দ্বিতীয় খুনের কাহিনি: প্রাথমিক পাঠ প্রতিক্রিয়া

Mon, Mar 2, 2020 11:32 PM

দ্বিতীয় খুনের কাহিনি: প্রাথমিক পাঠ প্রতিক্রিয়া

শ্ওগাত আলী সাগর: পর পর দুদিন একই ব্যাপার ঘটলো। ২/৩ পৃষ্ঠার পর আর কিছুতেই এগুতে পারলাম না। ঢাকার বইমেলা থেকে আসা বইগুলোর মধ্যে এটিই প্রথম পড়তে শুরু করেছিলাম। মশিউল আলমের লেখালেখির ব্যাপারে বরাবরই আমার একটা উচ্চ ধারনা আছে। এই বইটিও আমি আনিয়েছি ব্যাপক আগ্রহ নিয়েই।

কিন্তু দুদিনেও যে বইয়ের ২/৩ পাতার পর এগুনো গেলো না, সেই বই নিয়ে আমার এতো আগ্রহ কেন হয়েছিলো?

তৃতীয়বার বইটা হাতে নিলাম অনেক রাতে, ঘুমুতে যাবার আগে। তার আগে পণ করে নিলাম- ভালো না লাগলেও আজ ১০ পৃষ্ঠা পড়ে ঘুমুতে যাবো। সর্বনাশ ঘটালো সেই পণটাই। কখন যে প্রায় ভোর হয়ে গেছে টেরই পেলাম না। আশ্চর্য! এমনভাবে আঁকড়ে ধরলো কিভাবে বইটা?

মশিউল আলমের ‘দ্বিতীয় খুনের কাহিনী’র কথা বলছি। জেনালে জিয়া এবং মঞ্জুরের হত্যাকান্ডের ছায়াচ্ছন্ন ঘটনা নিয়ে এই বইয়ের কাহিনী গড়ে উঠেছে বলে ফ্ল্যাপে তথ্য দেয়া আছে। বাস্তবের ঘটনা নিয়ে গল্প কিংবা উপন্যাস লেখা কঠিন।আর সেটি যদি হয়- বহুল আলোচিত রাজনৈতিক কোনো ঘটনা, তা হলে সেটিকে ঠিক গল্প কিংবা উপন্যাস করে তোলার জন্য লেখকের অসাধারন দক্ষতা থাকতে হয়। নইলে সেটি ঘটনার বিবরন কিংবা সংবাদপত্রের ফিচার টিচার হয়ে যা্ওয়ার আশংকা থাকে। কোনো রকমে প্রথম অনুচ্ছেদ শেষ করে দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে ঢুকে যা্ওয়ার পর থেকেই আসলে মশিউলের গল্প বলার, চরিত্র নির্মানের,ক্লাইমেক্স তৈরির সর্বোপরি পরিবেশ পরিস্থিতির চিত্রায়নের মুন্সীয়ানার সঙ্গে পরিচয় ঘটতে থাকে।দ্বিতীয় খুনের কাহিনি’ তখন আর কেবলমাত্র জিয়া – মঞ্জুরের হত্যাকান্ডের ‘ছায়াচ্ছন্ন ঘটনা’ থাকে না।

জিয়াকে কিভাবে এঁকেছেন মশিউল? মঞ্জুরকে? মশিউল নিজে কোনো কথা বলেননি। কারো মুখ দিয়ে পেছনের দীর্ঘ ইতিহাস বয়ানের বিরক্তিকর চেষ্টাও  তিনি করেননি। কাহিনীর বাঁকে বাঁকে নানা পর্যায়ের সেনা কর্মকর্তাদের মুখ দিয়ে যে সব উক্তি বেরিয়েছে সেগুলো জোড়াতালি দিলে যে জিয়ার অবয়ব তৈরি হয়, সেটি কোনোভাবেই রাজনীতির মাঠে যে জিয়াকে উপস্থাপন করা হয়- তার সঙ্গে মেলে না।  সেই জিয়া খুন হয়েছেন চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে,খুন পরবর্তী ঘটনা প্রবাহে মশিউলের পাত্রপাত্রীরা কোনোভাবেই পাঠককে ছাড়তে চাইবে না, একেবারে মনোযোগি  পাঠক না হলেও । কাহিনীর পরম্পরা জানিয়ে দেয়- জিয়া এবং মঞ্জুর হত্যার নেপথ্য ক্রীড়নক এরশাদ, কিন্তু সেই বার্তাটাও তিনি সাংবাদিকের মতো করে দেন না, কাহিনীর বিন্যাসেই সেটিই মূর্ত হয়ে ওঠে।

’দ্বিতীয় খুনের কাহিনি’র মূখ্য চরিত্র  জিয়া এবং মঞ্জুর হলেও  আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে রেজা নামের তরুন এক মেজর,যাকে জেনারেল মঞ্জুর অস্থির সময়টায় নিজের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আহা! মেজর রেজা আমাকে এতোটাই ছুঁয়ে দিলো যে, বার বার মনে হচ্ছিলো- মেজর রেজার চরিত্রকে কেন্দ্র করেই তো চমৎকার একটি গল্প কিংবা উপন্যাস হতে পারে।

শুরুতেই বলেছিলাম- বাস্তব ঘটনা নিয়ে গল্প উপন্যাস লেখা কঠিন কাজ, সেটি গল্পের চেয়েও ধারাভাষ্য হয়ে যায়। মশিউল সেটি করেননি, পুরোপুরি সাহিত্য করেছেন, ঘটনার সাথে সাথে পরিবেশ পারিপার্শ্বিকতার যে বিবরন, কোথাও কোথাও  প্রতীকী পাল্টা কাহিনির সংযোজন ঘটিয়েছেন- তা অসাধারন। আর এই সব কারনেই ‘দ্বিতীয় খুনের কাহিনি’ একটি উপন্যাস হয়ে উঠেছে, সাহিত্য হয়ে উঠেছে।

পুনশ্চ: মশিউলের ‘দ্বিতীয় খুনের কাহিনি’ পড়ার পর এটি হচ্ছে আমার প্রাথমিক পাঠপ্রক্রিয়া। বইটা নিয়ে আরো ডিটেইলস ভাবনাগুলো প্রকাশের জন্য মন আঁকুপাকু করছে। সময় সুযোগ করে নিশ্চয়ই সেটি করবো।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান