গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা থেকে পপ সম্রাট আজম খানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা

Fri, Jun 5, 2020 6:35 PM

গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা থেকে পপ সম্রাট আজম খানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা

ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম : ‘একে একে চলিয়া যাবে সবাই, তুমিও যাবে আমিও যাব, মিছে ভাব তাই’—মাইক্রোফোন হাতে মঞ্চে যে মানুষটি দাঁড়ালেই হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ত অগণিত মানুষ, আজ সেই মানুষটির স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার দিন। আজ ৫ জুন, বাংলা পপ গানের কিংবদন্তি আজম খানের মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১১ সালের এই দিনে সকাল ১০টা ২০ মিনিটে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে পৃথিবীর বাতাসে শেষবার নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬১ বছর। ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ চলছিল দেশের জন্য অস্ত্র হাতে নেওয়া মানুষটির। ক্যানসারের সঙ্গে এক বছরেরও বেশি সময় লড়েছিলেন, সে যুদ্ধে পরাজয় মেনে নিয়ে যাওয়ার আগে তিনি দুটি জিনিস রেখে গেছেন—স্বাধীন দেশ ও মানচিত্র আর অন্যটি বাংলা রক গান।

বাংলাদেশের ‘পপগুরু’ আজম খান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে এক বড় আদর্শ। বেশির ভাগ রক সংগীত অনুরাগীর মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এখন যে বাংলা রক ও ব্যান্ডের গান হচ্ছে, তার যাত্রা হয়েছিল এ মানুষটির হাত ধরে। একসময় ব্যান্ড মিউজিক ছিল বসার ঘরে। তাকে সবার সামনে নিয়ে আসায় নেতৃত্ব দেন আজম খান। জনপ্রিয় করে তোলেন এই ধারাকে। আজম মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব ও পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষোভ-আনন্দ, প্রেম-বেদনা, জীবন-মৃত্যুর অনুভব—সবকিছু অবলীলায় তাঁর সংগীতের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন। ব্যক্তিসত্তার ঊর্ধ্বে উঠে একজন শিল্পী কীভাবে নিজেই একটি ঘটনা হয়ে যান, আজম খান তাঁর উদাহরণ।

বাংলা পপ ও ব্যান্ড সংগীতের অগ্রপথিক তিনি। দেশের সবার কাছে তিনি গুরু আজম খান নামে পরিচিত। তার গানের বিশেষত্ব ছিল পশ্চিমা ধাঁচের পপগানে দেশজ বিষয়ের সংযোজন ও পরিবেশনার স্বতন্ত্র রীতি। মুক্তিযোদ্ধা এই শিল্পীর আজ নবম মৃত্যুবার্ষিকী ।

 

তার পুরো নাম ছিল মাহবুবুল হক খান। জন্মেছিলেন ঢাকার আজিমপুরে দশ নাম্বার কোয়ার্টারে, ১৯৫০ সালে। বাবা মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন খান ছিলেন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার, সেক্রেটারিয়েট হোম ডিপার্টমেন্ট, মা জোবেদা খাতুন। তার ছিল তিন ভাই ও এক বোন। আজম খানের বড় ভাই সাইদ খান (সরকারি চাকরিজীবী), মেজ ভাই আলম খান (সুরকার), ছোট ভাই লিয়াকত আলী খান (মুক্তিযোদ্ধা) এবং ছোট বোন শামীমা আক্তার খানম।  আজম খানের বড় ভাই সাইদ খান, মোহাম্মদী গ্রুপে আমার সহকর্মী ছিলেন ।

পড়ালেখা শুরু হয় ১৯৫৫ সালে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী স্কুলে। ১৯৬৫ সালে সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাসের পর ১৯৭০ সালে টিঅ্যান্ডটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। মুক্তিযুদ্ধের জাগরণ তখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে পড়ালেখা আর এগোয়নি তার।

বিয়ে করেন ১৯৮১ সালে ঢাকার মাদারটেকের সাহেদা বেগমকে। তাদের ঘরে আসে এক ছেলে এবং দুই মেয়ে। তাঁর দুই মেয়ে ইমা খান ও অরণি খান এবং ছেলে হৃদয় খান । সহধর্মিণী মারা যাবার পর থেকে অনেকটা নিভৃতে অনাড়ম্বর একাকি জীবন যাপন করে গেছেন আজম খান। একটা সময় গান থেকেও অনেক দূরে সরে যান। সুরের বাণিজ্যিকরণে নিজেকে কখনো বিকোতে চাননি তিনি।

১৯৮২ সালে ‘এক যুগ’ নামের এ্যালবাম দিয়ে অডিও জগতে আত্মপ্রকাশ করেন আজম খান। এরপর থেকে নিয়মিত বিরতিতে মোট ১৭টি একক এ্যালবাম করেন। তার উল্লেখযোগ্য এ্যালবামগুলোর মধ্যে আছে দিদি মা, বাংলাদেশ, কেউ নাই আমার, অনামিকা, কিছু চাওয়া, নীল নয়না ইত্যাদি।

মায়াময় দৃষ্টির প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন না বলা এক একটি কবিতা। কাব্যের হাত ধরে সুরের বর্ণ পরিচয়। বন্দুক ছেড়ে দিয়েছিলেন অনেক আগেই। পিতৃআজ্ঞা পালন করে দেশকে মুক্ত করতে গেরিলা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার অধ্যায়ও কবেই চুকেবুকে গেছে। হাতের ‘গান’ ফেলে দিলেও কণ্ঠের গানতো আর কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। হয়ে গেলেন যোদ্ধা থেকে গানের বোদ্ধা। রণাঙ্গন ছেড়ে একেবারে সঙ্গীতাঙ্গনে। সেই থেকে কোটি মানুষের অন্তরে মিশে যাওয়া এক নাম, আজম খান। যে নাম কখনও মোছার নয়, কারণ তিনি যে গুরু। গুরুদের কখনো আমরা হারাইনি, হারাতে পারি না।

 

১৯৬৮ সাল, তখন ছাত্রাবস্থায় আজম খান। খুব সাদামাটা গোছের দেখতে, লিকলিকে দীর্ঘদেহী যুবকটি। লম্বা চুলে সারল্য মাখা চাহনি। কিন্তু চাল-চলনে ব্যক্তিত্বের ছাপ ষোলোআনা। বয়স তখন আঠারো ছুঁই ছুঁই। গান বাজনা নিয়ে মেতে থাকতে ভালোবাসেন সব সময়। কখনো মনে হয়নি এই ছেলের বুকেও জ্বলছে পরাধীনতার লেলিহান শিখা।

 

যুক্ত হলেন গণশিল্পীগোষ্ঠী ‘ক্রান্তি’র সাথে। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংগীতের মাধ্যমে নতুন জোয়ার তোলার চেষ্টায় রত হলেন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ শুরু হলে নিজেকে আর ঘরে বেঁধে রাখতে পারেননি তিনি।

 

বাড়ি থেকে বিদায় বলে রওনা দেয়া, বন্ধুদের নিয়ে হাঁটা পথে কুমিল্লা বর্ডার দিয়ে আগরতলা পৌঁছানো, সেখান থেকে মেঘালয়ে সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের অধীনে দু’মাস গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেয়া- সবই যেন একটা ঘোরের মধ্যেই হচ্ছিল।

 

কুমিল্লার সালদায় প্রথম সরাসরি যুদ্ধের সাফল্যের পর তাকে একটা সেকশনের ইন-চার্জ করে ঢাকায় পাঠানো হয় গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য। যাত্রাবাড়ী-গুলশান এলাকায় গেরিলা তাণ্ডবে পুরো পাকিস্তানি বাহিনীর ঘুম উধাও করে দিয়েছিল আজম খানের দল। তার হাত ধরেই এলো ‘অপারেশান তিতাস’। ঢাকা শহরের গ্যাস পাইপলাইন নষ্ট করে দিয়ে বিদেশীদের জানান দেয়া যে এদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছে, এটাই ছিল এই অপারেশনের মূল লক্ষ্য। অপারেশনের সময় তার বাম কান আঘাতপ্রাপ্ত হয়, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে সেসব নিয়ে ভাবার সময় কোথায়। আজম খান তার সঙ্গীদের নিয়ে পুরোপুরি ঢাকায় প্রবেশ করেন ১৯৭১ এর ডিসেম্বরে। এর আগে তারা মাদারটেকের কাছে ত্রিমোহনীতে সংঘটিত যুদ্ধে পাক সেনাদের পরাজিত করেন।

 

কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রেও কখনো গানটাকে ভোলেননি তিনি। সাময়িক যুদ্ধ বিরতিতে সহযোদ্ধাদের কাছে তার গানই ছিল একমাত্র বিনোদন।

 

অবশেষে এলো সেই বহুল প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা। কিন্তু প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির সেতুবন্ধন মনের মতো হয়ে ওঠেনি। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ তখনও যেন অপেক্ষা করছিল আরেকটি সংগ্রামের। সেটি ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি ও শিল্প সংস্কৃতির শক্তিশালী অবস্থান অর্জনের সংগ্রাম। দিশাহীন পথের গন্তব্য খোঁজার চেষ্টায় পাশে পেলেন ‘আখন্দ’ ভাতৃদ্বয়কে- হ্যাপি আখন্দ এবং লাকী আখন্দ, গড়ে তুললেন ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’। ব্যান্ড স্পন্দনের পর এটি ছিল বাংলা নামে স্বাধীন দেশের দ্বিতীয় ব্যান্ড। গিটারে থাকলেন আজম খানের বন্ধু নিলু আর মনসুর, ড্রামে সাদেক আর নিজে রইলেন প্রধান ভোকাল হিসেবে। ১৯৭২ সালে বিটিভির ডাকে দুটি গান উপস্থাপন করল তাদের ব্যান্ড। একটিতে গাইলেন,

 

হে আল্লাহ, হে আল্লাহ রে

এতো সুন্দর দুনিয়ায়

কিছুই রবে না গো

হে আল্লাহ, হে আল্লাহ রে।

আরেকটি গান ছিল, ‘চার কালেমা সাক্ষী দেব’। মরমী ধারার এই গান দুটি মানুষের অন্তরের গভীরে নতুন এক আবেগের সঞ্চার ঘটায়, যা আজম খানকে কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে দেয়।

 

খুব সাধারণ ছিলেন অসাধারণ মানুষটি

 

রাজধানীর কমলাপুর এলাকায় কবি জসীমউদ্‌দীন রোডে, মতিঝিলের ব্যাংক কলোনি মাঠে কিংবা স্টেডিয়ামের সুইমিংপুলে যারা আজম খানকে দেখেছেন, তাঁরা জানেন, বিপুল জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও ব্যক্তিজীবনে শিল্পী আজম খান কতটা সহজ-সরল ছিলেন। খোলা মনের মানুষ ছিলেন। সহশিল্পী বা সংগীতজগতের মানুষেরাও প্রমাণ পেয়েছেন বারবার। কবি জসীমউদ্‌দীন রোডে বাবার রেখে যাওয়া বাড়িতেই থাকতেন সন্তানদের নিয়ে। অনেকটা নিভৃতে, অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। গান করতেন, ক্রিকেট খেলতেন। সুইমিংপুলে গিয়ে সাঁতার শেখাতেন। মানুষকে আকর্ষণ করার প্রবল ক্ষমতা ছিল তাঁর মধ্যে।

 

বাংলা পপ সংগীতের পথিকৃৎ

 

সত্তর দশকের একেবারে শুরুতে অর্থাৎ যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে লাকী আখন্দ, হ্যাপী আখন্দ, নিলু, মনসুর এবং সাদেককে নিয়ে গড়ে তোলেন ব্যান্ডদল ‘উচ্চারণ’। তার পরের বছর বিটিভিতে ‘এত সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ ও ‘চার কালেমা সাক্ষী দেবে’ গান দুটি সরাসরি প্রচারিত হলে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রশংসা আর তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। তবে ১৯৭৪ সালে ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’ শিরোনামের সাড়া জাগানো গান গেয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক হৈচৈ ফেলে দেন এই কিংবদন্তি পপ কিং। সেই সময় ফিরোজ সাঁই, ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহিদ এবং পিলু মমতাজের সঙ্গে বেশ কয়েকটা জনপ্রিয় গানও করেন এই পপগুরু। তাকে আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মতো কিছুই নেই। তিনি বাংলা পপ সংগীতের পথিকৃৎ, বীর মুক্তিযোদ্ধা আজম খান। দীর্ঘদিন দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে ২০১১ সালের ৫ জুন (আজ) ঢাকাস্থ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বাংলার সংগীত জগতের এই মহান পপতারকা ।

 

তাঁর গানগুলো যেন ছিল তাঁর সহজ–সরল জীবনের কোরাস। ‘আলাল দুলাল’, ‘সালেকা মালেকা’, ‘রেললাইনের বস্তির ছেলে’র কথা তুলে ধরে তিনি স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা গানে সমাজের নিচুতলার অতি সাধারণ মানুষকে উপস্থাপন করেছিলেন। এসব সাধারণ মানুষ, তাঁর ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বর এবং সংগীত পরিবেশনার একান্ত আপন আঙ্গিক তাঁকে দ্রুত জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। বিশেষ করে, ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে জন্মে ছিল একটি ছেলে/ ছেলেটি মরে গেছে/ মা তার কাঁদে/ বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ গানটি শ্রোতাদের হৃদয়ে তাঁর জন্য স্থায়ী আসন তৈরি করে দেয়।

 

 

গর্বিত এক বীর মুক্তিযোদ্ধা

বাবার অনুপ্রেরণায় মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন আজম খান। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে তিনি হেঁটে আগরতলা চলে যান। তার গাওয়া গান প্রশিক্ষণ শিবিরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণ জোগাতো। যুদ্ধ প্রশিক্ষণ শেষে তিনি কুমিল্লায় পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নেন। ‘২০ আগস্ট, ১৯৭১ একটা তাঁবুতে আলো জ্বলছে, আর সেখান থেকে ভেসে আসছে গানের সুর : হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশÑ বুঝলাম আজম খান গাইছে। আজম খানের সুন্দর গলা। আবার অন্যদিকে ভীষণ সাহসী গেরিলা, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা।

 

পপগুরু যখন সেকশন কমান্ডার

 

আজম খান ছিলেন দুই নম্বর সেক্টরের একটা সেকশনের ইনচার্জ। সেকশন কমান্ডার হিসেবে ঢাকা ও এর আশপাশে বেশ কয়েকটি গেরিলা আক্রমণে অংশ নেন। আজম খান যাত্রাবাড়ী-গুলশান এলাকার গেরিলা অপারেশনগুলো পরিচালনার দায়িত্ব পান। তার নেতৃত্বে সংঘটিত ‘অপারেশন তিতা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অপারেশনের লক্ষ্য ছিল ঢাকার কিছু গ্যাস পাইপলাইন ধ্বংস করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (বর্তমান রূপসী বাংলা হোটেল) এবং হোটেল পূর্বাণীর গ্যাস সরবরাহে বিঘœ ঘটানো। কারণ ওই সব হোটেলে অবস্থানরত বিদেশিরা যাতে বুঝতে পারে এ দেশে একটা যুদ্ধ চলছে। তাদের লক্ষ্য, ওই সব হোটেলে অবস্থানরত বিদেশিরা যাতে বুঝতে পারে যে দেশে একটা যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধে তিনি তার বাম কানে আঘাতপ্রাপ্ত হন।

 

শোবিজ অঙ্গনেও অসামান্য প্রতিভা

 

পপগুরু আজম খানকে গানের বাইরে মাঝে মাঝে দেখা গেছে অন্য ভূমিকায়। কখনো অভিনেতা, কখনো বা মডেল, কখনো আবার ক্রিকেটার হিসেবে। শাহীন-সুমন পরিচালিত ‘গডফাদার’ নামের একটি ছবিতে নাম ভূমিকায় খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছেন আজম খান। পরবর্তীতে আরও ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব পেলেও তা গ্রহণ করেননি। এছাড়াও আজম খান মডেল হয়েছেন এনার্জি ড্রিংক আর বাংলালিংকের দুটি বিজ্ঞাপন চিত্রে। বিটিভির একাধিক নাটকে বাউল চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন।

 

বয়স্ক ক্রিকেটার হিসেবে অনন্য রেকর্ড

 

গানের পাশাপাশি ক্রিকেটও খেলেছেন আজম খান। গোপীবাগ ফ্রেন্ডস ক্লাবের হয়ে তিনি প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছেন।

ক্রিকেটার হিসেবে আজম খান তৈরি করে গেছেন এক অনন্য রেকর্ড। তিনি দেশের বয়স্ক ক্রিকেটার হিসেবে ৪১ বছর বয়স থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত একটানা ১০ বছর ক্রিকেট খেলেছেন। ক্রিকেটে আজম খান ছিলেন একজন অলরাউন্ডার। গোপীবাগ ফ্রেন্ডস ক্লাবের হয়ে ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছেন ।

 

দেশের প্রথম পপতারকা

 

বাংলাদেশের প্রথম পপতারকা আজম খান। বাংলাদেশের পপ ও ব্যান্ড সংগীতের অগ্রপথিক। তার পথ অনুসরণ করে ব্যান্ড সংগীত বর্তমানে বাংলাদেশে একটি শিল্প হিসেবে গড়ে উঠেছে। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ে আজম খান ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে গণসংগীত প্রচার করেন।

 

বাংলা গানের ইতিহাসে প্রথম হার্ডরক

 

এই মহান সংগীত তারকা বন্ধু ইশতিয়াকের পরামর্শে সৃষ্টি করেছিলেন একটি এসিড-রক ঘরানার গান ‘জীবনে কিছু পাবো না এ হে হে!’ বাংলা গানের ইতিহাসে- এটিই প্রথম হার্ডরক হিসেবে চিহ্নিত।

 

রকস্টারদের পথদ্রষ্টা

 

‘গুরু’ নামে আশির দশকের তরুণদের কাছে পরিচিত নাম আজম খান। তার পথ ধরেই পরে এসেছেন হামিন, শাফিন, মাকসুদ, জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, হাসান, বিপ্লবসহ আরও অনেকেই।

 

পপগুরুর জনপ্রিয় যেসব গান

 

তার জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে- ‘আমি যারে চাইরে’, ‘এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’, ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘একসিডেন্ট’, ‘অনামিকা’, ‘অভিমানী’, ‘আসি আসি বলে’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘পাপড়ি’, ‘বাধা দিও না’, ‘যে মেয়ে চোখে দেখে না’ ইত্যাদি।

 

 

১৯৭৪-১৯৭৫ সাল, যুদ্ধ পরবর্তী হাহাকার চলছে চারদিকে। না পাওয়ার বেদনা স্বাধীনতার উল্লাসকে অনেক পেছনে ফেলে রেখে এসেছে। এই সময় আজম খান গাইলেন এক হতাশার গান,

 

রেললাইনের ঐ বস্তিতে

জন্মেছিল একটি ছেলে

মা তার কাঁদে

ছেলেটি মরে গেছে।

হায়রে হায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ

 

হৈ চৈ পড়ে গেল চারদিক। এ যেন এক নতুন জাগরণ। হাজার মানুষের মনের কথা যেন ফুটে উঠছে তার কণ্ঠে। শুরু হলো বাংলায় পপ গানের বিস্তার। তারই হাত ধরে ফিরোজ সাঁই, ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহিদ, পিলু মমতাজের গানের জগতে আসা। ধীরে ধীরে শ্রোতাদের হৃদয় জয় করে পপ সম্রাট হয়ে উঠলেন সঙ্গীতের মহাগুরু আজম খান।

 

আজম খানের মঞ্চে বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনা, গান গাওয়ার আকর্ষণীয় ভঙ্গি এখনও আমরা ভুলতে পারি না। সঙ্গীত ছাড়াও মিডিয়ার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি কাজ করেছেন। ১৯৮৬ সালে ‘কালা বাউল’ নামে একটি নাটকে কালা বাউলের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এছাড়াও ২০০৩ সালে ‘গডফাদার’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয় যার নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। এছাড়াও বিজ্ঞাপন জগতে তিনি পদার্পণ করেন ২০০৩ সালে ক্রাউন এনার্জি ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। পরবর্তিতে বাংলালিংক ও কোবরা ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনেও কাজ করেন তিনি।

 

তার বর্ণাঢ্য সঙ্গীত জীবনে অনেকবার পুরস্কৃত হয়েছেন, যার মধ্যে হলিউড থেকে ডিসকো রেকর্ডিংয়ের সৌজন্যে ১৯৯৩ সালে ‘বেস্ট পপ সিংগার অ্যাওয়ার্ড’, ‘টেলিভিশন দর্শক পুরস্কার ২০০২’, ‘কোকাকোলা গোল্ড বটল’ সহ ‘লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ অন্যতম।

 

ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে অন্তিম শয্যায়

 

একুশে পদকপ্রাপ্ত গায়ক আজম খান ২০১০ সাল থেকে মুখগহ্বরের ক্যান্সারে ভোগেন। এ জন্য দুবার তাকে সিঙ্গাপুরে নিয়েও চিকিৎসা করানো হয়। দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে পরিশেষে অন্তিম শয্যায় শায়িত হন এই পপগুরু ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। কিংবদন্তি এই সংগীত তারকার প্রয়াণের নবম বছর হলো। জানি হারিয়ে গেছ, ফিরে পাব না... তবুও তিনি অবিনশ্বর; চিরভাস্বর বাংলা সংগীত ভুবনে!

 

বলিষ্ঠ মনোবল আর দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বের এই লোকটির না পাওয়ার ক্ষোভ ছিল অনেক। দেশের জন্য অনেক কিছু করে গেছেন এই অভিমানী ক্ষণজন্মা বীর। বেশি কিছু চাহিদা ছিল না বলেই হয়তো শ্রোতাদের ভালোবাসাটাকেই বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। চেয়েছিলেন দেশের মানুষ সঠিক পথে চলবে, স্বাধীন দেশে স্বাধীন পতাকায় মুক্তিযুদ্ধের কথা বলবে। জীবনের ক্রান্তিলগ্নে এসে আটকে পড়লেন দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারের কবলে। গানের জগতকে শূন্য করে ২০১১ সালের ৫ জুন অসংখ্য গানপাগল ভক্তদের কাঁদিয়ে তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। আর মহাগুরুর স্মরণে তার গাওয়া একটি গান বারবার মনে বাজে অসংখ্য ভক্তের,

 

হারিয়ে গেছে খুঁজে পাবো না।

এতো দিনের আশা হল নিরাশা।

যদি জানিতাম তবে আর মিছে মরিতাম না।।

ভালোবাসা, শুধু মিছে আশা।

এ জীবনে তারে আর ফিরে পাব না।।

 

পপগুরু আজম খান সংগীতের মধ্য দিয়ে একটি শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়তে চেয়েছিলেন৷ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তাঁর সেই আন্দোলন থেমে যেতে পারে না, এমনটাই মনে করেন তাঁর ভক্ত, অনুরাগীরা৷ 

 

লেখক : ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম, বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও রাজনীতিবিদ, শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক রিসার্চ ইনস্টিটিউট’র প্রতিষ্ঠিতা ।


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান