স্কুটারে চলে এলো থানায়। ডিউটি অফিসার জানালো যে থানা থেকে রিপোর্ট গ্রহণের রেট হলো: জীবিতের বেলায় ত্রিশ হাজার আর মৃতের বেলায় পঞ্চাশ হাজার-নো লেস নো মোর!

রিপোর্ট নেগেটিভ। নাজিমের ইচ্ছের কথা শুনে রাজিয়া সুলতানা বললেন, না রে বাপ! কী দরকার এপার্টমেন্টের সবাইকে এটা বলার! চল তোর বাবার লাশ নিয়ে বাড়িতে রওয়ানা দেই।

নাজিম বললো, এপার্টমেন্টের সবাই ধরে নিয়েছে বাবা করোনা ভাইরাসে মারা গেছে। এই ভুল না ভাঙ্গালে বাড়ি থেকে আসার পর আমাদের বাসা থেকে বের করে দেবে, অথবা চৌদ্দ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। তোমরা রেডি হয়ে নামতে থাকো। আমি রিপোর্ট দেখিয়ে সবার ভুল ভাঙ্গাতে যাচ্ছি।

রিপোর্টটা সকল ভাড়াটে ও মালিকগণ একে একে দেখে গেলো চুপসে। ততক্ষণে রাজিয়া সুলতানা ও নাসিমা সুলতানা নেমে এলো নিচে।

ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে লাশ গ্রহণ করে ফৃজিং এ্যাম্বুলেন্সে রওয়ানা দিলো গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্য। রাত একটায় পৌঁছলো লাশ নিয়ে বাড়িতে। ইতোমধ্যে গ্রামের অনেক লোক বাড়িতে এসে জড়ো হয়েছে। এ্যাম্বুলেন্স বাড়িতে ঢুকতেই আগত লোকজন দূরে সরে গেলো। বাড়িতে থাকা আত্মীয়রা বিলাপ করে কাঁদতে লাগলো এ্যাম্বুলেন্স ঘিরে। এ্যাম্বুলেন্স আসার খবর শুনে গ্রামের আরো লোকজন বাড়িতে আসতে থাকলেও পূর্বে আগত লোকদের মতো দূরেই দাঁড়াতে থাকলো।

নাজিম বাবার লাশ নামানোর জন্য এ্যাম্বুলেন্সের দরজার হাতলে হাত দিলে গ্রামের কয়েজন এগিয়ে এলো এক কদম। একজন বললো, লাশ নামানো যাইতো না নাজিম।

নাজিম বুঝতে না পেরে বললো, কেনো?

অপর এক যুবক বললো, আমরা শুনছি চাচা করোনায় মারা গেছে। এই গ্রামে করোনা রোগীর কোনো জায়গা নাই। লাশের তো দাফনকাফন হবেই না!

এ কথা শুনে সবাই কান্না থামিয়ে অবাক চোখে যুবকের দিকে রইলো। রাজিয়া সুলতানা ও নাসিমা সুলতানা এ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে নাজিমের পাশে এসে দাঁড়ালো। নাজিম যুবকের দিকে তাকিয়ে বললো, কী বলছো তুমি কাশেম! বাবা করোনা ভাইরাসে মারা গেছেন, একথা তোমাদের কে বলেছে?

কাশেম দৃঢ়তার সাথে বললো, অহন করোনাকাল চলছে। করোনা ভাইরাসে মারা যাইতাছে সবাই। তাছাড়া ঢাকা থাইকও ফোন আইছে।

নাজিম এদিকওদিক মাথা নেড়ে বললো, কী বলছো তুমি আবোলতাবোল কাশেম! বাবা হার্ট এটাকে মারা গেছেন। উনার কোনো করোনা ভাইরাস রোগ হয় নাই। এই যে আমি টেস্ট রিপোর্ট নিয়ে এসেছি। বিশ্বাস না হলে রিপোর্টটা দেখো।

নাজিম পকেট থেকে করোনা ভাইরাস টেস্ট রিপোর্টটা কাশেমের দিকে বাড়িয়ে ধরলো। কাশেম রিপোর্টটা হাতে নিতেই দুই পাশ থেকে দুই যুবক ঝটপট মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে ধরলো রিপোর্টের উপর।

কাশেম টর্চের আলোয় পড়তে গিয়ে হোচট খেলো। Result: Coronavirus –iv(Ngetive) মনে মনে একবার পড়ে চিৎকার করে বললো, এই যে এখানে লেখা আছে করোনাভাইরাস!

পরেরটা পড়ো! ওখানে নেগেটিভ লেখা আছে।

পরে যাই লেখা থাকুক, রিপোর্টে করোনাভাইরাস লেখা আছে। সেজন্য চাচার লাশ এই গ্রামে নামান যাইতো না, কবরও দেওন যাইতো না।

রাজিয়া সুলতানা নাজিমের মুখের দিকে তাকিয়ে ভগ্নকণ্ঠে বললো, এরা এসব কী বলছে রে নাজিম? নিজের বাড়িতে কবর দিতে পারবো না তোর বাবাকে?

নাজিম প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করতে করতে বললো, সব ঠিক হয়ে যাবে মা। আমি ইউএনও সাহেবের সাথে কথা বলছি।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান