একচর জীবনের আলো-অন্ধকার- “তোমারে চিনি না আমি”

Mon, Jun 15, 2020 11:30 PM

একচর জীবনের আলো-অন্ধকার- “তোমারে চিনি না আমি”

মহিউদ্দিন কাজী : এই আধমরা কালে খন্ডকালীন সময়ের সাশ্রয় হয়েছে বলে বহুকাল পর একটি উপন্যাস পড়ে শেষ করতে পেরেছি। কোনো এক পড়ুয়া বৃত্তে লেখক মাহবুব মোর্শেদের-“ তোমারে চিনি না আমি “ উপন্যাসটিকে  পুরুষতান্ত্রিক প্রলেপ দেওয়ায় পড়ার আগ্রহ বাড়ে।

উপন্যাসের শুরুতে জানি এর সময়কাল, মুঠো ফোন মানুষের হাতে আসার আগের সময়চিত্র।মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রের কবি হওয়ার স্বপ্ন, রাজনীতি ও প্রেমে পল্লবিত জীবনের আখ্যান।উপন্যাসচিত্রে রাজশাহী  শহর,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়,পদ্মার পাড়,প্রকৃতি,সেখানকার মানুষের সরল জীবনধারা এসব এসেছে সাবলীলভাবে। মফস্বল শহরের একজন রানা ও একজন সর্দার দুইজন মানুষের স্বপ্ন, সংকট,প্রেম ও রাজনৈতিক জীবনচিত্র।উপন্যাসের চরিত্ররা সময়ে পাঠকের নিজের চেনা  মানুষ হয়ে যায়।

মূলত প্রেম,এবং কবিতা ও রাজনীতি এই তিন উপাদানে উপন্যাস-“তোমারে চিনি না আমি”।এই তুমিটা কে ? একবচন,একজন ! নূরুন্নাহার ? শুধু মনে মনে ছাড়া আর কখনো —“ভালবাসি” কথাটি নূরুন্নাহারকে বলা হয়নি রানার।তবু তার মনে হয় সে নূরুন্নাহারকে ভালবাসেন।

 রানা’র পারিবারিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার দায় যে নাস্তিকতা এটুকু শুধু একবার বলেই নাস্তিক জীবনের আর কোন অনুসঙ্গ সচেতনভাবেই বোধকরি আনা হয়নি।উৎকন্ঠায় ছিলাম-যে সমাজে নাস্তিকের মূল্য একদলা থুথুর চে’বেশী কিছু না,সে সমাজে ধর্মহীন মানুষের সমাজ বাস্তবতার বিন্যাস কেমন হতে পারে এই ভেবে।আমাদের বাক স্বাধীনতায় ধর্মাক্রান্ত সমাজ সংকীর্ণতায় ঋদ্ধ,সেখানে ঈশ্বরমুক্ত মানুষের ঠাঁই নেই।সেখানে মুক্তকণ্ঠে বলা যায় না-আমার ঈশ্বর নেই।লেখক ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় কোনো নাস্তিকের চরিত্রের চিত্রায়ন করেন নি, একথা নিশ্চিত যখন রানা বলেন-আমি নাস্তিক না।

 নারীর শরীর দখল করে আছে কবিতার ঈশ্বর,রানা কবিতা খোঁজেন নারীর প্রেমে।রানা তার সকল প্রেমিকার ঘ্রাণ নেয়ার গল্প বলে পাঠককে মগ্ন রাখেন,নিয়ে যান উষ্ণতার উত্তুঙ্গে। কবিতা,বিপ্লব,মানুষের অধিকার এসব আদর্শীক বুননে পাঠক রানার খেলারাম ভূমিকাটি ক্ষমা করে দেন।

শরীর  শৃংখলিত সমাজে এই পরিনত বোধভাষ্যটুকু বেশ, সরদার যখন পপিকে বলেন-“কিন্ত আপনি কি মনে করেন,আমি কৌশলে আপনার দেহ আদায় করেছি?

ছিছি সরদার।এটা কি বললেন? ভালবাসি বলেননি বলে নিশ্চয় আমি বলবো না আপনি কৌশল করেছেন বা জোর করেছেন।শরীর তো আপনার একার জাগেনি।আমারও জেগেছে।তাহলে কেন একথা বললেন”?

প্রতিশ্রুতি ছাড়া আমরা শরীরকে অযথা সংযমে রাখি,এমন যথার্থ একটি আক্ষেপ শুনি-“আমরা দেখুন কীভাবে নিজেদের বেঁধে রাখি।হয়তো একজন আরেকজনের প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ করছি।হয়তো খুব এনজয় করা সম্ভব যৌনতা।কিন্ত কোথাও থমকে আছি সবাই।আগাতে পারছি না”।

 

রানার বহুগামী স্বভাব সহজ করার একটি স্বীকারোক্তি স্পষ্ট,যেমন-“ গভীর ও দুরারোগ্য অসুখ আমার।আমি প্রত্যেক নারীকে জড়িয়ে ধরে তার ঘ্রাণ নিই,স্পর্শ করি।

প্রথম স্পর্শের পরই ওই অসুখটা ফিরে আসে।আমি অনুভব করি,না হলো না।ওই বিদ্যুৎটা নেই “। প্রেম-ভালবাসা-শরীর,এই ত্রিভুজ ঐক্যের বিশ্লেষনে কিছু তর্ক আছে যা  মনোযোগী করে।

 

রানার জীবনে সর্দারের উপস্হিতি অনেকটা হঠাৎ করে আকাশ থেকে পরী নেমে আসার মতো।রানার কাব্যস্বপ্নের আরো বেগবান উত্তরণ সর্দারের কন্ঠে উল্লখযোগ্যভাবে  উপস্হাপিত হয়েছে।তারা দুজন  স্বভাবে কিছুটা সমান্তরাল।

 

কবিতা-বিপ্লব নিয়ে রানাকে সর্দারের অভিজ্ঞ উচ্চারণ-“ আপনার হয়তো নিজেকে বদলানো দরকার।কিন্তু আপনি সেটা করবেন না।আপনার হয়তো দুনিয়াকে বদলানোর দরকার আপনি সেটাও করবেন না।কবিরা,বুঝলেন,এমন হয়,আপনার মতো।তারা বিপ্লবের কথা ভাবে,বদলানোর কথা ভাবে,কিন্তু একটু এগিয়ে থেমে যায়।কিছু ঘটতে না পারার অসুখ থেকে কবিতার জন্ম হয় “।

অন্যত্র-“ কবিতা নিজে বিপ্লব নয়,কবিতা দিয়ে বিপ্লবও হয় না।কিন্তু কবিতার মাধ্যমে সেই  সংকেতটা মানুষ পায় “। চমৎকার অভিব্যক্তি,এখান থেকে প্লেটো কি উত্তর পাবেন কবিদের প্রোডাক্টিভিটির ? বোধকরি অমিমাংসিত পর্যালোচনা।

 

সর্দারের আড্ডায় একজন জোড় দিয়ে যখন রানার উদ্দেশ্যে বলেন- “ আধুনিক কবিতা কোথায় গিয়ে থমকে গেছে সে তা সাধুগুরুদের সাথে কথা না বললে ঠাহর করতে পারবেন না “।বাউল ফকিরের প্রজ্ঞা আধুনিক মননের চে’ উৎকৃষ্ট এই দৃঢ়তার কোনো উপমা মেলেনি!

উপন্যাসের শেষে এসে রানার আক্ষেপ হয় ফেলে আসা সময় এবং সেই সময়ের না পাওয়া  নিয়ে।যদিও চলে যাওয়া সময়ে ফিরে যাওয়া যায় না তবু চেপে রাখা অপ্রাপ্তি, হাহাকার হারানো সময়কে ঘিরেই আবর্তিত হয়।প্রথম যৌবনে শরীরের ডাকে যে তরঙ্গ বয়ে যায় তা বোধকরি কিছুকাল পরে বদলে যেতে থাকে।তবু সেই বোধটুকুর ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা থাকে।

উপন্যাসের বাস্তবতায় সংকট নেই,তবে মনোসংকট অথবা আত্মবিস্মৃত আক্ষেপ এখানে প্রকট।রাজনৈতিক বিপ্লবে দিন বদলের স্বপ্ন অথবা কবিতায় সমাজ বদলে যাওয়ার স্বপ্ন অধরা থেকে যায়।অসফল স্বপ্নের গ্লানি নিয়ে রানা চুপচাপ এক নি:সংগ মানুষ হয়ে উঠে।

 

রানা হয়তো খুঁজেছিলেন কেউ একজন তার উপর নির্ভর করুক,তার প্রয়োজন ছিলো একজন প্রতিশ্রুতিশীল নারী,একথা জানা যায় যখন রানা বলে-“কেউ আমাকে আমার মতো করে ভালবাসেনি।আমার হাত ধরে কেউ বলেনি,তুমি পারবা।তুমি যা করছো তাই করো।তুমি পারবা।আমি তোমার উপর বিশ্বাস করি”।রানা যে সমাজ বৃত্তে বেড়ে উঠেছে সেখানে এই প্রত্যয়ের পেছনে পার্থিব অবস্হার একটি প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকে।যা একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীর জীবনে সেই প্রত্যাশাও সরল মনে হয় না।এবং এই আক্ষেপটুকু গুরুত্বপূর্ণ ও না।কারণ এসব চিরায়ত চেনা ঘটনা।এখানে ব্যাপক বৈষম্যে বেড়ে উঠা কোনো কষ্ট নেই।

রানা কবি হতে পারেননি,পারেননি দ্রোহে জ্বলে উঠতে,ধরে রাখতে পারেননি কোন প্রেমিকাকে।স্ত্রী সমাজ সংসার সব সম্পর্ক থেকে নিজেকে গুটিয়ে একাকিত্বের জীবনযাপন করছেন।শেষে নিভৃতে নিজের ক্ষরণ খুঁজে নিজেকে উপলবদ্ধি করার প্রয়াস।

 

লেখক মাহবুব মোর্শেদ সহজ ভাষায় স্বতন্ত্র এক গদ্যশৈলী নির্মাণ করেছেন।যদিও তার আর কোনো লেখা পড়া হয়ে উঠেনি।শরীর বৃত্তান্তে এক মোহন মগ্নতা ও শিহরণ,যেমনটি বোধ করেছি সিকি শতাব্দি আগে রশিদ করিমের উপন্যাস-‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’ পড়ে।উপন্যাস পড়া শেষ হলেও,কিছুকাল চরিত্রগুলো মাথা থেকে নামানো যায় না।

 

উৎসর্গ পর্বে লেখা হয়েছে-“স্বর্গের উজ্জ্বল নদী”।সিরায়াসলি ? এতোসব আধুনিক চিন্তা,তত্ব-যুক্তিযুক্ত কথার শুরুতে ধর্মাক্রান্ত উচ্ছ্বাস ! চিত্রকল্প বা রুপক অর্থে হ’লে কথা নেই। যদিও এই বিষয়টি উপন্যাস সম্পৃক্ত না,তবুও একটু ধাক্কা লাগে বৈকি! অবশ্য উৎসর্গে যা ইচ্ছে লেখার স্বাধীনতাটুকু লেখকের নিজস্ব।

অসংখ্য ধন্যবাদ সেরীন ফেরদৌস,যিনি উপন্যাসটি আগ্রহ নিয়ে পড়েছেন,লিখেছেন এবং পড়তে দিয়েছেন।


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান