ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল- কিছু স্মৃতি

Fri, Feb 7, 2020 10:55 PM

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল- কিছু স্মৃতি

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো। বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।)

সৈয়দা দিলরুবা ইয়াসমিন (মুন্না): জানি সব স্মৃতি মধুর নয়, আবার সব স্মৃতির কক্ষে গোবাক্ষে মন যেতেও চায় না। তবুও স্মৃতি সতত সুন্দর।

আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের কিছু স্মৃতি আছে যা আমার জীবনের অনেক কিছুর প্রেরণার উৎস। জীবন তো বহমান কিন্তু তার কিছু কিছু অংশ উজ্জ্বল, আলোকদায়িনী।

তখন সবেমাত্র ভর্তি হয়েছি।শামসুন্নাহার হলের আবাসিক মেয়ে আমি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনকিছুই ভালো করে চিনে উঠতে পারিনি। হল থেকে সতীর্থদের সাথে ক্লাসে আর ক্লাস থেকে হলে। হলে এর মধ্যেই আশেপাশের রুমের মেয়েরা জেনে গেছে আমি গান গাই। যদ্দুর মনে পরে দর্শন বিভাগের শেলী শামসুন্নাহার হলের ২০০৪ রুমে আমাকে প্রথম বলে 'চলো লাকী ভাইয়ের সাথে দেখা করে আসি। চলো গিয়ে সাংস্কৃতিক দলে জয়েন করি।' শেলী নিজেও অনেক ভালো গান গাইত। তো ওর সাথেই প্রথম আমি টিএসসিতে দোতলায় লাকী ভাইয়ের অফিসে যাই। আমি কিন্তু কোনো ইন্টারভিউ বা পরীক্ষা দেইনি। সরাসরি লাকী ভাই এর অফিস, ওখানে অনেকের সাথে দেখা হলো, কথা হলো, গান হলো। হয়ে গেলাম আমি সাংস্কৃতিক দলের একজন।তার সামনে গান গাওয়াটা আর উৎরে যাওয়াটাই হয়তো ইন্টারভিউ। তারপর থেকে ক্লাস শেষে ফেরার সময় প্রায় প্রতিদিন দুপুর ১২.৩০ থেকে ১.০০ টার দিকে টিএসসিতে সাংস্কৃতিক দলের কার্যালয়ে যেতাম।

 

ওখানে গিয়েই পরিচয় হলো সুজিত মোস্তফা ভাই, সুমন দা, পুলক দা, টোকন ভাই, সাজিদ আকবর ভাই, শাকিলা জাফর আপা। যারা এখন সংগীত জগতের গুণী ব্যক্তিত্ব তাঁদের সাথে। আমি আর শেলী আর রোকেয়া হল থেকে আসতো ছিপছিপে শ্যামলা মেয়ে বেলী। এছাড়াও অনেকে আসতো। নাহিদ আপা আসতেন মাঝে মাঝে। হঠাৎ ঝড়ের মতন ঢুকে পড়তেন তিনি। সাদা শাড়ী আর কালো টিপে খুব উজ্জ্বল দেখাতো তাকে। এত সুন্দর লাগতো তাকে যে আজও তেমনি আছেন তিনি আমার মনের মাঝে।

আমরা আড্ডা মারতাম, গান করতাম, গান শিখতাম।অনেক সময় লাকী ভাইয়ের রুমের পাশের রুমে যেখানে অনেক সময় অন্যান্য মহড়া বা ক্লাস চলত।

আমার প্রথম বিটিভি অনুষ্ঠান ঢাবিসাদের হয়ে ক্যাম্পাস অনুষ্ঠানে। আমরা সব কোরাস গান করেছিলাম। বিটিভির বাস টিএসসি থেকে আমাদের নিয়ে গেছিলো আবার নামিয়ে দিয়েছিলো। মনে আছে শাকিলা আপা আমাদের সাথে মহড়া করলেও রেকর্ডিং এর দিন আসেন নি। অবশ্য তখন তিনি সদ্য তারকা হয়ে উঠছিলেন। একটা উদ্দীপনাময় গানের কথা খুব মনে আছে যা মাঝে মাঝে এখনো গেয়ে উঠি যা লাকী ভাইয়ের শেখানো। সলিল চৌধুরীর কালজয়ী সঙ্গীত

'ও আলোর পথযাত্রী এ যে রাত্রি এখানে থেমো না'।

 

জিমনেসিয়াম মাঠেও আমাদের অনেক বড় অনুষ্ঠান হয়েছিলো। আমার ডাকসুর প্রথম স্টেজ প্রোগ্রাম। লাকী ভাই গান তুলে দিয়েছিলেন। 'জনম জনম তব তরে কাঁদিব।' মনে আছে সেই অনুষ্ঠানে স্টেজে বসে প্রথম দেখেছিলাম সোহেলসহ আরো অনেকের নৃত্য পরিবেশনা।

 

আমি হিসাব বিজ্ঞান এর ছাত্রী। আমার বিভাগ সেমিস্টার সিস্টেমের। যার জন্য প্রতি সপ্তাহেই কোন না কোন মিডটার্ম পরীক্ষা থাকত। না শুধু পড়াশোনার জন্যই নয় ব্যক্তিগত নানা কারণে জানি না কেন, কেমন করে ধীরে ধীরে যাওয়া আসা আগের চাইতে কমে আসল। লাকী ভাই দেখা হলেই বলতেন ' কিরে কেন তুই আসছিস না। তোর এত ভালো গলা। '

লাকী ভাই অবশ্যই ভুলে গেছেন কিন্তু আমার মনে আছে। যেটুকুই হোক না সাংস্কৃতিক দলের এই স্মৃতিগুলোর মূল্য আমার কাছে অনেক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের অনেক নিবেদিত প্রাণকর্মী আজ দেশে বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে । সবার সাথে এখন এককাট্টা সম্পর্ক বজায় আছে দেখে নিজেকে খুব গর্বিত লাগে। কারণ আমিও তো দলের উত্তাল দিনের সংগী।

লাকী ভাই আমাকে সেই স্বল্পকালীন সময়ের দিনগুলোতে যে স্নেহ ভালোবাসা দেখিয়েছিলেন তাঁর তুলনা নাই।

মহান আল্লাহ কাছে লাকী ভাই ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের সবার জন্যে সুস্বাস্থ্য, আনন্দ ও দীর্ঘজীবন কামনা আমার সকল প্রার্থনায়।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান