এক  অকুতোভয় বাংগালী যোদ্ধা-বৈমানিকের কথা

Mon, Jun 15, 2020 11:35 PM

এক  অকুতোভয় বাংগালী যোদ্ধা-বৈমানিকের কথা

ডঃ মোহম্মদ মাহবুব চৌধুরী : বাংলার মাটিতে জন্ম নেয়া সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফাইটার পাইলট গ্রুপ ক্যাপ্টেন জনাব সাইফুল আজম গতকাল সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (CMH) ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

এই অকুতোভয় বীর যোদ্ধা-বৈমানিক এর কতগুলি অবিস্মরনীয় অর্জনের কথা প্রথম জানলাম যা আপনাদের সাথে শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারলাম না:

১) তিনি সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র যুদ্ধবিমানের পাইলট যিনি চারটি দেশের বিমান বাহিনীর যুদ্ধ বিমান নিয়ে আকাশে উড়েছেন এবং তিনটি দেশের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছেন: পাকিস্তান (১৯৬০-১৯৭১), জর্ডান (১৯৬৬-ডেপুটেশন), ইরাক (১৯৬৭-ডেপুটেশন), বাংলাদেশ (১৯৭২-১৯৭৯)।

 

২) তিনটি ভিন্ন দেশের (পাকিস্তান, জর্ডান, ইরাক) হয়ে যুদ্ধ করে দুই শত্রু দেশের (ভারত, ইসরায়েল) বিমান ধ্বংস করেছেন। একই সাথে তিনটি ভিন্ন দেশের হয়ে একই ব্যক্তির দ্বারা একের অধিক শত্রু-রাষ্ট্রের (ভারত এবং ইসরায়েল ) বিমান ভূপাতিত করার বিরল রেকর্ডের অধিকারীও হয়েছেন তিনি।

 

৩) যুদ্ধক্ষেত্রে তার অসম সাহসিকতার জন্য তিনি তিনটি ভিন্ন দেশ থেকেই বীরত্বসূচক সামরিক পদক বা খেতাব লাভ করেছেন: পাকিস্তান (সিতারা-ই-জুরাত), ইরাক (নুত-আল-শুজাত) ও জর্ডান (হুসাম-আল-ইশতিকলাল)। তিনটি দেশের সম্মান সূচক সামরিক পদক অর্জনের ঘটনা সামরিক ইতিহাসে বিরল।

৪) ১৯৬৭ আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ইসরাইলের ৩টা যুদ্ধবিমান উনি ‘ডগফাইট’ এর মাধ্যমে ধ্বংস করেছেন। এখন পর্যন্ত আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ সংখ্যক বিমান ঘায়েল করার রেকর্ড উনার দখলে !

 

৫) উনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রেনিং নেয়া একজন বাংলাদেশি 'টপ গান'। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে ২২ জন 'লিভিং ঈগল' এর তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল উনি তাঁদের একজন!

 

সংক্ষিপ্ত জীবনী:

১) সাইফুল আজম ১৯৪১ সালে পাবনা জেলার খগড়বাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। উচ্চ-মাধ্যমিক স্তরের পর ১৯৫৮ সালে তিনি পশ্চিম পাকিস্তান এ গিয়ে তৎকালিন পাকিস্তান এয়ারফোর্স (PAF) এ যোগদান করেন। ১৯৬০ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে তিনি জিডি পাইলট ব্রাঞ্চের একজন পাইলট হন।

২) পাক-ভারত যুদ্ধ-১৯৬৫: ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাইফুল আজম এফ-৮৬ স্যাবর জেট বিমান এর পাইলট হিসেবে প্রধানত পদাতিক সহায়ক মিশন পরিচালনা করতেন। ১৯৬৫ সালের ১৯ এ সেপ্টেম্বর বিখ্যাত চাবিন্দা ট্যাংক যুদ্ধে অংশ নিয়ে বিমান থেকে রকেট ও গোলা বর্ষন করে একাধিক ভারতিয় ট্যাংককে ধ্বংস ও অকার্যকর করেন। এসময় চারটি ভারতীয় ‘Folland Gnat’ জঙ্গি বিমান তাদের উপর আক্রমন করে। কিন্তু ফ্লাইট লেফটেনান্ট সাইফুল আজম রুখে দাড়ান এবং বিমান যুদ্ধ বা ‘ডগ ফাইট’ (Dog Fight) এ একটি ভারতীয় ”Gnat” জঙ্গি বিমানকে ভুপাতিত করেন। ভারতীয় পাইলট ফ্লাইং অফিসার ভি মায়াদেব নিরাপদে বেরিয়ে আসলে তাকে যুদ্ধবন্দি করা হয় । অন্য ‘Folland Gnat ‘টি রনেভঙ্গ দিয়েছে বুঝতে পারার পর সেটিকে পালিয়ে যেতে দেওয়া হয়। এই কৃতিত্বের জন্য তাঁকে পাকিস্তানে ”সিতারা-ই-জুরাত” ( Sitara-e-Jurat, বাংলাদেশের বীরবিক্রম এর সমতুল্য, পাকিস্তানের তৃতীয় সামরিক বীরত্বের খেতাব) পদকে ভুষিত করা হয়।

 

৩) আরব-ইসরাইল যুদ্ধ ১৯৬৭: ১৯৬৬ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাইফুল আজম এবং অপর আরেক জন পাকিস্তানী বিমান বাহিনীর অফিসার ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সারওয়ার সাদকে রাজকীয় জর্ডান বিমান বাহিনীতে প্রেষণ (Deputation) এ প্রেরণ করা হয়। সেখানে তারা রাজকীয় জর্ডান বিমান বাহিনীর হকার হান্টার (Hawker Hunter) অপারেট করতেন এবং ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬৭ সালের ৫ জুন জর্ডানের আল মাফরাক থেকে উড্ডয়নের পর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাইফুল আজম একটি ইসরাইলি যুদ্ধবিমান- ‘Dassault Mystere IV’ কে ভূপাতিত করেন্। এরপর আবার আঘাত করে আরেকটি ইসরাইলি ‘Dassault Mystere IV’ কে প্রায় অকেজো করে দেন যা ঐ অবস্থায় পিছু হটে ইসরাইলি সীমানার দিকে ফিরে যায়।  কিন্তু এই দিনের যুদ্ধে সাইফুল আজম ও তার স্কোয়াড্রন সাফল্য লাভ করলেও অন্যান্য জর্ডানি বিমানগুলি ব্যর্থ হয়- ইসরাইলি বোমা বর্ষনে বেশিরভাগ জর্ডানি বিমান ভুমিতেই ধ্বংস হয়ে যায় এবং রানওয়েগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাইফুল আজম তাঁর সাফল্যের জন্য জর্ডানিদের প্রশংসা ও শ্রদ্ধা পান। বাদশাহ হুসাইন তার নিজের গাড়িতে করে সাইফুল আজমকে তার মেসেও পৌছে দেন। জর্ডান থেকে আর উড্ডয়ন সম্ভব না হওয়ায় জর্ডানি বিমান বাহিনীর পাইলটরা প্রতিবেশি ইরাকি বিমান বাহিনীকে সহায়তার সিদ্ধান্ত নেয়। সাইফুল আজমও পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে ইরাকি বিমান বাহিনীর হয়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন।

 

এই ঘটনার মাত্র দুইদিন পর- ১৯৬৭ সালের ৭ জুন ইরাকী বিমান বাহিনীতে সদ্য নিয়োগ প্রাপ্ত হয়ে পশ্চিম ইরাকী এয়ার ফিল্ড এইচ-৩ ( H-3) এ সাইফুল আজম অবস্থান করছিলেন। এসময় অনেকটা ভোজবাজির মতোই আকাশে চারটা ইসরাইলি বিমানের ( ৪ টা ‘Vautour II’ বম্বার যাদের কে এস্কোর্ট করছিলো দুইটা ইসরাইলি ‘Dassault Mirage IIIC’ ফাইটার ) উদয় হয়। এই আকস্মিক আক্রমণে ইরাকি এয়ারফোর্স প্রায় বিপর্যস্ত! ইসরাইলি ক্যাপ্টেন ড্রোর একের পর এক ইরাকি বিমানকে ধ্বংস করে চলেছে। তার সাথে সঙ্গী হিসাবে ছিলেন আরেক ইসরাইলি ক্যাপ্টেন গোলান। এসময় ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাইফুল আজম ইরাকী ‘হকার হান্টার’ (Hawker Hunter) বিমান নিয়ে আকাশে উড়াল দেন । উড়াল দেবার কিছুক্ষণের মাঝেই তাঁর উইংম্যান কেও ফেলে দেয় ইসরাইলি ক্যাপ্টেন ড্রোর। কিন্তু সাইফুল আজম অন্য ধাতুতে গড়া। একে একে তিনি ক্যাপ্টেন ড্রোর চালিত ‘Dassault Mirage IIIC’ ফাইটার এয়ারক্র্যাফটটিকে এবং ক্যাপ্টেন গোলান চালিত ‘Vautour II’ বম্বারটি্কে ভূপাতিত করেন। মোটামুটি একাই লড়াই করে বাকী ইসরায়েলি বিমান গুলোকে ইরাকের আকাশ ছাড়তে বাধ্য করেন । ইসরাইলি ক্যাপ্টেন ড্রোর এবং গোলান কে পরে যুদ্ধবন্দী হিসাবে আটক রাখা হয় ।  ‘Vautour II’ বম্বারটির ছোট্ট কিছু ভগ্নাবশেষ সাইফুল আজমের ‘হকার হান্টার’ এ গেঁথে থাকতে দেখা যায়, যা থেকে তাঁর সহকর্মীরা বুঝতে পারেন যে তিনি বিমানটিকে আকাশেই গুড়িয়ে দিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, এয়ার-টু-এয়ার কমব্যাটের ক্ষেত্রে ইসরাইলি এয়ারফোর্সের ‘Mirage III’ বা ‘Mystere IV’ সাইফুল আজমের Hawker Hunter এর তুলনায় কয়েকগুন বেশী শক্তিশালী হওয়া সত্বেও শুধুমাত্র সাইফুল আজমের দক্ষতা, রণকৌশল, ও সাহসের কাছে তাদের পরাজয় ঘটে। মাত্র ২ দিনের মধ্যেই ৩ টা ইসরাইলি ফাইটার/বম্বার কে ভূপাতিত করার এই অনন্য বিশ্ব-রেকর্ডটি এখনো সাইফুল আজমের দখলে!

 

 

‘৬৭ এর আরব-ইসরাইল যুদ্ধে অসাধারণ কৌশল ও সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে জর্ডান সরকার তাঁকে ”হুসাম-আল-ইশতিকলাল” বা ‘’স্বাধীনতা পদক’’ এবং ইরাক সরকার তাঁকে ”নুত-আল-শুজাত” পদকে ভুষিত করে।

 

৪) ১৯৬৯ সালে ডেপুটেশন শেষে পাকিস্তান এয়ারফোর্সে (PAF) আবার যোগদান করেন এবং ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার আগ পর্যন্ত ‘ফ্লাইং কমান্ডার’ হিসেবে PAF এর বিভিন্ন বেসে কর্মরত ছিলেন।

 

৫) ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ‘বাঙ্গালী’ হওয়ায় পাকিস্তান বিমান বাহিনী তাঁকে ‘অকার্যকর’ (Grounded) করে অর্থাৎ ‘উড্ডয়নে’ সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তাই যুদ্ধ শুরুর আগে বাংগালী অফিসারদের সাথে আলোচনা করে জেটপ্লেন ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর এ পরিকল্পনা সফল হয়নি। সাইফুল আজম পাকিস্তান এয়ারফোর্সে একসময় বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের প্রশিক্ষক ছিলেন। ‘৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের সময় মতিউরের প্লেন ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা সম্পর্কেও তিনি অবগত ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে ‘T-33’ ফাইটার বিমান নিয়ে পালিয়ে যাবার সময় বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর শহীদ হলে তাঁর পূর্বতন বাংগালী প্রশিক্ষক সাইফুল আজমকে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের বাকী সময়টুকুতে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশের জন্ম হলে তিনি নতুন গঠিত বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর (BAF) এ ‘ডিরেক্টর অফ ফ্লাইট সেইফটি’ ( Director of Flight Safety) এবং পরবর্তীতে ‘ডিরেক্টর অফ অপারেশন (Director of Operation)’ হিসেবে নিয়োগ পান।

 

৬) ১৯৭৭ সালে তিনি ‘উইং কমান্ডার’ পদে পদোন্নতি পান এবং ঢাকা বিমান বাহিনী ঘাটির ‘বেস কমান্ডার’ হন। ১৯৭৯ সালে সাইফুল আজম বাংলাদেশ বিমান বাহিনী থেকে ‘গ্রুপ ক্যাপ্টেন’ পদে থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

 

৭) বাংলাদেশ বিমানবাহিনী হতে অবসর গ্রহণ করার পর তিনি দুই টার্মে বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (Film Development Corporation, FDC) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকও ছিলেন।

 

৮) ১৯৯১-৯৬ সময়ে উনি পঞ্চম জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি থেকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য ছিলেন। পরবর্তী জীবনে উনি ব্যক্তিগত ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন।

 

৯) ২০০১ সনে আমেরিকান সরকার (এয়ারফোর্স) তাকে "লিভিং ঈগল" "টপ গান" উপাধি দেয় এবং পৃথিবীর সেরা বাইশজন ফাইটার পাইলটের মধ্যে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করে। ইসরাইলি ফাইটার ফেলে দেয়ার পরেও আমেরিকা তার বিরল যোগ্যতার স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠাবোধ করেনি।

 

গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজম কে হারালো আজ এই জাতি । দু:খজনকভাবে দেশের প্রচারমাধ্যমে এলোনা পৃথিবীর মাত্র বাইশজন লিভিং ঈগলের একজন আজ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। এই অকুতোভয় বীর-যোদ্ধার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। আমিন।

 

ডঃ মোহম্মদ মাহবুব চৌধুরী, মন্ট্রিয়াল, কানাডা

১৫/৬/২০২০

 


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান