বাজারে জিনিসপত্র ফুরিয়ে যাবে- এমন ভাববার কারন নাই

Fri, Mar 13, 2020 2:13 AM

বাজারে জিনিসপত্র ফুরিয়ে যাবে- এমন ভাববার কারন নাই

শ্ওগাত আলী সাগর:বিকেল থেকেই নানা জনের পোষ্ট দেখছিলাম ফেসবুকে। ওয়ালমার্ট, নো ফ্রিলসমহ এথনিক গ্রোসারি স্টোরগুলোয় যেনো উপচে পড়া ভীড়। কেনাকাটা করতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে সবাই। অনেকেই ছবি তুলে সেগুলো পোষ্ট দিচ্ছেন,কেউ কেউ ভিডিও করে আপলোড করছেন। কেউ কেউ গ্রোসারি স্টোরের শূণ্য হয়ে যা্ওয়া শেল্ফ এর ছবি দিয়েছেন।

ঠিক এই সময়েই এক বন্ধুর ফোন। নানা কথার পর হঠাৎ তিনি  জানতে চান- আচ্ছা, আপনি কি মনে করেন, ওয়ালমার্ট, নো ফ্রিলস বন্ধ হয়ে যাবে?

: কেন- আমি প্রশ্ন করি।

: এই যে করোনা ভাইরাসে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সে কারনেই।এমন হ্ওয়ার কি চান্স আছে যে সব স্টোর বন্ধ হয়ে গেলো!

মুহুর্তে থমকে যাই। এই যে সবাই গ্রোসারি স্টোরে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে, তাদের সবাই কি এমনই ভাবছেন? সবাই কি মনে করছেন- দোকান পাটের জিনিসপত্র ফুরিয়ে যাবে, কিংবা স্টোরগুলো বন্ধ হয়ে যাবে? নইলে এইভাবে সবাই জিনিসপত্র কিনে মজুদ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেন কেন?

টেলিফোনটা রেখেই বেরিয়ে পরি। মানুষের এই ‘পাগলাটে’ আচরনটা নিজ চোখে না দেখলেই নয়! বাংলাদেশি গ্রোসারী স্টোরগুলোতে ভীড় দেখে আমার তো চক্ষু চড়কগাছ। ফেসবুকের পোষ্ট পড়ে আর মানুষের মুখে শুনে শুনে পরিস্থির আঁচ করা যাচ্ছিলো না। সত্যিই কি কানাডা তা হলে কোনো দুর্বিপাকের মুখোমুখি? সত্যিই কি রাত পোহালে দোকানের সব পণ্য ফুরিয়ে যাবে? বাংলাদেশি স্টোরগুলোর চিত্র দেখলে যে কারো তাই মনে হবে।

দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষমান অনেক পরিচিতজনদের পা্ওয়া গেলো।একজন ফিসফিস করে বললেন- দেখেন, এরা দাম পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে। ‘না বাড়িয়ে উপায় কি?’- মনে মনে বলি। তা ছাড়া বাংলাদেশি গ্রোসারি স্টোর বলে কথা!

নোফ্রিলস, ওয়ালমার্টেও একই ভীড়। এই স্টোরগুলোতে আমি মানুষের মুখগুলো দেখার চেষ্টা করি। প্রায় সবাই অভিবাসী কানাডীয়ান। ‘হুজুগ’টা কি তা হলে অভিবাসীদের মধেই প্রকট!  চেইন স্টোরগুলো মানুষের ভীড় দেখে, ক্রেতাদের অস্থিরতা দেখে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়নি।যেটা বাংলাদেশি স্টোরগুলো করেছে। আরেকটা বিষয় চোখে পড়লো। সেল্ফ খালি হ্ওয়ার সাথে সাথেই  কর্মীরা দ্রত জিনিসপত্র এনে শূণ্য সেল্ফ পূরণ করে দিচ্ছে।   বিশেষ করে নোফ্রিলস এই ব্যাপারে বেশি তৎপর মনে হলো। তার মানে কি? তারা ক্রেতাদের আস্থা ধিরে রাখতে চায়? নিশ্চিত করতে চায়- তাদের পণ্য ফুরিয়ে যাবে না, চাহিদা মোতাবেক পণ্য সরবরাহে তারা প্রস্তুত!

কিছুদিন আগে ফেডারেল স্বাস্থ্যমন্ত্রী  নাগরিকদের পর্যাপ্ত খাবার সংগ্রহে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তার পরামর্শটা কি  জনমনে বিশেষ করে অভিবাসীদের মনে আতংক তৈরি করেছে?  সেই সময় থেকেই নাগরিকরা খাদ্যসামগ্রীসহ  প্রয়োজনীয় নানা পণ্য কিনে বাসায় মজুদ করতে শুরু করে। মাঝে মধ্যেই ফেসবুকে নানাজনের পোষ্ট চোখে পড়তো- অমুক স্টোরে টয়লেট পেপার সোল্ড আউট, তমুক স্টোরে হ্যান্ড সোপ নাই। পরিস্থিতিটা যে এতোটা হয়ে গেছে- সেটা ঘরে বসে টের পা্ওয়া যায়নি।

ফেডারেল মন্ত্রীর আহ্বানটা ছিলো সতর্কতা হিসেবে। যদি কেউ যদি করোনায় সংক্রমিত হয়ে পরেন, কাউকে যতি সেল্ফ আইসোলেশনে থাকতে হয় তা হলে সেই সময়টায় যেনো কেউ সমস্যায় না পরেন। যেনো হাতের কাছে প্রয়োজনীয় সবকিছুই থাকে। কাউকে বাইরে যেতে না হয়। সবাই সেই পরামর্শের  কি অর্থ বুঝেছে তা ঠাহর করা কঠিন।  এই যে যারা স্টোরে স্টোরে ভীড় জমিয়েছেন, শপিং কার্ট ভর্তি করে জিনিসপত্র কিনে নিয়ে আসছেন, তাদের সবাই আশংকা করছেন- তাকেই সেল্ফ আইসোলেশনে যেতে হবে! তার প্রস্তুতি হিসেবেই কি তারা বেশি বেশি  খাদ্যসামগ্রী কিনে রাখছেন। না কি তারা মনে করছেন- বাজারের সব পণ্য উধাও হয়ে যাবে? দোকান পাট বন্ধ হয়ে যাবে?

সব পণ্য শেষ হয়ে যাবে কিংবা দোকান পাট বন্ধ হয়ে যাবে- এমন ভাবনা কানাডার মতো দেশে কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়।ওয়ালমার্ট এবং নোফ্রিলস এ সেল্ফ খালি হ্ওয়ার সাথে সাথেই পণ্য রেখে ভরাট করে দেয়ার প্রক্রিয়া দেখে এই বিশ্বাস জন্মেছে। এই সব চেইনশপগুলো তাদের ব্যবসার কারনেই স্বল্পতম সময়ে পণ্য এনে ক্রেতার সামনে তুলে ধরবে। আর কানাডা সরকারও তার বাজারে পণ্য নেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে দেবে বলে আমার মনে হয় না।

আমরা যেসব পণ্য সামগ্রী কিনি তার সিংহভাগইতো কানাডা আমদানি করে। বিশ্বের নানা দেশ থেকে পণ্য আমদানি করে তারা তাদের নাগরিকদের জন্য সরবরাহ পর্যাপ্ত রাখে। যে দেশে বছরের প্রায় পুরোটা সময় ধরেই মৌসুমী ফল আমের সরবরাহ থাকে, সেই দেশে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট দেখা দেবে- এমন ভাবনাকে আমি পাত্তা দিতে চাই না। কাজেই পণ্যসামগ্রী নিয়ে ’হুজুগে দৌড়ানোর’ পক্ষে আমি না।

একটা কথা বলি।করোনাভাইরাস নিয়ে সতর্ক হ্ওয়ার দরকার আছে, সচেতন হ্ওয়ার দরকার আছে। কিন্তু আতংকিত হ্ওয়ার,আতংক ছড়ানো ঠিক না। সবাই যখন বাজারে হুমড়ি খেয়ে পরে, পণ্য কিনে সেল্ফ খালি করে ফেলার চেষ্টা করে সেটি জনমনে  আতংক তৈরি করে, অস্তিতিশীলতা  তৈরি করে। এই অস্থিরতাটা একেবারেই কাম্য নয়।সবাইকে বলি, যুক্তি দিয়ে ভাবুন, যু্ক্তি  দিয়ে সিদ্ধান্ত নিন।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমনের এই সময় কেবল আপনি ভালো থাকলেই তো  চলবে না। আপনার আশপাশের মানুষদেরও ভালো থাকতে হবে। আশপাশের মানুষগুলো ভালো না থাকলে,সুস্থ না থাকলে আপনিও কিন্তু নিরাপদ থাকতে পরবেন না।

লেখক: শ্ওগাত আলী সাগর, নতুনদেশ ডটকম এর প্রধান সম্পাদক


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান