ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল- আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী

Sun, Mar 15, 2020 1:41 PM

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল- আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো। বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।)

ইকবাল জামাল জুয়েল : এ বিষয়ে নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিকথা ৫০০ থেকে ১০০০ শব্দের মধ্যে লিখতে হবে সেই তাগাদা আহমেদ হোসেন এর অনেক দিনের। লিখিনি বা লেখা শুরু করিনি বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের পরবর্তী প্রজন্মের সদস্য ও সহধর্মিণী সাবরিনা হাবিব নিপু-র  তাগাদা যখন রাগে রূপান্তরিত হলো তখন লেখার অভ্যাস না থাকলেও লিখতে আরম্ভ করলাম। স্মৃতিকথা হিসেবে না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল সম্পর্কিত বিষয়ে লিখতেই আমি স্বচ্ছন্দ বোধ করছি।

এ বিষয়ে মনির ভাই এর একটি লেখা পড়ার সুযোগ হয়েছিলো। তাতে অনেক কিছু বেশ ভালো ভাবেই আছে। আবার কিছু কথা একদমই নাই। হয় তিনি ভুলে গেছেন বা বাহুল্য মনে করেছেন। অবশ্য সুযোগও ছিলো কম। তাছাড়া এতো বছর পর স্মৃতিতে আবছা হতে পারে বয়সের প্রভাবে। বিশেষ করে যারা লেখালেখির সাথে যুক্ত নন। সমস্যাটা আমার বেলায় তো বটেই।

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর ৮০-৮১ শিক্ষা বর্ষের অনিয়মিত ছাত্র। ৮১-৮২ শিক্ষাবর্ষের নিয়মিত ছাত্র। মাঝের এক বছর লেদার টেকনোলজিতে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি নেবার ব্যর্থ চেষ্টা করে ঢাবিতে পুণঃভর্তি হই। সংযুক্ত হই সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে, পড়ি বিষয় বাংলা নিয়ে। ঐ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক উৎসবে এই হলের নাট্য প্রযোজনা ‘ইডিপাস’ এ কোরাস টিমে সুযোগ পাই। নতুন নিরীক্ষাধর্মী নির্দেশনার এ নাটকের নির্দেশক ছিলেন সদ্য এনএসডি স্নাতক ফেরত গোলাম সরোয়ার ভাই। সাংস্কৃতিক উৎসব এর পর ডাকসু’র সামাজিক আপ্যায়ন সম্পাদক লিয়াকত আলী  লাকী ভাই'র নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ও ডাকসুর সমর্থনে গঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল যার মূল মন্ত্র ছিলো ‘আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী'। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল আনুষ্ঠানিক ভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংষ্কৃতি চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। ঐ সময় ঢাবির টিএসসি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংষ্কৃতি চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল, একটি সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট। দল মত নির্বিশেষে সবাই  সাদরে একে গ্রহণ করে র‍্যাগডে   পরিবর্তে চালু হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। সাংস্কৃতিক দল শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে এর মূল আয়োজকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

 

আমার সুযোগ হলো  সাংস্কৃতিক দলের সাহচর্যে আসার। সেই সাথে সদস্য হই লোক নাট্যদলের। কোনটা আগে এখন আর সেটা মনে নেই। লোক নাট্যদলের রিহার্সেল হতো তেজগাঁও সরকারী কলেজ ও সাংস্কৃতিক দলের রিহার্সেল হতো টিএসসিতে । শুরুতে উভয় সংগঠনের ব্যাক স্টেজ কর্মী আমি। লোক নাট্যদলের অধিকাংশ সদস্যই ঢা.বি.সা. দলের সদস্য ছিলো। লোকনাট্য দলের কথা সুযোগ পেলে অন্য লেখায় লিখবো। যেহেতু ব্যাক স্টেজ কর্মী তাই অনুষ্ঠান বা শো’ র সময় ছাড়া অবসরও বেশী। তাই সেই ফাঁকে সংস্কৃতি চর্চা পর্বে ফটোগ্রাফি কোর্স , আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কোর্স , উচ্চারণ প্রশিক্ষণ কোর্স , মুকাভিনয় প্রশিক্ষণ কোর্স ও নাট্যচক্রের নাট্য প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণ  করি। নাট্য প্রশিক্ষণ কোর্স অনিয়মিত হলেও দীর্ঘ মেয়াদী হওয়ায় সংস্কৃতি অঙ্গনে যুক্ত থাকার একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়।

 

ছাত্র রাজনীতির সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের আগেই যুক্ত ছিলাম। সে ধারাবাহিকতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও অব্যাহত থাকলো। সহপাঠী বান্ধবীও ছিলো। ফলে ক্লাসের ফাঁকে মিছিল ও বিকেলে রোকেয়া এবং শামসুন্নাহার হলের মহড়াও নিয়মিত চলতো। তাই সাংস্কৃতিক চর্চায় অনিয়মিত না হলেও গতি শম্ভুক ছিলো । পেছনের কর্মী বলে কথা । কি শিখলাম তা দেখার ইচ্ছে আমারও ছিলো। কিন্তু সুযোগ আসছিলো না। লিয়াকত আলী লাকী ভাইয়ের নজর ব্যাক এ ভালোই , ফ্রন্ট এ কম। এক সময় সে সুযোগও এলো, সে কথা অন্যদিন।

 

সেটা ছিলো এক সুবর্ণ সময়। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো জ্ঞানের, মননের, সৌহার্দ্যের এক দূর্লভ সমাবেশ। দেশের সকল ক্ষেত্রের সকল মেধাবী ছাত্রের এক বিরল সম্মিলন ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আমার দেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়। সহপাঠী, বিভাগ, হল, ছাত্র রজনীতির সহকর্মী ও ঢা .বি .সা .দলের সদস্য মিলে বিরাট সংখ্যক বন্ধু সৃষ্টি হয়। আজ তাদের অনেকের  কথা মনে পড়ছে। সে সময় সাংস্কৃতিক দলের কয়েকটি অসাধারন যুগান্তরকারী  প্রযোজনা যারা প্রত্যক্ষ করেছেন তারা আমৃত্যু ভুলতে পারবেন না। দলে উল্লেখযোগ্য  চরিত্রে অভিনয় বা কাজ করার ফলে অনেকে জনপ্রিয় ছিলো । এর মধ্যেই আমাদের একটা নিবিড় বন্ধন তৈরি হতে থাকে। আমাদের মধ্যে সবার একটা মহৎ উদ্দেশ্য, লক্ষ্য কাজ করতো,  তাই কাজের পরিবেশ ছিলো অনন্য। যে গুটিকয়েক খ্যাতিমান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ত্বের কিছু ভুল সংশোধন ও নিয়ন্ত্রণের দরকার ছিলো তা আমরা যথাযথ ভাবে করেছিলাম। কিন্তু সে সকল ব্যাক্তিদের নাম এবং ঘটনা আজ আর উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করছি না। অবশ্য ধাম ( হুটহাট কোথাও দল বেঁধে বেরিয়ে যাওয়া) এর বাইরে একটি ভিন্ন বিষয় ছিলো যা সাংস্কৃতিক দলের কর্মকাণ্ডকে ব্যাহত করেনি বরং কাজের ক্লান্তি দূর করতে সহায়তা করেছে, যদিও সবাই ধামের সদস্য ছিলাম না।  আমার সাথে রহিম ভাই, আহমেদ, কিসলু, আনিস, মাহবুব, সাইফুল, অশোক দত্ত, মনির ভাই সুজিত মোস্তফা ,  লেমন ভাইদের সাথে বন্ধুত্ব ছিলো ভিন্ন মাত্রার। লাকী ভাই ছিলেন আমাদের সকলের মধ্যমনি।

 

সে সময়ের ছাত্রদের শিক্ষা নীতির আন্দোলন পরিশেষে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে রূপ নিলো এবং সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হতে থাকলো। তবে সক্রিয় ছাত্র রাজনীতির সাথে সংযুক্ত ও সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হবার ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে আমার কাজ করার সুযোগ ছিলো উভয় ক্ষেত্রে। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন আরো উত্তাল রূপ নিতে লাগলো। সময়টা যেন ছিলো ৬৯, ৭০, ৭১ এর মতো। সেদিন যেমন সবাই ছিলো এক প্রাণ, আশির শেষের দিকের অবস্থাও প্রায় ছিলো তেমনি। কোথাও ভিন্ন মত নাই। আমাদের প্রায় সকলের চাওয়া ছিলো একটাই ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক‘। আমাদের সকল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে একই চেতনা এবং এর  সর্বাগ্রে ছাত্রসমাজ যার অন্যতম মুখপাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। আমাদের সকল প্রযোজনা যেমন নাটক, পথ নাটক, গান,গণসঙ্গীত,  আবৃত্তি ইত্যাদি সকল কর্মকান্ডের মূলমন্ত্র এক ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক'।

আমরা তা কোনো প্রতীকি ভাষায় বলতাম না, নির্ভীক ভাবে স্পষ্ট ও সহজ ভাষায় সরাসরি বলতাম এবং তাতে আমরা সফলও হই। কি সাভার স্মৃতিসৌধ, কি শহীদ মিনারের প্রথম প্রহরে, মে দিবসে, সকল জাতীয় দিবসে আমরা যেন আরো বেগবান, আরো সোচ্চার। কোনো বাঁধাই আমাদের দমাতে পারেনি। আমাদের স্বৈরাচার বিরোধী কর্মকাণ্ড সকলের প্রাণে কথা হয়ে ওঠে। আমরা সত্যিকার অর্থেই হয়ে উঠি সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী। লাভ করি সমস্ত রাজনৈতিক দলের সমর্থন। স্বৈরাচার বিরোধী রাজনৈতিক দলের অনেক কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ – পরোক্ষ ভাবে আমরাও অংশগ্রহণ  করি। সকলের অংশগ্রহণ   সম্মিলিত আন্দোলন ও অনেক ত্যাগের বিনিময়ে ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের পতন হয়। যার সমঅংশীদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল এবং এর কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। আমি নিজেও ঐ দলের একজন নগণ্য গর্বিত সৈনিক ইকবাল জামাল জুয়েল।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান