“এক ঝাঁক জোনাকী,সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী”

Wed, Feb 12, 2020 11:33 PM

“এক ঝাঁক জোনাকী,সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী”

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো।– বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।)

লতিকা সরকার লতা : শ্যামলী বাংলার বিভিন্ন প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকা ছোট্ট ছোট্ট জোনাকী মিটি মিটি আলো ছড়াতে ছড়াতে উড়তে উড়তে এক সময় এসে জড়ো হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অংগনে।এক ঝাঁক জোনাকীর আলোর ছটায় আলোকিত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন। সঠিক পথ নির্দেশনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি ছাড়িয়ে সমগ্র দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক জগতকে করেছে আন্দোলিত ও উৎসব মূখর। তৈরী করেছে সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ।

            শুরুটা হয়েছিল ১৯৮২ সনে ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে । ডাকসু সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে বিপুল ভোটে জনাব লিয়াকত আলী লাকী ভাইয়ের জয়লাভ এবং তাঁরই সুযোগ্য নেতৃত্বে সৃষ্টি হলো আনুষ্ঠানিকভাবে ০৭ সেপ্টেম্বর ১৯৮২ সনে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। আমি এ দলের সদস্য হয়েছিলাম একদম শুরুতে অডিশনের মধ্য দিয়ে । এ দলের সদস্য হতে পেরে বিশ^বিদ্যালয় জীবনের দিনগুলো আজো আমার ‘স্বর্ণালী দিন’ হয়ে আছে ।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি তখন রোকেয়া হলের এক্সটেনশন ভবনের আবাসিক ছাত্রী । ডাকসু নির্বাচনের পূর্বে ‘র‌্যাগ ডে এর নেতিবাচক অভিজ্ঞতা একটু না বললেই নয় । রাত ০১ টার দিকে রোকেয়া হলে এক্সটেনশন ভবনের সিড়ি এবং বারান্দায় সব লাইট অফ করে দেয়া হলো। রোকেয়া হলের ঠিক বিপরীতে মেইন গেটের রাস্তার উপর র‌্যাগ ডে  অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের একটি গ্রুপ কুরুচিপূর্ণ,অশ্লীল শারিরীক কসরত দেখে আমি স্তম্ভিত আর হতবাক হয়ে ভাবছিলাম - একটি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা জীবন সমাপ্তির পথে কিভাবে কুরুচিপূর্ণ,অদ্ভুত কর্মকান্ড করা সম্ভব হচ্ছে!!

            অতপর আমাদের প্রিয় লাকী ভাই এই ছোট্ট ছোট্ট একঝাঁক জোনাকীর আলোয় আলোকিত,উদ্ভাষিত করলেন র‌্যাগডের আন্ধকারময় জগতকে। নব উদ্যমে র‌্যাগডের পরিবর্তে প্রচলন ঘটলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। এক্ষেত্রে সংগীত পরিবেশনসহ নানা কর্মকান্ডে সাংস্কৃতিক দলের সদস্যরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করলো ।

           ক্রমশ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের কর্মযজ্ঞ সম্প্রসারিত হয়ে বছরব্যাপী শুরু করলো নানাবিধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান । একের পর এক নাটক, পথনাটক,ডাকসু নাট্যোৎসব, ডাকসু সাংস্কৃতিক প্রতিযোগীতা,সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটে অগ্রণী ভূমিকা পালন সহ,বি.টি.ভি, বিশ^বিদ্যালয় খেলার মাঠে সর্বত্রই এই দল সমগ্র সাংস্কৃতিক জগৎকে করেছে আলোড়িত,আন্দোলিত। যেমন ছিলেন দলের পরিচালক আমাদের প্রিয় লাকী ভাই, তেমনি ছিল তাঁর সুযোগ্য সদস্যরা । সে সময়টি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের ‘স্বর্ণযুগ’।

রোকেয়া হলের সরস্বতী পূজা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুটা করেছিলাম আমরা কয়েকজন। সাংস্কৃতিক দলের পরিচালনায় সংগীত অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পূজার সমাপ্তি হতো। সন্ধ্যায় দলের সদস্য আমি আর সুনীতা রায় আরতী নৃত্য করতাম। ঢাবিসাদ দলের সবাই উৎসবের আমেজে সর্বদা সজীব ও অফুরন্ত প্রাণশক্তিতে ছিল ভরপুর।

তবে আমাদের এই অগ্রযাত্রায় ছিল বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা। বেশ কয়েকবার আমরা অনাকাঙ্খিত ঘটনার শিকারও হয়েছি সুস্থ ধারার সংস্কৃতিচর্চা বিকাশে। একদিন সন্ধ্যার পর হঠাৎ গোলাগুলির শব্দ ও ধোঁয়া,আমরা বেশ ভয়ও পেয়েছিলাম ক্ষণিকের জন্য। জানতে পারলাম সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরীদের অগ্রযাত্রা রোধ করতেই এসব অনাকাঙ্খিত ঘটনার সূত্রপাত। গোলাগুলি থামতেই আমি আর বেলী লাকি ভাইয়ের নির্দেশে দৌড়ে হলে ফিরে আসি। আর একদিনের স্মৃতিও এ মুহুর্তে মনে পড়ছে, স্নেহভাজন আহমেদ  পিলখানায় একটি অনুষ্ঠান করতে দলকে নিয়ে গিয়েছিলাম । সে দিনের অনুষ্ঠানেও একটু সমস্যায় পড়তে হয়েছিল।

 

 এমনিভাবে সাংস্কৃতিক দলের সদস্যরা নিরলসভাবে সুস্থধারা সংস্কৃতি বিকাশে নিজ নিজ জায়গা থেকে তাদের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দিয়েছে দলকে ভালোবেসে। আজ শ্রদ্ধেয় লাকি ভাই লাকি হতে পেরেছেন একঝাঁক চৌকস এবং সেরা মেধাগুলোর সমন্বয়ের ফলশ্রুতিতে। তাঁর একুশে পদক প্রাপ্তি এ যেন দলেরও প্রাপ্তি। সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসের পর বিকেল হতে না হতেই সোজা টি.এস.সি তে লাকি ভাইয়ের কক্ষে, কখনো পাশের কক্ষে,একের পর এক নাটক,আবৃত্তি ও গানের মহড়া চলেছে। সোনাই মাধবের গানগুলো আজও মুখস্ত। ডাকসু সাংস্কৃতিক প্রতিযোগীতায় শাকিলা জাফর,সুমনা হক,শুভ্রদেব তখনো সেলিব্রেটি হয়ে উঠেনি। বেঞ্জু,পাপড়ি এবং আমি রবীন্দ্র সংগীতে যথাক্রমে ১ম,২য় ও ৩য় স্থান অধিকার করেছিলাম। আমাদের এই বন্ধন আজো অটুট। রবীন্দ্র জয়ন্তী,ডাকসুর অভিষেক অনুষ্ঠান, বিজয় দিবসে সাভার জাতীয় স্মৃতি সৌধের অনুষ্ঠানে সংগীতের পাশাপাশি সেদিন আমি কবিতা আবৃত্তি করেছিলাম। সেই থেকে আমার শ্রুতি নাটক ও কবিতা আবৃত্তি শুরু।

 ঢাবিসাদ থেকে আমরা প্রতিটি সদস্য নিজেদেরকে তৈরী করেছি ভবিষ্যত পরিপূর্ণ মানুষ হবার। একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি কিভাবে সহশিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠভাবে,সুস্থধারা ও নান্দনিকতায় প্রবাহিত করতে হয় সে দিকনির্দেশনা আমি পেয়েছি দলের কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়ে।

 

                   ডাকসুর নাট্য উৎসবে রোকেয়া হল থেকে আমরা মঞ্চস্থ করেছিলাম চিরকুমার সভা। তখন সবে ভারতের পূণা থেকে ফিরেছেন বাহার উদ্দীন খেলন ভাই,ভাষ্করদা,আমিনুল হক টোকন ভাই। খেলন ভাই আর ভাষ্করদার পরিচালনা ও সহযোগীতায় আমরা এতটাই সুন্দরভাবে নাটকটি মঞ্চস্থ করেছিলাম যে টি.এস.সি অডিটোরিয়াম ছিল কানায় কানায় পরিপূর্ণ। ভি.সি স্যারের নাকি দেরীতে আসায় প্রবেশ করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। আমি, বেঞ্জু নেপথ্য কন্ঠ দিয়েছিলাম। এই নাটকের সূত্র ধরেই খেলন ভাই আর খালেদা বিউটির শুভ পরিণয় হা হা হা ।

 

              এক সম্মোহনী বাঁশীর সুরে আমরা বিমোহিত। দলের সদস্যরা পড়ালেখার জন্য যতোটা না ভাবতাম দলের জন্য আমাদের ভাবনা ছিল এক ও অভিন্ন। কালজয়ী গানগুলো এখনো নানা অনুষ্ঠানে গেয়ে চলেছি,প্রাণে প্রাণ মিল করে দাও,অধিকার কে কাকে দেয়,চলছে মিছিল চলবে মিছিল ও আলোর পথ যাত্রী ইত্যাদি অজস্র  গান।

 

           দলের সদাপ্রস্তুত হাস্যমুখ রহিম ভাই,বাকি ভাই,অসি দপ্তর সামলানো থেকে সর্বত্র, রেশমি চুল উড়িয়ে মনির ভাই টগবগে ঘোড়ার মত দৌড়ে দৌড়ে কাঁজের মাঝে নিজেকে সঁপে দেয়া,সুজিতদার ‘বনে নয় মনে মোর পাখী আজ গান গায়, পুলকদার অপূর্ব কন্ঠ ও গায়কী,টোকন ভাইয়ের রাগাশ্রয়ী কন্ঠে অপূর্ব এক গানের অলিখিত,অনির্ধারিত আসর জমে যেত লাকি ভাইয়ের কক্ষে। আরো ছিল সান্তনুদার মায়াবী কন্ঠে পিন্টু ভট্টাচার্যের বিখ্যাত গানগুলি,শৈবালদার, নারায়নদার অপূর্ব লোকসংগীত,বিকাশদা,দিলীপদার কন্ঠের মাধুর্য্য, শ্যামল চৌধুরী দাদার গণসংগীত আজো অমলিন। মনে মনে বলতাম ‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী’ ।

 

          লাকী ভাই আজ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালকের পদে আসীন। তাঁর দলের অন্য সদস্যরাও নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ‘হাম কিসিসে কম নেহি’ অবস্থানে । দলের বেশ কিছু সদস্যদের নাম আজো স্মৃতিতে উজ্জল। লেমন ভাই , হিরা,অভিজিৎ চৌধুরী,অরিজিৎ চৌধুরী,সাজেদ আকবর  (ছোটকা দা),মিন্টু ভাই,সামলু,শ্যামল কর্মকার,জিয়া,মিতা ভাই,আহম্মদ,শাহীন,অসি,সোহেল,অনুপ,এ্যানি আপা,এলিস আপা,,ডালিয়া আপা,কল্পনা আপা,ডায়না আপা,সাজু,ডুরিন আপা,বিরুপাক্ষ,শিমু,লিপি,সুবর্ণা,চম্পা,মৃদুলা,লিপিকা,বিপা,কৃষ্টি,ইস্তেকবাল, সুনিতা,আলম আরা বিউটি,মেহেরুন্নেসা লাকি,রিমি,ইয়াসমিন,মুন্না,নয়ন,চয়ন,সত্যেন,দলের ৪৬০ জনের নাম এ মুহুর্তে মনে করতে পারছিনা বিধায় আন্তরিক দু:খিত।

          কিভাবে যে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এতগুলো বছর কেটে গেল টেরই পেলাম না ঢাবিসাস  এর কারনে বাবা - মা পরিজনদের ছেড়ে খারাপ লাগা কাকে বলে সাংস্কৃতিক দল তা উপলব্ধি করার সুযোগই দেয়নি। এটাই ছিল আমার পরিবার । সন্ধ্যা পর্যন্ত হৈচৈ,গান,আড্ডা দিয়ে বেলী আর আমি এক দৌড়ে রোকেয়া হলের গেটে এসে ধুমধাম গেট চাপড়ে ডাকতাম, ও দাদু গেট খুলেন। আমি লতা আর বেলী,সাংস্কৃতিক দলের সুবাদে আমরা একটু দেরী করে হলে ঢোকার সুযোগ পেতাম। আবাসিক শিক্ষিকারা আমাদের বিশেষ  স্নেহ  করতেন।

           আহমেদ হোসেন  ১০০০ শব্দ নির্ধারণ করে দিয়েছে। প্রাণের অসীম আবেগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেময় স্বর্ণযুগের কথা ১০০০ কেন, কোন সংখ্যায় তাকে বাঁধা সম্ভব নয় । প্লিজ আহমেদ  কোন অংশ বাদ দিওনা। আখেরি অনুরোধ তোমার প্রতি।

      সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রপথিক ঢাবিসাদ এর আলোর পথ যাত্রীরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে আজ বিশ্বের  সর্বত্র নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আজো প্রাণের টানে একই বন্ধনে আবদ্ধ। আমাদের এ বন্ধন অটুট,অমলিন হোক এ প্রত্যয় আমাদের সকলের।

লেখক: লতিকা সরকার (লতা), অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ইতিহাস বিভাগ,ইডেন মহিলা কলেজ,ঢাকা


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান